১০:২০ এম
একসময় যে নদীর পানিতে মাছের প্রাচুর্য ছিল, এখন সেই নদীটি মাছহীন ও স্রোতহীন হয়ে পড়েছে। হাঁড়িধোয়া নদী বর্তমানে বিষের নদী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। রুই, কাতল, মৃগেল, বোয়াল, চিতল, পুঁটি, মলা, ঢেলাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের সমাহার ছিল এখানে। কিন্তু এখন হাঁড়িধোয়ার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
নদীর পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় এটি অনেকটা খালের মতো হয়ে গেছে। কলকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য এবং বাজারের ময়লা-আবর্জনায় হাঁড়িধোয়া নদীর পানি দীর্ঘদিন ধরে কালো বিষে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি, নদীর পানি আরও কালচে হয়ে উঠেছে। কোথাও কোথাও পানির রং দেখে মনে হয়, যেন আলকাতরা মিশে আছে।
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার হাঁড়িধোয়া নদীর বর্তমান অবস্থা এমনই। নরসিংদীর মাধবদী, শেখেরচর ও পাইকারচর এলাকার পাওয়ারলুম ও বস্ত্র কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য পানি নদীতে ফেলার অভিযোগ উঠেছে।
আরও পড়ুন: রাঙামাটিতে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে যানবাহন মেরামতের প্রশিক্ষণ, সনদ পেলেন ১৭ যুবক
স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, অনেক কারখানা বর্জ্য পরিশোধনের জন্য ইটিপি (বর্জ্যপানি শোধনাগার) ব্যবহার না করে দূষিত পানি নদীতে ছেড়ে দিচ্ছে। সেই দূষিত পানি হাঁড়িধোয়ায় এসে মিশে যাচ্ছে। পাশাপাশি নদীর দুই পাড়ের বিভিন্ন জনপদ থেকে গৃহস্থালি বর্জ্য ও বাজারের আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। সব মিলিয়ে নদীটি তার স্বাভাবিক রূপ হারিয়েছে। মাছের সংখ্যা কমে গেছে এবং কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য পানি অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। নদীর পাড়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
নদীর পানি দূষিত হয়ে পড়ায় কৃষিকাজেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আগে নদীর পানি ব্যবহার করে জমিতে চাষাবাদ করা সম্ভব ছিল। কিন্তু এখন দূষণের কারণে কৃষকেরা সেই পানি ব্যবহার করতে চান না। পানির অভাবে অনেক জমিতে চাষাবাদ বন্ধ হয়ে গেছে, স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে।
বিশনন্দী ইউনিয়নের বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, ‘একসময় হাঁড়িধোয়া নদীতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এখন দূষণের কারণে নদীতে মাছ নেই বললেই চলে। কখনো কখনো মাছ মরে ভেসে উঠতে দেখা যায়।’ তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন মিল-কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য নদীতে ফেলার কারণে পানির এই বেহাল দশা হয়েছে।
নদীরক্ষা কমিটির নেতা প্রকৌশলী মাহফুজ সালমান বলেন, নদীটির সেই পুরনো রূপ আর নেই। তিনি ছোটবেলার স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘ছোটবেলায় আমরা এই নদীতে মাছ শিকার করেছি, গোসল করেছি। এখন দূষণের কারণে নদীটি তার সব ঐতিহ্য হারিয়েছে।
আরও পড়ুন: জোরারগঞ্জ থানা পুলিশের অভিযানে মাদকসেবীসহ গ্রেফতার ১৪
নদীর পানি থেকে দুর্গন্ধ ছড়ানোর কথাও জানান কুতুব উদ্দিন। তিনি বলেন, দুর্গন্ধের কারণে নদীর পাড় দিয়ে হাঁটাচলা করাও কষ্টকর হয়ে উঠেছে।
রামচন্দ্রদীর বাসিন্দা রোহেল সিকদার বলেন, ‘হাঁড়িধোয়া নদী একসময় মিঠাপানির মাছের জন্য বিখ্যাত ছিল। এই নদীর মাছ খুব সুস্বাদু ছিল। রুই, কাতল, মৃগেল, পুঁটি, চিতল, বোয়াল, মলা, ঢেলা, চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। আমরা দল বেঁধে মাছ ধরতে আসতাম। নদীর পাড়ে বসে মানুষ আড্ডা দিত। কিন্তু সেই দিন এখন আর নেই।’
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হাঁড়িধোয়া নদী বিশনন্দী ইউনিয়নের মেঘনা ঘাট এলাকা থেকে শুরু হয়ে খাগকান্দা ইউনিয়নের মেঘনা ঘাটে গিয়ে মিশেছে। নদীটির প্রকৃত নাম মেঘনার হাঁড়িধোয়া নদী। একসময় এই নদী ঘিরে আশপাশের জনপদে মানুষের জীবনযাত্রা, মাছ ধরা ও কৃষিকাজের নানা কর্মকাণ্ড চলত। বর্তমানে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীটির অনেক অংশ খালের মতো দেখায়।
আড়াইহাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুর রহমান বলেন, ‘হাঁড়িধোয়া নদীর বিষয়ে আমরা এর আগে নরসিংদীর জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলেছি। নদীটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে প্রশাসনিকভাবে চেষ্টা চলছে।’
আরও পড়ুন: কুমিল্লায় কর্ণফুলী এক্সপ্রেসের চার বগি লাইনচ্যুত, আপ লাইনে ট্রেন চলাচল বন্ধ
এমই
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন