১২:০০ এম
সুদানের গৃহযুদ্ধ মানুষের জীবিকা ধ্বংস করে দিচ্ছে। কাজের অভাবে হাজার হাজার মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষুদ্র স্বর্ণের খনিতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। ১৬ বছর বয়সী আলতায়েব আলহাদি একটি খনিতে কাজ করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে। তার মৃত্যুতে সামনে এসেছে নিরাপত্তাহীন পরিবেশে কাজ করা শিশু ও তরুণ খনি শ্রমিকদের ভয়াবহ বাস্তবতা।
আলতায়েবের বয়স যখন মাত্র ছয় বছর, তখন দক্ষিণ-মধ্য সুদানের হোয়াইট নাইল রাজ্যের তার গ্রামের একটি কুয়ো ধসে মারা যান তার বাবা। এর দুই মাস পর মারা যান মা-ও। এতিম হয়ে পড়ে পরিবারের পাঁচ ভাইবোন। সবার বড় হওয়ায় ছোট ভাইবোনদের ভরণপোষণের দায়িত্ব এসে পড়ে আলতায়েবের কাঁধে।
১৪ বছর বয়সে ভাইবোনদের খাবার ও পড়াশোনার খরচ জোগাতে কাজের সন্ধানে বাড়ি ছাড়ে সে। নিজের গাল্লি গ্রাম থেকে শত শত কিলোমিটার উত্তরে পাড়ি জমায় আলতায়েব। ওই অঞ্চলে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে স্বর্ণের খনি।
আরও পড়ুন: কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে পেলে কতদিন ক্ষমতায় থাকবেন নেতানিয়াহু?
আলতায়েবের চাচা আলহাদি হামিদ আল জাজিরাকে বলেন, "আমরা তাকে খনির বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছিলাম। তবে আলতায়েব ছিল উচ্চাকাঙ্ক্ষী। তার কয়েকজন আত্মীয় আগে থেকেই ওই এলাকায় কাজ করতেন। যদিও তারা ভূগর্ভস্থ খনিতে নয়, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন।"
শুরুতে পরিবহনসহ বিভিন্ন ধরনের কাজ করত আলতায়েব। পরে স্থানীয় খনি শ্রমিকদের কাছ থেকে স্বর্ণ তুলে ভালো আয় করার গল্প শুনে আশপাশের পাহাড়ে স্বর্ণের সন্ধান শুরু করে সে।
সুদানের লোহিত সাগর অঞ্চলের জাবাল আল-আইগদাতের কাছে একটি স্বর্ণের খনিতে মিশরীয় সেনাবাহিনীর বিমান হামলায় নিহত হয় আলতায়েব। ওই হামলায় অন্তত ৭২ জন খনি শ্রমিক প্রাণ হারান। খনিটিতে কাজ শুরু করার কয়েক মাসের মধ্যেই এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।
আলতায়েবের এক সহকর্মী খনি শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে আল জাজিরাকে বলেন, "আমাদের আলাদা হওয়ার ৩০ মিনিটও পার হয়নি। এর মধ্যেই আলতায়েব তাকে জানিয়েছিল, সে খনিতে যাচ্ছে। হঠাৎ বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনে তারা ছুটে যান ঘটনাস্থলে। পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ বিশৃঙ্খল। লোকজন চারদিকে ছোটাছুটি করছিল। কয়েক মিনিটের মধ্যে একের পর এক হামলা চলছিল।"
আরও পড়ুন: ‘নেতানিয়াহু সরকারের প্রতি আস্থার অভাব’, বুথফেরত জরিপে মন্তব্য আইজেনকোটের
সহকর্মীটি জানান, তারা আলতায়েবকে খুঁজে পান গুরুতর আহত অবস্থায়। বিস্ফোরণে তার হাত-পা বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল এবং পেটে ছিল মারাত্মক ক্ষত। তারা তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করেন এবং পাহাড়ের কাছে একটি নিরাপদ স্থানে নিয়ে যান। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মারা যায় সে। এত দ্রুত সবকিছু ঘটে যাবে, তা তারা বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না।
আলতায়েব প্রায় ১৫ জন তরুণ ও শিশুর সঙ্গে সাধারণ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে পাথর থেকে স্বর্ণ উত্তোলন করত। শ্রমিকেরা দিনরাত খনিতে কাজ করতেন। পরে উত্তোলিত পাথর ও অন্যান্য উপাদান প্রক্রিয়াজাত করতে সেগুলো কাছের কারখানায় নিয়ে যাওয়া হতো।
স্বর্ণ বিক্রির আয় শ্রমিকদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হতো। তবে প্রত্যেকের আয় নির্ভর করত কতটুকু স্বর্ণ পাওয়া গেল এবং ব্যক্তিগত চুক্তির শর্ত কী ছিল, তার ওপর। খনির মালিকের ভাষ্য অনুযায়ী, ভালো দিনে পুরো দল ১০০ ডলারের বেশি আয় করতে পারত।
আলতায়েবের সাবেক এক সহকর্মী বলেন, "আমরা টানা দুই থেকে তিন সপ্তাহ খনন করেও কখনো এক গ্রাম বা তার চেয়ে কম স্বর্ণ পেতাম। কোনো কুয়োয় স্বর্ণের পরিমাণ কম হলে অন্য জায়গায় চলে যেতাম। পাওয়া স্বর্ণ বিক্রি করে লাভ ভাগ করে নিতাম, যা কখনো কখনো প্রায় ১০০ ডলার হতো।"
আরও পড়ুন: বোম্বে হাইকোর্ট ইমরান খানের ভারত ছাড়ার নোটিশ স্থগিত করেছে
পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্বে থাকা তরুণদের কাছে এমন ঝুঁকিপূর্ণ খনিতে অনিয়মিত আয়ও বেকার থাকার চেয়ে ভালো বিকল্প বলে মনে হতে পারে। আলতায়েবের বোন রোগাইয়া আলহাদি স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানান, মৃত্যুর মাত্র ১০ দিন আগে ভাইবোনদের বলেছিল, শিগগিরই বাড়ি ফিরবে।
আলতায়েবের চাচা জানান, বন্ধুদের কাছ থেকে পরিবার জানতে পেরেছে, হামলার দিন সকালে আলতায়েব খনির কাছের একটি রেস্তোরাঁয় তাদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। শেষবারের মতো খনির উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে তারা এক কাপ চা পান করে। কয়েক মিনিট পরই ওই এলাকায় বিমান হামলা চালানো হয়।
মিশরীয় কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, সুদানি খনি শ্রমিকেরা সীমান্ত অতিক্রম করে মিশরে প্রবেশ করেন। তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে স্বর্ণ চোরাচালান, মাদক ও মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সুদানের পক্ষ থেকে কোনো জবাব দেয়া হয়নি।
২০২৩ সালে সুদানের সামরিক বাহিনী ও আধাসামরিক গোষ্ঠী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দেশটির অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। জীবিকার বিকল্প উৎস না থাকায় হাজার হাজার মানুষ উত্তর সুদানের ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পভিত্তিক স্বর্ণের খনিতে কাজ খুঁজতে বাধ্য হন।
আরও পড়ুন: জার্মান ভাইস মিনিস্টার ড. বারবেল কোফলারের আবুল খায়ের স্টীল মেল্টিং লিমিটেড পরিদর্শন
এসব খনিতে কাজের ধরনও ভিন্ন। কেউ নিজের উদ্যোগে স্বর্ণ খোঁজেন, আবার কেউ বিনিয়োগকারীদের মালিকানাধীন খনিতে কাজ করেন। এ ক্ষেত্রে আয় নির্ভর করে পাওয়া স্বর্ণের পরিমাণ, সরঞ্জাম ও জ্বালানির খরচ এবং অর্থায়নকারীদের সঙ্গে সম্মত লাভের ভাগের ওপর।
স্বর্ণ পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও খনি শ্রমিকদের প্রতিনিয়ত নানা বিপদের মুখে পড়তে হয়। ধসে পড়া খনি, অস্থিতিশীল মাটি ও বিমান হামলার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসার সুযোগ সীমিত হওয়ায় দুর্ঘটনায় আহত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
খনি শ্রমিকদের জীবনযাপনও অত্যন্ত কঠিন। রিভার নাইল রাজ্যে ১০ বছর খনি শ্রমিক হিসেবে কাজ করা মোহাম্মদ আওয়াদালকারিম জানান, শ্রমিকেরা প্রায়ই চটের বস্তা ও প্লাস্টিকের শিট দিয়ে তৈরি অস্থায়ী কুঁড়েঘরে থাকেন। তাদের প্রধান খাবার মসুর ডাল ও জোয়ারের পায়েস।
তবে যেসব পরিবারের নির্ভরযোগ্য আয়ের উৎস নেই, তাদের কাছে এসব খনি তাৎক্ষণিক উপার্জনের একটি সম্ভাবনা তৈরি করে। যদিও ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্বর্ণ খুঁজেও অনেক শ্রমিক নিজেদের খরচ মেটানোর মতো স্বর্ণ পান না। আবার কেউ কেউ বিনিয়োগকারী বা যন্ত্রপাতির মালিকদের সঙ্গে আয় ভাগ করে নেন। ফলে দিনশেষে তাদের হাতে খুব সামান্য অর্থ থাকে।
আরও পড়ুন: হলুদ বিন্দু দেখে খননে ২ কোটি টাকার স্বর্ণের খণ্ড উদ্ধার
চ্যাথাম হাউস থিঙ্ক ট্যাঙ্কের গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সুদানের ঘোষিত স্বর্ণ উৎপাদনের ৫৩ দশমিক ৭১ টন বা প্রায় ৮৩ শতাংশ এসেছিল কুটিরশিল্প ও ক্ষুদ্র পরিসরের খনি থেকে। তবে এই হিসাব শুধু সরকার-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর উৎপাদনকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। সুদানের ১৮টি রাজ্যজুড়ে প্রায় ১০ লাখ মানুষ এ ধরনের খনির কাজে যুক্ত ছিলেন। এসব খাত থেকে বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার আয় হতো।
ক্ষুদ্র খনিগুলোকে সাধারণত যুদ্ধের মূল অর্থায়ন নেটওয়ার্কের বাইরে বলে মনে করা হলেও, এসব এলাকাও সহিংসতা থেকে রেহাই পায়নি। স্থানীয় সূত্র ও খনি শ্রমিকদের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ জুন মিশরীয় সীমান্তের কাছে একটি খনি এলাকায় হামলায় বেশ কয়েকজন নিহত ও আহত হন। সীমান্তবর্তী সুদানি এলাকায় বারবার বিমান হামলার ঘটনায় বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা, ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্ব ও জবাবদিহি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
মিশরীয় কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, সুদানি স্বর্ণ অনুসন্ধানকারীরা সীমান্ত পেরিয়ে একটি মিশরীয় কোম্পানি পরিচালিত খনি এলাকার কাছে খননকাজ চালাচ্ছিলেন। তবে এ দাবির পক্ষে স্বাধীন প্রমাণ খুবই সীমিত।
জানা গেছে, সুদানের সামরিক নেতা আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান হামলার ঘটনা তদন্তে প্রসিকিউটর, বিচার বিভাগীয় প্রতিনিধি ও নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যদের নিয়ে একটি তথ্য অনুসন্ধান কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে জুনে ঘোষিত একই ধরনের আরেকটি ঘটনার তদন্তের ফলাফল এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।
আরও পড়ুন: ফ্লাভিও বলসোনারোর পাসপোর্ট বাতিল
আঞ্চলিক সংঘাত ও স্বর্ণের সন্ধানে প্রাণ দিতে হয়েছে আলতায়েবকে। যে স্বর্ণ কারও কারও জন্য বিপুল মুনাফার উৎস, সেটিই আবার অনেক শ্রমিকের কাছে সামান্য আয় করে বেঁচে থাকার অবলম্বন।
আলতায়েবের মৃত্যুর পর তার ভাইবোনেরা এখন চাচা, খালা ও চাচাতো ভাইবোনসহ বর্ধিত পরিবারের সঙ্গে বসবাস করছে। পরিচিতজনেরা তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে আলতায়েবের স্মৃতি ধরে রাখতে গাল্লি গ্রামে সামাজিক উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে।
আলতায়েবের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তারা তার ইচ্ছা অনুযায়ী ছোট ভাইবোনদের লালন-পালন ও যত্ন নেবেন। আলতায়েব ছিল তরুণ, যত্নশীল ও সাহসী। তাকে সবসময় স্মরণ করা হবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন