০৯:৫১ পি.এম
ফুটবল শুধুই প্রতিযোগিতার মঞ্চ নয়, এটি বিভিন্ন জাতি, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের মানুষের মিলনস্থলও। তবে এই আবেগঘন খেলাকে ঘিরে কখনো কখনো মাথাচাড়া দেয় বর্ণবাদ, বিদ্বেষ ও ধর্মীয় বিদ্রূপের মতো নেতিবাচক প্রবণতা। এমন এক ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিলেন স্পেনের তরুণ ফুটবল তারকা লামিনে ইয়ামাল। প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ্য করে দেওয়া একটি ধর্মীয় বিদ্রূপাত্মক স্লোগানের পর তিনি নিজের পরিচয় আড়াল না করে গর্বের সঙ্গে ঘোষণা করেন— ‘আমি একজন মুসলিম, আলহামদুলিল্লাহ।’
ঘটনার সূত্রপাত হিসেবে দেখা যায়, গত ৩১ মার্চ ২০২৬ বার্সেলোনার আরসিডিই স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত স্পেন ও মিশরের মধ্যকার প্রীতি ফুটবল ম্যাচটি গোলশূন্য ড্রতে শেষ হয়। দুই দলের পারফরম্যান্স ছিল বেশ কাছাকাছি। তবে ম্যাচকে কেন্দ্র করে স্পেনের কিছু সমর্থকের আচরণ নিয়ে সমালোচনা তৈরি হতে শুরু করে। ম্যাচ দেখতে আসা কয়েকজন স্প্যানিশ সমর্থক মিশরীয় খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্যে একটি স্লোগান দিতে থাকে—
“El que no bote es un musulmán”
আরও পড়ুন: ইসরাইল নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই, সরকার গঠনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অধরাই
যার অর্থ হচ্ছে—‘যে লাফাবে না বা ভালো খেলতে পারবে না, সে মুসলিম।’ স্প্যানিশ ফুটবল সংস্কৃতিতে প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ্য করে ‘যে লাফাবে না, সে…’ ধরনের ছড়া বা স্লোগান দেওয়ার প্রচলন দীর্ঘদিনের। কিন্তু ওই ঘটনায় সমালোচনার কারণ ছিল— মিশরের খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্যে বিদ্রূপ করতে তাদের মুসলিম পরিচয়কে ব্যবহার করা।
সমর্থকেরা হয়তো এটিকে শুধুই প্রতিপক্ষকে খোঁচা দেওয়ার একটি পদ্ধতি হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল, যে দলের সমর্থনে তারা এই স্লোগান দিচ্ছিল, সেই স্পেন দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়, লামিনে ইয়ামাল, নিজেও একজন গর্বিত মুসলিম। তাই ‘মুসলিম’ শব্দটিকে বিদ্রূপ হিসেবে ব্যবহার করা শুধু মিশরীয় খেলোয়াড়দের নয়, ইয়ামালের নিজের পরিচয়ের প্রতি অসম্মান হিসেবে ধরা পড়ে।
ইয়ামালের জবাব ছিল— ‘আমি একজন মুসলিম, আলহামদুলিল্লাহ’। ঘটনার পরদিন, অর্থাৎ ১ এপ্রিল ২০২৬, ইয়ামাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি নিজের মুসলিম পরিচয়কে গর্বের সঙ্গে তুলে ধরে লেখেন—
‘আমি একজন মুসলিম, আলহামদুলিল্লাহ।’
আরও পড়ুন: ইসরায়েলে পার্লামেন্ট নির্বাচনের ভোট গণনা চলছে, লিকুদ পার্টি এগিয়ে
তিনি আরও বলেন, ‘গতকাল স্টেডিয়ামে আমরা শুনেছি স্লোগান দেওয়া হচ্ছিল—‘যে লাফাবে না সে মুসলিম’। আমি জানি, এটি প্রতিপক্ষ দলকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছিল, ব্যক্তিগতভাবে আমাকে লক্ষ্য করে নয়। কিন্তু একজন মুসলিম হিসেবে আমার কাছে এটি অত্যন্ত অসম্মানজনক। আমরা এমন আচরণ মেনে নিতে পারি না।’
ইয়ামাল এই প্রসঙ্গে আরও লেখেন, ‘আমি বুঝি, সব সমর্থক এমন নন। তবে যারা এই ধরনের স্লোগান দিয়েছেন, তাদের বলব— ফুটবল স্টেডিয়ামে মানুষকে উপহাস করার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করা আপনাদের অজ্ঞতা ও বর্ণবাদী মানসিকতার পরিচয় দেয়।’ তিনি ফুটবলের প্রকৃত চেতনার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘ফুটবল উপভোগ ও ভালোবাসার জায়গা। কার পরিচয় কী বা কে কোন বিশ্বাস ধারণ করে, তা নিয়ে অপমান করার জায়গা নয়।’
এখানে মনে করলে দেখা যায়, মুসলমান ইয়ামালের এই প্রতিক্রিয়া শুধু একটি ব্যক্তিগত প্রতিবাদ ছিল না; বরং এটি বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে ধর্মীয় বিদ্বেষ ও ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে একটি শক্ত অবস্থান হিসেবে দেখা হয়। তিনি দেখিয়েছেন যে, নিজের ধর্মীয় পরিচয় লুকিয়ে না, বরং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করেও একজন ক্রীড়াবিদ বিশ্বমঞ্চে সফল হতে পারেন।
ইয়ামাল কখনোই তার মুসলিম পরিচয় গোপন করেননি। পেশাদার ফুটবলের কঠোর অনুশীলন, ব্যস্ত সূচি এবং শারীরিক চাপের মধ্যেও তিনি রমজান মাসে রোজা পালনের বিষয়টি আগেও প্রকাশ্যে জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন: ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ স্থলভাগে প্রবেশ, উপকূলে তাণ্ডবের আশঙ্কা
মিশরের খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্যে দেওয়া ওই স্লোগান মূলত একটি নির্দিষ্ট দলকে লক্ষ্য করে হলেও এর মধ্যে থাকা ধর্মীয় বিদ্রূপ অনেকের কাছে আপত্তিকর হয়ে ওঠে। ইয়ামাল সেই জায়গাতেই মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, খেলাধুলার মাঠে প্রতিযোগিতা থাকতে পারে, কিন্তু ঘৃণা, বিদ্বেষ কিংবা কোনো মানুষের বিশ্বাসকে অপমান করার জায়গা সেখানে হওয়া উচিত নয়।
লামিনে ইয়ামালের ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমি একজন মুসলিম’— এই বক্তব্য শুধুমাত্র তার ব্যক্তিগত বিশ্বাসের প্রকাশ নয়; এটি সম্মান, সহনশীলতা ও বৈচিত্র্যের পক্ষে একটি শক্তিশালী বার্তা। ফুটবল বিশ্বের কোটি মানুষের আবেগের জায়গা। এই আবেগ যেন কখনো বিদ্বেষে পরিণত না হয়, বরং পারস্পরিক সম্মান ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও দৃঢ় করে— ইয়ামালের প্রতিবাদ সেই প্রত্যাশাকেই সামনে রেখেছে।
সূত্র: রিলিজিয়ন আনপ্ল্যাগ্ড ডটকম
আরও পড়ুন: ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ ১৫০ কিলোমিটার বেগে আঘাত হেনেছে অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলে
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন