১০:৩৯ এম
‘একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না?
এটি শিল্পী ভূপেন হাজারিকার কালজয়ী গান ‘মানুষ মানুষের জন্য’-এর একটি অত্যন্ত আবেগঘন ও জনপ্রিয় লাইন। গানটির মূল থিম হলো মানবতার ডাক, যেখানে মানুষকে স্বার্থপরতা ভুলে একে অপরের বিপদে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। গানের মূল অংশটুকু হচ্ছেÑ
‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য
একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না? ও বন্ধু...’
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্র ওলামা লীগ নেতার বিএনপিতে যোগদান নাকি সৌজন্য সাক্ষাৎ?
সমাজে একা বাঁচার সুযোগ নেই। একজন মানুষের বিপদে অন্য একজন মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন। বিপদে এগিয়ে আসা দয়া বা করুণা নয়, বরং এটি মানবতার পরিচায়ক। মানুষের প্রতি মানুষের সহজাত দায়িত্বই এটি। কিন্তু এই মানবিকতা যেন হারিয়ে গেছে। মেট্রোরেলের একজন শিক্ষকের মৃত্যু সেই সত্যকে পুনর্ব্যক্ত করছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ নাজিবুর রহমান গত ২৪ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে এসেছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে বিকাল ৩টার দিকে তিনি শাহবাগ স্টেশন থেকে উত্তরায় তার বাসায় যাওয়ার উদ্দেশে মেট্রোরেলে ওঠেন। ট্রেনটিতে প্রচণ্ড ভিড় ছিল। শেওড়াপাড়া ও কাজিপাড়া স্টেশনের মাঝামাঝি ট্রেনটি যাওয়ার পর ড. নাজিবুর হঠাৎ প্রচণ্ড অসুস্থতাবোধ করেন। দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তিনি এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ছিলেন যে, পাশে বসে থাকা যাত্রীদের কাছে বসার জন্য অনুরোধ জানান। তিনি কয়েকবারই বলতে থাকেন আমি প্রচণ্ড অসুস্থতাবোধ করছি কেউ একজন আমাকে একটু বসতে দিন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কেউ তার আকুতি কিংবা অনুরোধে সাড়া দেয়নি, একটি আসন ছেড়ে দিয়ে তাকে বসতে দেয়নি।
বসার অনুরোধ করার মাত্র এক-দুই মিনিটের মধ্যেই তিনি মেট্রোরেলের মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। তার ছেলে নাকিবুর রহমানের ধারণা, ট্রেনের ভেতরে পড়ে যাওয়ার মুহূর্তেই তার বাবা স্ট্রোক করে এবং জীবনাবসান হয়। ট্রেনটি উত্তরা উত্তর স্টেশনে পৌঁছালে আনসার সদস্য ও কর্তৃপক্ষের সহায়তায় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল করে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকরা শরীর পরীক্ষা করে জানান, তিনি আগেই মারা গেছেন।
এই মৃত্যু নিয়ে তার ছেলে নাকিবুর রহমান একটি পোস্ট দেন। তিনি লেখেন, ‘ছেলে হিসেবে আজীবন একটাই আক্ষেপ থাকবে, কেউ যদি আব্বুকে ট্রেনের আসনে একটু বসতে দিতেন, তাহলে হয়তো তিনি এভাবে মেঝেতে লুটিয়ে না পড়ে কারো কোলে মাথা রেখে শান্তিতে বিদায় নিতে পারতেন।’ তবে নাকিবুর এ নিয়ে কারো দোষারোপ করতে চান না। তার একটিই অনুরোধ গণপরিবহনে মানুষ প্রবীণ ও অসুস্থ যাত্রীদের প্রতি যেন একটু সংবেদনশীল ও সহনশীল হয়।
আরও পড়ুন: ত্রয়োদশ সংসদের চতুর্থ অধিবেশন ৯ নভেম্বর শুরু হবে
মানুষের অন্তর কি মরে গেছে!
একটি আধুনিক গণপরিবহনে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ও স্পষ্টত অসুস্থ মানুষ বসার আকুতি জানানোর পরও কারো সিট ছেড়ে না দেওয়াটা নাগরিক সংবেদনশীলতার চরম অবক্ষয়ের কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে।
ব্যস্ত শহরে যান্ত্রিক জীবনের কারণে মানুষের মাঝে এক ধরনের তীব্র আত্মকেন্দ্রিকতা বা অন্যের বিপদে চোখ বন্ধ করে রাখার যে প্রবণতা তৈরি হচ্ছে, এটা তারই নির্মম উদাহরণ।
গণপরিবহনে প্রবীণ বা অসুস্থদের অগ্রাধিকার দেওয়ার যে স্বাভাবিক সামাজিক ও নৈতিক নিয়ম রয়েছে, তা পুরোপুরি উপেক্ষিত হয়েছে এ ঘটনা তারই প্রমাণ।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের ‘গার্ডিয়ান শার্ক’ মহড়া শুরু
এই মর্মান্তিক ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে যে, অবকাঠামোগতভাবে আমরা আধুনিক হলেও সামাজিকভাবে সহমর্মিতা ও মানবিক আচরণের দিক থেকে কতটা পিছিয়ে পড়ছি। মানুষ এতটাই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে যে, চারপাশের অন্য মানুষের কষ্ট, প্রয়োজন বা সংকট তাকে স্পর্শ করল না, যাকে নাগরিক উদাসীনতা বলা যায়।
যে কোনো সভ্য সমাজে প্রবীণ, শিশু, গর্ভবতী নারী কিংবা অসুস্থ মানুষকে নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে জায়গা ছেড়ে দেওয়া একটি ন্যূনতম সামাজিক শিষ্টাচার। এই ন্যূনতম সৌজন্যটুকু হারিয়ে যাওয়া সমাজের নৈতিক কাঠামোর ভাঙনকেই বোঝায়।
অথচ পৃথিবীতে মানবিকতার কত সুন্দর উদাহরণ আছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য ব্রিটিশ তরুণ নিকোলাস উইন্টন সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় ৯টি ট্রেনের ব্যবস্থা করে তৎকালীন চেকোস্লোভাকিয়া থেকে ৬৬৯ জন ইহুদি শিশুকে ইংল্যান্ডে পাচার করে জীবন বাঁচিয়েছিলেন। তিনি প্রায় ৫০ বছর এই ত্যাগের কথা কাউকে জানাননি। পরে তার স্ত্রী ঘরের চালার গোপন নথিতে শিশুদের তালিকা খুঁজে পাওয়ায় বিশ্ববাসী এই নীরব নায়কের খোঁজ পায়।
আরও পড়ুন: এনসিপির ক্রীড়া উইং ‘ন্যাশনাল স্পোর্টস অ্যালায়েন্স’ আত্মপ্রকাশ
কোনো কোনো মানুষ নিজের জীবন বিলিয়ে দেয় পুরো সমাজকে আলোর পথ দেখাতে। ইতিহাসে এমন অনেক চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী আছেন, যারা মহামারি বা সংক্রামক রোগের ওষুধ আবিষ্কারের সময় নিজের শরীরেই প্রথম সেই মরণব্যাধির জীবাণু প্রবেশ করিয়ে পরীক্ষা করেছেন, যেন মানবজাতি বেঁচে যায়।
২০১১ সালে জাপানের ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিস্ফোরণের পর যখন প্রাণঘাতী তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে, তখন দেশের শত শত প্রবীণ নাগরিক (যাদের বয়স ৬০ বছরের উপরে) তরুণদের সরিয়ে দিয়ে নিজেরা সেই বিপজ্জনক এলাকা পরিষ্কার করার দায়িত্ব নেন। তাদের যুক্তি ছিল‘আমাদের আয়ু তো শেষের দিকে, তেজস্ক্রিয়তায় ক্যানসার হতে কয়েক বছর লাগবে, ততদিনে আমরা হয়তো স্বাভাবিকভাবেই মারা যাব। কিন্তু দেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ এখনো পড়ে আছে, তাই তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি আমরাই নেব।’
সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় যখন বোমা বর্ষণে পুরো আলেপ্পো শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছিল এবং মানুষ জীবন বাঁচাতে শহর ছাড়ছিল, তখন আলা আল-জলিল নামের একজন সাধারণ অ্যাম্বুলেন্স চালক শহর ছাড়েননি। তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরে ফেলে যাওয়া এবং অনাহারে থাকা শত শত বিড়াল ও পরিত্যক্ত প্রাণীদের জন্য একটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলেন এবং নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের খাবার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।
যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডের সমুদ্র উপকূলে ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবী ও সাধারণ নাগরিকদের দ্বারা পরিচালিত একটি সংস্থা রয়্যাল ন্যাশনাল লাইফবোট ইনস্টিটিউশন। এর সদস্যরা কোনো বেতন বা আর্থিক লাভ ছাড়াই ঝড়-তুফানের রাতে উত্তাল সমুদ্রে লাইফবোট নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন শুধুমাত্র ডুবন্ত অপরিচিত কোনো মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য।
আরও পড়ুন: ডিএনএ বিশ্লেষণে সর্বোচ্চ ১৭৪৭ গুণ দ্রুত বাকৃবির নতুন সফটওয়্যার
বিভিন্ন দেশে গণপরিবহন ব্যবহারের সংস্কৃতি
জাপানের গণপরিবহন ব্যবস্থা বিশ্বজুড়ে তাদের শৃঙ্খলার জন্য বিখ্যাত। রেলে বা বাসে ওঠার জন্য জাপানিরা প্ল্যাটফর্মে নিখুঁত একক লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন। কেউ ধাক্কাধাক্কি বা লাইন ভাঙার কথা চিন্তাও করে না।
জাপানি সংস্কৃতিতে প্রবীণদের প্রতি সম্মান ওমোতেনাশি বা আতিথেয়তার অংশ। যদিও আত্মমর্যাদাশীল অনেক জাপানি প্রবীণ সহজে অন্যের দয়া নিতে চান না, তবুও তরুণরা অত্যন্ত বিনীতভাবে এবং কোনো রকম শোরগোল না করে প্রবীণ বা অসুস্থদের বসার জায়গা ছেড়ে দেন।
লন্ডনের টিউব (পাতাল রেল) এবং বাসে সাধারণ মানুষের মাঝে সহমর্মিতা বাড়াতে লন্ডনের পরিবহন কর্তৃপক্ষ একটি চমৎকার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা চালু করেছে। সেটা হচ্ছে অনুগ্রহ করে আমাকে একটি আসন দিন লেখা বিশেষ ব্যাজ ও কার্ড প্রদান। ট্রেনে কোনো যাত্রী এই ব্যাজ পরা কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে মুহূর্তের মধ্যে নিজে থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তাকে বসার জায়গা করে দেন। কোনো প্রশ্ন বা দ্বিধা ছাড়াই নাগরিকরা এই দায়িত্ব পালন করেন।
আরও পড়ুন: ধর্মমন্ত্রী কায়কোবাদ ১০ কোটি টাকা ফেরত আনতে দ্রুত পদক্ষেপ নেন, হজের কোটা বাড়াতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর দাবি হাবের
সিঙ্গাপুরের ‘কেয়ার জোন’ এবং মানবিক সংস্কৃতিÑসিঙ্গাপুরের গণপরিবহন ব্যবস্থা অত্যন্ত আধুনিক হলেও তারা মানবিক মূল্যবোধকে প্রযুক্তির ওপরে স্থান দিয়েছে। অনেক বড় মেট্রো স্টেশনে সুনির্দিষ্ট কিছু এলাকা থাকে যেগুলোকে বলা হয় ‘হার্ট জোন’। এখানে প্রবীণ, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বা শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা দাঁড়ালে সাধারণ সহযাত্রীরা নিজে থেকে এগিয়ে আসেন এবং তাদের হাত ধরে নিরাপদে ট্রেনে বা বাসে চড়ে আসন পেতে সাহায্য করেন।
সিঙ্গাপুরে সংরক্ষিত আসনগুলোতে কোনো সুস্থ তরুণ বসে থাকলেও প্রবীণ কেউ কামরায় প্রবেশ করা মাত্রই তরুণরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ান।
জার্মানি এবং ফ্রান্সে ট্রেনে উচ্চস্বরে কথা বলা বা ফোনে জোরে কথা বলা নিষিদ্ধ। তারা বিশ্বাস করে, সহযাত্রীদের মানসিক শান্তি নষ্ট না করাও এক ধরনের মানবিকতা।
বাসে বা ট্রেনে সাধারণ আসন ফাঁকা থাকলেও কেউ প্রবীণ বা গর্ভবতী নারীদের জন্য নির্ধারিত আসনে বসেন না। আর যদি পুরো ট্রেন পূর্ণ থাকে, তবে প্রবীণ বা স্পষ্টত কোনো অসুস্থ মানুষ ভেতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে একাধিক তরুণ আসন ছেড়ে দেওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার সংস্কৃতিতে কনফুসীয় মূল্যবোধের গভীর প্রভাব রয়েছে, যা প্রবীণদের সর্বোচ্চ সম্মান দিতে শেখায়।
কোরিয়ান সাবওয়েতে প্রবীণদের জন্য নির্দিষ্ট আসনগুলো ট্রেন পুরোপুরি উপচে পড়া ভিড় থাকলেও কোনো তরুণ বা সুস্থ মানুষ ভুলেও ব্যবহার করেন না। আসনগুলো প্রবীণদের জন্যই ফাঁকা রাখা হয়, যাতে তারা যে কোনো স্টেশনে উঠেই সরাসরি বসতে পারেন।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিষ্ঠাচার ও নৈতিকতা শিক্ষার গুরুত্ব দেওয়া হোক
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল জিপিএ-৫ বা সনদ পাওয়ার জায়গা নয়, এটি মানুষ গড়ার কারখানাও। প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত কেবল মুখস্থ করার জন্য ‘ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা’ বই না রেখে, ব্যবহারিক শিষ্টাচার শেখানো উচিত। যেমনÑকীভাবে লাইনে দাঁড়াতে হয়, প্রবীণ ও অসুস্থদের কীভাবে সাহায্য করতে হয়, এবং অন্যের অধিকারকে কীভাবে সম্মান জানাতে হয়।
যেহেতু সংকটটি গণপরিবহনে তীব্রভাবে প্রকাশ পেয়েছে, তাই পরিবহন মন্ত্রণালয় ও ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড কিছু সৃজনশীল পদক্ষেপ নিতে পারে।
মানবতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ সম্পর্কে নবীজির শিক্ষা
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন দর্শন ও শিক্ষা হলো মানবতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের সর্বশ্রেষ্ঠ স্মারক। আজকের অবক্ষয় থেকে আমাদের প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে নবীজি (সা.)-এর শিক্ষায় তাদের গড়ে তুলতে হবে।
বড়দের প্রতি সম্মান ও ছোটদের প্রতি স্নেহপ্রবণ হওয়ার অনন্য উপদেশ দিয়ে গেছেন নবীজি (সা.)। সুনানে আবু দাউদের এক হাদিসে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান জানায় না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’
নবীজির এই শিক্ষা যদি আমাদের জানা থাকত, তাহলে মেট্রোরেলে ওই প্রবীণ শিক্ষকের প্রতি আমরা অবহেলা করতাম না। অসুস্থ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ড. নাজিবুর রহমানের অনুরোধ শোনামাত্রা আমরা মেট্রোরেলে নিজের আসন ছেড়ে দিয়ে তাকে বসতে দিতাম। তাহলে সেটা হতো নবীজির (সা.)-এর শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন।
নবীজি (সা.) মানুষের উপকার করাকে শ্রেষ্ঠ ইবাদত হিসেবে বলে গেছেন। তিনি বলেছেন, সমাজসেবা ও পরোপকার ঈমানের অঙ্গ এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল।
আল মুজামুল আওসাদ-এর একটি হাদিসে আছে, নবীজি (সা.) বলেন, ‘মানুষের মধ্যে সেই সর্বোত্তম, যে মানুষের সবচেয়ে উপকার করে।’ মেট্রোরেলে যখন একজন যাত্রী হিসেবে শিক্ষক ড. নাজিবুর রহমান তীব্র অসুস্থতায়ে ছটফট করে সিটে বসতে চাইছিলেন, তখন মোবাইল বা ল্যাপটপে মগ্ন না থেকে কিংবা না শোনার ভান করে অনুরোধ অগ্রাহ্য করা ঠিক হয়নি।
ওই যাত্রীদের কেউ যদি তাকে সাহায্য করতে নিজের আসনটি ছেড়ে দিতেন, তাহলে নবীজির (সা.) দৃষ্টিতে তিনি নফল ইবাদতের চেয়েও উত্তম কাজ করার সওয়াব পেতেন।
নবীজি (সা.) তাঁর সাহাবিদের রাস্তার অধিকার (হক) আদায়ের উপদেশ দিয়ে গেছেন। সাহাবিরা যখন নবীজিকে (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, রাস্তার হক কী? তখন নবীজি (সা.) অন্য বিষয়ের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘পথহারাকে পথ দেখানো এবং বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করা’ (সহীহ বুখারী)।
ড. নাজিবুর রহমানকে সাহায্য করা যে একটি দ্বীনি ও নৈতিক দায়িত্ব ছিল এ হাদিস থেকেও আমরা তার শিক্ষা পাই।
নবীজি (সা.) মুসলিম উম্মাহকে একটি দেহের সঙ্গে তুলনা করেছেন। পারস্পরিক সহমর্মিতার অভাব দূর করতে নবীজি (সা.)-এর অনন্য একটি হাদিস আছে। সহীহ মুসলিম শরীফের এই হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন, ‘মুমিনদের পারস্পরিক মহব্বত, দয়া ও অনুগ্রহের উদাহরণ একটি দেহের মতো। যখন দেহের কোনো অঙ্গ অসুস্থ বা ব্যথাতুর হয় তখন পুরো দেহ জাগ্রত থেকে ও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে তার সঙ্গে শরিক হয়।’ নবীজি (সা.)-এর এই শিক্ষা জীবন্ত থাকলে মেট্রোরেলের পুরো কামরায় ড. নাজিবুর রহমানের সাহায্যের আবেদনে যাত্রীদের অস্থির হয়ে ওঠার কথা ছিল। নবীজির (সা.) ওই শিক্ষা সমাজকে আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে বের করে আনতে পারে।
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কোনো মুমিনের একটি সংকট দূর করবে, আল্লাহ তার কিয়ামতের দিন একটি বড় সংকট দূর করবেন’ (সহীহ মুসলিম)।
নবীজির (সা.) এসব শিক্ষা কেবল বইয়ের পাতায় বা বক্তব্য-ওয়াজ মাহফিলে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। চর্চা করতে হবে। তাহলে কোনো অসুস্থ মানুষ, কোনো প্রবীণ মানুষ বিপদগ্রস্ত হবেন না, সাহায্য পাবেন।
পবিত্র কোরআনের শিক্ষা
পবিত্র কোরআনের মূল বাণীই হলো মানুষের প্রতি দয়া, ইনসাফ ও সামাজিক দায়িত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করা।
পবিত্র কোরআনে মানুষের জীবনের মূল্যকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। সূরা মায়িদাহর ৩২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মানুষের জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করল।’ মেট্রোরেলে অসুস্থ শিক্ষক ড. নাজিবুর রহমানকে বসার জায়গা দেওয়া বা দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করার ক্ষুদ্র উদ্যোগটি কোনো যাত্রী তখন করলে সেটি হতে পারত পবিত্র কোরআন অনুযায়ী মানুষের জীবন বাঁচানোর দৃষ্টান্ত। যা পুণ্য হিসেবে গণ্য হতো।
মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে মুমিনদের একে অপরের ভালো কাজে হাত বাড়াতে বলেছেন। সূরা মায়িদাহর ২ নম্বর আয়াতে আছে, ‘সৎকর্ম ও আল্লাহভীতিতে তোমরা একে অপরের সাহায্য করো। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সাহায্য করো না।’ পবিত্র কোরআনের এই নির্দেশ অমান্য করে মুখ ফিরিয়ে রাখা সামাজিক অপরাধ। পবিত্র কোরআনে আত্মকেন্দ্রিকতা ও উদাসীনতা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মানুষের কষ্ট দেখেও না দেখার ভান করার অভ্যাসের সমালোচনা করা হয়েছে।
সূরা মাউনের ৪-৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘ধ্বংস সেই নামাজিদের জন্য যারা ছোটখাটো সাহায্য করতেও অস্বীকৃতি জানায় বা উদাসীন থাকে। এখানে মাউন শব্দের অর্থ নিত্যদিনকার ছোট-খাটো সাহায্য। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ মানুষকে পারস্পরিক আচরণের ক্ষেত্রে দয়াশীল হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
সূরা ফালাকের ১৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, অতঃপর সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয় যারা ঈমান এনেছে এবং পরস্পরকে ধৈর্য ও দয়া-সহানুভূতির উপদেশ দেয়।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে অহংকার ও নিষ্ঠুরতা বর্জন করার কথা বলেছেন। অহংকারবশত অন্যের প্রয়োজনকে গুরুত্ব না দেওয়া কোরআনের দৃষ্টিতে চরম অপছন্দনীয় আচরণ।
লোকমান হাকিম তার সন্তানকে উপদেশ দিতে গিয়ে যা বলেছিলেন তা সূরা লোকমানের ১৮ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, ‘অহংকারবশত তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না, এবং পৃথিবীতে গর্বভরে পদচারণা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দাম্ভিক, অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ ড. নাজিবুরের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ পবিত্র কোরআনের এই সহমর্মিতা ও জীবন রক্ষার শিক্ষাকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অনুসরণ করতে হবে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক (বর্তমানে সরকারের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা)।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন