১১:৩৩ এম
যুক্তরাষ্ট্রের এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জাতীয়, অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় পর্যায়ে অন্তত ৯৭ জন মুসলিম-আমেরিকান প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। এই তথ্যটি দেশটির মুসলিম অধিকারবিষয়ক সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (কেয়ার) প্রকাশ করেছে।
নির্বাচনে মূল নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ১৬৮ জন মুসলিম-আমেরিকান প্রার্থীর মধ্যে সাতজন ওয়াশিংটন ডিসিতে যাচ্ছেন। প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হয়েছেন—ইলহান ওমর, রাশিদা তালিব, আন্দ্রে কারসন ও লতিফা সাইমনের মতো বর্তমান সদস্যদের পাশাপাশি নতুন করে নির্বাচিত হয়েছেন আদম হামাউই, আয়েশা ওয়াহাব ও দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ের।
অন্যদিকে, সিনেটে নির্বাচিত হয়েছেন আবদুল আল-সাইয়েদ। তিনি ছয় বছরের মেয়াদে দায়িত্ব পালনকারী প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে পরিচিত।
আরও পড়ুন: গাজায় ভারী বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ায় ভবন ধসে, আহত ২
এছাড়া, অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেল, আইনসভা ও সিনেটসহ বিভিন্ন পদে ৩৯ জন, কাউন্টি ও পৌর পর্যায়ে ১৬ জন, শিক্ষা ও স্কুল বোর্ডে ২৭ জন এবং বিচারক হিসেবে আটজন মুসলিম নির্বাচিত হয়েছেন। মুসলিম প্রার্থীদের জন্য এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সর্বোচ্চ নির্বাচনী সাফল্য।
দল নয়, নীতিই মুখ্য
যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার মাত্র এক শতাংশ মুসলিম। দেশে মুসলিমের সংখ্যা প্রায় ৫৫ লাখ। যদিও জনসংখ্যায় তারা কম, রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনায় তাদের উপস্থিতি এবং পরিচয় নিয়ে বিতর্ক তুলনামূলকভাবে বেশি।
এবারের নির্বাচনে মুসলিম ভোটার নিবন্ধন গত বছরের তুলনায় অন্তত ২৫ শতাংশ বেড়েছে। একটি জরিপে ভোটদানের হার ৯৩ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কেয়ারের তথ্য অনুযায়ী, মুসলিম ভোটারদের ৮০ শতাংশ ডেমোক্র্যাটদের এবং ৬ শতাংশ রিপাবলিকানদের ভোট দিয়েছেন। এনবিসির বুথফেরত জরিপেও দেখা গেছে, ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে অন্য যেকোনো গোষ্ঠীর তুলনায় মুসলিম ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের প্রতি সমর্থন বেশি ছিল।
আরও পড়ুন: মার্কিন নির্বাচনে ইতিহাস গড়া প্রথম দক্ষিণ এশীয় মুসলিম নারী সাবা হায়দার
তবে ২০২৪ সালের নির্বাচনে ২০ শতাংশের বেশি মুসলিম ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন বলে ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল পলিসি অ্যান্ড আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের (আইএসপিইউ) এক গবেষণায় উঠে এসেছে।
জর্জিয়া ভোটার প্রজেক্টের যোগাযোগ পরিচালক উরুজ আলির মতে, মুসলিম ভোটাররা সাধারণত দলীয় পরিচয়ের চেয়ে নীতিগত অবস্থানকে বেশি গুরুত্ব দেন। অনেকে নিজেদের ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান না ভেবে স্বতন্ত্র ভোটার হিসেবে পরিচয় দেন।
এবার জর্জিয়ায় আগাম ভোটের ক্ষেত্রেও রেকর্ড হয়েছে। আলির তথ্যমতে, প্রায় ৩০ হাজার মুসলিম ভোটার আগাম ভোট দিয়েছেন। অথচ ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সব মিলিয়ে মুসলিম ভোটারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৬ হাজার। জর্জিয়ায় হিজাব পরিহিত চার মুসলিম নারীও রাজ্য সিনেটে নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের একজন রুওয়া রোমান।
ইসলামবিদ্বেষের মধ্যেও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্য, হুমকি ও সহিংসতার ঘটনা বেড়েছিল। ক্যালিফোর্নিয়ায় বিভিন্ন ভবনে ইসলামবিদ্বেষী গ্রাফিতি, ইলিনয়ে হিজাব পরা নারীদের গুলি করার হুমকি এবং ক্যালিফোর্নিয়ায় মসজিদে হামলায় এক নিরাপত্তাকর্মী নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে।
আরও পড়ুন: মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগের সৌদি আরবে হুথিদের হামলার তীব্র নিন্দা
সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেটের (সিএসও) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে রিপাবলিকান জনপ্রতিনিধিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক হাজার ১১১টি পোস্ট, আটটি বিল এবং ৬২ সদস্যের কংগ্রেসনাল ককাসের মাধ্যমে সমন্বিত ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণা চালিয়েছেন। সংস্থাটির মতে, এসব বক্তব্য সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
কেয়ারের জরিপে ৭০ শতাংশ মুসলিম ভোটার জানিয়েছেন, ইসলামবিদ্বেষ ভোট দিতে উৎসাহিত করেছে। আইএসপিইউর জাতীয় ইসলামোফোবিয়া সূচকও ২০২২ সালের ২৫ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৩৩-এ দাঁড়িয়েছে।
তবে এসব ঘটনা মুসলিমদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কমাতে পারেনি। বরং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা ও অংশগ্রহণ বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ট্রাম্পের ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশনের সাবেক সদস্য সামিরাহ মুনশি বলেন, ৯/১১-পরবর্তী সময়ে মুসলিমদের যে হতাশা ও ভীতির অভিজ্ঞতা হয়েছিল, বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই তা সরাসরি অনুভব করেনি। ফলে তারা রাজনীতিতে আরও সক্রিয় ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন: গাজায় যুদ্ধের ক্ষত বুকে ২৫০ দম্পতির বিয়ের উৎসব
গত তিন বছরে ফিলিস্তিনের পক্ষে জনমত এবং ইসরাইলের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা মূলধারার সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে জায়গা করে নেওয়াও মুসলিমদের রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হতে উৎসাহিত করেছে বলে মনে করেন তিনি।
কেয়ারের জরিপ অনুযায়ী, ৭৬ শতাংশ মুসলিম ভোটার ফিলিস্তিন ও গাজার মানবাধিকার পরিস্থিতিকে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনি ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করেছেন। ৮০ শতাংশ বলেছেন, গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান তাদের ভোটের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলেছে।
ধর্মীয় পরিচয়কে আড়াল না করে নির্বাচনি প্রচার
এবারের নির্বাচনে মুসলিম ও অন্যান্য ধর্মীয় পরিচয়ের প্রার্থীদের সাফল্যের পেছনে ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রকাশও ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
আরও পড়ুন: হাইতিতে গ্যাং নেতার মৃত্যু, প্রধানমন্ত্রী উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন
বেলিভার্স কনসালটিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা জামিয়াহ অ্যাডামস বলেন, ধর্মপ্রাণ ভোটাররা তাদের মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নেতৃত্ব চান। যেসব প্রার্থী নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও জনসেবার অঙ্গীকারের মধ্যে সম্পর্ক তুলে ধরেছেন, তারা ভোটারদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পেরেছেন।
মুসলিম পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিলের (এমপ্যাক) ভাইস প্রেসিডেন্ট হারিস তারিনের মতে, ডেমোক্র্যাটরা ঐতিহাসিকভাবে নির্বাচনি প্রচারে ধর্মীয় পরিচয় তুলে ধরতে সংকোচ বোধ করতেন। কিন্তু এবার দেখা গেছে, নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাসের কথা খোলাখুলিভাবে বলা প্রার্থীরাও ভোটারদের সমর্থন পেয়েছেন।
সিনেটর নির্বাচিত আবদুল আল-সাইয়েদের প্রচারেও ধর্মীয় পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন এবং নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসকে জনসেবার যোগ্যতার অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তার বিজয় ভাষণের শুরুতে ছিল ‘ইনশাআল্লাহ’ ও ‘আলহামদুলিল্লাহ’।
অন্যদিকে নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি নির্বাচনি প্রচারে ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে নাগরিক ও সামাজিক ইস্যুকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তবে নির্বাচিত হওয়ার পর নিজের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে আরও খোলামেলা হয়েছেন।
আরও পড়ুন: স্বর্ণে মোড়ানো ১২৬ কক্ষের রাজপ্রাসাদ, প্রবেশমূল্য লাখ ডলার—ট্রাম্পের বিলাসী অন্দরমহল
ফিলিস্তিন ইস্যুতে আন্তধর্মীয় সংহতি
ফিলিস্তিনের অধিকার ও গাজা পরিস্থিতি নিয়ে মুসলিমদের পাশাপাশি খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী কয়েকজন ডেমোক্র্যাট নেতাও সরব হয়েছেন। টেক্সাসের নতুন সিনেটর জেমস তালারিকো বলেছেন, ইসলামও খ্রিষ্টধর্মের মতো সত্যের একটি পথ। গাজার পরিস্থিতি তাকে একজন শিক্ষক, খ্রিষ্টান ও মানুষ হিসেবে ব্যথিত করে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
কানসাসের নবনির্বাচিত ডেমোক্র্যাট সিনেটর অ্যাডাম হ্যামিলটন বলেছেন, খ্রিষ্টানরা পরকালে মুসলিমদের সঙ্গে মিলিত হবেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন। ফিলিস্তিনি খ্রিষ্টানদের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের যোগাযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে টেক্সাসের রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ এসব বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন। মুসলিম ও ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করায় তিনি দুই ডেমোক্র্যাট নেতার সমালোচনা করেন।
এদিকে ট্রাম্পের ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন থেকে সামিরাহ মুনশি পদত্যাগ করেছিলেন ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া এক ক্যাথলিক সহকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিবাদে। কমিশনের চেয়ারম্যান ও টেক্সাসের লেফটেন্যান্ট গভর্নর ড্যান প্যাট্রিক এবারের নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন।
পরিচয়ের বাইরেও বহুমাত্রিক প্রতিনিধিত্ব
মুসলিম প্রার্থীদের জয় মানেই তারা সবাই প্রগতিশীল বা ডেমোক্র্যাট—এমন নয়। অ্যারিজোনার রিপাবলিকান প্রতিনিধি আবে হামাদেহও পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি ট্রাম্পের সমর্থন পেয়েছিলেন।
মুসলিম আমেরিকানস ইন পাবলিক সার্ভিসের চেয়ারম্যান আহমাদ মাতি বলেন, সরকারি দায়িত্ব ও নেতৃত্বে মুসলিমদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ বহু বছরের সামাজিক সম্পৃক্ততা, পরিশ্রম ও নাগরিক উদ্যোগের ফল। এসব জয় প্রমাণ করে, দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে মুসলিমদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
ইলিনয়ের অষ্টম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টে ডেমোক্র্যাট প্রাইমারিতে পরাজিত মুসলিম প্রগতিশীল নেতা জুনায়েদ আহমেদের মতে, এবারের সাফল্য মূলত বৈচিত্র্য ও প্রতিনিধিত্বের জয়। মুসলিম আমেরিকানরা বিভিন্ন জাতি, বর্ণ ও রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ। তাদের নির্বাচিত হওয়া সেই বৈচিত্র্যেরই প্রতিফলন।
জর্জিয়া মুসলিম ভোটার প্রজেক্টের উরুজ আলি বলেন, মুসলিম আমেরিকানদের কোনো অভিন্ন রাজনৈতিক এজেন্ডা নেই। তবে সমাজের কল্যাণ, মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উন্নত পৃথিবী গড়ে তোলার মূল্যবোধ তাদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এবারের নির্বাচনে মুসলিম আমেরিকানদের সাফল্য শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়; বরং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, নাগরিক অধিকার, ফিলিস্তিন ইস্যু, অর্থনীতি এবং বহুমাত্রিক সামাজিক প্রতিনিধিত্বের সম্মিলিত প্রতিফলন।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই
আরএ
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন