১১:১০ এম
বাংলাদেশ সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি ‘মক্কা চুক্তি’-তে যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে বলে জানিয়েছেন এক মন্ত্রী।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ যদি এই চুক্তিতে যোগ দেয়, তাহলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন বিদ্যমান। বাংলাদেশ ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে যে তারা জোর করে মানুষকে বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে।
এছাড়া, আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবিও উঠেছে।
আরও পড়ুন: সুইজারল্যান্ডের প্রতি বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের আহ্বান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলের
শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ যদি মক্কা চুক্তিতে যোগ দেয়, তাহলে তা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ওপর নতুন প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামী দেশগুলোর মধ্যে কোনো নিরাপত্তা চুক্তি হলে বাংলাদেশ তাতে অংশ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।’ সোমবার তিনি সাংবাদিকদের আরো বলেন, ‘এ ধরনের উদ্যোগকে বাংলাদেশ ইতিবাচকভাবে দেখছে।’
হুমায়ুন কবির বলেন, ‘বাংলাদেশের নেতৃত্বকে, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এই উদ্যোগে অংশ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।’
আরও পড়ুন: ২০৩৪ সালের মধ্যে জিডিপি ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়াবে প্রধানমন্ত্রীর আশা
রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে ‘মক্কা চুক্তি’-তে যোগ দেওয়ার জন্য সৌদি আরব আমন্ত্রণ জানিয়েছে বলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে। তবে এই আমন্ত্রণ কখন পাঠানো হয়েছে, তা জানা যায়নি। রয়টার্সকে ওই সূত্র এই তথ্য জানিয়েছে। গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি না থাকায় সূত্রটি নাম প্রকাশ করেনি।
চলতি মাসে সৌদি আরবের পবিত্র শহর মক্কায় তিনটি সুন্নি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এই প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেছে। চুক্তিটি ন্যাটোর যৌথ প্রতিরক্ষা নীতির আদলে তৈরি করা হয়েছে। চুক্তিতে সই করা দেশগুলো অঙ্গীকার করেছে, কোনো একটি সদস্য দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ওই মন্ত্রীর বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বাংলাদেশে অবস্থিত সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের দূতাবাসগুলো তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
আরও পড়ুন: ২৫টি সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের দ্বিতীয় শিফট সাময়িক স্থগিত
এদিকে, তুরস্ক জানিয়েছে, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে করা ‘মক্কা চুক্তি’ আরো দেশকে যুক্ত করে সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী তুরস্ক। অন্যদিকে, পাকিস্তান একটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ এবং সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল রপ্তানিকারক দেশ।
মধ্যপ্রাচ্যে যখন আঞ্চলিক সংঘাত তীব্র হচ্ছে, তখন এই চুক্তিটি সম্পন্ন হলো। এর মধ্যে ইরান থেকেও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চলছে। তুরস্কের মতো বাংলাদেশও একটি ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র। তবে বাংলাদেশের ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ নিজেদের সুন্নি মুসলিম হিসেবে পরিচয় দেন।
পররাষ্ট্রনীতির পরীক্ষা
বিশ্লেষকরা বলছেন, কোনো সামরিক জোটে বাংলাদেশ যোগ দিলে দেশের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরীক্ষা আসতে পারে। বাংলাদেশ সাধারণত বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে। পাশাপাশি বিনিয়োগ বাড়ানো, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়।
আরও পড়ুন: এস এম জিলানী: গুপ্ত ও ফ্যাসিস্টরা নতুন চক্রান্ত শুরু করেছে
তাহলে, কোনো সামরিক জোটে যোগ দিলে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকটা তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। দেশের তৈরি পোশাকের বেশিরভাগই ব্রিটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়। এছাড়া, বিদেশে কর্মরত লাখ লাখ বাংলাদেশির পাঠানো রেমিট্যান্সও দেশের বৈদেশিক মুদ্রার একটি বড় উৎস। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বাংলাদেশি শ্রমিকদের পাঠানো অর্থ এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক কল্লোল কিবরিয়া মনে করেন, বাংলাদেশ যদি কোনো সামরিক জোটে যোগ দেয়, তাহলে শুধু ভারতের সঙ্গে নয়, চীন, ইরান, জাপান, কুয়েত, ওমান, কাতার, রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্ক জটিল হতে পারে।
তিনি বলেন, এসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক হঠাৎ করে নষ্ট হবে না। তবে বাংলাদেশ যদি কোনো সামরিক জোটে যোগ দেয়, তাহলে দেশটি কোন পক্ষের সঙ্গে আছে, এমন প্রশ্ন এড়ানো কঠিন হয়ে যাবে।
আরও পড়ুন: জয়-পুতুলসহ ৮ জনের আয়কর নথি জব্দের নির্দেশ আদালতের
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে জটিলতা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের ছয় মাসের সময়ে সৌদি আরবের এই আমন্ত্রণ এসেছে। এই সময়ে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে। দুই দেশই সম্পর্ক ভালো রাখার চেষ্টা করছে। তবে মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশ যোগ দেওয়ার বিষয়টি ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে নতুন করে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফর করবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। চলতি মাসে প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র এ কথা জানিয়েছেন। এদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধের বিষয়ে ভারতের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা।
চলতি মাসে নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে শেখ হাসিনা কথা বলার পর এ ধরনের সফরের জন্য ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরির আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। তবে হাসিনার ওই বক্তব্যের সমালোচনা করেছে ঢাকা।
আরও পড়ুন: গোলাম মোস্তফা: ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদের সূচনা
মক্কা চুক্তির বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, তারা পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তানকে নিয়ে গঠিত কোনো নিরাপত্তা জোটে বাংলাদেশ যোগ দিলে ভারত বিষয়টি ভালোভাবে নাও নিতে পারে। তবে এমন সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বাংলাদেশকেই বিবেচনা করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ শাহান বলেন, কোনো সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে স্থিতিশীল বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল।
তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ যদি এই জোটে যোগ দেয়, তাহলে ভারতসহ কয়েকটি দেশ অসন্তুষ্ট হতে পারে। তবে শুধু অন্য দেশ কী ভাববে, সেটিকে বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ করা উচিত নয়।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন