০২:৫৮ এম
কূটনীতিকরা টেবিলে বসেছিলেন। বিশ্বকে বলা হচ্ছিল উত্তেজনা কমছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতা আবারও প্রমাণ করল, এই অঞ্চলে কূটনীতির টেবিল আর যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে দূরত্ব কখনো কখনো মাত্র কয়েক মিনিটের। আজ কি মধ্যপ্রাচ্যে আবারো দাবানলের মতো জেগে উঠছে যুদ্ধের আগুন?
যুদ্ধবিরতির আলোচনা চলছিল। কিন্তু এই আলোচনাকে কোন গুরুত্ব না দিয়ে লেবাননে ক্রমাগত হামলা চালিয়ে ঘরবাড়ি ধ্বংসের পাশাপাশি লেবানিজ নাগরিকদেরকে ফিলিস্তিনের গাজার মত হত্যার মাধ্যমে ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে যেন আগুনে ঘি ঢালছিল। এমন সময় দুদিন আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরাইলকে সতর্ক করে বলেছিলেন, ইসরাইল যাতে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে হামলা না করে, এবং যদি হামলা করে সেটি হবে ইরানের রেড লাইন অতিক্রম করার সমান। আজ ইসরাইল সেটি অতিক্রম করেছে অর্থাৎ ইরানের দেওয়া রেডলাইন অতিক্রম করে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে হামলা চালিয়েছে।
এরপরপর-ই ইরানের সর্বোচ্চ সামরিক নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে হয়তো সম্ভাব্য ইজরাইলকে পাল্টা জবাব দেয়ার জন্য। কারণ তার লক্ষণ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। ইরানের আকাশ সীমা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে সেই সাথে সম্ভাব্য কাতার তার আকাশ সীমায় আন্তর্জাতিক ফ্লাইটগুলো স্থগিত কিংবা রুট পরিবর্তন করার কথা জানা গেছে, অন্যদিকে ইরানি স্থানীয় তথ্য মতে ইরানের আকাশে ইরানি যুদ্ধ বিমান গুলোর গর্জন শোনা যাচ্ছে, এ থেকে যতটা অনুমান হচ্ছে তাতে ইরান তার দেয়া রেড লাইন অতিক্রম করায় ইসরাইলকে এবার চরম শিক্ষা দিতে ভয়াবহ হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং সেটা হয়তো শুরুও হয়ে যেতে পারে যখন তখন এই লেখা পর্যন্ত শুরুর খবর পাওয়া যায়নি তবে যেকোনো সময় শুরু হতে পারে। আর এবার এই হামলায় কি তবে ইসরাইলকে বিশ্বের মানচিত্র থেকে মুছে দিবে ইরান? কারণ বৈরুতে হামলার পর ইরানি সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পরিষদের একজনের বক্তব্য অত্যন্ত আক্রমণাত্মক এবং সবচেয়ে ভয়াবহ বলে মনে হয়েছে। তার কথায় তিনি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু কে পরোক্ষ ইঙ্গিত করে পাগল কুকুরের গলায় রশি বাধার এখনই সময় বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।
লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরাইলের সাম্প্রতিক হামলা শুধু একটি সামরিক অভিযান নয়; এটি এমন একটি পদক্ষেপ, যা অনেকের মতে সরাসরি ইরানের ঘোষিত রেড লাইনের প্রতি চ্যালেঞ্জ। প্রশ্ন হচ্ছে, যদি কোনো রাষ্ট্র বছরের পর বছর একটি সীমারেখা টেনে দেয়, আর প্রতিপক্ষ বারবার সেই সীমারেখা অতিক্রম করে, তাহলে সেই সীমারেখার অস্তিত্ব কোথায়? সে ক্ষেত্রে কি ইরান এবার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়ে ইসরাইলকে বিশ্বের মানচিত্র থেকে মুছে দেবে? এটি হয়তো ইরানের জন্য একটি মোক্ষম সময় এমনটা মনে না করার কোন কারণ নেই। কারণ ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা জীবিত থাকাকালীন ইসরাইলকে মধ্যপ্রাচ্যের ক্যান্সারের সাথে তুলনা করে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তার মৃত্যুর পর তার যোগ্য উত্তরসূরী আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনিও সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধের মধ্যে আবারো তেমন উক্তি পুনরায় করেছেন।
বৈরুতে হামলার পর যে ঘটনাগুলো দ্রুত ঘটতে শুরু করেছে, সেগুলোকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফ্লাইট রুট পরিবর্তন করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে অস্বাভাবিক সতর্কতা জারি হয়েছে, আঞ্চলিক বিমান চলাচল নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে এবং একাধিক রাষ্ট্র নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা ও আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও জানিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে অনেক পর্যবেক্ষকের মনে প্রশ্ন জাগছে—তবে কি তেহরান এমন কোনো প্রতিক্রিয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা অতীতের সীমিত জবাবের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত হবে?
কারণ বিষয়টি এখন আর শুধু একটি বিমান হামলার নয়। বিষয়টি ইরানের কৌশলগত বিশ্বাসযোগ্যতার। যদি রেড লাইন অতিক্রমের পরও কোনো কার্যকর প্রতিক্রিয়া না আসে, তাহলে ভবিষ্যতে সেই রেড লাইনের রাজনৈতিক মূল্য কতটুকু থাকবে?
ইতোমধ্যে ইরানের বিভিন্ন পর্যায় থেকে কঠোর ভাষার বক্তব্য আসছে। বৈরুতে হামলার জবাবে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে এবং আরও ধারাবাহিক আঘাতের ইঙ্গিত দিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সেই প্রতিক্রিয়া কি শুধুই প্রতীকী থাকবে, নাকি তা রূপ নেবে কথিত "অপারেশন ট্রু প্রমিস-৫" ধরনের বৃহত্তর সামরিক অভিযানে?
যদি তেহরান মনে করে যে বৈরুতে হামলার মাধ্যমে শুধু লেবানন নয়, বরং পুরো প্রতিরোধ অক্ষকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে, তাহলে তাদের জবাবও হয়তো শুধু একটি লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, সাইবার সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সমন্বয়ে এমন এক বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে, যার প্রভাব তেলআবিব থেকে শুরু করে সমগ্র অঞ্চলে অনুভূত হবে।
তবে আরেকটি বাস্তবতা রয়েছে। ইসরাইলও জানে, প্রতিটি সামরিক সাফল্যের একটি রাজনৈতিক মূল্য আছে। বৈরুতে হামলা যদি সত্যিই ইরানের কাছে অমার্জনীয় সীমালঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে স্বল্পমেয়াদি সামরিক অর্জন দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
আজ মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে শুধু যুদ্ধবিমান উড়ছে না; উড়ছে অনিশ্চয়তা, শঙ্কা এবং সম্ভাব্য বৃহত্তর সংঘাতের ছায়া। বিমান রুট পরিবর্তন, আকাশসীমা সংকট, আন্তর্জাতিক উদ্বেগ—সবকিছু যেন একটি বড় ঝড়ের আগমনী বার্তা বহন করছে।
সুতরাং মূল প্রশ্নটি আর "ইরান প্রতিক্রিয়া জানাবে কি না" নয়। মূল প্রশ্ন হলো—ইরান কত বড় প্রতিক্রিয়া জানাবে?
বৈরুতের ধোঁয়া হয়তো একসময় মিলিয়ে যাবে। কিন্তু সেই ধোঁয়ার আড়ালে যে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হচ্ছে, সেগুলোই নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্যের পরবর্তী অধ্যায় কূটনীতির ভাষায় লেখা হবে, নাকি ক্ষেপণাস্ত্রের আগুনে।
আর যদি সত্যিই তেহরান সিদ্ধান্তে পৌঁছে থাকে যে, ইসরাইল কে দেয়া রেড লাইন আর পিছু হটার জন্য নয়, বরং কার্যকর করার জন্য, তাহলে বৈরুতের হামলাকে ভবিষ্যতে ইতিহাস হয়তো একটি নতুন আঞ্চলিক সংঘাতের সূচনা বিন্দু হিসেবেই স্মরণ করবে।
ইরানি জনগণ যে মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিরোধের প্রতীক তা ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছে। ইরানের উপর মার্কিন ইজরায়েলের অবৈধ হামলার পর ইরানি জনগণের শতকরা ৮০ শতাংশ নাগরিক পশ্চিমা শক্তি কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোন আলোচনার টেবিলে না গিয়ে ইরানকে যুদ্ধের মাধ্যমে এর সমাপ্তির জন্য সমর্থন জানিয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যখন ইরান আমেরিকার মধ্যে যুদ্ধ বিরতির মাঝেই একটি শান্তি চুক্তির আলোচনা চলছিল সেই সময়ও যে ইসরাইল সেই শান্তি চুক্তিকে তোয়াক্কা না করে ক্রমাগত লেবাননে ফিলিস্তিনের মতো ক্রমাগত হামলা চালিয়ে ধ্বংসলীলা চালিয়ে যাচ্ছিল এবং সর্বশেষ ইরানের রেডলাইন অতিক্রম করেছে, এর ফলে ইরান কর্তৃক ঘোষিত পাল্টা হামলায় কি তবে মানচিত্র থেকে মুছে যাবে ইসরাইল? ইরান কি তেমন হামলা শুরু করবে? মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে কি আবার গর্জন করবে যুদ্ধের দামামা! বাস্তবতা সময়েই বলে দেবে।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন