০৫:৪৩ পি.এম
ভারত ও বাংলাদেশের জেন জি আন্দোলনের মধ্যে মিল ও অমিল সম্পর্কে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান নিজের ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস প্রকাশ করেছেন।
বাংলাদেশি এই অর্থনীতিবিদ ও সাবেক সচিব মন্তব্য করেন, ভারত ও বাংলাদেশের জেন জি আন্দোলনের ক্ষেত্রে কিছু মিল রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন,
১. "আমাদের বর্ষা বিপ্লবের মতো, ভারতে যুবারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করছে এবং সাধারণ মানুষ তাদের সমর্থন করছে।"
আরও পড়ুন: সুইজারল্যান্ডের প্রতি বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের আহ্বান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলের
২. "আমাদের মতো ভারতীয় যুবাদের আন্দোলন, প্রচলিত রাজনৈতিক দলের আন্দোলন থেকে ভিন্ন: গান ও ক্ষমতাসীনদের মেমে এর প্রধান উপাদান।"
৩. "আমাদের মতো ভারত সরকারও পুলিশ ও সরকারি দলের পেটোয়া বাহিনী দিয়ে আন্দোলনকারীদের হেনস্থা করছে। ইন্টারনেট ও গণপরিবহন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে আন্দোলন স্তিমিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।"
৪. "দুই জায়গাতেই আন্দোলনকারীদের বিভক্ত করার চেষ্টা হয়েছে এবং হচ্ছে।"
তিনি আরও বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের জেন জি আন্দোলনের মধ্যে কিছু অমিলও রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন,
আরও পড়ুন: ২০৩৪ সালের মধ্যে জিডিপি ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়াবে প্রধানমন্ত্রীর আশা
১. "আন্দোলনকারীদের দমন করা হলেও তা আমাদের মতো প্রাণঘাতী নয়; কাউকে গুম, খুন করা হচ্ছে না।"
২. "ভারতের বিচারব্যবস্থা তার মেরুদণ্ড দেখাচ্ছে। খানিকটা হলেও সরকার থেকে স্বাতন্ত্র বজায় রেখেছে।"
৩. "ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন কোটা, পরীক্ষার ফল, নির্বাচন কমিশনের অনিয়ম থেকে সরকার পতনের দিকে গেলেও ভারতের ক্ষেত্রে নির্বাচনের মাধ্যমেই তা নির্ধারিত হতে যাচ্ছে।"
৪. "ভারতের সশস্ত্রবাহিনী আন্দোলন থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করছে।"
আরও পড়ুন: এস এম জিলানী: গুপ্ত ও ফ্যাসিস্টরা নতুন চক্রান্ত শুরু করেছে
তিনি ভারতীয় দুর্নীতিবিরোধী আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ কর্তৃক শেয়ার করা একটি ইংরেজি লেখার উল্লেখ করেন। সেই লেখাটি ভারতীয় ছাত্র আন্দোলনকর্মী নেহা বোরা সম্পর্কে। লেখাটি বাংলায় অনুবাদ করে দেওয়া হয়েছে।
‘নেহা বোরা: ত্যাগের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা নেতৃত্ব, পরিবারের রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে বেরিয়ে আসার গল্প’
নেহা বোরাকে নিয়ে তার বাবার হৃদয়ছোঁয়া বার্তা তুলে ধরা হয়েছে।
“আমি যখন বিয়ে করি, তখনই জানতাম, আমি কেবল একটি সন্তান চাই। আর মনের গভীরে আশা ছিল, সন্তানটি যেন মেয়ে হয়।
আরও পড়ুন: জয়-পুতুলসহ ৮ জনের আয়কর নথি জব্দের নির্দেশ আদালতের
আমি একটি কন্যাসন্তান পেয়েছিলাম।
প্রথমবার যখন তাকে কোলে নিয়েছিলাম, তখন নীরবে তাকে একটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। "তোমাকে কখনো আমার সময় ভাগ করে নিতে হবে না। আমার মনোযোগ পাওয়ার জন্য তোমাকে কখনো অপেক্ষা করতে হবে না। আমার যা কিছু আছে, সবটুকুই তুমি পাবে।"
“আমি চার-পাঁচটি সন্তান আছে—এমন পরিবার দেখেছি। মা-বাবা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ছুটে বেড়ান, তারপরও কোনো না কোনো সন্তানকে সব সময় অপেক্ষা করতে হয়। আমার এটাও মনে হয়েছিল, আমাদের দেশে মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি এবং এর মূল্য দিতে হচ্ছে প্রকৃতিকে। একটি সন্তানই আমার কাছে সঠিক সিদ্ধান্ত বলে মনে হয়েছিল। মনে হয়েছিল, এটাই দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত।
বছরের পর বছর আমি এ নিয়ে কখনো প্রশ্ন তুলিনি।
আরও পড়ুন: ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে শৃঙ্খলা ফেরাতে এআই ক্যামেরার ব্যবস্থা
কিন্তু এ বছর আমি নেহা বোরাকে দেখলাম।
তার বয়স ২৯ বছর। তিনি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) পিএইচডির শিক্ষার্থী, উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ি অঞ্চলের ছোট শহর খাটিমার একজন নাট্যকর্মী। নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটার পর তিনি জন্তর মন্তরে অবস্থান ধর্মঘটে বসেছিলেন এমন সব শিক্ষার্থীর জন্য, যাদের তিনি চিনতেনও না। সেই শিক্ষার্থীরা বছরের পর বছর পড়াশোনা করেছিল। তাদের অভিভাবকেরা কোচিংয়ের পেছনে নিজেদের সঞ্চয় খরচ করেছিলেন, তারপরও শেষ পর্যন্ত তাদের সন্তানদের হতাশ হতে হয়েছিল।
তিনি টানা ২৩ দিন কিছু খাননি।
অনশন শুরু করার সময় তার ওজন ছিল ৬৬ কেজি। তিনি সাত কেজিরও বেশি ওজন হারিয়েছিলেন। অনশনের শেষ দিকে চিকিৎসকেরা দিনে তিন থেকে চারবার তার রক্ত পরীক্ষা করছিলেন।
আরও পড়ুন: দেশি মাছের প্রাকৃতিক উৎপাদন বাড়াতে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে: মৎস্যমন্ত্রী
সেই রাতের খবরটি পড়ার পর আমি ঘুমাতে পারিনি। বারবার নিজের মেয়েকে নেহার জায়গায় কল্পনা করছিলাম। দিল্লির গরম রাস্তায় বসে আছে সে। রোগা। ক্লান্ত। আবার একজন চিকিৎসক তার কবজি ধরে আছেন। আর আমি জানতাম, এমন দৃশ্য সামনে দাঁড়িয়ে দেখা আমার পক্ষে সম্ভব হতো না। আমি তাকে অনশন থামানোর জন্য অনুরোধ করতাম, মিনতি করতাম।
কিন্তু নেহা কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত থামেননি। আর সবকিছু শেষ হওয়ার পর তিনি বলেছিলেন, তার শরীর যেন খাওয়ার কথা ভুলে গিয়েছিল। আবার খেতে শেখাতে হয়েছে, ঠিক একটি শিশুর মতো। এত কিছুর পরও, শরীর দুর্বল থাকা অবস্থায় তিনি বিহারে গিয়েছিলেন গ্রেপ্তার হওয়া ৬০০ জনের বেশি শিক্ষার্থীর সঙ্গে দেখা করতে। তিনি বাড়ি ফিরে বিশ্রাম নিতে যাননি। তিনি গিয়েছিলেন সেই মানুষগুলোর কাছে, যারা তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
আমি একজন ডাউজার। প্রতিদিন শক্তি নিয়ে কাজ করি। আমি শিখেছি, রাগ অনেক ভারী একটি অনুভূতি। এটি দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যায়। ২৩ দিন না খেয়ে কেবল রাগের ওপর ভর করে কেউ বেঁচে থাকতে পারে না। এত দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে একমাত্র ভালোবাসা।
এরপর আমি জানতে পারলাম, নেহার বাবা সেনাবাহিনীতে ছিলেন এবং তার পরিবারকে এক পোস্টিং থেকে আরেক পোস্টিংয়ে যেতে হতো।
আমার স্ত্রীর বাবাও সেনাবাহিনীতে ছিলেন। আমি কখনো তাকে শ্বশুর বলে ডাকি না। আমার কাছে তিনি কেবল পাপা। আমার স্ত্রী ১৩টি স্কুলে পড়েছেন। ১৩ বার নতুন স্কুলে প্রথম দিন কাটিয়েছেন। ১৩ বার এমন একটি শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেছেন, যেখানে কেউ তার নাম জানত না। ১৩ বার এমন বন্ধুদের বিদায় জানিয়েছেন, যাদের আর কখনো দেখা হয়নি। সেনাসদস্যদের সন্তানেরা হাসিমুখে নিজেদের ব্যাগ গুছিয়ে নেয় এবং আবার নতুন করে শুরু করে। কেউ তাদের জিজ্ঞেস করে না, এতে তাদের কতটা কষ্ট হয়। আমি প্রতিদিন আমার স্ত্রীর মধ্যে সেই শক্তি দেখতে পাই। নেহার মধ্যেও আমি সেই শক্তি দেখেছি।
রাঁচিতে এক ব্যক্তি তার মুখে কালি ছুড়ে মেরেছিলেন এবং তাকে দেশবিরোধী বলেছিলেন। নেহা বলেছিলেন, দিল্লিতে তিনি ইতিমধ্যে ছররা গুলি ও লাঠির আঘাতের মুখোমুখি হয়েছেন। কালি তাকে ভয় দেখাতে পারবে না।
কালি ধুয়ে যায়। শক্তি নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে আমরা বলি, মানুষ আপনার দিকে যা ছুড়ে দেয়, আপনি তা নিজের মধ্যে গ্রহণ না করলে সেটি আপনার ভেতরে থেকে যায় না। মনে হয়, কোনো পেন্ডুলাম হাতে না নিয়েও নেহা বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন।
তার পরিবার তার সঙ্গে একমত ছিল না। বাড়িতে ঝগড়াও হয়েছিল। কিন্তু অনশন চলাকালে তার মা জন্তর মন্তরে এসেছিলেন।
তাদের মধ্যে কী কথা হয়েছিল, তা আমি জানি না। জানার প্রয়োজনও নেই। আমি একজন অভিভাবক। আমি জানি, কোনো মা যখন রাস্তায় নিজের সন্তানকে দুর্বল ও রোগা অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন, তখন তার কেমন লাগে। এত কিছুর পরও সন্তানটি দাঁড়িয়ে আছে। সেই মুহূর্তে সব তর্ক-বিতর্ক ভুলে যাওয়া হয়। তখন শুধু একটিই সত্য বাকি থাকে—এ আমার সন্তান।
নেহা বলেছেন, তিনি এখনো তার বাবার সঙ্গে কথা বলেননি।
আমি তার বাবাকে চিনি না। কিন্তু আমিও একজন বাবা, আর আমি জানি, আমাদের মতো পুরুষদের জন্য কিছু কথা মুখে বলা কতটা কঠিন। তাই তিনি যদি এখনো কথাটি বলতে না পারেন, তাহলে চেন্নাই থেকে তার হয়ে আমি কথাটি বলে দিই।
বেটা, আমরা তোমাকে নিয়ে গর্বিত। এবার ঠিকমতো কিছু খাও।
এই পুরো ঘটনার মধ্যে কোনো একসময় আমার মনে এমন একটি চিন্তা এসেছিল, যা আগে কখনো আসেনি। আমার যদি আরও একটি মেয়ে থাকত! নেহার মতো একটি মেয়ে।
এতে আমার নিজের মেয়ের প্রতি ভালোবাসার কিছুই কমে যায় না। সে আমার পৃথিবী। সব সময় তা-ই থাকবে। কিন্তু নেহা আমাকে একটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন।
আমরা আমাদের সন্তানদের নিরাপদ রাখতে এবং জীবনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করতে পুরো জীবন কাটিয়ে দিই। কিন্তু যারা পিছিয়ে পড়ে, তাদের দিকে ফিরে তাকাতে কি আমরা কখনো সন্তানদের শেখাই?
আর কোনো একদিন যদি তারা অন্য কারও অধিকারের জন্য দাঁড়িয়ে যায়, তাহলে আমরা কি নেহার মায়ের মতো তাদের পাশে দাঁড়াব? নাকি তাদের বাড়ি ফিরে এসে চুপচাপ থাকতে বলব?
আমাদের দায়িত্ব হলো সেই আলোকে রক্ষা করা, এমনকি যখন সেই আলো আমাদের ভয় পাইয়ে দেয়।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন