০৪:১১ এম
রাজনীতির ক্যারিয়ার বিপদে ফেলার একটি প্রাণঘাতী অস্ত্র হিসেবে প্রতিনিয়ত সামনে এসেছে গোপন ক্যামেরা এবং স্টিং অপারেশন। প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে কখনও অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা লুকানো লেন্স ব্যবহার করেছেন, আবার কখনও সরকারি অফিস বা হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ ফাঁস হয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে জোয়ার।
নৈতিক পতন এবং রাজনৈতিক দুর্নীতির প্রমাণ পেয়ে পদ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন এবং বিচারের শিকার হয়েছেন, এ রকম কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও কর্মকর্তাদের কেলেঙ্কারির বিষয়গুলো নিচে আলোচনা করা হলো।
গোপন ক্যামেরায় ধরা পড়া কেলেঙ্কারি বিষয়ে পদ ছাড়তে বাধ্য হওয়া কয়েকজন প্রভাবশালী বিশ্বনেতা এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে আমরা এই বিশেষ প্রতিবেদন প্রদান করছি।
আরও পড়ুন: যাত্রাবাড়ীতে ছিনতাই সন্দেহে গণপিটুনিতে আহত যুবক নিশাত মিয়ার মৃত্যু
ভারত: জর্জ ফার্নান্দেস ও বঙ্গারু লক্ষ্মণ
ভারতের রাজনীতিতে গোপন ক্যামেরভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সবচেয়ে সুপ্রসিদ্ধ উদাহরণ হলো ২০০১ সালে ‘তেহেলকা’ (Tehelka) সংবাদমাধ্যমের পরিচালিত ‘অপারেশন ওয়েস্ট এন্ড’।
তেহেলকার সাংবাদিকরা একটি কাল্পনিক অস্ত্র সরবরাহকারী কোম্পানির প্রতিনিধির ভূমিকায় গোপন ক্যামেরা নিয়ে ভারত সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কাছে পৌঁছান। গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা ফুটেজে দেখা যায়, প্রতিরক্ষামন্ত্রী জর্জ ফার্নান্দেসের দলের ‘সমতা পার্টি’র শীর্ষ কর্মকর্তা এবং ক্ষমতাসীন বিজেপির তৎকালীন সভাপতি বঙ্গারু লক্ষ্মণ ঘুষ নিচ্ছেন।
বঙ্গারু লক্ষ্মণের গোপন ক্যামেরায় ঘুষ নেওয়ার দৃশ্য ফাঁস হওয়ার পর তিনি বিজেপির সভাপতির পদ ছাড়তে বাধ্য হন এবং পরবর্তীতে আদালতের রায়ের মাধ্যমে সাজাপ্রাপ্ত হন। অন্যদিকে, পুরো ঘটনায় তৎকালীন অটল বিহারী বাজপেয়ী সরকারের ওপর চরম চাপের সৃষ্টি হওয়ায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী জর্জ ফার্নান্দেসও পদত্যাগ করেন।
আরও পড়ুন: কাতারের শান্তি প্রস্তাব নাকচ, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন হামলার শঙ্কা
নারদ স্টিং কেলেঙ্কারি (পশ্চিমবঙ্গ)
২০১৪-২০১৬ সালের মধ্যে সাংবাদিক ম্যাথিউ স্যামুয়েল পরিচালিত ‘নারদ স্টিং অপারেশনে’ দেখা গেছে, পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের একাধিক শীর্ষস্থানীয় মন্ত্রী ও সাংসদ একটি কাল্পনিক কোম্পানির জন্য নগদ অর্থ গ্রহণ করছেন। এসব ভিডিও একের পর এক প্রকাশ হওয়ার পর তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই। এতে শোভন চট্টোপাধ্যায়সহ একাধিক প্রভাবশালী মন্ত্রীকে তাদের পদ ছাড়তে হয় এবং পরে তারা আদালতে দীর্ঘ আইনি লড়াই ও গ্রেফতারের মুখোমুখি হন।
দিলীপ সিং জুদেব
দিলীপ সিং জুদেব ছিলেন অটল বিহারী বাজপেয়ী সরকারের কেন্দ্রীয় পরিবেশ ও বন প্রতিমন্ত্রী। ২০০৩ সালের ছত্তিশগড় রাজ্য নির্বাচনের পূর্বে একটি গোপন ক্যামেরার ভিডিও ফাঁস হয়।
আরও পড়ুন: গণভোটের রায় না মানলে তারেক রহমানের ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই: জুনায়েদ
ভিডিওতে দেখা যায়, প্রতিমন্ত্রী জুদেব এক কাল্পনিক অস্ট্রেলীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির কাছে অর্থ গ্রহণ করেছেন এবং বলেন, পয়সা খোদা তো নেহি, পার খোদা সে কম ভি নেহি (টাকা খোদা নয়, আবার খোদার চেয়ে কমও নয়)।
ভিডিওটি ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করার পর, রাজনৈতিক ভাবমূর্তি রক্ষা করতে এবং তোপের মুখে পড়ার কারণে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
যুক্তরাষ্ট্র: হ্যারিসন উইলিয়ামস
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে রাজনৈতিকদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত স্টিং অপারেশন ছিল এফবিআই (FBI)-এর ‘অ্যাবস্ক্যাম’ (Abscam)।
আরও পড়ুন: বিয়ের ১৫ দিনের মাথায় সড়কে প্রাণ গেল ইতালি প্রবাসী তানভীরের
১৯৭০-এর দশকের শেষ ভাগে এফবিআই একটি ভুয়া কোম্পানি এবং একজন কাল্পনিক আরব ধনকুবের সাজিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের গোপন লেনদেনের পরীক্ষা নেয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি গোপন ক্যামেরা ও মাইক্রোফোনে রেকর্ড করা হয়। ফুটেজে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ভিসা এবং ব্যবসায়িক সুবিধার বিনিময়ে বহু রাজনৈতিক নেতা ঘুষ নিচ্ছেন।
এই ঘটনা সূত্র ধরে নিউ জার্সির প্রভাবশালী সিনেটর হ্যারিসন এ. উইলিয়ামস সিনেট থেকে বহিষ্কার হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এছাড়াও মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের বেশ কয়েকজন সদস্য পদ হারান এবং বিচারে দোষী সাব্যস্ত হন।
অস্ট্রিয়া: হাভাঞ্জ-ক্রিস্টিয়ান স্ট্রাখ
২০১৯ সালে ইউরোপীয় রাজনীতিতে ঘটে যাওয়া অন্যতম বড় কেলেঙ্কারি হলো অস্ট্রিয়ার ‘ইবিজা অ্যাফেয়ার’ (Ibiza Affair)।
আরও পড়ুন: ক্ষমতা হারালেই কি গ্রেফতার হবেন নেতানিয়াহু?
২০১৭ সালে স্পেনের ইবিজা দ্বীপে গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা একটি ভিডিও ২০১৯ সালে প্রকাশিত হয়। সেখানে দেখা যায়, অস্ট্রিয়ার তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর (উপ-প্রধানমন্ত্রী) ও চরম ডানপন্থি রাজনীতিবিদ হাভাঞ্জ-ক্রিস্টিয়ান স্ট্রাখ একজন নারীকে অস্ট্রিয়ার প্রধান সংবাদপত্রের বড় শেয়ার কিনে দেওয়ার বিনিময়ে সরকারি ড্রাইভিং চুক্তি ও সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। নারীটি নিজেকে একজন রুশ ধনকুবেরের আত্মীয়া হিসেবে পরিচয় দেন।
ভিডিওটি প্রকাশিত হওয়ার পর ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। স্ট্রাখ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং তৎকালীন চ্যান্সেলর সেবাস্তিয়ান কুর্স দেশের সরকার ভেঙে দিয়ে আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন।
যুক্তরাজ্য: স্যার ম্যালকম রিফকাইন্ড ও জ্যাক স্ট্র
২০১৫ সালে যুক্তরাজ্যের ডেইলি টেলিগ্রাফ এবং চ্যানেল ৪-এর সাংবাদিকরা একটি ভুয়া হংকংভিত্তিক কোম্পানির প্রতিনিধি সেজে গোপন ক্যামেরা নিয়ে দেশটির গোয়েন্দা বিষয়ক সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান ম্যালকম রিফকাইন্ড ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাক স্ট্র-এর মুখোমুখি হন। ক্যামেরায় ধরা পড়ে যে তারা অর্থের বিনিময়ে ওই কোম্পানির জন্য সংসদে প্রভাব খাটানোর এবং বিশেষ সুবিধা দেওয়ার আশ্বাস দিচ্ছেন।
আরও পড়ুন: হাসিনার পতনের আগে ইউনূসকে দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান করেন শফিকুল আলম
ভিডিওটি সম্প্রচারিত হওয়ার পর যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়। ম্যালকম রিফকাইন্ড সংসদীয় গোয়েন্দা কমিটির প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং তিনি সংসদীয় রাজনীতি থেকে বিদায় ঘোষণা করেন।
প্যাট্রিক মার্সার (ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্য, কনজারভেটিভ পার্টি)
২০১৩ সালে বিবিসি ‘প্যানোরামা’ এবং দ্য নিউজের গোপন ক্যামেরায় ধরা পড়ে যে, প্যাট্রিক মার্সার অর্থ গ্রহণের বিনিময়ে সংসদে বিশেষ দেশের (ফিজি) স্বার্থে প্রশ্ন উত্থাপন এবং সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। গোপন ক্যামেরার ফুটেজ প্রকাশ্যে আসার পর তিনি পদত্যাগ করেন এবং কনজারভেটিভ পার্টি থেকেও বরখাস্ত হন।
স্টিফেন বায়ার্স, জেফ হুন ও প্যাট্রিশিয়া হিউইট (যুক্তরাজ্যের সাবেক তিন মন্ত্রী)
২০১০ সালে দ্য সানডে টাইমসের সাংবাদিকরা লবিস্ট বা দালাল সেজে তাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং গোপন ক্যামেরায় রেকর্ড করেন। স্টিফেন বায়ার্স নিজেকে ‘ট্যাক্সি ক্যাব’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে বলেন, অর্থের বিনিময়ে তাকে যে কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে।
ক্যাবিনেটের গোপন তথ্য ও প্রভাব বিক্রির অভিযোগে তাদের তিনজনকেই লেবার পার্টি থেকে বরখাস্ত করা হয় এবং পরে তাদের পার্লামেন্টে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
ম্যাট হ্যানকক
করোনাভাইরাস মহামারি চলাকালে যুক্তরাজ্যে যখন পুরো দেশ কঠোর লকডাউনে আবদ্ধ, তখন নিজের তৈরি সামাজিক দূরত্বের নিয়ম ভঙ্গ করার জন্য তোপের মুখে পড়েন তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ম্যাট হ্যানকক।
২০২১ সালের জুন মাসে যুক্তরাজ্যের দ্য সান পত্রিকা একটি সিসিটিভি বা গোপন ক্যামেরার ফুটেজ প্রকাশ করে। ভিডিওটি ছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে হ্যানককের নিজস্ব কার্যালয়ের। সেখানে দেখা যায়, তিনি নিজের বানানো সামাজিক দূরত্ব এবং বিধিনিষেধ ভঙ্গ করে একজন নারী সহকর্মীকে জড়িয়ে ধরছেন এবং চুম্বন করছেন।
একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রী হয়ে নিজের তৈরি স্বাস্থ্যবিধিকে নিজেই অমান্য করার বিষয়টি সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করে। নৈতিকতার কারণে এবং জনরোষের মুখে ম্যাট হ্যানকক স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, দ্য লোকাল অস্ট্রিয়া, ওয়েলস অনলাইন, ইবিএসসিও, এনসাইক্লোপিডিয়া
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন