ঢাকা সোমবার, ০২ই নভেম্বর, ২০২৬খ্রিষ্টাব্দ ১৭ই কার্তিক, ১৪৩২বঙ্গাব্দ ২১শে জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮হিজরী
সোমবার, ০২ই নভেম্বর, ২০২৬ইং ১৭ই কার্তিক, ১৪৩২বাং

সমাজে সহানুভূতির অভাব ও নাগরিক দায়িত্ববোধের সংকট: শিক্ষক ড. নাজিবুর রহমানের মৃত্যু


সমাজে সহানুভূতির অভাব ও নাগরিক দায়িত্ববোধের সংকট: শিক্ষক ড. নাজিবুর রহমানের মৃত্যু

‘একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না?

এটি শিল্পী ভূপেন হাজারিকার কালজয়ী গান ‘মানুষ মানুষের জন্য’-এর একটি অত্যন্ত আবেগঘন ও জনপ্রিয় লাইন। গানটির মূল থিম হলো মানবতার ডাক, যেখানে মানুষকে স্বার্থপরতা ভুলে একে অপরের বিপদে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। গানের মূল অংশটুকু হচ্ছেÑ

‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য
একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না? ও বন্ধু...’

আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্র ওলামা লীগ নেতার বিএনপিতে যোগদান নাকি সৌজন্য সাক্ষাৎ?

সমাজে একা বাঁচার সুযোগ নেই। একজন মানুষের বিপদে অন্য একজন মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন। বিপদে এগিয়ে আসা দয়া বা করুণা নয়, বরং এটি মানবতার পরিচায়ক। মানুষের প্রতি মানুষের সহজাত দায়িত্বই এটি। কিন্তু এই মানবিকতা যেন হারিয়ে গেছে। মেট্রোরেলের একজন শিক্ষকের মৃত্যু সেই সত্যকে পুনর্ব্যক্ত করছে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ নাজিবুর রহমান গত ২৪ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে এসেছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে বিকাল ৩টার দিকে তিনি শাহবাগ স্টেশন থেকে উত্তরায় তার বাসায় যাওয়ার উদ্দেশে মেট্রোরেলে ওঠেন। ট্রেনটিতে প্রচণ্ড ভিড় ছিল। শেওড়াপাড়া ও কাজিপাড়া স্টেশনের মাঝামাঝি ট্রেনটি যাওয়ার পর ড. নাজিবুর হঠাৎ প্রচণ্ড অসুস্থতাবোধ করেন। দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তিনি এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ছিলেন যে, পাশে বসে থাকা যাত্রীদের কাছে বসার জন্য অনুরোধ জানান। তিনি কয়েকবারই বলতে থাকেন আমি প্রচণ্ড অসুস্থতাবোধ করছি কেউ একজন আমাকে একটু বসতে দিন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কেউ তার আকুতি কিংবা অনুরোধে সাড়া দেয়নি, একটি আসন ছেড়ে দিয়ে তাকে বসতে দেয়নি।

বসার অনুরোধ করার মাত্র এক-দুই মিনিটের মধ্যেই তিনি মেট্রোরেলের মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। তার ছেলে নাকিবুর রহমানের ধারণা, ট্রেনের ভেতরে পড়ে যাওয়ার মুহূর্তেই তার বাবা স্ট্রোক করে এবং জীবনাবসান হয়। ট্রেনটি উত্তরা উত্তর স্টেশনে পৌঁছালে আনসার সদস্য ও কর্তৃপক্ষের সহায়তায় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল করে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকরা শরীর পরীক্ষা করে জানান, তিনি আগেই মারা গেছেন।

এই মৃত্যু নিয়ে তার ছেলে নাকিবুর রহমান একটি পোস্ট দেন। তিনি লেখেন, ‘ছেলে হিসেবে আজীবন একটাই আক্ষেপ থাকবে, কেউ যদি আব্বুকে ট্রেনের আসনে একটু বসতে দিতেন, তাহলে হয়তো তিনি এভাবে মেঝেতে লুটিয়ে না পড়ে কারো কোলে মাথা রেখে শান্তিতে বিদায় নিতে পারতেন।’ তবে নাকিবুর এ নিয়ে কারো দোষারোপ করতে চান না। তার একটিই অনুরোধ গণপরিবহনে মানুষ প্রবীণ ও অসুস্থ যাত্রীদের প্রতি যেন একটু সংবেদনশীল ও সহনশীল হয়।

আরও পড়ুন: ত্রয়োদশ সংসদের চতুর্থ অধিবেশন ৯ নভেম্বর শুরু হবে

মানুষের অন্তর কি মরে গেছে!

একটি আধুনিক গণপরিবহনে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ও স্পষ্টত অসুস্থ মানুষ বসার আকুতি জানানোর পরও কারো সিট ছেড়ে না দেওয়াটা নাগরিক সংবেদনশীলতার চরম অবক্ষয়ের কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে।

ব্যস্ত শহরে যান্ত্রিক জীবনের কারণে মানুষের মাঝে এক ধরনের তীব্র আত্মকেন্দ্রিকতা বা অন্যের বিপদে চোখ বন্ধ করে রাখার যে প্রবণতা তৈরি হচ্ছে, এটা তারই নির্মম উদাহরণ।

গণপরিবহনে প্রবীণ বা অসুস্থদের অগ্রাধিকার দেওয়ার যে স্বাভাবিক সামাজিক ও নৈতিক নিয়ম রয়েছে, তা পুরোপুরি উপেক্ষিত হয়েছে এ ঘটনা তারই প্রমাণ।

আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের ‘গার্ডিয়ান শার্ক’ মহড়া শুরু

এই মর্মান্তিক ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে যে, অবকাঠামোগতভাবে আমরা আধুনিক হলেও সামাজিকভাবে সহমর্মিতা ও মানবিক আচরণের দিক থেকে কতটা পিছিয়ে পড়ছি। মানুষ এতটাই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে যে, চারপাশের অন্য মানুষের কষ্ট, প্রয়োজন বা সংকট তাকে স্পর্শ করল না, যাকে নাগরিক উদাসীনতা বলা যায়।

যে কোনো সভ্য সমাজে প্রবীণ, শিশু, গর্ভবতী নারী কিংবা অসুস্থ মানুষকে নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে জায়গা ছেড়ে দেওয়া একটি ন্যূনতম সামাজিক শিষ্টাচার। এই ন্যূনতম সৌজন্যটুকু হারিয়ে যাওয়া সমাজের নৈতিক কাঠামোর ভাঙনকেই বোঝায়।

অথচ পৃথিবীতে মানবিকতার কত সুন্দর উদাহরণ আছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য ব্রিটিশ তরুণ নিকোলাস উইন্টন সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় ৯টি ট্রেনের ব্যবস্থা করে তৎকালীন চেকোস্লোভাকিয়া থেকে ৬৬৯ জন ইহুদি শিশুকে ইংল্যান্ডে পাচার করে জীবন বাঁচিয়েছিলেন। তিনি প্রায় ৫০ বছর এই ত্যাগের কথা কাউকে জানাননি। পরে তার স্ত্রী ঘরের চালার গোপন নথিতে শিশুদের তালিকা খুঁজে পাওয়ায় বিশ্ববাসী এই নীরব নায়কের খোঁজ পায়।

আরও পড়ুন: এনসিপির ক্রীড়া উইং ‘ন্যাশনাল স্পোর্টস অ্যালায়েন্স’ আত্মপ্রকাশ

কোনো কোনো মানুষ নিজের জীবন বিলিয়ে দেয় পুরো সমাজকে আলোর পথ দেখাতে। ইতিহাসে এমন অনেক চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী আছেন, যারা মহামারি বা সংক্রামক রোগের ওষুধ আবিষ্কারের সময় নিজের শরীরেই প্রথম সেই মরণব্যাধির জীবাণু প্রবেশ করিয়ে পরীক্ষা করেছেন, যেন মানবজাতি বেঁচে যায়।

২০১১ সালে জাপানের ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিস্ফোরণের পর যখন প্রাণঘাতী তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে, তখন দেশের শত শত প্রবীণ নাগরিক (যাদের বয়স ৬০ বছরের উপরে) তরুণদের সরিয়ে দিয়ে নিজেরা সেই বিপজ্জনক এলাকা পরিষ্কার করার দায়িত্ব নেন। তাদের যুক্তি ছিল‘আমাদের আয়ু তো শেষের দিকে, তেজস্ক্রিয়তায় ক্যানসার হতে কয়েক বছর লাগবে, ততদিনে আমরা হয়তো স্বাভাবিকভাবেই মারা যাব। কিন্তু দেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ এখনো পড়ে আছে, তাই তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি আমরাই নেব।’

সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় যখন বোমা বর্ষণে পুরো আলেপ্পো শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছিল এবং মানুষ জীবন বাঁচাতে শহর ছাড়ছিল, তখন আলা আল-জলিল নামের একজন সাধারণ অ্যাম্বুলেন্স চালক শহর ছাড়েননি। তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরে ফেলে যাওয়া এবং অনাহারে থাকা শত শত বিড়াল ও পরিত্যক্ত প্রাণীদের জন্য একটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলেন এবং নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের খাবার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।

যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডের সমুদ্র উপকূলে ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবী ও সাধারণ নাগরিকদের দ্বারা পরিচালিত একটি সংস্থা রয়্যাল ন্যাশনাল লাইফবোট ইনস্টিটিউশন। এর সদস্যরা কোনো বেতন বা আর্থিক লাভ ছাড়াই ঝড়-তুফানের রাতে উত্তাল সমুদ্রে লাইফবোট নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন শুধুমাত্র ডুবন্ত অপরিচিত কোনো মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য।

আরও পড়ুন: ডিএনএ বিশ্লেষণে সর্বোচ্চ ১৭৪৭ গুণ দ্রুত বাকৃবির নতুন সফটওয়্যার

বিভিন্ন দেশে গণপরিবহন ব্যবহারের সংস্কৃতি

জাপানের গণপরিবহন ব্যবস্থা বিশ্বজুড়ে তাদের শৃঙ্খলার জন্য বিখ্যাত। রেলে বা বাসে ওঠার জন্য জাপানিরা প্ল্যাটফর্মে নিখুঁত একক লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন। কেউ ধাক্কাধাক্কি বা লাইন ভাঙার কথা চিন্তাও করে না।

জাপানি সংস্কৃতিতে প্রবীণদের প্রতি সম্মান ওমোতেনাশি বা আতিথেয়তার অংশ। যদিও আত্মমর্যাদাশীল অনেক জাপানি প্রবীণ সহজে অন্যের দয়া নিতে চান না, তবুও তরুণরা অত্যন্ত বিনীতভাবে এবং কোনো রকম শোরগোল না করে প্রবীণ বা অসুস্থদের বসার জায়গা ছেড়ে দেন।

লন্ডনের টিউব (পাতাল রেল) এবং বাসে সাধারণ মানুষের মাঝে সহমর্মিতা বাড়াতে লন্ডনের পরিবহন কর্তৃপক্ষ একটি চমৎকার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা চালু করেছে। সেটা হচ্ছে অনুগ্রহ করে আমাকে একটি আসন দিন লেখা বিশেষ ব্যাজ ও কার্ড প্রদান। ট্রেনে কোনো যাত্রী এই ব্যাজ পরা কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে মুহূর্তের মধ্যে নিজে থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তাকে বসার জায়গা করে দেন। কোনো প্রশ্ন বা দ্বিধা ছাড়াই নাগরিকরা এই দায়িত্ব পালন করেন।

আরও পড়ুন: ধর্মমন্ত্রী কায়কোবাদ ১০ কোটি টাকা ফেরত আনতে দ্রুত পদক্ষেপ নেন, হজের কোটা বাড়াতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর দাবি হাবের

সিঙ্গাপুরের ‘কেয়ার জোন’ এবং মানবিক সংস্কৃতিÑসিঙ্গাপুরের গণপরিবহন ব্যবস্থা অত্যন্ত আধুনিক হলেও তারা মানবিক মূল্যবোধকে প্রযুক্তির ওপরে স্থান দিয়েছে। অনেক বড় মেট্রো স্টেশনে সুনির্দিষ্ট কিছু এলাকা থাকে যেগুলোকে বলা হয় ‘হার্ট জোন’। এখানে প্রবীণ, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বা শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা দাঁড়ালে সাধারণ সহযাত্রীরা নিজে থেকে এগিয়ে আসেন এবং তাদের হাত ধরে নিরাপদে ট্রেনে বা বাসে চড়ে আসন পেতে সাহায্য করেন।

সিঙ্গাপুরে সংরক্ষিত আসনগুলোতে কোনো সুস্থ তরুণ বসে থাকলেও প্রবীণ কেউ কামরায় প্রবেশ করা মাত্রই তরুণরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ান।

জার্মানি এবং ফ্রান্সে ট্রেনে উচ্চস্বরে কথা বলা বা ফোনে জোরে কথা বলা নিষিদ্ধ। তারা বিশ্বাস করে, সহযাত্রীদের মানসিক শান্তি নষ্ট না করাও এক ধরনের মানবিকতা।

বাসে বা ট্রেনে সাধারণ আসন ফাঁকা থাকলেও কেউ প্রবীণ বা গর্ভবতী নারীদের জন্য নির্ধারিত আসনে বসেন না। আর যদি পুরো ট্রেন পূর্ণ থাকে, তবে প্রবীণ বা স্পষ্টত কোনো অসুস্থ মানুষ ভেতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে একাধিক তরুণ আসন ছেড়ে দেওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করেন।

দক্ষিণ কোরিয়ার সংস্কৃতিতে কনফুসীয় মূল্যবোধের গভীর প্রভাব রয়েছে, যা প্রবীণদের সর্বোচ্চ সম্মান দিতে শেখায়।

কোরিয়ান সাবওয়েতে প্রবীণদের জন্য নির্দিষ্ট আসনগুলো ট্রেন পুরোপুরি উপচে পড়া ভিড় থাকলেও কোনো তরুণ বা সুস্থ মানুষ ভুলেও ব্যবহার করেন না। আসনগুলো প্রবীণদের জন্যই ফাঁকা রাখা হয়, যাতে তারা যে কোনো স্টেশনে উঠেই সরাসরি বসতে পারেন।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিষ্ঠাচার ও নৈতিকতা শিক্ষার গুরুত্ব দেওয়া হোক

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল জিপিএ-৫ বা সনদ পাওয়ার জায়গা নয়, এটি মানুষ গড়ার কারখানাও। প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত কেবল মুখস্থ করার জন্য ‘ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা’ বই না রেখে, ব্যবহারিক শিষ্টাচার শেখানো উচিত। যেমনÑকীভাবে লাইনে দাঁড়াতে হয়, প্রবীণ ও অসুস্থদের কীভাবে সাহায্য করতে হয়, এবং অন্যের অধিকারকে কীভাবে সম্মান জানাতে হয়।

যেহেতু সংকটটি গণপরিবহনে তীব্রভাবে প্রকাশ পেয়েছে, তাই পরিবহন মন্ত্রণালয় ও ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড কিছু সৃজনশীল পদক্ষেপ নিতে পারে।

মানবতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ সম্পর্কে নবীজির শিক্ষা

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন দর্শন ও শিক্ষা হলো মানবতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের সর্বশ্রেষ্ঠ স্মারক। আজকের অবক্ষয় থেকে আমাদের প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে নবীজি (সা.)-এর শিক্ষায় তাদের গড়ে তুলতে হবে।

বড়দের প্রতি সম্মান ও ছোটদের প্রতি স্নেহপ্রবণ হওয়ার অনন্য উপদেশ দিয়ে গেছেন নবীজি (সা.)। সুনানে আবু দাউদের এক হাদিসে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান জানায় না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’

নবীজির এই শিক্ষা যদি আমাদের জানা থাকত, তাহলে মেট্রোরেলে ওই প্রবীণ শিক্ষকের প্রতি আমরা অবহেলা করতাম না। অসুস্থ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ড. নাজিবুর রহমানের অনুরোধ শোনামাত্রা আমরা মেট্রোরেলে নিজের আসন ছেড়ে দিয়ে তাকে বসতে দিতাম। তাহলে সেটা হতো নবীজির (সা.)-এর শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন।

নবীজি (সা.) মানুষের উপকার করাকে শ্রেষ্ঠ ইবাদত হিসেবে বলে গেছেন। তিনি বলেছেন, সমাজসেবা ও পরোপকার ঈমানের অঙ্গ এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল।

আল মুজামুল আওসাদ-এর একটি হাদিসে আছে, নবীজি (সা.) বলেন, ‘মানুষের মধ্যে সেই সর্বোত্তম, যে মানুষের সবচেয়ে উপকার করে।’ মেট্রোরেলে যখন একজন যাত্রী হিসেবে শিক্ষক ড. নাজিবুর রহমান তীব্র অসুস্থতায়ে ছটফট করে সিটে বসতে চাইছিলেন, তখন মোবাইল বা ল্যাপটপে মগ্ন না থেকে কিংবা না শোনার ভান করে অনুরোধ অগ্রাহ্য করা ঠিক হয়নি।

ওই যাত্রীদের কেউ যদি তাকে সাহায্য করতে নিজের আসনটি ছেড়ে দিতেন, তাহলে নবীজির (সা.) দৃষ্টিতে তিনি নফল ইবাদতের চেয়েও উত্তম কাজ করার সওয়াব পেতেন।

নবীজি (সা.) তাঁর সাহাবিদের রাস্তার অধিকার (হক) আদায়ের উপদেশ দিয়ে গেছেন। সাহাবিরা যখন নবীজিকে (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, রাস্তার হক কী? তখন নবীজি (সা.) অন্য বিষয়ের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘পথহারাকে পথ দেখানো এবং বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করা’ (সহীহ বুখারী)।

ড. নাজিবুর রহমানকে সাহায্য করা যে একটি দ্বীনি ও নৈতিক দায়িত্ব ছিল এ হাদিস থেকেও আমরা তার শিক্ষা পাই।

নবীজি (সা.) মুসলিম উম্মাহকে একটি দেহের সঙ্গে তুলনা করেছেন। পারস্পরিক সহমর্মিতার অভাব দূর করতে নবীজি (সা.)-এর অনন্য একটি হাদিস আছে। সহীহ মুসলিম শরীফের এই হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন, ‘মুমিনদের পারস্পরিক মহব্বত, দয়া ও অনুগ্রহের উদাহরণ একটি দেহের মতো। যখন দেহের কোনো অঙ্গ অসুস্থ বা ব্যথাতুর হয় তখন পুরো দেহ জাগ্রত থেকে ও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে তার সঙ্গে শরিক হয়।’ নবীজি (সা.)-এর এই শিক্ষা জীবন্ত থাকলে মেট্রোরেলের পুরো কামরায় ড. নাজিবুর রহমানের সাহায্যের আবেদনে যাত্রীদের অস্থির হয়ে ওঠার কথা ছিল। নবীজির (সা.) ওই শিক্ষা সমাজকে আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে বের করে আনতে পারে।

নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কোনো মুমিনের একটি সংকট দূর করবে, আল্লাহ তার কিয়ামতের দিন একটি বড় সংকট দূর করবেন’ (সহীহ মুসলিম)।

নবীজির (সা.) এসব শিক্ষা কেবল বইয়ের পাতায় বা বক্তব্য-ওয়াজ মাহফিলে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। চর্চা করতে হবে। তাহলে কোনো অসুস্থ মানুষ, কোনো প্রবীণ মানুষ বিপদগ্রস্ত হবেন না, সাহায্য পাবেন।

পবিত্র কোরআনের শিক্ষা

পবিত্র কোরআনের মূল বাণীই হলো মানুষের প্রতি দয়া, ইনসাফ ও সামাজিক দায়িত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করা।

পবিত্র কোরআনে মানুষের জীবনের মূল্যকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। সূরা মায়িদাহর ৩২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মানুষের জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করল।’ মেট্রোরেলে অসুস্থ শিক্ষক ড. নাজিবুর রহমানকে বসার জায়গা দেওয়া বা দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করার ক্ষুদ্র উদ্যোগটি কোনো যাত্রী তখন করলে সেটি হতে পারত পবিত্র কোরআন অনুযায়ী মানুষের জীবন বাঁচানোর দৃষ্টান্ত। যা পুণ্য হিসেবে গণ্য হতো।

মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে মুমিনদের একে অপরের ভালো কাজে হাত বাড়াতে বলেছেন। সূরা মায়িদাহর ২ নম্বর আয়াতে আছে, ‘সৎকর্ম ও আল্লাহভীতিতে তোমরা একে অপরের সাহায্য করো। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সাহায্য করো না।’ পবিত্র কোরআনের এই নির্দেশ অমান্য করে মুখ ফিরিয়ে রাখা সামাজিক অপরাধ। পবিত্র কোরআনে আত্মকেন্দ্রিকতা ও উদাসীনতা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মানুষের কষ্ট দেখেও না দেখার ভান করার অভ্যাসের সমালোচনা করা হয়েছে।

সূরা মাউনের ৪-৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘ধ্বংস সেই নামাজিদের জন্য যারা ছোটখাটো সাহায্য করতেও অস্বীকৃতি জানায় বা উদাসীন থাকে। এখানে মাউন শব্দের অর্থ নিত্যদিনকার ছোট-খাটো সাহায্য। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ মানুষকে পারস্পরিক আচরণের ক্ষেত্রে দয়াশীল হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

সূরা ফালাকের ১৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, অতঃপর সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয় যারা ঈমান এনেছে এবং পরস্পরকে ধৈর্য ও দয়া-সহানুভূতির উপদেশ দেয়।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে অহংকার ও নিষ্ঠুরতা বর্জন করার কথা বলেছেন। অহংকারবশত অন্যের প্রয়োজনকে গুরুত্ব না দেওয়া কোরআনের দৃষ্টিতে চরম অপছন্দনীয় আচরণ।

লোকমান হাকিম তার সন্তানকে উপদেশ দিতে গিয়ে যা বলেছিলেন তা সূরা লোকমানের ১৮ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, ‘অহংকারবশত তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না, এবং পৃথিবীতে গর্বভরে পদচারণা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দাম্ভিক, অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ ড. নাজিবুরের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ পবিত্র কোরআনের এই সহমর্মিতা ও জীবন রক্ষার শিক্ষাকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অনুসরণ করতে হবে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক (বর্তমানে সরকারের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা)।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

সন্ধ্যার পর রাস্তায় শিক্ষার্থীদের পেলে গ্রেফতার: ডিআইজি আব্দুল কুদ্দুছ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

তালাশ বিডি ডেস্ক

রবিবার, ১ই নভেম্বর, ২০২৬ ইং

১০:৩৯ এম


সন্ধ্যার পর রাস্তায় শিক্ষার্থীদের পেলে গ্রেফতার: ডিআইজি আব্দুল কুদ্দুছ

চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী সতর্ক করে বলেছেন, সন্ধ্যার পর স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের রাস্তায় দেখা গেলে তাদের গ্রেফতার করা হবে। কিশোর গ্যাং নির্মূলে পুলিশের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে তিনি বলেছেন, এ অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম চলমান থাকবে।

শনিবার সন্ধ্যায় কক্সবাজার শহরের পাবলিক লাইব্রেরির শহীদ সুভাষ হলে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ এবং সামাজিক অপরাধ দমনের উদ্দেশ্যে আয়োজিত এক সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব মন্তব্য করেন। এই সমাবেশের আয়োজন করেছে কক্সবাজার জেলা পুলিশ।

অভিভাবক ও শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে ডিআইজি বলেন, "ছেলে-মেয়েদের ওপর অভিভাবক ও শিক্ষকদের নিয়ন্ত্রণ নেই।" তিনি উল্লেখ করেন, যে বয়সে তাদের বই-খাতা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা, সে সময় বিকালে রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। তিনি আরও বলেন, "বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করে শিস দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে।" পারিবারিক শাসন ও নজরদারির অভাবের কারণে কিশোর গ্যাং তৈরি হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ডিআইজি বলেন, "আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, কিশোর গ্যাং এই দেশ থেকে নির্মূল করব। কিশোর গ্যাং বলতে কিছু থাকবে না। এটি পুরোপুরি নির্মূল করতে আমাদের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।"

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান। বক্তব্য দেন পৌর বিএনপির সভাপতি রফিকুল ইসলাম চৌধুরী, সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মাবুদ, কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সভাপতি মাহবুবর রহমান এবং জেলা শ্রমিক দলের সভাপতি রফিকুল ইসলাম।

বক্তারা বলেন, কক্সবাজার শহরে বহুমাত্রিক অপরাধ সংঘটিত হয়। জেলা পুলিশ সম্প্রতি অপরাধ দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

সমাবেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

বলিভিয়ায় এল নিনোর কারণে জরুরি অবস্থা ঘোষণা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

রবিবার, ১ই নভেম্বর, ২০২৬ ইং

১০:৩৯ এম


বলিভিয়ায় এল নিনোর কারণে জরুরি অবস্থা ঘোষণা

বলিভিয়াজুড়ে এল নিনো আবহাওয়াজনিত প্রাকৃতিক ঘটনার প্রভাব মোকাবিলার জন্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বন্যা ও খরার প্রভাব মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করার উদ্দেশ্যে। একই সঙ্গে, দুর্যোগে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকারী দলের সংখ্যা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গত শনিবার, জরুরি অবস্থার ঘোষণা দিয়ে একটি ডিক্রিতে সই করেন বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজ। তিনি উল্লেখ করেন, এল নিনোর কারণে খরা ও বন্যার ‘খুব ভয়াবহ প্রভাব’ পড়তে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সকল প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা প্রয়োজন।

সরকারের চলতি সপ্তাহের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বলিভিয়ার ৯টি বিভাগের মধ্যে ৬টিতে খরার প্রভাব পড়েছে। এতে ৭৮ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খরার কারণে দেশটিতে ৭৫ হাজারের বেশি গবাদিপশু মারা গেছে।

বলিভিয়ায় বন্যার ঝুঁকিও রয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দেশটির সান্তা ক্রুজ অঞ্চলে বন্যায় অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

এদিকে প্রতিবেশী চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোতে এ বছরের অক্টোবরে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে। অন্যদিকে, গত মাসে পেরুতে দাবানলে অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

এল নিনো একটি বৈশ্বিক জলবায়ুর প্রাকৃতিক ঘটনা। সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পরপর এটি ঘটে। এই সময় প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। এর ফলে বিশ্বজুড়ে বায়ুপ্রবাহ, বায়ুচাপ ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আসে। ফলে বিভিন্ন অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

এল নিনোর তীব্রতা সব সময় এক রকম থাকে না। ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী এর প্রভাবও ভিন্ন হয়। তবে চলতি চক্রটি ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের শেষ দিকে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি হওয়ার কথা। তবে এর প্রভাব ২০২৭ সালজুড়েও অব্যাহত থাকতে পারে।

বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এল নিনোর কারণে বিশ্বজুড়ে ৪ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে দরিদ্র দেশগুলোর।

এর আগে, গত সেপ্টেম্বরের শুরুতে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছিল, ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এল নিনোর প্রভাব অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা প্রায় ১০০ শতাংশ।

এএম

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

তাহসিফের মৃত্যু ঘিরে তদন্তে নতুন মোড়, রহস্যময় তরুণীকে খুঁজছে পুলিশ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

তালাশ বিডি ডেস্ক

রবিবার, ১ই নভেম্বর, ২০২৬ ইং

১০:৪০ এম


তাহসিফের মৃত্যু ঘিরে তদন্তে নতুন মোড়, রহস্যময় তরুণীকে খুঁজছে পুলিশ

বিমানবাহিনীর বরখাস্ত হওয়া ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরীর মৃত্যুর মামলার তদন্তে পুলিশ একটি তরুণীকে খুঁজছে। তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগে উত্তরার সোনারগাঁও জনপথ রোডের ১৩ নম্বর সেক্টরে অবস্থিত ‘নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার’-এ ওই তরুণীর সঙ্গে দেখা গিয়েছিল। শুক্রবার রাতে বাবার দায়ের করা হত্যা মামলায় তাহসিফকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়া জুনিয়র বন্ধু দীপকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়েছে নৌপুলিশ।

জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় পুলিশের ধাওয়া খেয়ে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন। তবে কেন তিনি নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, এরপর কী ঘটেছিল কিংবা তাহসিফের মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা রয়েছে-এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। এদিকে, তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর রহস্য ঘিরে নতুন করে সামনে এসেছে আরেকটি সিসিটিভি ফুটেজ।

ফুটেজের সূত্রে জানা যায়, ঘটনার রাতে উত্তরার একটি রেস্টুরেন্ট ও বারে এক তরুণী এবং জুনিয়র বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের সঙ্গে প্রায় দেড় ঘণ্টা কাটান তাহসিফ। পরে দীপকে সঙ্গে নিয়ে যান টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায়। সেখান থেকে কীভাবে তাহসিফ তুরাগ নদে গেলেন, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে পৌঁছান তাহসিফ ও তার বান্ধবী। তারা একটি মোটরসাইকেলে সেখানে যান। ওই তরুণীকে খুঁজছেন তদন্তকারীরা।

এদিকে, তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন ও দায়ীদের বিচারের দাবি করেছে অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের সংগঠন ‘রাওয়া’। এর আগে, তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দীপকে হেফাজতে নেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সংস্থাটি তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং দীপকে নিয়ে ঘটনাস্থলও পরিদর্শন করে। পরে শুক্রবার রাতে নৌপুলিশের কাছে তাকে হস্তান্তর করে পিবিআই। ওই রাতেই ডিএমপির উত্তরখান থানায় হত্যা মামলা করেন তাহসিফের বাবা এনায়েতুল করিম হেলাল। ওই মামলায় দীপকে গ্রেফতার দেখিয়ে শনিবার দুপুরে তাকে আদালতে হাজির করা হয়। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাকে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন নৌপুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াস শুনানি শেষে দীপের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার দিকে দীপের ডাকে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। এরপর থেকে তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদে একটি লাশ ভাসার খবর পায় পুলিশ। পরে নৌপুলিশ লাশটি উদ্ধার করে। সুরতহাল করার সময় তাহসিফের ট্রাউজারের পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়।

রিমান্ড আবেদনে আরও বলা হয়, তথ্যপ্রযুক্তি ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তে জানা গেছে, ঘটনার দিন তাহসিফকে নিয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানার মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন দীপ। প্রাথমিক তদন্তে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দীপের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কীভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে তাহসিফের মৃত্যু হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তদন্তকারীরা বলছেন, জিজ্ঞাসাবাদে দীপ জানিয়েছেন, টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় পোশাক পরা দুজন পুলিশ কর্মকর্তাকে দেখে তারা দৌড়ে দুইদিকে চলে যান। এরপর তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন বলে তার দাবি। তবে ওই দুই পুলিশ কর্মকর্তা কারা, তারা কেন ধাওয়া করেছিলেন, তাহসিফ কী কারণে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন এবং এরপর কী ঘটেছিল-এসব বিষয় যাচাই করা হচ্ছে। ঘটনাস্থলে তাহসিফের মোটরসাইকেল কীভাবে এলো, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

নৌপুলিশের কর্মকর্তারা জানান, জিজ্ঞাসাবাদে দীপ বিভিন্ন তথ্য দিচ্ছেন। তবে তার বক্তব্যে কিছু অসংগতি ও এলোমেলো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সেগুলো অন্যান্য তথ্যপ্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।

নৌপুলিশ ঢাকা রেঞ্জের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন যুগান্তরকে বলেন, দীপ পুরো ঘটনার সঙ্গে ছিলেন। ফলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদে মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি পাওয়া গেছে। জিজ্ঞাসাবাদে বেশকিছু তথ্য সামনে আসছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তাহসিফ সত্যিই পুলিশের ধাওয়া খেয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বাসা থেকে বের হওয়ার পর তাহসিফ কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন এবং কার কার সঙ্গে সময় কাটিয়েছিলেন, তা জানার চেষ্টা চলছে। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের ফরেনসিক পরীক্ষাও করা হচ্ছে। মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য আলামত উদ্ধারের বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। সব তথ্য পর্যালোচনা করেই প্রকৃত ঘটনা বের করার চেষ্টা চলছে।

বারে তরুণীর সঙ্গে তাহসিফ : মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) তাহসিফ বাসা থেকে দীপের সঙ্গে বের হলেও ওই রাতে ১০টা ১৭ মিনিটে এক তরুণীকে নিয়ে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ‘নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে’ গিয়েছিলেন বলে তথ্য পেয়েছে পুলিশ। ওই তরুণীর বয়স ২৪-২৫ বছর। গোয়েন্দারা তার ছবি সংগ্রহ করেছেন। পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ঘটনার রাতে মোটরসাইকেলে ওই বার ও রেস্টুরেন্টে যান তাহসিফ। তার সঙ্গে ছিলেন ওই তরুণী। পরে সেখান থেকে তাহসিফ টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যান। তবে সেখানে ওই তরুণী গিয়েছিলেন কি না, সেটা এখনো জানা যায়নি। পুলিশের ধারণা, ওই এলাকায় মাদকসেবনের অভিযোগে টহল পুলিশ তাদের ধাওয়া করে থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

বারের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, তরুণী গেঞ্জি, প্যান্ট ও কেডস পরেছিলেন। বারে প্রবেশের সময় তার হাতে একটি সাদা পলিথিন ছিল। এ সময় হেলমেট পরা অবস্থায় দীপ তাহসিফের সঙ্গে ছিলেন। ওই তরুণীকে শনাক্ত ও জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে ঘটনার আগের সময়ের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।

সত্য উদ্ঘাটন চায় রাওয়া : তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন ও দায়ীদের বিচারের দাবি জানিয়েছে অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের কল্যাণ সংস্থা রাওয়া। শনিবার দুপুরে উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের ‘করবী’ ভবনে তাহসিফের বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সংগঠনটির নেতারা। এ সময় তারা শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

পরে রাওয়ার যুগ্মসম্পাদক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু নওরোজ খুরশিদ আলম বলেন, তাহসিফের বাবা কেএম এনায়েতুল করিমের সঙ্গে তাদের কথা হয়েছে। পরিবারকে কী ধরনের সহযোগিতা করা যায়, তা জানতে চেয়েছেন তারা। তাহসিফের বাবা জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা ঘটনার অনুসন্ধান করছে। তারা প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলছে এবং সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করছে। খুরশিদ আলম আরও বলেন, অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের কাছে তাহসিফের মৃত্যু অত্যন্ত কষ্টের। তারা আশা করছেন, দ্রুত প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর আল আমিন বলেন, এ ঘটনা তারা ছেড়ে দেবেন না। তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করবেন। ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত এবং দায়ীদের বিচার চান তারা।

অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করে হত্যা মামলা: তাহসিফের বাবা কেএম এনায়েতুল করিম শুক্রবার রাত ১টার দিকে উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। পরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে থাকা দীপকে এ মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসাবে গ্রেফতার দেখানো হয়।

নৌপুলিশ ঢাকা রেঞ্জের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন যুগান্তরকে বলেন, দীপ পুরো ঘটনার সঙ্গে ছিলেন। ফলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। আদালত থেকে তাকে চার দিনের রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি পাওয়া গেছে। জিজ্ঞাসাবাদে বেশকিছু তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তবে দীপের দেওয়া তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তাহসিফ সত্যিই পুলিশের ধাওয়া খেয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বাসা থেকে বের হওয়ার পর তাহসিফ কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন, কার কার সঙ্গে সময় কাটিয়েছিলেন, সেসব তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের ফরেনসিক পরীক্ষাও করা হচ্ছে। পাশাপাশি মোটরসাইকেলটি কীভাবে ঘটনাস্থলে গেল, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। সব তথ্য ও আলামত মিলিয়ে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে। রিমান্ড শেষে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো সম্ভব হবে।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি গড়েছেন ২০ মুসলিম বিজ্ঞানী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

তালাশ বিডি ডেস্ক

রবিবার, ১ই নভেম্বর, ২০২৬ ইং

১০:৪০ এম


আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি গড়েছেন ২০ মুসলিম বিজ্ঞানী

গণিতের অ্যালগরিদম, চিকিৎসাবিজ্ঞান, আলোকবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদ্যা এবং যন্ত্রপ্রকৌশল—মুসলিম বিশ্বের বহু মনীষী আধুনিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। কেউ বীজগণিতের ভিত্তি সুসংহত করেছেন, কেউ মানুষের চোখে দেখার প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করেছেন, আবার কেউ তৈরি করেছেন স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র ও জটিল যান্ত্রিক ব্যবস্থা। এসব অবদান ইতিহাসের পাতায় ছড়িয়ে রয়েছে এবং নতুন করে তুলে ধরা হয়েছে ‘২০ মুসলিম বিজ্ঞানী, যারা আধুনিক বিজ্ঞানকে চিরতরে বদলে দিয়েছেন’ শিরোনামের একটি তথ্যচিত্রে।

‘ইখতিলাফ এক্সপ্লেইনড’ নামের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত ৩৫ মিনিটের তথ্যচিত্রটিতে চিকিৎসক, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ, দার্শনিক, প্রকৌশলী ও উদ্ভাবক—এমন ২০ জন মুসলিম মনীষীর কাজ তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৬ সালের ১৫ অক্টোবর প্রকাশিত ভিডিওটিতে দেখানো হয়েছে, অষ্টম থেকে ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে তাদের গবেষণা ও উদ্ভাবন কীভাবে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় ভূমিকা রেখেছে।

ইসলামের স্বর্ণযুগে, বিশেষ করে অষ্টম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যে গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসা, আলোকবিজ্ঞান ও প্রকৌশলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটে। এ সময়ের গবেষকেরা প্রাচীন গ্রিক, পারস্য ও ভারতীয় জ্ঞানভান্ডার নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি নতুন তত্ত্ব, পদ্ধতি ও যন্ত্র উদ্ভাবন করেন। তাঁদের কাজ পরবর্তী সময়ে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের জ্ঞানচর্চায় প্রভাব ফেলে।

তথ্যচিত্রে তুলে ধরা ২০ মনীষীর মধ্যে রয়েছেন—

ইবনে জুহর: চিকিৎসাবিজ্ঞানে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার জন্য পরিচিত এই চিকিৎসক রোগীর ওপর চিকিৎসাপদ্ধতি প্রয়োগের আগে প্রাণীর ওপর পরীক্ষা চালানোর কথা লিখেছিলেন। তিনি শ্বাসনালিতে অস্ত্রোপচার এবং খাবার গিলতে অক্ষম রোগীকে নল দিয়ে পুষ্টি দেওয়ার পদ্ধতি নিয়েও আলোচনা করেছেন। তার চিকিৎসাবিষয়ক গ্রন্থ ‘আল-তাইসির’ পরবর্তী সময়ে লাতিন ও হিব্রু ভাষায় অনূদিত হয়।

আল-ফারাবি: দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, সংগীত ও জ্ঞানবিজ্ঞানের শ্রেণিবিন্যাসে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। অ্যারিস্টটলের দর্শন ব্যাখ্যা করার জন্য তিনি ‘দ্বিতীয় শিক্ষক’ উপাধি পান। তার ‘ইহসা আল-উলুম’ গ্রন্থে বিভিন্ন জ্ঞানশাখাকে পৃথকভাবে সাজানোর চেষ্টা দেখা যায়। সংগীতের গাণিতিক ভিত্তি নিয়েও তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেন।

নাসির আল-দিন আল-তুসি: ত্রয়োদশ শতাব্দীর এই গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ ইরানের মারাগা মানমন্দিরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেখানে তিনি জ্যোতির্বিদদের নিয়ে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান পর্যবেক্ষণ ও হিসাবের কাজ করেন। তার উদ্ভাবিত ‘তুসি কাপল’ নামে পরিচিত গাণিতিক মডেল জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত। কপার্নিকাসের গাণিতিক মডেলের সঙ্গে এর মিল নিয়ে গবেষকদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।

ইবনে খালদুন: তাকে সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম অগ্রদূত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-মুকাদ্দিমা’য় সমাজের গঠন, অর্থনীতি, রাষ্ট্রক্ষমতা, রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং সভ্যতার উত্থান-পতনের কারণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ইতিহাসকে কেবল রাজা-বাদশাহ ও যুদ্ধের বিবরণ হিসেবে না দেখে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার আলোকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা ছিল তার চিন্তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

বানু মুসা ভ্রাতৃদ্বয়: নবম শতাব্দীর বাগদাদের তিন ভাই মুহাম্মদ, আহমদ ও হাসান বানু মুসা নামে পরিচিত। তারা যন্ত্র নির্মাণ ও প্রকৌশলে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাদের ‘কিতাব আল-হিয়াল’ গ্রন্থে প্রায় ১০০টি যান্ত্রিক যন্ত্রের বিবরণ রয়েছে। এসব যন্ত্রের মধ্যে ছিল স্বয়ংক্রিয় ফোয়ারা, পানি ও বাতাসের সাহায্যে কাজ করা পাত্র এবং বিভিন্ন ধরনের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।

ফতুল্লাহ শিরাজি: মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে কাজ করা এই পারস্য বংশোদ্ভূত মনীষী গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসা ও প্রকৌশলে দক্ষ ছিলেন। তার উদ্ভাবনের মধ্যে একাধিক নলবিশিষ্ট কামান এবং একসঙ্গে কয়েকটি বন্দুকের নল পরিষ্কারের যন্ত্রের কথা উল্লেখ করা হয়। ভারতের জাতীয় বিজ্ঞান একাডেমির প্রকাশিত গবেষণাপত্রেও তার কামান ও বহুনলবিশিষ্ট আগ্নেয়াস্ত্রের নকশা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

আবুল ওয়াফা আল-বুজজানি: গণিত ও ত্রিকোণমিতিতে তার অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাইন, কোসাইন, ট্যানজেন্টসহ ত্রিকোণমিতির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তিনি কাজ করেন। কোণের যোগফলের সাইন নির্ণয়ের সূত্র এবং জ্যোতির্বিদ্যার কাজে ব্যবহারের জন্য সূক্ষ্ম সারণি তৈরিতেও তার অবদান ছিল।

আল-রাজি: চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগ পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসার কার্যকারিতা যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন তিনি। গুটিবসন্ত ও হামকে পৃথক রোগ হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে তার গবেষণা বিশেষভাবে পরিচিত। চিকিৎসায় অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করার মানসিকতাও তাঁর কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল।

আল-বাত্তানি: জ্যোতির্বিদ্যায় নির্ভুল পর্যবেক্ষণের জন্য পরিচিত এই বিজ্ঞানী সৌর বছরের দৈর্ঘ্য ও পৃথিবীর অক্ষের হেলানো অবস্থান নির্ণয়ে কাজ করেন। তাঁর জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সারণি পরবর্তী সময়ে ইউরোপে অনূদিত হয় এবং কয়েক শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত হয়।

ইবনে সাহল: দশম শতাব্দীর এই গণিতবিদ আলো ও লেন্স নিয়ে গবেষণা করেন। আলো এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে প্রবেশের সময় কীভাবে দিক পরিবর্তন করে, অর্থাৎ প্রতিসরণের নিয়ম নিয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন। লেন্সের সাহায্যে আলোকে একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত করার পদ্ধতিও তাঁর গবেষণার অংশ ছিল।

আল-বিরুনি: গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, ভূগোল ও ইতিহাসে বিস্তৃত জ্ঞান ছিল তার। পৃথিবীর ব্যাসার্ধ নির্ণয়ে তাঁর পদ্ধতি বিশেষভাবে আলোচিত। পাহাড়ের উচ্চতা এবং দিগন্তের অবনমন কোণ পরিমাপ করে গাণিতিক হিসাবের মাধ্যমে তিনি পৃথিবীর ব্যাসার্ধ নির্ণয়ের চেষ্টা করেন। তথ্যচিত্রে তার হিসাবের ফল প্রায় ৬ হাজার ৩৪০ কিলোমিটার বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা আধুনিক পরিমাপের কাছাকাছি।

আল-জাজারি: যন্ত্রপ্রকৌশল ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র তৈরিতে তার অবদান তাকে বিশেষ পরিচিতি দিয়েছে। ১২০৬ সালে লেখা তার ‘আল-জামি বাইন আল-ইলম ওয়াল-আমাল আল-নাফি ফি সিনাআত আল-হিয়াল’ গ্রন্থে প্রায় ৫০টি যন্ত্রের নকশা ও নির্মাণপদ্ধতি রয়েছে। তার তৈরি হাতির আকৃতির পানিঘড়ি, স্বয়ংক্রিয় সংগীতশিল্পী এবং বিভিন্ন গিয়ার ও ক্র্যাঙ্কচালিত যন্ত্র প্রকৌশলের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

আব্বাস ইবনে ফিরনাস: উড়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে এই আন্দালুসীয় উদ্ভাবকের নাম ইতিহাসে আলোচিত। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, তিনি পালক ও ডানার মতো কাঠামো ব্যবহার করে আকাশে ওড়ার চেষ্টা করেন। তবে তার উড্ডয়নসংক্রান্ত ঘটনাগুলোর বিবরণ অনেক পরে লেখা সূত্রে পাওয়া যায়। ফলে এসব ঘটনার সব তথ্য নিশ্চিত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসে প্রকাশিত গবেষণাতেও তার উড্ডয়ন-পরীক্ষার প্রাচীনতম প্রমাণ ও পরবর্তী বিবরণ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

আল-কিন্দি: গণিত, চিকিৎসা, সংগীত ও আলোকবিজ্ঞানের পাশাপাশি সাংকেতিক ভাষা বা ক্রিপ্টোগ্রাফি নিয়ে কাজ করেছিলেন তিনি। গোপন বার্তার অক্ষরগুলোর ব্যবহারের হার বিশ্লেষণ করে সংকেত ভাঙার পদ্ধতি, যা ‘ফ্রিকোয়েন্সি অ্যানালাইসিস’ নামে পরিচিত, তার প্রাচীন লিখিত ব্যাখ্যার সঙ্গে তার নাম যুক্ত।

ইবনে আল-নাফিস: চিকিৎসাবিজ্ঞানে ফুসফুসীয় রক্তসঞ্চালন ব্যাখ্যার জন্য পরিচিত এই চিকিৎসক দেখান, হৃদ্‌যন্ত্রের ডান দিক থেকে রক্ত ফুসফুসে যায় এবং সেখান থেকে বাম দিকে ফিরে আসে। এর মাধ্যমে তিনি হৃদ্‌যন্ত্রের দুই পাশের মধ্যে অদৃশ্য ছিদ্র দিয়ে রক্ত চলাচলের প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করেন।

ইবনে সিনা: চিকিৎসাবিজ্ঞান ও দর্শনে তার অবদান বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-কানুন ফি আল-তিব্ব’ বা ‘চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিয়মাবলি’তে রোগ, ওষুধ, শারীরবিদ্যা ও চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। মধ্যযুগে মুসলিম বিশ্ব ও ইউরোপের চিকিৎসাশিক্ষায় গ্রন্থটি দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

জাবির ইবনে হাইয়ান: রসায়নবিজ্ঞানের ইতিহাসে তার নাম বিশেষভাবে আলোচিত। পাতন, স্ফটিকীকরণ, বাষ্পীভবন ও পরিস্রাবণের মতো পরীক্ষাগারভিত্তিক পদ্ধতির বিকাশের সঙ্গে তার নাম জড়িত। তবে তার নামে প্রচলিত বহু গ্রন্থের প্রকৃত রচয়িতা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। ফলে তার ব্যক্তিগত অবদান ও তাঁর নামে পরিচিত বৃহত্তর রচনাগুচ্ছের অবদান আলাদা করে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

আল-জাহরাবি: শল্যচিকিৎসার ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম। তার ৩০ খণ্ডের চিকিৎসাবিষয়ক গ্রন্থ ‘আল-তাসরিফ’-এর শেষ খণ্ডে অস্ত্রোপচার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। সেখানে ২০০টির বেশি অস্ত্রোপচারের যন্ত্রের চিত্র ও ব্যবহারবিধি তুলে ধরা হয়। অস্ত্রোপচারের পদ্ধতি, যন্ত্রের ব্যবহার এবং রোগীর প্রতি চিকিৎসকের দায়িত্ব নিয়েও তিনি নির্দেশনা দেন।

ইবনে আল-হাইসাম: আলোকবিজ্ঞানের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত এই বিজ্ঞানী মানুষের দেখার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রচলিত ধারণা বদলে দেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, চোখ থেকে আলো বেরিয়ে বস্তুতে পড়ে না; বরং বস্তু থেকে প্রতিফলিত আলো চোখে প্রবেশ করায় মানুষ দেখতে পায়। তার ‘কিতাব আল-মানাজির’ গ্রন্থে আলো, দৃষ্টি ও আলোকবিজ্ঞানের নানা বিষয় পরীক্ষার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অন্ধকার কক্ষের ছোট ছিদ্র দিয়ে আলো প্রবেশ করিয়ে উল্টো প্রতিবিম্ব তৈরির পরীক্ষাও তার কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আল-খাওয়ারিজমি: তালিকার শীর্ষে থাকা এই গণিতবিদের নাম থেকেই ‘অ্যালগরিদম’ শব্দটির উৎপত্তি। নবম শতাব্দীতে তার লেখা বীজগণিতবিষয়ক গ্রন্থে সমীকরণ সমাধানের নিয়মবদ্ধ পদ্ধতি তুলে ধরা হয়। ‘আল-জাবর’ শব্দ থেকে ইংরেজি ‘অ্যালজেবরা’ শব্দের উৎপত্তি। ভারতীয় দশমিক সংখ্যা পদ্ধতি ও শূন্যের ব্যবহার ইউরোপে পরিচিত করাতেও তার রচনার ভূমিকা ছিল।

তথ্যচিত্রটির মূল বক্তব্য হলো, আধুনিক বিজ্ঞানের বিকাশ কোনো একক সভ্যতা বা অঞ্চলের অবদান নয়। বিভিন্ন সময় ও ভূখণ্ডের গবেষক, অনুবাদক ও উদ্ভাবকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতি ঘটেছে। মুসলিম বিশ্বের এসব মনীষী সেই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তথ্যচিত্রে ব্যবহৃত ‘বিজ্ঞানের জনক’ বা ‘রোবোটিকসের জনক’-এর মতো উপাধিগুলোকে আক্ষরিক অর্থে না নিয়ে তাঁদের ঐতিহাসিক অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দেখা প্রয়োজন। একইভাবে আব্বাস ইবনে ফিরনাসের উড্ডয়ন কিংবা জাবির ইবনে হাইয়ানের নামে প্রচলিত রচনাগুলোর মতো কিছু বিষয় নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে আলোচনা ও মতভেদ রয়েছে। তাই তাদের অবদান তুলে ধরার পাশাপাশি ঐতিহাসিক প্রমাণের সীমাবদ্ধতাও বিবেচনায় রাখা জরুরি।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

আর্কাইভ

Please select a date!

নামাজের সময়সূচী

তারিখঃ ২১শে জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮হিঃ
ফজর ০৪:৪৮
জোহর ১১:৪৩
আসর ০৩:৪৩
মাগরিব ০৫:১৯
ইশা ০৬:৩১
সূর্যোদয় : ০৬:০৫ সূর্যাস্ত : ০৫:১৯
অনলাইন জরিপ
ফলাফল
থার্টি-ফার্স্ট নাইটে তরুণদের জন্য প্রকাশ্যে পানি-টানি খাওয়ার বিরুদ্ধে আহ্বান। আপনার মন্তব্য দিন
হ্যা
100%
না
0%
মন্তব্য নেই
0%