০৮:৪০ এম
ডিএমপির পল্লবী থানার ওসি হাসান বাসিরের ফাইল ছবি সংযুক্ত।
আহসান হাবিব, যিনি প্রতারণার স্বভাবে অভ্যস্ত। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে খাদ্যপণ্য সাপ্লাই ব্যবসার মাধ্যমে অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা সংগ্রহ করে লাপাত্তা হয়ে যান। নানাভাবে প্রলোভন দেখিয়ে কাউর কাছ থেকে এক কোটি টাকা নিতে পারলেই কেল্লাফতে। এরপর ৩০ লাখ টাকা খরচ করে পুলিশ ও আইনজীবীদের পেছনোশ। এতে উদ্দেশ্য হলো পাওনাদারের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে পুলিশ ও আইনজীবীদের সহায়তায় হয়রানি করা।
এর ফলে, গ্রেপ্তার করে কারাগারে আটকে রাখা হয়। যাতে নির্বিঘ্নে টাকা আত্মসাৎ করা যায়। প্রথমে পুলিশের সঙ্গে সমঝোতা করে সেই মামলায় ভুক্তভোগীদেরই গ্রেপ্তার করানো হয়। এরপর শুরু হয় টানা হয়রানি-পর্ব।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের লড়াই বদলে দিচ্ছে সুপ্রিম কোর্ট
এমন ভয়ংকর প্রতারক আহসান হাবিব। পল্লবী থানা পুলিশ শনিবার বিকেল বেলায় তার পরিকল্পনার পথ বেছে নেয়।
দৈনিক যুগান্তরের এক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, এই প্রতারক কয়েকজন পাওনাদারকে টাকা পরিশোধের কথা বলে শনিবার বিকেল বেলায় ডেকে নিয়ে যান রাজধানীর ইসিবি চত্বরে। এরপর যথারীতি পরিকল্পনা অনুযায়ী সাজানো অপহরণ মামলায় পল্লবী থানা পুলিশ ভুক্তভোগীদের কয়েকজনকে আটক করতে থাকে।
তাৎক্ষণিকভাবে পল্লবী থানার ওসিসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়। তবে, তাও সত্ত্বেও ভুক্তভোগীদের থানায় নিয়ে আটকে রাখা হয়। রাত ১২টা পর্যন্ত ভুক্তভোগীদের ছাড়া হয়নি।
ভুক্তভোগীদের আটককারীদের বিষয়ে জানতে সংশ্লিষ্ট এসআই সাইফুলের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন: নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগের দাবি জানালো নিসচার
ডিএমপির পল্লবী থানার ওসি হাসান বাসির বলেন, 'ভাই, আমি বুঝতে পারছি ওনারা (আটক তিনজন) প্রতারণার শিকার হয়েছেন। ওনাদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলাটিও সঠিক নয়। আমি মামলার ফাইনাল রিপোর্ট (চূড়ান্ত প্রতিবেদন) দেব। তবে যেহেতু মামলা হয়েছে, তাই আমি আটক ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার দেখাব।'
মিথ্যা মামলা হলেই কোনো ধরনের অনুসন্ধান ছাড়া গ্রেপ্তার করা যায় কিনা, জানতে চাইলে ওসি সন্তোষজনক কোনো উত্তর দিতে পারেননি।
ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. মোস্তাক সরকার বলেন, 'আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। বিস্তারিত জানতে আমি পল্লবী থানায় যাচ্ছি।'
সূত্র জানায়, বেলা ২টার দিকে আট ভুক্তভোগীর মধ্যে রোমেল নামে এক ব্যক্তি আহসান হাবিবের স্ত্রী ফোনে বলেন, আপনাদের টাকাটা ধীরে ধীরে দিয়ে দেব। আজ ২ কোটি ২৫ লাখ টাকার একটি অংশ ফেরত দেওয়ার কথা জানান এবং যে আপাকে টাকা দেওয়ার পরিবর্তে জমি লিখে দিয়েছি, সেটাও বিক্রি করে দেব। আপনাদের ইসিবি চত্বরে ৩টার সময় আসতে হবে। এই কথায় বিশ্বাস করে রুমেল তার স্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট আরো একজন ভুক্তভোগীকে বিষয়টি জানান। এরপর তারা তিনজন সেখানে যান। কিন্তু যাওয়ার কিছুক্ষণ পর ইসিবি চত্বরে আহসান হাবিব স্ত্রীসহ আসার কথা বললেও তখনও আসেননি। বৃষ্টির জন্য পথে আটকা পড়েছেন বলে সময়ক্ষেপণ করেন। এক পর্যায়ে তাদের সামনে হাজির হয় পল্লবী থানা পুলিশের একটি টিম। এসআই সাইফুলের নেতৃত্বে পুলিশের টিম তাদের ওয়ারেন্ট আছে বলে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।
আরও পড়ুন: আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ নেই: তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী
সূত্র জানায়, এই আটক নাটকের আগে আসামি আহসান হাবিবকে নিয়ে থানার ভিতরে একাধিক বৈঠকও করেন পল্লবী থানার ওসি। পল্লবী থানায় মাত্র দুই মাস হলো তার পোস্টিং হয়েছে। আর এর মধ্যেই তিনি নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
আটকের সময় ভুক্তভোগীরা জানান, তারা আহসান হাবিবের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলাও করেছেন। এর মধ্যে একটিতে আহসান হাবিবের বিরুদ্ধে চার্জশিটও হয়েছে।
এদিকে আটকের পর ভুক্তভোগীরা জানতে পারেন, প্রতারক আহসান হাবিব তাদের বিরুদ্ধে ১৫ জুলাই পল্লবী থানায় একটি অপহরণ মামলা করেছেন। কিন্তু ভিক্তভোগীদের বিরুদ্ধে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নেই।
সূত্র বলছে, প্রতারক আহসান হাবিব সম্প্রতি ৮ ব্যক্তির কাছ থেকে প্রায় ১৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করছেন।
আরও পড়ুন: বিমানের দাম্মাম ও রিয়াদগামী ফ্লাইট স্থগিত
আহসান হাবিবের বিরুদ্ধে ডিএমপির গুলশান থানায় (এফআইআর নং-২, তারিখ: ৬ এপ্রিল, ২০২৩; জিআর নং-৮৩), চট্টগ্রামের পটিয়া যুগ্ম দায়রা জজ আদালত (মামলা নং-৫৪৩৩৯, সিআর নং-৪০৯/২২, তারিখ: ৩ ডিসেম্বর ২০২৪), রাজশাহী মহানগর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৫ (সিআর নং-১০৪/২৫, তারিখ: ১ ডিসেম্বর, ২০২৫), ঢাকার বিজ্ঞ যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আদালত-৬ (সিআর নং-১৫১/২১, তারিখ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫) এবং সাভারের বিজ্ঞ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত নং-০২ (সিআর নং-১১৮৬/২৫, তারিখ: ২ মার্চ ২০২৬)-সহ বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটিতে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি রয়েছে। প্রতারক আহসান হাবিবের বাবার নাম হাতেম আলী। বাড়ি পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার পাইকরহাটি পশ্চিমপাড়া গ্রাম। এছাড়া তার বর্তমান ঠিকানা সাভারের রামনগর। তবে এই প্রতারক একাধিক ঠিকানা ব্যবহার করেন।
সূত্র জানায়, আত্মগোপনে থাকা এই আহসান হাবিবকে স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় এক সপ্তাহ আগে মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে ভুক্তভোগীরা ধরতে সক্ষম হন। থানায় নিয়ে তার বিরুদ্ধে থাকা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পুলিশকে দেখানোর পর পুলিশ সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগ না করে রহস্যজনক কারণে সালিশ করে। পুলিশের একজন এসআই প্রথমে প্রতারক আহসান হাবিবের সঙ্গে আলাদা কথা বলার নাম করে ১০ মিনিট আলাপ করেন। এরপর তিনি বেরিয়ে এসে বলেন, সাতদিনের মধ্যে আহসান পাওনাদারদের সব টাকা বুঝিয়ে দেবে। এভাবে আশ্বাস দিয়ে একজন ব্যক্তির জিম্মায় দিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সে অনুযায়ী টাকা না দিয়ে গোপনে ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করে এভাবে হয়রানির পথ বেছে নেন। যার অন্যতম সহযোগী হচ্ছেন পুলিশের কতিপয় দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা। এছাড়া নৌবাহিনীর একজন সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পেছন থেকে তাকে সহায়তা করছেন। যিনি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর উপদেষ্টা হিসাবে আহসান হাবিবের কথিত সাপ্লাই ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। মূলত বেশিরভাগ ভুক্তভোগী এই কর্মকর্তাকে দেখে অর্থ বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হন।
সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, মামলা দুই ধরনের হয়, একটি কগনিজেবল (আমলযোগ্য) এবং আরেকটি নন-কগনিজেবল (আমল অযোগ্য)। কগনিজেবল অফেন্স হলে পুলিশের দায়িত্ব এফআইআর রেজিস্টার হওয়ার আগে তদন্ত করে দেখা ঘটনাটি সঠিক কিনা।
আরও পড়ুন: আদাবর থেকে তুলে নিয়ে কারওয়ান বাজারের চাঁদাবাজির মিথ্যা মামলায় জেলে নয়ন হোসেন
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন