০৯:১৯ এম
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার পর এবার নতুন বার্তা দিচ্ছে ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ নিয়ে। দেশটি ইঙ্গিত দিয়েছে, প্রয়োজনে ইয়েমেনের হুতি মিত্রদের মাধ্যমে লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালিতেও জাহাজ চলাচল ব্যাহত করা হতে পারে।
এমন পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে, বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে ইরানের ভেতরে সামরিক হামলা বাড়াচ্ছে এবং অন্যদিকে ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধেও অভিযান জোরদার করেছে। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে, ইরান সংঘাতকে আরো বিস্তৃত করার কৌশল নিচ্ছে।
আরও পড়ুন: কক্সবাজারে নলকূপ খননের স্থান থেকে গ্যাসের আগুন, বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে
শুধু উপসাগর নয়, লোহিত সাগর এলাকাকেও সংঘাতের আওতায় এনে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরির উদ্দেশ্যে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়াতে চাইছে তেহরান। ইতোমধ্যেই ইরান তাদের অন্যতম বড় কৌশলগত শক্তির প্রভাব দেখিয়েছে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করে। বিশ্লেষকদের ধারণা, বাব আল-মান্দেব প্রণালিকে দ্বিতীয় চাপের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করার প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশটি। এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
সৌদি আরবের তেল রপ্তানির বড় অংশ এবং বিশ্বের বিপুল পরিমাণ পণ্যবাহী জাহাজ এই পথ দিয়েই চলাচল করে। ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার ইয়েমেনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেন, যদি সৌদি আরব ইয়েমেনে হামলা অব্যাহত রাখে, তাহলে ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনী বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। তার দাবি, এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ২০০ ডলারে পৌঁছে যেতে পারে।
হুতি আন্দোলন আনসারুল্লাহর রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-ফারাহও একই ধরনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে ইয়েমেনে হামলা চালাতে উৎসাহিত করছে। তার ভাষায়, এই নীতি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের স্বার্থের বিরুদ্ধেই যাবে। তিনি আরো বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির আরো অবনতি হলে বাব আল-মান্দেব ও হরমুজ—দুই প্রণালিতেই যৌথ সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। তার দাবি, এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ব বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ২০০ ডলারে পৌঁছে যেতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, যদি হরমুজ প্রণালি ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশলগত হাতিয়ার হয়ে থাকে, তাহলে বাব আল-মান্দেব হতে পারে তাদের পরবর্তী বড় চাপ সৃষ্টির উপায়। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক ফাওয়াজ গেরগেস রয়টার্সকে বলেন, ইরান প্রয়োজনে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত যেতে প্রস্তুত। তার মতে, তেহরান ওয়াশিংটনকে এই বার্তা দিতে চাইছে যে, তারা একই সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি সামুদ্রিক পথকেই ঝুঁকির মুখে ফেলতে সক্ষম। এর ফলে সংঘাত শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। গেরগেস আরো বলেন, ইরান এখন একই সঙ্গে কাছের ও দূরের বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। তাদের বার্তা হলো, শুধু হরমুজ নয়, বাব আল-মান্দেবও এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় আশঙ্কা এখনই পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হওয়া নয়। বরং এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে কোনো পক্ষ সরাসরি যুদ্ধে না গিয়েও একের পর এক পদক্ষেপ নিয়ে সংঘাতের পরিধি বাড়াতে থাকবে। উপসাগর থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাণिज্য ও জ্বালানি সরবরাহ আরো অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি তেল পরিবহন পথ যদি দীর্ঘ সময়ের জন্য ঝুঁকির মধ্যে থাকে, তাহলে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠবে। এমন অবস্থায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের ওপর আবারও আলোচনায় ফেরার আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচক ডেনিস রস বলেন, ওয়াশিংটনের প্রধান লক্ষ্য হলো এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে ইরান আবার আলোচনায় ফিরতে বাধ্য হয়। শুধু আলোচনা নয়, এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছানোও গুরুত্বপূর্ণ, যা উভয়পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য হবে।
আরও পড়ুন: কুমিল্লায় রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যা মামলায় পাঁচজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট
হুতিরা আগেই দেখিয়েছে যে তারা বাব আল-মান্দেব প্রণালির মাধ্যমে বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর, ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠী লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করে। তাদের দাবি ছিল, ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে তারা ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করছে। এসব হামলার কারণে বিশ্বের বড় বড় জাহাজ পরিবহন কোম্পানিগুলোকে লোহিত সাগরের পরিবর্তে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে চলাচল করতে হয়। এতে পরিবহন ব্যয় ও সময় দুটিই বেড়ে যায়। পরিস্থিতি মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য হুতিদের অবস্থানে বিমান হামলা চালায়। এই সঙ্গে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বহুজাতিক নৌ অভিযানও শুরু হয়। লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তা গবেষণা বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বলেন, হরমুজের পর বাব আল-মান্দেব নিয়ে হুতিদের সাম্প্রতিক হুমকি ইরানের আরেকটি চূড়ান্ত কৌশল হতে পারে। তার মতে, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী যদি মনে করে পূর্ণমাত্রার সংঘাত এড়ানো আর সম্ভব নয়, তখনই তারা এই পদক্ষেপ নিতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা আরো বাড়ায়, তাহলে তেহরান ইয়েমেনের হুতি মিত্রদের ব্যবহার করে বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করতে পারে। এতে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে, তা আরো বেড়ে যাবে।
সৌদি আরবভিত্তিক গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুলআজিজ সাগের বলেছেন, উপসাগরীয় দেশগুলো ক্রমেই মনে করছে, ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সীমা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। তবে একই সঙ্গে তারা এটাও বুঝতে পারছে যে, বড় ধরনের যুদ্ধ পুরো অঞ্চলের জন্যই অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে। তার ভাষায়, ইরান জিতুক বা হারুক—দুই ক্ষেত্রেই পুরো অঞ্চলের জন্য বড় ধরনের পরিণতি থাকবে। তবে কিছু উপসাগরীয় দেশ মনে করতে পারে, যদি ইরানের পরাজয়ের ফলে ভবিষ্যতে আরো স্থিতিশীল আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তাহলে সেই মূল্য মেনে নেওয়া যেতে পারে। সাগের আরো বলেন, বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার সক্ষমতা এখনো হুতিদের রয়েছে। তবে তেহরানের সরাসরি নির্দেশনা ছাড়া তারা বড় ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি করবে বলে মনে হয় না। তার মতে, হুতিরা যদি আবার আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের হুমকি সৃষ্টি করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা আরো বড় সামরিক অভিযান চালাতে পারে। এর উদ্দেশ্য হবে হুতি গোষ্ঠীর সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেওয়া।
এদিকে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে সামরিক অভিযান শুরু করে, তার পর থেকে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা বেড়েছে। সংঘাত ধীরে ধীরে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ইরানও বিভিন্ন দেশে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালিয়েছে। চলমান এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। নিহতদের বেশিরভাগই ইরান ও লেবাননের নাগরিক।
আরও পড়ুন: সেনাপ্রধানের সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধি দলের সাক্ষাৎ, এলএফটি-২০২৬ সফলভাবে সম্পন্ন
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন