০৫:২২ পি.এম
জুলাই মাস জুড়ে গণ-অভ্যুত্থানে হামলা, হুমকি ও বিভিন্ন বাধা উপেক্ষা করে আহতদের চিকিৎসাসেবা, রক্ত ও জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ করেন চিকিৎসকরা। এমনকি সরকারি পর্যায় থেকে আহতদের চিকিৎসা না দেওয়ার (নো ট্রিটমেন্ট) নির্দেশ থাকলেও নানা কৌশলে আহতদের চিকিৎসা করে বহু প্রাণ রক্ষা করার দাবি করে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ)।
সংগঠনটি জানাচ্ছে, ওই বীরত্বগাথা, আত্মত্যাগ এবং মানবিক দায়িত্ববোধের ইতিহাসের সূচনা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে তারা মাসব্যাপী 'জুলাই উদযাপন' কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
আরও পড়ুন: ইসরাইলে নির্বাচন: ৮৫ শতাংশ ভোট গণনা শেষ, চূড়ান্ত ফলাফল দুই দিনে আসবে
বুধবার (১ জুলাই) সকালে রাজধানী ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের আব্দুস সালাম হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে 'জুলাই অভ্যুত্থান: ইনসাফ, মেধা ও রাষ্ট্র বিনির্মাণ/রাষ্ট্র সংস্কার' শীর্ষক মাসব্যাপী এ কর্মসূচির ঘোষণা দেয় এনডিএফ। কর্মসূচির স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে—‘জুলাইয়ের আত্মত্যাগ থেকে আগামীর অঙ্গীকার’ বলা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে এনডিএফের অফিস সম্পাদক ডা. এ কে এম জিয়াউল হক জানান, জুলাই স্মরণে মাসব্যাপী কর্মসূচির আওতায় গবেষণা, চিকিৎসাবিষয়ক সম্মেলন, স্মৃতিচারণ, আলোকচিত্র প্রদর্শনী, তথ্যচিত্র প্রদর্শন, বিতর্ক ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং ‘এনডিএফ ৩৬ জুলাই অ্যাওয়ার্ড’ প্রদানসহ নানা আয়োজন করা হবে।
আসন্ন ৯ আগস্ট রাজধানীর শহীদ আবু সাঈদ ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে দিনব্যাপী সমাপনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এ আয়োজনের সমাপ্তি ঘটবে।
তিনি জানান, এই আয়োজনে লক্ষ্য শুধু একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা নয়; বরং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদ পরিবার ও আহতদের সম্মান দেওয়া, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের অবদান তুলে ধরা এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে ন্যায়বিচার, মেধা, দেশপ্রেম ও জাতীয় ঐক্যের চেতনা উদ্ভাবন করা।
আরও পড়ুন: ইসরায়েলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা: সরকার গঠনের তিন সম্ভাব্য পথ
সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তারা দাবি করেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়ে চিকিৎসক, নার্স, মেডিক্যাল ও ডেন্টাল শিক্ষার্থী, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট এবং অ্যাম্বুলেন্সকর্মীরা মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে আহতদের চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। সেই সাথে দায়িত্বশীল গণমাধ্যমও আন্দোলনের প্রকৃত চিত্র প্রমাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
এনডিএফের সিনিয়র সহ-সভাপতি চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও সার্জন ডা. এ কে এম ওয়ালিউল্লাহ জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সাংবাদিকদের পাশাপাশি চিকিৎসকরাও নীরবে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। গুলিতে মাথার খুলি উড়ে যাওয়া, মস্তিষ্ক বেরিয়ে আসা কিংবা ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত রোগীদের ঠাণ্ডা মাথায় চিকিৎসা দিয়ে অসংখ্য প্রাণ রক্ষা করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, শুধুমাত্র এনডিএফের উদ্যোগেই আন্দোলনের সময় আহতদের জন্য ৮৪ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করা হয়েছিল। সেইসাথে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে সরবরাহ করা হয়, যাতে আহতদের চিকিৎসা ব্যাহত না হয়।
এনডিএফের সহ-সভাপতি ডা. আতিউর রহমান জানান, আন্দোলনের সময় সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর সংকট দেখা দেওয়া সত্ত্বেও সংগঠনের পক্ষ থেকে সেগুলি সরবরাহ করা হয়। তাই চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়েছে।
আরও পড়ুন: নির্বাচনে হারের মুখে আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে ভোট চুরির অভিযোগ লিকুদ পার্টির
ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক ডা. নুরুদ্দিন তালুকদার দাবী জানান যে, সে সময় হাসপাতালগুলোতে আহতদের চিকিৎসা না দেওয়ার নির্দেশনা ছিল। এই পরিস্থিতিতে চিকিৎসকদের কখনও কখনও আহতদের পরিচয় গোপন করে চিকিৎসা দিতে হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমাদের বলা হয়েছিল—‘নো ট্রিটমেন্ট, নো রিলিজ’। অনেক ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে, বলার জন্য যে, তিনি গুলিবিদ্ধ নন, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন। এই ভাবে চিকিৎসা দিয়ে অনেক রোগীর জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।”
ডা. নুরুদ্দিন আরো জানান, চিকিৎসকদের জন্য রোগীর জীবন সর্বাধিক অগ্রাধিকারে। তাই সেই নৈতিক দায়িত্ব থেকে এনডিএফের চিকিৎসকেরা জীবন ঝুঁকি নিয়ে আহতদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
এনডিএফের ভাইস প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. আমিনুল হক খান জানান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা ছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। এই ইতিহাস সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব সকলের।
আরও পড়ুন: শামা ওবায়েদের স্পেন ও ইইউর সহযোগিতার প্রশংসা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায়
তিনি জানান, জুলাইয়ের আত্মত্যাগকে ধারণ করে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মেধানির্ভর ও ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা থেকেই এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।
এনডিএফের যুগ্ম সম্পাদক ডা. রুহুল কুদ্দুস বিপ্লব জানান, ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে কোনো জাতি এগিয়ে যেতে পারে না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস এবং চিকিৎসকদের অবদান যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, মাসব্যাপী কর্মসূচিতে গবেষণাপত্র আহ্বান, স্মৃতিকথা সংগ্রহ, আলোকচিত্র ও তথ্যভিত্তিক প্রদর্শনী, শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, তথ্যচিত্র প্রদর্শনী এবং সাংস্কৃতিক আয়োজন থাকবে। এসব আয়োজনের মাধ্যমে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যসেবাকর্মী, শহীদ পরিবার, আহত ব্যক্তি এবং গণমাধ্যমকর্মীদের অবদানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ডা. উসামা রাইয়ান। সংবাদ সম্মেলনে এনডিএফের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন পর্যায়ের চিকিৎসকরা উপস্থিত ছিলেন।
আরও পড়ুন: "অসহিষ্ণু বক্তব্য রাজনীতিকে ‘পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন’-এ নিয়ে যেতে পারে": সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন