০৫:৩৫ এম
আর্জেন্টাইন সমর্থকদের উন্মাদনায় কক্সবাজার আকাশী-সাদায় রঙিন হয়ে উঠেছে। শহরের প্রধান সড়কগুলো ছিল জার্সি, পতাকা এবং স্লোগানে মুখরিত। বিভিন্ন বয়স ও পেশার হাজারো ফুটবলপ্রেমী অংশ নেন দীর্ঘ শোভাযাত্রায়। তারা প্রিয় দল ও খেলোয়াড়দের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করার পাশাপাশি ফুটবলের প্রতি আগ্রহ ছড়িয়ে দিতেই এই আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাদের উচ্ছ্বাসে পুরো পর্যটন নগরী উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। এমনকি সমুদ্রসৈকতের বালুচরে মানবপ্রাচীর গড়ে তৈরি হয় বাংলাদেশের মানচিত্র।
পর্যটন নগরী কক্সবাজারে ফুটবলপ্রেমীদের উন্মাদনার সীমা নেই। একের পর এক শোডাউন এবং বর্ণিল আয়োজনে শহর মুখরিত হয়ে উঠছে। এবার এই উন্মাদনায় যোগ দিয়েছেন আর্জেন্টিনার সমর্থকরা। পুরো শহর আকাশী-সাদা রঙে অভিনظمة এনে দিয়েছে।
সোমবার (১৫ জুন) বিকেল গড়াতেই শহরের মুক্তিযোদ্ধা মাঠে কয়েক হাজার সমর্থক জড়ো হতে শুরু করেন। কারও গায়ে ছিল আর্জেন্টিনার জার্সি, কারও মুখে ছিল পতাকার রঙ আঁকা। অনেকে হাতে জাতীয় পতাকা এবং প্রিয় দলের পতাকা নিয়ে হাজির হন। কিছু সমর্থক ঘোড়ায় চড়ে, আবার অন্যরা মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে অংশ নেওয়ার জন্য যোগ দেন। ভুভুজেলার শব্দ, ডিজের তালে তালে উচ্ছ্বাস এবং বিশাল আর্জেন্টিনার পতাকা- সব কিছু মিলিয়ে মাঠজুড়ে এক উৎসবের আবহ সৃষ্টি হয়।
আরও পড়ুন: ঈশ্বরদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন
শুধু তরুণরাই নন, পরিবারের সদস্য এবং শিশুদের নিয়েও সমর্থকেরা এখানে এসেছিলেন। ছোটদের গায়েও এখানে দেখা গিয়েছিল আর্জেন্টিনার জার্সি, এবং তাদের চোখেমুখে দেখা যাচ্ছিল আনন্দের ছাপ।
শহরের টেকপাড়া থেকে আসা আরিফ বলেন, "২০০৫ সালে আমরা যে বিশ্বকাপের আনন্দ পেয়েছিলাম, ২০২৬ সালেও আমরা সেটাকেই মনে করি। এখনও মনে হয় যেন সেই অনুভূতিটাই আমাদের মধ্যে রয়ে গেছে। আর্জেন্টিনার ত্রিস্তরীয় তারকা দেখে আমরা গর্ব অনুভব করি। আমরা আর্জেন্টিনার সমর্থক হিসেবে এটা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মেসির ভক্ত, মেসির অনুরাগী।"
মোহাজেরপাড়া থেকে আসা মোহাম্মদ ফয়সাল বলেন, "২০২২ বিশ্বকাপে মেসির অসাধারণ নৈপুণ্য দেখে আমরা আর্জেন্টিনার যে ট্রফি জয়ের আনন্দ পেয়েছিলাম, তা ছিল অবিস্মরণীয়। এবারও আমাদের আশা, আর্জেন্টিনা ভালো খেলবে এবং শিরোপা জয়ের পথে এগিয়ে যাবে। মেসির জাদুকরি নৈপুণ্যে এবারও আমরা দারুণ খেলা উপভোগ করব।"
রিয়াজ উদ্দিন বলেন, "আমার ভাইয়েরা কাতার থেকে পুরো সেটআপ পাঠিয়েছে, কারণ আমি আর্জেন্টিনার একজন বড় ভক্ত। আমি আর্জেন্টিনাকে খুব ভালোবাসি।"
আরও পড়ুন: জামিনে মুক্ত হয়ে শ্বশুরবাড়িতে পুলিশকন্যা তাসনিয়া রানা তামান্না
তিনি আরও মন্তব্য করেন, "ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, এবং অনেক টানটান উত্তেজনাপূর্ণ লড়াই হবে। তবে আমি মনে করি, ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা—দুই দলই ফুটবলের শক্তি, তারা একে অপরের ভাইয়ের মতো। এবারের বিশ্বকাপে আমরা আর্জেন্টিনার সাফল্য কামনা করি, বিশেষ করে মেসির জন্য। আমরা চাই আর্জেন্টিনা ভালো খেলুক এবং শিরোপার পথে এগিয়ে যাক।"
কক্সবাজার জেলা ছাত্রদলের সভাপতি ফাহিমুর রহমান বলেন, "যে খেলা উপভোগ করে, যে খেলার শৈল্পিকতা ছড়িয়ে দেয়, আমরা সবসময় তাদেরই সমর্থন করি। এখানে বিপুল সংখ্যক দর্শক, সমর্থক এবং আর্জেন্টিনাপ্রেমী মানুষের উপস্থিতি থেকেই বোঝা যায় আর্জেন্টিনার জনপ্রিয়তা কতটা ব্যাপক।"
একপর্যায়ে শুরু হয় বর্ণাঢ্য আনন্দ শোভাযাত্রা। সামনে ছিল ঘোড়া এবং বিশাল আর্জেন্টিনার পতাকা, তার পেছনে মোটরসাইকেলের এক বিশাল বহর। এরপর হাজারো সমর্থকের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে শহরের প্রধান সড়ক। প্রায় তিন কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে শোভাযাত্রাটি অবশেষে পৌঁছে যায় বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে। সমর্থকদের স্লোগান, গান এবং উচ্ছ্বাসে পুরো শহর উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।
সামুদ্রিক সৈকতেও থামেনি আর্জেন্টাইন সমর্থকদের উল্লাস। সৈকত পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের পর তারা জড়ো হন সি-গাল পয়েন্টে। সেখানে উড়ানো হয় আকাশী-সাদা রঙের ধোঁয়া। বালুচরে স্থাপন করা হয় ফুটবল তারকা লিওনেল মেসি এবং ২০২২ বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা দলের বড় ফটোকার্ড। পর্যটক ও সমর্থকেরা সেসবের সামনে ছবি তুলে স্মরণীয় করে রাখেন মুহূর্তগুলো।
আরও পড়ুন: ভালুকায় যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে মিলটনের নেতৃত্বে হাজারো নেতাকর্মীর র্যালি
দিনের আয়োজনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ ছিল সৈকতের বালুচরে মানবপ্রাচীর গড়ে বাংলাদেশের মানচিত্র তৈরি করা। শত শত সমর্থকের অংশগ্রহণে তৈরি সেই দৃশ্য মুগ্ধ করে উপস্থিত সবাইকে।
সমর্থকদের বক্তব্য, ফুটবল একটি খেলা নয়, এটি হচ্ছে ভালোবাসা ও আবেগের নাম। তারা প্রিয় দল এবং প্রিয় খেলোয়াড়দের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের মধ্যে ফুটবলের প্রতি আগ্রহ বাড়াতেই তাদের এই ব্যতিক্রমী আয়োজন।
আয়োজক ফারুক আজম জানান, "বাংলাদেশে, বিশেষ করে কক্সবাজারে, যে বিপুলসংখ্যক আর্জেন্টিনা সমর্থক রয়েছেন, তা বিশ্বকে জানান দিতেই আমরা সমুদ্র সৈকতে এই র্যালির আয়োজন করেছি।"
আয়োজক দেবু বলেন, "বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের এই সুশৃঙ্খল আয়োজনের মাধ্যমে আমরা বিশ্বকে জানাতে চাই, বাংলাদেশের মানুষ কতটা আবেগ ও ভালোবাসা নিয়ে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করে। একই সঙ্গে এই আয়োজনের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশ ও কক্সবাজারের সৌন্দর্য, সংস্কৃতি এবং শৃঙ্খলাবোধকেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরতে চেয়েছি।"
আরও পড়ুন: সাংবাদিক আশরাফ ইকবালের জন্মদিন
আর্জেন্টিনার সমর্থকগোষ্ঠীর সমন্বয়ক মো. মোরশেদ বলেন, "আমরা বিশ্ববাসীকে জানাতে চাই যে বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা সমর্থকেরা শুধু প্রিয় দলের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করছেন না, বরং বাংলাদেশ ও বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারকেও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।"
আকাশী-সাদার রঙে রাঙানো এই আয়োজন একটি নতুন বার্তা দিয়েছে যে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে বিশ্বকাপের আবেগ কখনোই শেষ হয় না। এই আবেগকে কেন্দ্র করেই কক্সবাজার পরিণত হয়েছে উৎসবের নগরীতে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন