০৯:২৬ এম
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দেশটির সঙ্গে একটি চুক্তির মাধ্যমে কয়েকটি তেলক্ষেত্রের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা করছে। এই চুক্তির আওতায় মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো এসব তেলক্ষেত্রের উন্নয়ন করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উৎপাদিত অপরিশোধিত তেলের একটি বড় অংশ নিশ্চিত করা হবে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে যে, চুক্তিটি খুব শিগগিরই সই ও প্রকাশ করা হতে পারে। এতে ভেনেজুয়েলার কিছু গুরুত্বপূর্ণ তেলক্ষেত্র মার্কিন সরকারের নিয়ন্ত্রণে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে পারে। একটি সূত্র জানায়, বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলা সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আলোচনা চলছে।
সূত্রের ভাষ্য, “এটি সত্যি এবং দুই দেশের সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।” অন্য একটি সূত্র বলেছে, চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য “ইজারা” পদ্ধতি ব্যবহারের কথা ভাবা হচ্ছে। পরে নিলাম বা দরপত্রের মাধ্যমে প্রতিটি তেলক্ষেত্র মার্কিন তেল উৎপাদনকারী কোম্পানির কাছে দেওয়া হতে পারে।
আরও পড়ুন: যাত্রাবাড়ীতে ছিনতাই সন্দেহে গণপিটুনিতে আহত যুবক নিশাত মিয়ার মৃত্যু
রয়টার্স যে আলোচনার তালিকা দেখেছে, তাতে মোট ১৭টি তেলক্ষেত্রের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এই তালিকার মধ্যে ভেনেজুয়েলার বিশাল ওরিনোকো বেল্টের নতুন তেলক্ষেত্র রয়েছে। এছাড়া মারাকাইবো হ্রদের আশপাশের পুরোনো ও বেশি উৎপাদনশীল তেলক্ষেত্রও রয়েছে। তালিকায় থাকা কয়েকটি তেলক্ষেত্র বর্তমানে একটি ছোট চীনা কোম্পানি পরিচালনা করছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সরকারের সময়ে ওই কোম্পানির সঙ্গে এসব তেলক্ষেত্র নিয়ে চুক্তি হয়েছিল।
সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে হোয়াইট হাউসের কাছে জানতে চাওয়া হলে তারা প্রশ্নটি যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি দপ্তরের কাছে পাঠায়।
তবে ভেনেজুয়েলার তেল মন্ত্রণালয়, রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ এবং যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি দপ্তর তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। ভেনেজুয়েলার তেলমন্ত্রী পাওলা এনাওয়ের সঙ্গেও যোগাযোগ করা যায়নি। বৃহস্পতিবার ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার অংশ হিসেবে ওপেক থেকে বের হয়ে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
আরও পড়ুন: কাতারের শান্তি প্রস্তাব নাকচ, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন হামলার শঙ্কা
ভেনেজুয়েলা ১৯৬০ সালে ওপেকের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে সংগঠনটিতে যোগ দেয়। তবে দেশটির রাষ্ট্রীয় তেল খাতে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগের ঘাটতি ও দুর্নীতির কারণে দেশটি অনেক বছর ধরে ওপেকের নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। তেলের উৎপাদন ও দামের ওপর ওপেকের প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংগঠনটির দীর্ঘদিনের মতবিরোধ রয়েছে। ফলে ভেনেজুয়েলার ওপেক ছাড়ার সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেলের মজুত ভেনেজুয়েলায় রয়েছে। তবে দেশটির বর্তমান জ্বালানি আইনে সরাসরি তেলক্ষেত্র ইজারা দেওয়ার ব্যবস্থা নেই। দেশটির সংবিধানেও তেল শিল্পের মূল কার্যক্রম রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রাখার কথা বলা হয়েছে। हालের সংস্কার করা তেল আইনে যৌথ উদ্যোগ ও উৎপাদন ভাগাভাগির চুক্তির মাধ্যমে তেলক্ষেত্র পরিচালনার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে কয়েক দশক ধরে ভেনেজুয়েলা বিদেশি তেল কোম্পানিগুলোকে দেশটির তেলের মজুত নিজেদের সম্পদ হিসেবে হিসাবভুক্ত করার অনুমতি দেয়নি। এই কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে যে চুক্তির আলোচনা চলছে, সেটি বাস্তবায়িত হলে দেশটির সংবিধান ও বিদ্যমান আইনের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চুক্তিটি আইনি চ্যালেঞ্জের মুখেও পড়তে পারে। কারণ, তেলক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ বিদেশি কোম্পানি বা অন্য কোনো দেশের হাতে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভেনেজুয়েলার আইনে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে ভেনেজুয়েলার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকেই দেশটির অপরিশোধিত তেলের স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলার দুর্বল হয়ে পড়া তেল ও জ্বালানি খাতে মার্কিন বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে ভেনেজুয়েলায় প্রতিদিন প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদিত হয়। দেশটির বিশাল তেল মজুতের তুলনায় এই উৎপাদন অনেক কম। মার্কিন প্রশাসন মনে করছে, দেশটির তেলক্ষেত্রে নতুন বিনিয়োগ ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে উৎপাদন আরো বাড়ানো সম্ভব। এতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদে তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা সহজ হবে।
নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে দেশটিতে পেট্রলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। ভেনেজুয়েলা থেকে তুলনামূলক কম দামে তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং দেশটির উৎপাদন বাড়াতে পারলে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির বাজারে চাপ কিছুটা কমতে পারে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত বা স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (এসপিআর) আবার পূরণ করার চেষ্টা করছে। জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহারের জন্য এই মজুত রাখা হয়। মজুত পূরণের ক্ষেত্রে মার্কিন তেল উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর সঙ্গে অপরিশোধিত তেল বিনিময়ের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: গণভোটের রায় না মানলে তারেক রহমানের ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই: জুনায়েদ
তবে এসপিআর পূরণ করতে অর্থের সংকট রয়েছে। পাশাপাশি মজুতের অবকাঠামোতে চলমান রক্ষণাবেক্ষণের কাজও প্রশাসনের পরিকল্পনাকে সীমিত করছে। ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশলগত মজুত থেকে বিপুল পরিমাণ তেল বাজারে ছাড়ে। এরপর ফেব্রুয়ারিতে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরও মজুত থেকে তেল নেওয়া হয়। এতে এসপিআরের মজুত অনেক কমে গেছে। ফলে এখন সেই মজুত আবার পূরণ করা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভেনেজুয়েলার তেলক্ষেত্রে মার্কিন কোম্পানিগুলোর প্রবেশের সম্ভাব্য চুক্তি তাই শুধু দুই দেশের জ্বালানি সম্পর্কের বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের তেলের সরবরাহ, জ্বালানির দাম এবং কৌশলগত তেল মজুত পূরণের বিষয়ও সরাসরি জড়িত।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন