০১:৫৯ পি.এম
রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে পদ্মা নদীর তীব্র ভাঙনে স্থানীয় কৃষকরা দিশাহারা হয়ে পড়েছেন, যদিও বন্যার পানি কমে গেছে। শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাতে একটি গভীর নলকূপের (ডিপটিউবওয়েল) ঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। পৌরসভার কুঠিপাড়া মরহুম ইয়াহিয়া মিয়ার বাড়ির পাশে অবস্থিত জামে মসজিদটি ভাঙন থেকে মাত্র কয়েক ফুট দূরে অবস্থান করছে। গত দুই মাসে প্রায় ২০০ বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে চলে গেছে। পদ্মাপাড়ের কৃষক ও সাধারণ মানুষের জন্য এই ভাঙন সবচেয়ে বেশি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা ৮ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে চলমান।
গোদাগাড়ী পৌরসভার রেলওয়ে বাজার, মাদারপুর, দেওয়ানপাড়া, বারুইপাড়া, কুঠিপাড়া, হাটপাড়া, সুলতানগঞ্জ, জামাতিরমোড় এবং উপজেলার আলিপুর, বিয়ানাবোনা, নীলবোনা এলাকায় বসতবাড়ি ও আবাদি জমি হারিয়ে শত শত মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। এই পরিস্থিতির ফলে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের তথ্য অনুযায়ী, পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের দেওয়ানপাড়ায় একটি ডিপটিউবওয়েল ঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে, যা কয়েকশ বিঘা জমিতে সেচ ও ফসল ফলানোর কাজে ব্যবহৃত হত। মাদারপুর এলাকায় পদ্মা নদীর ধারে জেগে ওঠা চরে আম, শিশু ও মেহগনি বাগান নদীগর্ভে চলে গেছে। রেলবাজার ঘাটের দুই পাশে ১২টি দোকান, একটি বটগাছ এবং বেশ কয়েকটি খেলার মাঠ বর্তমানে ৩০-৩৫ হাত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। রেলবাজার এলাকায় কেফাতুল্লাহ মাস্টারের ৭৫ বিঘা আবাদি জমির মধ্যে এখন মাত্র কয়েক কাঠা অবশিষ্ট রয়েছে।
আরও পড়ুন: যশোরে সার ডিলার নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ, পাঁচ এমপির বাতিলের দাবি
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ মরিয়ম আহম্মেদ জানান, চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়ন এবং গোদাগাড়ী পৌরসভার আলিপুর ও বিয়ানাবোনা এলাকার শত শত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পদ্মার ভাঙনে চর এলাকায় টমেটো, চিনাবাদাম, কলাই, মটর, খেসারি, মূলা, বেগুনসহ বিভিন্ন মৌসুমী ফসল ও সেচ পাম্পগুলো ধ্বংস হয়েছে।
গত ১৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ এমপি সরেজমিনে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি এক মতবিনিময় সভায় বলেন, "গোদাগাড়ী পৌরসভার নদীতীরবর্তী এলাকায় পদ্মার ভাঙন দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য উদ্বেগের কারণ। ভাঙন প্রতিরোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হবে এবং যেখানে যা করা দরকার তার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।" তিনি এ সময় কোনো অনিয়ম সহ্য করা হবে না এবং দলীয় লোক জড়িত থাকলেও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
পরিদর্শনকালে আরও উপস্থিত ছিলেন পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলন, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমান রিটন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক মো. রুহুল আমিন এবং গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত জাহানসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা।
এদিকে রাজশাহী-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান জানান, ৫ বছরের জন্য ২০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। চরআষাড়িয়াদহ ইউনিয়ন ও গোদাগাড়ী পৌর এলাকায় প্রায় ৩ কিলোমিটার পদ্মার তীরে বাঁধ নির্মাণের প্রক্রিয়া শেষের পথে।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীর জীবনের হুমকির পেছনে বিরোধী দলের উসকানি: রাশেদ খান
স্থানীয়দের মতে, ১৯৭৫ সাল থেকে একতরফা ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর থেকেই শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট এবং বর্ষায় তীব্র ভাঙনের শিকার হচ্ছে এই অঞ্চল। ১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি অনুযায়ী ন্যায্য পানির প্রবাহ না পাওয়া এবং ভারত কর্তৃক বর্ষার সময় বাঁধের গেট খুলে দেওয়ায় প্রতিবছর গোদাগাড়ীতে নদীভাঙন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।
স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে গোদাগাড়ীর বাকি আবাদি জমি, বসতবাড়ি, দোকান ও মসজিদ পদ্মার বুকে হারিয়ে যাবে এবং এলাকার মানচিত্র বদলে যাবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন