১১:৫৬ এম
এক দশক ধরে বৈদেশিক ঋণের বকেয়া বৃদ্ধি পেয়ে ১৪ লাখ কোটি টাকার বেশি হয়ে গেছে। এই বকেয়া ঋণের পরিমাণ প্রায় তিন গুণ বেড়ে গেছে। ২০১৫ সালে দেশের মোট বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল ৩,৮৭৭ কোটি ডলার, যা ২০২৫ সালের শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৩৪৩ কোটি ডলারে। বর্তমান বিনিময়মূল্য অনুযায়ী (প্রতি ডলার ১২৫ টাকা) দেশের মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১৪ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। ঋণের এই ক্রমবর্ধমান বোঝার পাশাপাশি কিস্তি ও সুদ পরিশোধের চাপও বাড়ছে। আগামী দিনে বড় কয়েকটি অবকাঠামো প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ শুরু হলে সরকারের ওপর দায় আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ডেট রিপোর্ট-২০২৬’-এ বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের এই চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে দেশের মোট ঋণের স্থিতি বেড়েছে ৮.৬ শতাংশ। গত ৫ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয় থেকে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের বড় অংশ এসেছে বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর কাছ থেকে। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে দেশের মোট বকেয়া রয়েছে ৫,১১৪ কোটি ডলার। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের কাছে ২,২৬৩ কোটি এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছে ১,৭৫১ কোটি ডলার পাওনা রয়েছে।
আরও পড়ুন: ৬ বছর ১০ মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৩০০ পরিবার পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন
অন্যদিকে, জাপান, চীন, ভারত ও রাশিয়ার মতো দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতা দেশগুলোর কাছে বাংলাদেশের ঋণ ৩,২৬৪ কোটি ডলার। এর মধ্যে জাপানের কাছে ১,২৭২ কোটি এবং রাশিয়ার কাছে ৯০২ কোটি ডলার বকেয়া রয়েছে। সরকারি ঋণের বাইরে, বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণ প্রায় ১,০০০ কোটি ডলার। এছাড়া স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১,৫০০ কোটি ডলার।
বিদেশি ঋণের স্থিতি বাড়লেও তা পরিশোধের সক্ষমতার কয়েকটি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো তুলনামূলকভাবে সহনীয় বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুসারে, দেশের মোট জাতীয় আয়ের (জিএনআই) তুলনায় বিদেশি ঋণের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ২৪ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে এই হার বেড়েছে প্রায় ৬ শতাংশ।
তবে রপ্তানি আয়ের বিপরীতে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের অনুপাত কমে ১৬ শতাংশে নেমেছে। আগের বছরের তুলনায় এই হার ৩ দশমিক ৮ শতাংশ কম। অর্থাৎ, রপ্তানি থেকে অর্জিত প্রতি ১০০ ডলারের মধ্যে ১৬ ডলার ব্যয় হচ্ছে বিদেশি ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে। এই অনুপাত কমে আসাকে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ঋণের স্থিতির পাশাপাশি আসল ও সুদ পরিশোধের পরিমাণও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১২-১৩ অর্থবছরে বিদেশি ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয়েছিল ১১০ কোটি ডলার। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে ২০১ কোটি এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রায় ৩০০ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই ব্যয় বেড়ে হয়েছে প্রায় ৪৫০ কোটি ডলার। অর্থাৎ, ১৪ বছরে পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে চার গুণের বেশি।
আরও পড়ুন: শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনতে আইনগত পদক্ষেপ নেবে সরকার
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ বাবদ ১৩৫ কোটি ১২ লাখ ডলার পরিশোধ করেছে বাংলাদেশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১২৭ কোটি ৯৯ লাখ ডলার। সে হিসাবে ব্যয় বেড়েছে ৫.৬ শতাংশ।
সামনে এই চাপ আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পের ঋণের কিস্তি পরিশোধ শিগগির শুরু হবে। অন্যদিকে, মেট্রোরেল ও কর্ণফুলী টানেলের ঋণ পরিশোধ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এতে সরকারের বাজেট ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন