১২:২৯ পি.এম
> জুলাই বিপ্লবের সময় সাভার-আশুলিয়ায়, ফ্যাসিবাদী সরকারের সন্ত্রাসীদের দ্বারা ঘটেছিল এক ট্র্যাজিক ঘটনা, ৫ আগস্ট। আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচার গুলিবর্ষণের ফলে শহীদ হন অনেকে। হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ নামের হায়েনারা ছয় শহীদকে পুড়িয়ে মারে আশুলিয়া থানার সামনে। সেদিন বিশ্ববাসী এ মর্মান্তিক ঘটনা দেখে নাড়িয়ে গিয়েছিল।
জুলাই বিপ্লব বিজয়ের পূর্বমুহূর্তে বর্তমান সময়ের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী ক্যাডারদের গুলিতে সাভার-আশুলিয়ায় ৩১ জন শহীদ হন। এ ঘটনায় দুই শতাধিকেরও বেশি মানুষ আহত হন। দুই বছর পরে বিচারের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় হতাশা প্রকাশ করেছেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ওই দিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি লংমার্চ শুরু হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে থেকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ধরে। এতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শ্রমজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করে। সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পৌঁছালে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহিল কাফির নেতৃত্বে মিছিলটিকে গুলি ছুড়ে বাধা দেওয়া হয়। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে পুলিশ নির্বিচারে গুলি ছুচ্ছিলে, যার ফলে বেশ কয়েকজন ঘটনাস্থলেই শহীদ হন, তাদের মধ্যে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবদুল কাইউম এবং কলেজছাত্রী নাফিসা হোসাইন মারওয়া অন্যতম।
আরও পড়ুন: বরিশালে বিএমপির বিশেষ অভিযান: গাঁজা ও ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার ১৭, বিভিন্ন মামলায় আটক ১৪
আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীরা সাময়িকভাবে ছত্রভঙ্গ হলেও পরবর্তী সময়ে পাকিজা মোড় (বর্তমানে শহীদ ইয়ামিন চত্বর) ও সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পুনরায় সংগঠিত হন। তখনই ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনকারীরা দৃঢ় মনোবল নিয়ে বাধা দিতে সাভার থানায় অগ্রসর হন। দুপুরের পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ছাত্র-জনতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মুখোমুখি অবস্থান গ্রহণ করে। বিকাল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত মুক্তির মোড় এবং থানার মোড়ে ব্যাপক সংঘর্ষ ঘটে। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে অন্তত ১৫-১৬ জন নিহত হন। শত শত গুলির শব্দে শিল্পশহর সাভার প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এক পর্যায়ে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করলেও জনগণের আক্রমণ ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে অসংখ্য গুলি চালিয়ে সাভার ক্যান্টনমেন্টের দিকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যায়।
শহীদদের মধ্যে রমজান, মোজাহিদ, নাফিসা, তৌহিদুর রহমান, সাফোয়ান, রাসেল, রফিক, নিসান খান, মুন্না, সজিব, রানা, আলামিন, সাজ্জাদ, লালমিয়া এবং আবদুল কাউয়ুম, শ্রাবণ গাজী অন্যতম।
আশুলিয়ার স্থানীয় বেশ কয়েকজন বাসিন্দা জানান, এদিন অন্তত ১০-১১ জন নিহত হন, তাদের মধ্যে জাহিদুর রহমান এবং স্বপন প্রামাণিক উল্লেখযোগ্য। আশুলিয়া থানার সামনের মহাসড়কে সেতুর উপর দুই পথচারীর লাশ পা বেঁধে উল্টো করে ঝুলানো হয়েছিল। সকালে লাশ দুইটি নিচে নামানো হয়। তাদের মুখ থেঁতলানো ছিল এবং তারা ছিলেন পুলিশ সদস্যরা।
আরও পড়ুন: উজিরপুরে ‘গয়েশ্বর’ খ্যাত পলাশ কুন্ডুকে আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দিয়ে অপপ্রচারের অভিযোগ
সাভার এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও আশুলিয়ার বিভিন্ন চিকিৎসা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্ট ৩১ জন শহীদ হওয়ার তালিকা পাওয়া যায়। এছাড়া গুরুতর আহত ছিলেন শতাধিক ছাত্রজনতা।
ইতোমধ্যে জুলাই বিপ্লবের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ সাবেক এমপি সাইফুলসহ ছয় জনের মৃত্যুদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছে। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে স্বাক্ষরের পর এই রায় প্রকাশ করা হয়।
ঢাকার আট প্রবেশমুখে বিএনপির অবস্থান, ২০ জুলাই থেকেই প্রস্তুতি চলছে।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছে সাবেক এমপি মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, আশুলিয়া থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ এফ এম সায়েদ, সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুল মালেক, সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) বিশ্বজিৎ সাহা, সাবেক কনস্টেবল মুকুল চোকদার এবং যুবলীগের কর্মী রনি ভূঁইয়া।
আরও পড়ুন: যশোরের অভয়নগরে পৃথক দুটি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩
এ মামলায় আরো সাত আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন— ঢাকা রেঞ্জের সাবেক উপমহাপরিদর্শক সৈয়দ নুরুল ইসলাম, ঢাকা জেলার সাবেক পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান রিপন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহিল কাফী, সাভার সার্কেলের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শহিদুল ইসলাম, সাবেক পরিদর্শক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান, সাবেক পরিদর্শক নির্মল কুমার দাস এবং ঢাকা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের সাবেক পরিদর্শক আরাফাত হোসেন। এ ছাড়া আশুলিয়া থানার সাবেক উপপরিদর্শক আরাফাত উদ্দীন ও কামরুল হাসানকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে সাবেক এসআই শেখ আবজালুল হককে ক্ষমা করা হয়েছে। তিনি এ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন।
এছাড়া ৫ ফেব্রুয়ারি মামলাটির সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করা হয়েছিল। দশ আসামি গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে আছেন এবং বাকি আটজন পলাতক রয়েছেন। কারাগারে থাকা আট জন হলেন—আবদুল্লাহিল কাফী (যাবজ্জীবন), শাহিদুল ইসলাম (যাবজ্জীবন), আরাফাত হোসেন (যাবজ্জীবন), আবদুল মালেক (মৃত্যুদণ্ড), আরাফাত উদ্দীন (সাত বছরের কারাদণ্ড), কামরুল হাসান (সাত বছরের কারাদণ্ড), শেখ আবজালুল হক (ক্ষমা) এবং মুকুল চোকদার (মৃত্যুদণ্ড)।
পলাতকে আট আসামি হলেন—সাইফুল ইসলাম (মৃত্যুদণ্ড), সৈয়দ নুরুল ইসলাম (যাবজ্জীবন), আসাদুজ্জামান রিপন (যাবজ্জীবন), এ এফ এম সায়েদ (মৃত্যুদণ্ড), মাসুদুর রহমান (যাবজ্জীবন), নির্মল কুমার দাস (যাবজ্জীবন), বিশ্বজিৎ সাহা (মৃত্যুদণ্ড) এবং যুবলীগ ক্যাডার রনি ভূঁইয়া (মৃত্যুদণ্ড)।
হাসিনার ফাঁসি দ্রুত কার্যকর করুন।
আরও পড়ুন: নিখোঁজের দুই দিন পর কুমিল্লার জলাশয়ে মিলল ভারতীয় শিক্ষার্থীর মরদেহ
জুলাই আন্দোলনে শহীদ হয়েছিলেন সাজ্জাদ হোসেন সজল, যার বিরুদ্ধে পুলিশ ভ্যানে স্তূপ করে ছয় ছাত্রকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল। শেখ হাসিনার ফাঁসির রায় গ্রামে বসে জানতে পায় সজলের মা শাহীনা বেগম। মুঠোফোনে তার সঙ্গে কথা হয়।
শাহীনা বেগম কেঁদে বলেন, রায় শুনে কী হবে? মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার ফাঁসি দ্রুত কার্যকর চাচ্ছি। আমার সন্তানকে জনসম্মুখে গুলি করে হত্যা করার পর পুড়িয়ে মারা হয়েছে, ঠিক সেভাবেই হাসিনাকে মারা হোক। আমার ছেলে গুলির পরে ছটফট করেছে এবং পানি খেতে চেয়েছিল, পরে নিস্তেজ হয়ে পড়ে।
তিনি কেঁদে আরো বলেন, সে সময়ের পুলিশ প্রধান ছিলেন চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি রাজসাক্ষী হয়েছেন, কিন্তু তার মাত্র পাঁচ বছর সাজা হয়েছে। এতো কম সাজা আমি মানতে পারছি না।
সাভারে সিটি ইউনিভার্সিটিতে বিএসসি পড়তেন সজল। ২০০৫ সালের ১২ এপ্রিল তার জন্ম। সজলের বয়স হয়েছিল মাত্র ২০ বছর। তার মা শাহীনা বেগম আশুলিয়ায় নারী ও শিশু হাসপাতালে ক্লিনার পদে কাজ করে ছেলের লেখাপড়ার খরচ জোগাতেন। আশা ছিল ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হবে, কিন্তু সব আশা চুরমার হয়ে গেছে।
আরও পড়ুন: গাজীপুরে আন্দোলনের সময় আহত পোশাক শ্রমিক তৌফিক শেখ মারা গেছেন
শাহীনা বেগম বলেন, আমি নাতনি এবং বৌমার দিকে তাকালে চোখে পানি আসে। তাদের ভবিষ্যৎ চিন্তায় আমি উদ্বিগ্ন। তাই কিছুটা হলেও শান্তি পাব, হাসিনাকে ভারত থেকে ফিরিয়ে এনে এবং অন্যান্য দণ্ডিতদের রায় দ্রুত কার্যকর হলে।
এছাড়া জুলাই আন্দোলনের অন্যান্য শহীদদের পরিবার ও আন্দোলনকারীরা একই দাবি জানিয়েছেন সরকারের কাছে। দোষীদের বিচারের আওতায় এনে এবং প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের দায়ে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছেন তারা।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন