০৬:২২ পি.এম
ঢাকার পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা ধর্ষণের পর হত্যার মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, যখন কোনো শিশু যৌন নির্যাতন, সহিংসতা কিংবা হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের শিকার হয়, তখন তা শুধুমাত্র একটি পরিবারকে নয়, সমগ্র সমাজকে গভীরভাবে আহত করে। পাশাপাশি, এটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।
রোববার (৭ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন নৃশংস এই ঘটনায় অভিযুক্ত দুই আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রদান করেছেন। দণ্ড ঘোষণার পূর্বে বিচারক ঘটনাটি বিষয়ে ওই পর্যবেক্ষণ ব্যক্ত করেছেন।
আদালত পর্যবেক্ষণে তুলে ধরে জানিয়েছেন, শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের এই মামলা কেবল একটি ফৌজদারি বিচারিক কার্যক্রম নয়; বরং এটি আমাদের সমাজের বিবেক এবং আইনের শাসনের প্রতি গভীর ও কঠিন পরীক্ষা। শিশুদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি সভ্য রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। যখন কোনো শিশু এমন জঘন্য অপরাধের শিকার হয়, তা সমগ্র সমাজকে আহত করে এবং বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব।
আরও পড়ুন: মানিকগঞ্জে বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস পালিত, আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত
পর্যবেক্ষণে আদালত আরো উল্লেখ করেছেন, একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন নির্মমভাবে নিভিয়ে দেওয়ার অভিযোগে করা এই মামলার প্রতিটি পৃষ্ঠা ‘বেদনা, ক্ষোভ, উদ্বেগ ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় পরিপূর্ণ’ রয়েছে। মামলাটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে, কারণ এখানে তদন্ত, বিচারিক কার্যক্রম এবং সাক্ষ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া তুলনামূলক দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল সন্তোষের সঙ্গে লক্ষ্য করেছে যে, তদন্তকারী সংস্থা অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে মামলার তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেছে। একইভাবে, প্রসিকিউশন মামলার সব গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে অতি অল্প সময়ে আদালতের সামনে উপস্থাপন করে বিচার কার্য দ্রুত ও কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
২০১৯ সালের ১৯ মে ঢাকার পল্লবী থানায় মামলার এজাহারকারী আব্দুল হান্নান মোল্লা এবং পারভিন আক্তারের শিশুকন্যা রামিসা আক্তার (৮) ভয়াবহ ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। তারা পল্লবী থানাধীন ১১ নং সেকশনে ভাড়া থাকতেন। ঘটনার দিন ও সময়ে পারভিন আক্তার তার শিশুকন্যা রামিসাকে খুঁজতে গিয়ে পাশের ফ্ল্যাটে সতর্ক হয়ে গিয়েছিলেন, যেখানে তার একটি পায়ের জুতা দেখতে পান। পরবর্তীতে রামিসার মায়ের চিৎকারে আশপাশের সবাই আসলে আব্দুল হান্নান মোল্লা দরজা ভেঙে প্রবেশ করলে দেখতে পান, শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার পর দেহ খণ্ডিত অবস্থায় খাটের নিচে রাখা হয়েছে এবং আসামি মো. সোহেল রানা ভুক্তভোগীর হাত কেটে আলাদা করেছিল এবং যৌনাঙ্গ চাকু দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করেছিল। পরে, মৃতদেহ বাথরুম থেকে শয়নকক্ষে এনে খাটের নিচে রাখা হয় এবং মাথা বালতিতে লুকিয়ে রাখে।
আসামি স্বপ্না খাতুনের পরামর্শে জানালার গ্রিল কেটে তার স্বামী সোহেল রানা পালিয়ে যান। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে স্বপ্না খাতুনকে আটক করে এবং মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়। ২০ মে আব্দুল হান্নান মোল্লা মামলা করেন এবং এসআই অহিদুজ্জামান তদন্তভার প্রাপ্ত হন। আসামি সোহেল রানা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদের কাছে দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্তের সময় সব সাক্ষ্যপ্রমাণ ও প্রতিবেদন পর্যালোচনায় অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণ হওয়ায় অভিযুক্ত মো. সোহেল রানা ও মোছা. স্বপ্না খাতুনের বিরুদ্ধে পল্লবী থানার অভিযোগপত্র ২৩ মে আদালতে দাখিল করেন। ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল মামলার নথি প্রাপ্তির পর আসামিদের বিরুদ্ধে অপরাধ বিচারের জন্য আমলে গ্রহণ করেন। আসামি পক্ষের কোনো আইনজীবী না থাকায় আদালতের নির্দেশে মুসা কলিমুল্যাহকে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট অত্র ট্রাইব্যুনাল অবকাশ বহির্ভূত রেখে কার্যক্রম চলমান রাখার আদেশ দেন।
আরও পড়ুন: কক্সবাজারে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আবু বক্করকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ
গত ১ জুন অভিযুক্ত সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণ এবং ধষর্ণ পরবর্তী অন্যান্য কার্যকলাপের মাধ্যমে মৃত্যু ঘটানোর অপরাধে অভিযোগ গঠন করা হয়। অপর আসামি মোছা. স্বপ্না খাতুন ওই অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করার জন্য অভিযুক্ত হয়, আলামত বিনষ্ট করায় বাধা না দেওয়া এবং স্বামীকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করায় তার বিরুদ্ধেও সংশ্লিষ্ট ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়।
বিচার পর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষে ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের পর ২ জুন সাক্ষ্য গ্রহণ সমাপ্ত করা হয়। ৩ জুন অভিযুক্ত মো. সোহেল রানা ও মোসা. স্বপ্না খাতুনকে ৩৪২ ধারায় পরীক্ষা করা হলে তারা নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। ৪ জুন যুক্তিতর্ক শেষে আজ ৭ জুন রায় প্রচারের জন্য ধার্য হয়।
আদালতে রামিসার বাবা, মা, বড় বোন রাইসা আক্তারসহ সব সাক্ষী ঘটনার স্বপক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন। ময়নাতদন্তকারী ডাক্তার এবং স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী লিপিবদ্ধকারী ম্যাজিস্ট্রেটও আদালতে উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন। রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করেছে যে, তারা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। অন্যদিকে, আসামি পক্ষ দাবি করে আসামিরা সম্পূর্ণ নির্দোষ।
আদালত সাক্ষীদের বক্তব্য, জব্দতালিকা, সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং অন্যান্য নথি পর্যালোচনা করেন। প্রসিকিউশন পক্ষ দাবি করেছে, ঘটনার তারিখ, সময় ও ঘটনাস্থল সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সমর্থ হয়েছে। সাক্ষ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, অভিযুক্ত স্বপ্না খাতুন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি সোহেল রানাকে লাশ গুম করতে ও পালিয়ে যেতে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেছেন।
আরও পড়ুন: বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী আজ, বীরত্ব ও আত্মত্যাগ স্মরণে
আদালত রায় প্রদানকালে উচ্চ আদালতের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও সাক্ষ্য আইন ১০৬ ধারার বিধান পর্যালোচনা করেছেন। পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য বিশ্লেষণে সোহেল রানা ও স্বপ্না খাতুনের জড়িত থাকার বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে প্রমাণ হয়েছে। আদালত ধর্ষণের ক্ষেত্রে একজন সাক্ষীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে শাস্তি প্রদানের উচ্চ আদালতের নজিরও উল্লেখ করেছেন।
সার্বিক বিবেচনায় আদালত অভিযুক্ত সোহেল রানাকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এর ধারা ৯(২) মোতাবেক মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন এবং তাকে ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেছেন। একইভাবে অভিযুক্ত মোছা. স্বপ্না খাতুনকেও মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয় এবং তাকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।
হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদন সাপেক্ষে আসামিদের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত গলায় ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আসামিদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ সংক্রান্ত সব কার্যক্রম হাইকোর্ট বিভাগে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং তাদের ওপর আরোপিত অর্থদণ্ডের টাকা ভুক্তভোগী মৃত রামিসার আইনগত উত্তরাধিকারীকে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঢাকার পল্লবীতে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত এ কথা বলেন। বর্তমানে এই ট্রাইব্যুনাল ১ হাজার ৮০০-এর বেশি বিচারাধীন মামলার দায়িত্ব পালন করছে।
আরও পড়ুন: ইউপি নির্বাচনের হাওয়ায় সরগরম বাকেরগঞ্জ, মাঠে সম্ভাব্য প্রার্থীরা
রামিসার মামলাটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। কারণ এর তদন্ত, বিচারিক কার্যক্রম এবং সাক্ষ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে। তদন্তকারী সংস্থা এবং প্রসিকিউশন অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে তাদের দায়িত্ব পালন করায় আদালত সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
আদালত প্রত্যাশা করছে, এই মামলার ন্যায় দ্রুত ও মানসম্মত বিচারিক কার্যক্রম ভবিষ্যতে শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত অন্যান্য মামলাতেও অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হবে।
একটি ন্যায়সঙ্গত বিচার কেবল আদালতের একক প্রচেষ্টায় সম্ভব নয়, বরং বিচার ব্যবস্থার সব অংশীজনের সম্মিলিত দায়িত্বশীল অংশগ্রহণের মাধ্যমে তা অর্জিত হয়।
আদালতের দায়িত্ব আবেগ দ্বারা নয়, বরং আইন ও প্রমাণের আলোকে সত্য উদঘাটন করা। এই আদালত অত্যন্ত সতর্কতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং মামলার সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে রায় দিয়েছেন।
আরও পড়ুন: চুয়াডাঙ্গায় মাটির নিচে ঘাঁটি গেড়ে সাধনা করছেন নারী লাভলী শাহ ফকির রানী
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন