০৫:০৭ পি.এম
কঠোর ভিসানীতির চাপে জাপান জুড়ে বসবাসকারী বিদেশিরা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।
জাপানের রাজধানী টোকিওতে একটি ছোট নেপালি রেস্তোরাঁ পরিচালনা করেন ৩৮ বছর বয়সী নেপালি নারী বুধাথোকি সমঝানা। দীর্ঘ পরিশ্রমের মাধ্যমে গড়ে তোলা তার এই ব্যবসা এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে, কারণ জাপান বিদেশিদের জন্য ভিসানীতি কঠোর করেছে।
বিধান অনুযায়ী, জাপানে জনসংখ্যা দ্রুত বয়স্ক হচ্ছে এবং বিভিন্ন খাতে শ্রমিকের ঘাটতি থাকলেও দেশটিতে অভিবাসনবিরোধী মনোভাব বাড়ছে। এর প্রেক্ষাপটে ক্ষমতাসীন দল ২০২৫ সালের শেষ দিকে বিজনেস ম্যানেজার ভিসার জন্য নতুন ও কঠোর নিয়ম চালু করতে যাচ্ছে। এক দশক আগে মেয়ের জন্য ভালো ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় জাপানে আসা বুধাথোকি এখন আশঙ্কা করছেন, তিনি নতুন শর্ত পূরণ করতে না পারলে দেশ ছাড়তে বাধ্য হতে পারেন।
আরও পড়ুন: জাতিসংঘে মানবাধিকারভিত্তিক অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের আহ্বান বাংলাদেশ
তিনি বলেন, ‘আমি সব সময় জাপান ও নেপালের মধ্যে একটি সেতুবন্ধ হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আমার স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে।’ এ সমস্ত নতুন নিয়মগুলো এমন সময় কার্যকর হয়েছে, যখন অনেক জাপানি নাগরিক অতিরিক্ত পর্যটন এবং বিদেশি বিনিয়োগের কারণে জমির মূল্য বেড়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
এই পরিস্থিতিতে, প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সরকার বিদেশিদের জন্য আরো কঠোর নিয়ম চালু করেছে। গত মাসে সরকার প্রায় ৫০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো কিছু পর্যটকের ভিসা ফি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। এর ফলে একক ও একাধিক প্রবেশ ভিসার খরচ প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে।
জাপানের নতুন ভিসানীতিতে বিজনেস ম্যানেজার ভিসাধারীদের জন্য তিন বছরের সময়সীমা রাখা হলেও, অনেক ছোট ও মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আশঙ্কা করছে, তারা নতুন শর্ত পূরণ করতে পারবেনা। টোকিওর ওকুবো এলাকার জনপ্রিয় খাবারের দোকানগুলোর মধ্যেও এ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। নেপালি উদ্যোক্তা বুধাথোকি সমঝানা বলেন, নতুন নিয়মের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দেওয়া।
রেস্তোরাঁয় বসে হিসাবপত্র দেখার সময় তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মূলধনের ন্যূনতম শর্ত ৫০ লাখ ইয়েন (প্রায় ৩০ হাজার ডলার) থেকে বাড়িয়ে ৩ কোটি ইয়েন (প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ডলার) করা হয়েছে।’ তার মতে, এত বড় অঙ্কের অর্থ জোগাড় করা অনেক ছোট ব্যবসার পক্ষে সম্ভব নয়, ফলে বহু বিদেশি উদ্যোক্তার ব্যবসা এবং জাপানে থাকার সুযোগ ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
আরও পড়ুন: বিশ্ববাজারে আবারও বাড়ল তেলের দাম
তিনি বলেন, ‘এটা অসম্ভব।’ বুধাথোকি ২০১৬ সালে একজন ছাত্রী হিসেবে জাপানে আসেন এবং ২০২৩ সালে তার প্রথম রেস্তোরাঁ খোলার জন্য বছরের পর বছর ধরে টাকা জমিয়েছেন। জানুয়ারিতে তার তৃতীয় রেস্তোরাঁটি খোলার পর, এক দশক বিচ্ছিন্ন থাকার পর তিনি অবশেষে তার ১৪ বছর বয়সী মেয়েকে নেপাল থেকে নিয়ে আসেন এবং সে এখন একটি জাপানি স্কুলে ভর্তি হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এখন আমি নিজের জন্য নয়, আমার মেয়ের জন্য খুব চিন্তিত... আমি ওর সঙ্গে কী করেছি? পরবর্তী ভিসা নবায়নের কথা ভাবলেই আমার বুক ধড়ফড় করে।’ জাপানে তিন দশক ধরে বসবাসকারী ভারতীয় রেস্তোরাঁ মালিক মনীশ কুমারকে জানানো হয়েছে, তার বিজনেস ম্যানেজার ভিসা আর নবায়ন করা হবে না, যদিও নতুন নিয়ম কার্যকরের জন্য একটি গ্রেস পিরিয়ড রয়েছে। কুমার ঠিক কেন ভিসা নবায়ন হচ্ছে না তা জানেন না।
তবে ভিসা বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিবাসন কর্তৃপক্ষ এখন আরো কঠোরভাবে আবেদন যাচাই করছে এবং কর পরিশোধের রসিদ, সামাজিক বীমার নথিসহ অতিরিক্ত কাগজপত্র চাচ্ছে। গত মাসে ভিসা-সংক্রান্ত এক সমাবেশে আবেগাপ্লুত হয়ে কুমার বলেন, ‘আমার সন্তানরা শুধু জাপানি ভাষায় কথা বলতে পারে। অথচ এখন আমাদের ভারতে ফিরে যেতে বলা হচ্ছে।’ নতুন নিয়ম স্থগিতের দাবিতে একটি আবেদনে ইতোমধ্যে ৬৭ হাজার ৮০০ জনের বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেছেন।
এই উদ্যোগের সংগঠক টারো বলেন, ‘মনীশ কুমারের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা সত্যিই দুঃখজনক। তিনি আমার বন্ধু এবং ব্যবসায়ী সমাজের একজন বিশ্বস্ত সদস্য।’ বিশ্লেষকদের মতে, জনমনে অবৈধ অভিবাসন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার পর সরকার এই কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। গত বছরের মে মাসে জাপানের বিচার মন্ত্রণালয় ‘শূন্য অবৈধ বিদেশি বাসিন্দা’ লক্ষ্য নিয়ে একটি কর্মসূচি ঘোষণা করে। অন্যদিকে, দ্রুত বয়স্ক হয়ে ওঠা জাপানে জন্মহার বিশ্বের অন্যতম নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।
আরও পড়ুন: জামায়াত নেতাদের ভারতীয় গোয়েন্দাদের সঙ্গে বৈঠকের দাবি, রাশেদকে চ্যালেঞ্জ
অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, অভিবাসন বৃদ্ধি দেশটির কমে যাওয়া জনসংখ্যা ও শ্রমশক্তির ঘাটতি মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। তবে গত বছরের উচ্চকক্ষ নির্বাচনে অভিবাসন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়। এ সময় অভিবাসনবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত ‘সানসেইতো’ দলের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। দলটি অভিবাসনকে নীরব আগ্রাসন বলে বর্ণনা করে।
অক্টোবরে দায়িত্ব নেওয়ার পর জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি বিদেশিদের জন্য কঠোর ভিসা যাচাইয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সরকারি উপদেষ্টা কাজুকি ইউদার মতে, বিদেশি উদ্যোক্তাদের আকৃষ্ট করার জন্য চালু করা বিজনেস ম্যানেজার ভিসা অনেক ক্ষেত্রে এমন লোকজন ব্যবহার করছিলেন, যাদের প্রকৃত ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ছিল না। এই ভিসার জনপ্রিয়তা দ্রুত বেড়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে বিজনেস ম্যানেজার ভিসাধারীর সংখ্যা প্রায় ৪৬ হাজারে পৌঁছায়, যা ২০২০ সালের তুলনায় ৭০ শতাংশ বেশি। এদের প্রায় অর্ধেকই ছিলেন চীনা নাগরিক।
ইউদা বলেন, কিছু অসাধু রিয়েল এস্টেট এজেন্ট বিদেশিদের বোঝাতেন যে, জাপানে শুধু সম্পত্তি কিনলেই ভিসা পাওয়া সম্ভব। আরেক উপদেষ্টা দাইসুকে কোমোরি জানান, তিনি এমন অনেক আবেদন ফিরিয়ে দিয়েছেন, যাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্যবসা নয়। বরং সন্তানদের পড়াশোনা করানো বা চীন ছেড়ে অন্য দেশে বসবাস করা। তবে ইউদা ও কোমোরি দুজনই সতর্ক করেছেন, নতুন নিয়ম শুধু অপব্যবহারকারীদের নয়, বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করা ছোট রেস্তোরাঁর মালিক এবং তরুণ উদ্যোক্তাদেরও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
এপ্রিল মাসে পার্লামেন্টে আইনমন্ত্রী হিরোশি হিরোগুচি বলেন, বর্তমানে নিয়ম পরিবর্তনের কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে বিশেষ পরিস্থিতির ক্ষেত্রে পৃথকভাবে বিষয়গুলো বিবেচনা করা হবে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বিজনেস ম্যানেজার ভিসাধারীদের অন্তত একজন জাপানি নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দাকে চাকরি দিতে হবে।
আরও পড়ুন: ইউরোপের নেতারা রাজনৈতিক আত্মনিপীড়ক: লাভরভ
তবে টোকিওতে ব্যবসা পরিচালনাকারী এক বাংলাদেশি উদ্যোক্তা বলেন, জনসংখ্যা কমে যাওয়ায় পর্যাপ্ত জাপানি কর্মী পাওয়াই কঠিন। তার প্রশ্ন, ‘যে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজারের ভিসা প্রতি বছর নবায়ন করতে হয় এবং যার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, সেখানে কাজ করতে কে আগ্রহী হবে?’
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন