০৯:৪৭ পি.এম
থাইল্যান্ড দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য। মনোরম সমুদ্রসৈকত, দৃষ্টিনন্দন দ্বীপ, বৌদ্ধ মন্দির, সুস্বাদু খাবার এবং প্রাণবন্ত রাতের জীবনের কারণে প্রতিবছর লাখো পর্যটক দেশটিতে ভিড় করেন। বাংলাদেশিদের মধ্যে থাইল্যান্ডের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্য।
তবে থাইল্যান্ডে ভ্রমণের পূর্বে কিছু আইন ও বিধিনিষেধ সম্পর্কে অবগত হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নিজের দেশে স্বাভাবিক মনে হওয়া কিছু কাজ থাইল্যান্ডে অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। ভিসার মেয়াদ অতিক্রম, নিষিদ্ধ ই-সিগারেট বহন কিংবা মন্দিরে অনুপযুক্ত পোশাক পরিধান করার কারণে আইনি জটিলতায় পড়তে হতে পারে।
এজন্য থাইল্যান্ড ভ্রমণের আগে পর্যটকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ১০টি নিয়ম জানা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: তেঁতুলিয়া থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার সেরা সময় অক্টোবর-নভেম্বর
১. ভিসা ও অবস্থানের মেয়াদ অতিক্রম করবেন না
থাইল্যান্ডে প্রবেশের ভিসার মেয়াদ এবং দেশটিতে থাকার অনুমোদিত সময় এক নয়। প্রবেশের সময় ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার দ্বারা পাসপোর্টে উল্লেখিত শেষ তারিখ মেনে চলা আবশ্যক।
অনুমোদিত সময়ের বেশি অবস্থান করলে প্রতিদিন ৫০০ বাথ জরিমানা হতে পারে, যার সর্বোচ্চ পরিমাণ ২০ হাজার বাথ। দীর্ঘ সময় অবৈধভাবে অবস্থান করলে জরিমানার পাশাপাশি এক থেকে ১০ বছর পর্যন্ত থাইল্যান্ডে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। গ্রেফতার হলে শাস্তি আরও কঠোর হতে পারে।
সুতরাং, পাসপোর্টের প্রবেশ সিল ও থাকার শেষ তারিখ ভালোভাবে দেখে নেওয়া উচিত। মেয়াদ বাড়ানোর প্রয়োজন হলে নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগে আবেদন করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: গুলশানে ‘গোল্ড কিনেন’ এর প্রথম এক্সপেরিয়েন্স সেন্টার উদ্বোধন
২. কাস্টমসের নিয়ম না জেনে পণ্য বহন করবেন না
থাইল্যান্ডে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট শর্তে সর্বোচ্চ ২০ হাজার বাথ মূল্যমানের পণ্য শুল্কমুক্তভাবে নেওয়া যায়। ২০ বছরের বেশি বয়সি যাত্রীরা সাধারণত সর্বোচ্চ এক লিটার অ্যালকোহল এবং ২০০টি সিগারেট অথবা ২৫০ গ্রাম তামাক বহন করতে পারেন। এই সীমা একাধিক যাত্রীর মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ নেই।
এছাড়া ২০ হাজার মার্কিন ডলার বা তার বেশি সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা বহন করলে কাস্টমসে ঘোষণা দিতে হয়। নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রিত পণ্য থাকলে গ্রিন চ্যানেলের পরিবর্তে রেড চ্যানেল ব্যবহার করে ঘোষণা করা উচিত। মাদক, ই-সিগারেট, অস্ত্র, নকল পণ্য এবং অনুমতি ছাড়া প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বা বুদ্ধমূর্তি বহনের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।
৩. প্রেসক্রিপশনের ওষুধেও থাকতে পারে বিধিনিষেধ
আরও পড়ুন: মঙ্গলবার ১২ রাশির ভাগ্য জানালো জ্যোতিষশাস্ত্র, বিশ্লেষণ প্রকাশিত
নিজ দেশে বৈধ কোনো ওষুধ থাইল্যান্ডে বৈধ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কোডিন, মরফিন, ফেন্টানিল, মেথাডোনসহ কিছু ওষুধ এবং আলপ্রাজোলাম, ডায়াজেপাম ও জোলপিডেমের মতো নির্দিষ্ট ওষুধের ক্ষেত্রে বিশেষ নিয়ম রয়েছে।
ওষুধের ধরন ও অবস্থানের সময় অনুযায়ী থাই এফডিএর অনুমতি প্রয়োজন হতে পারে। কিছু নিয়ন্ত্রিত ওষুধ বহনের জন্য আগাম অনুমোদন নিতে হয়।
তাহলে ওষুধ মূল প্যাকেটে রাখুন, চিকিৎসকের ইংরেজি প্রেসক্রিপশন সঙ্গে নিন এবং ভ্রমণের আগে থাই এফডিএর নির্দেশনা যাচাই করুন। প্রয়োজনের অতিরিক্ত বা অন্যের জন্য ওষুধ বহন করা থেকে বিরত থাকুন।
৪. পাসপোর্টের কপি ও ডিজিটাল ব্যাকআপ রাখুন
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রে দ্রুত ক্রেডিট কার্ড পেতে যা করণীয়, জেনে নিন
থাইল্যান্ডে অবস্থানকালে পরিচয় যাচাইয়ের জন্য পাসপোর্ট প্রয়োজন হতে পারে। তবে প্রতিদিন ঘোরাঘুরির সময় মূল পাসপোর্ট সঙ্গে রাখলে হারানোর বা চুরির ঝুঁকি থাকে।
তাহলে পাসপোর্টের তথ্যসংবলিত পাতা, ভিসা ও প্রবেশের সিলের ফটোকপি এবং ডিজিটাল কপি রাখুন। হোটেলের ঠিকানা ও জরুরি যোগাযোগের নম্বরও সংরক্ষণ করুন। আন্তর্জাতিক ভ্রমণ বা সরকারি কাজে অবশ্য মূল পাসপোর্ট প্রয়োজন হতে পারে।
৫. রাজপরিবার নিয়ে মন্তব্যে সতর্ক থাকুন
থাইল্যান্ডের রাজপরিবারের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। দেশটির ফৌজদারি আইনের ১১২ ধারায় রাজা, রানি, উত্তরাধিকারী বা রাজপ্রতিনিধিকে অপমান, মানহানি কিংবা হুমকি দেওয়ার অপরাধে ৩ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
আরও পড়ুন: আজ ‘কোনো কাজ না করার’ দিবস পালিত
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপত্তিকর পোস্ট, ছবি বা মন্তব্য করলেও আইনি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই রাজপরিবার নিয়ে বিতর্ক, কটূক্তি বা অসম্মানজনক কনটেন্ট শেয়ার করা থেকে বিরত থাকুন। থাই মুদ্রা পায়ে মাড়ানোও অসম্মানজনক আচরণ হিসেবে গণ্য হয়।
৬. মন্দিরে পোশাক ও আচরণে শালীনতা বজায় রাখুন
থাইল্যান্ডের বৌদ্ধ মন্দিরগুলো পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হলেও স্থানীয়দের জন্য অত্যন্ত পবিত্র স্থান। তাই মন্দিরে প্রবেশের সময় কাঁধ ও হাঁটু ঢাকা পোশাক পরা উচিত। অতিরিক্ত খোলামেলা বা আঁটসাঁট পোশাক পরিধান থেকে বিরত থাকুন।
মন্দিরে জুতা খোলার নিয়ম থাকলে তা মেনে চলুন। উচ্চস্বরে কথা বলা, বুদ্ধমূর্তির সঙ্গে অসম্মানজনক ভঙ্গিতে ছবি তোলা কিংবা মূর্তির ওপর ওঠা থেকে বিরত থাকুন। বসার সময় পায়ের তলা বুদ্ধমূর্তি বা ভিক্ষুদের দিকে রাখবেন না। বিশেষ করে গ্র্যান্ড প্যালেস ও ওয়াট ফ্রা কায়েওতে পোশাকের নিয়ম বেশ কঠোর।
আরও পড়ুন: নতুন সাজে সেন্টমার্টিন, পর্যটকদের অপেক্ষা
৭. অ্যালকোহল কেনা ও পান করার নিয়ম জানুন
২০২৬ সালের ২৯ মে থেকে কার্যকর নিয়ম অনুযায়ী, থাইল্যান্ডে সাধারণভাবে লাইসেন্সপ্রাপ্ত দোকান ও সুপারমার্কেটে সকাল ১১টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত অ্যালকোহল কেনা যায়। তবে হোটেল, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্দিষ্ট এলাকা ও অনুমোদিত বিনোদনকেন্দ্রে আলাদা বিধান থাকতে পারে।
মন্দির, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস, পেট্রল পাম্প ও নির্দিষ্ট গণপরিবহন এলাকায় অ্যালকোহল পান নিষিদ্ধ। বৌদ্ধ ধর্মীয় দিবস ও নির্বাচনের সময়ও বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা থাকতে পারে। মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি বা মোটরসাইকেল চালানো থেকেও বিরত থাকতে হবে।
৮. ই-সিগারেট ও ভ্যাপিং ডিভাইস সঙ্গে নেবেন না
থাইল্যান্ডে ই-সিগারেট ও ভ্যাপিং পণ্য আমদানি এবং বহনের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ভ্যাপ পেন, ডিসপোজেবল ই-সিগারেট, ই-লিকুইড, পড ও হিটেড টোব্যাকো ডিভাইসও এর আওতায় পড়তে পারে। নিষিদ্ধ পণ্য বহন বা আমদানির ক্ষেত্রে জব্দ, জরিমানা এবং সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের ঝুঁকি রয়েছে। তাই ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য হলেও এসব পণ্য থাইল্যান্ডে নিয়ে যাওয়া উচিত নয়।
৯. গাঁজা ব্যবহারে রয়েছে কঠোর বিধিনিষেধ
২০২২ সালে গাঁজার ওপর বিধিনিষেধ শিথিলের পর থাইল্যান্ডকে অনেকে অবাধে গাঁজা ব্যবহারের দেশ মনে করেছিলেন। তবে ২০২৫ সালে নীতিতে পরিবর্তন এনে চিকিৎসাভিত্তিক ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, চিকিৎসার প্রয়োজনে গাঁজা ব্যবহার করতে থাইল্যান্ডের অনুমোদিত চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন প্রয়োজন। অনুমতি ছাড়া গাঁজা কেনা, বহন বা ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। জনসমক্ষে গাঁজা সেবনের জন্য জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধানও রয়েছে। নিজের দেশ থেকে গাঁজা বা গাঁজাজাত পণ্য নিয়ে থাইল্যান্ডে প্রবেশ করাও ঝুঁকিপূর্ণ।
১০. নির্দিষ্ট সমুদ্রসৈকতে ধূমপান নিষিদ্ধ
থাইল্যান্ডের জনপ্রিয় অনেক সমুদ্রসৈকতে পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় ধূমপানের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ফুকেটের পাটং, কাটা ও কারন; পাতায়ার বিচ ও জোমতিয়েন; কোহ সামুইয়ের চাওয়েং ও বোফুটসহ বিভিন্ন সৈকতে নির্দিষ্ট এলাকায় ধূমপান করা যায় না।
নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে সর্বোচ্চ এক লাখ বাথ জরিমানা, এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড কিংবা উভয় শাস্তি হতে পারে। কিছু সৈকতে আলাদা ধূমপান অঞ্চল থাকলেও সেখানে যাওয়ার আগে স্থানীয় সাইনবোর্ড ও নির্দেশনা দেখে নেওয়া উচিত। বালুতে সিগারেটের অবশিষ্টাংশ ফেলবেন না।
থাইল্যান্ড ভ্রমণের আগে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি
ভ্রমণ নির্বিঘ্ন রাখতে পাসপোর্ট ও ভিসার মেয়াদ যাচাই করুন। থাকার শেষ অনুমোদিত তারিখ জেনে নিন। প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রেসক্রিপশন ও অনুমতি সঙ্গে রাখুন। কাস্টমসের নিয়ম মেনে পণ্য ও নগদ অর্থ বহন করুন। পাশাপাশি পাসপোর্টের কপি, মন্দিরে পরার উপযোগী পোশাক এবং স্থানীয় আইন সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রস্তুত রাখুন।
থাইল্যান্ড ভ্রমণ হতে পারে দারুণ অভিজ্ঞতা। তবে বিদেশে গেলে নিজের দেশের নিয়ম নয়, গন্তব্য দেশের আইন ও সংস্কৃতিকে সম্মান করাই সবচেয়ে জরুরি। ভ্রমণের আগে বিধিনিষেধ সম্পর্কে জেনে নিলে অপ্রত্যাশিত জরিমানা ও আইনি জটিলতা এড়িয়ে নিশ্চিন্তে উপভোগ করা যাবে ছুটি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন