১০:৩২ পি.এম
আশপাশের বাড়ির ছাদের ওপর আকাশি-সাদা পতাকায় ছেয়ে যাওয়ার সময়ে দেয়ালে লিওনেল মেসির ম্যুরাল দেখে মনে হতে পারে, বাংলাদেশ নয়, এটি আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপের প্রেক্ষাপটে এমনি সাজ পুরো বাংলাদেশে এখন বিরাজমান।
আকাশপথের দূরত্ব প্রায় ১৭ হাজার কিলোমিটার হলেও আলবিসেলেস্তাদের জন্য গলা ফাটাচ্ছে দেশটি।
১৮ কোটির বেশি জনগণের বাংলাদেশ এখনো বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে না পারলেও বৈশ্বিক মহাযজ্ঞের আবহে যেভাবে আর্জেন্টিনাকে আপন করে নিয়েছে, তার তুলনা হয় না। আর্জেন্টিনার প্রতি বাংলাদেশের এই ভালোবাসা দীর্ঘ দশক ধরে অব্যাহত।
আরও পড়ুন: শেরপুরে বাস-সিএনজির সংঘর্ষে জুয়েল মিয়া নিহত, আহত ৪
এবারেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। আর্জেন্টিনা ফাইনালে উঠায় ভালোবাসার চিত্র আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। আগামী রবিবার মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা। তাই আবারও একটি উন্মাদনার রাত কাটানোর অপেক্ষায় রয়েছে পুরো বাংলাদেশ।
এএফপির সঙ্গে কথা বলার সময় মোটর মেকানিক নুরুল ইসলাম বলেছেন, ‘আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচের সময় আমি প্রচণ্ড টেনশনে ছিলাম।
ঘামতে ঘামতে আমি প্রায় কেঁদেই ফেলছিলাম। তবে এখন আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, আর্জেন্টিনাই জিতবে।’
অনেকের মতে, আর্জেন্টিনার বাইরে আলবিসেলেস্তেদের বৃহত্তম সমর্থক গোষ্ঠী বর্তমানে বাংলাদেশে রয়েছে। এই ভালোবাসার গল্পটি শুরু হয়েছিল ১৯৮৬ বিশ্বকাপে। ডিয়েগো ম্যারাডোনার অসাধারণ পারফরমেন্সের মাধ্যমে।
আরও পড়ুন: নিম্নতম মজুরি বোর্ড অচিরেই গঠন হবে: শ্রমমন্ত্রী
আর্জেন্টিনার প্রতি নুরুলের ভালোবাসা এসেছে তাঁর বাবার কাছ থেকে। ম্যারাডোনার প্রতি তাঁর বাবা ছিলেন অন্ধ ভক্ত। সেই আবেগ তার তৃতীয় প্রজন্মেও ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার দুই সন্তানও আর্জেন্টিনার ভক্ত। তারা এই খেলা নিয়ে বেশ সিরিয়াস এবং নতুন জার্সির জন্য বায়না ধরেছে।’
সমর্থকদের তীব্র উৎসাহ-উদ্দীপনার কারণে জার্সির বাজার বর্তমানে জমজমাট। বাংলাদেশ স্পোর্টস অ্যাক্সেসরিজ মার্চেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান উপদেষ্টা শামীম পাটোয়ারী জানিয়েছেন, বাজারে জার্সির চাহিদা ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে। এএফপিকে তিনি বলেন, ‘আর্জেন্টিনার কত সমর্থক আছেন, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই, তবে আমরা বিপুল পরিমাণ জার্সি বিক্রি করেছি।’
মোট বিক্রির প্রায় ৩০ শতাংশই আর্জেন্টিনার জার্সি বলে জানান বাংলাদেশের অন্যতম ক্রীড়া সামগ্রী বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ‘গ্যালাক্সি স্পোর্টসের’ রায়হান হোসেন। তিনি বলেন, ‘কিছু অভিভাবক তো সদ্যজাত শিশুদের জন্যও আর্জেন্টিনার জার্সি কিনেছেন। আমাদের স্টকে থাকা প্রায় সব জার্সিই বিক্রি হয়ে গেছে, বিশেষ করে প্লেয়ার এডিশনগুলো।’
রায়হান আরো যোগ করেন, ‘জার্সি কেনার পেছনে কাজ করে এক গভীর আবেগ। সেদিন এক অটোরিকশাচালক আমাদের দোকানে এসে প্রায় ১,২০০ টাকা দিয়ে প্লেয়ার-এডিশনের একটি জার্সি কিনলেন। জানি না, তিনি এই টাকা দিনে আয় করতে পারেন কি না।’
আরও পড়ুন: শেরপুরে বাসের চাপায় সিএনজি যাত্রী নিহত, আহত ৪
আল মামুন নামের ৫৫ বছর বয়সী এক বিক্রেতা জার্সি বিক্রি করার সময় জানিয়েছেন, ‘আমি ম্যারাডোনার খেলা দেখেছি এবং তখন থেকেই আমি আর্জেন্টিনার সমর্থক হয়ে আছি।’
ফিফা র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮১তম হলেও, প্রতি ৪ বছর পর পর পুরো দেশ ফুটবল জ্বরে কাঁপতে থাকে। টুর্নামেন্টের আবেগ এতটাই তীব্র যে, দেশের সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিশ্বকাপ চলাকালীন ফুটবল-সংক্রান্ত বিভিন্ন ঘটনায় অন্তত ১২ জনের মৃত্যু ঘটেছে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারই প্রথম তিন দেশে আয়োজন করা হচ্ছে। সঙ্গে ৪৮ দলের বিশ্বকাপও হচ্ছে প্রথমবার। আয়োজক দেশগুলো হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকো, এবং বাংলাদেশের সময়ের সঙ্গে রয়েছে দিন-রাতের বেশ পার্থক্য। গভীর রাতে ম্যাচ শুরু হলেও, ভক্ত-সমর্থকদের চোখ ঠিকই বোকাবাক্সে থাকে।
আর্জেন্টিনার খেলা দেখার জন্য রাত জেগে অপেক্ষায় থাকেন ৩৭ বছর বয়সী জাকিয়া মুসান্না। তিনি বলেন, ‘এই জার্সি পরি কারণ এটি আমাদের মনে এই অনুভূতি দেয় যে আমরাও দলেরই একটি অংশ, একাত্মতার একটি অনুভূতি।’
আরও পড়ুন: কেন্দুয়ায় পাচারের সময় ৩২ বস্তা সার জব্দ, চালক পালিয়েছে
তিনি বাবার সাথে বসে ২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্মৃতিচারণা করেন। রবিবারের ফাইনালও ঠিক একই জায়গায় বসে দেখার পরিকল্পনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা একই জায়গায় যাওয়ার পরিকল্পনা করছি, আগের জয়ের স্মৃতিগুলো রোমন্থন করব এবং আরেকটি বিজয় উদযাপন করব।’ তবে তিনি জায়গার নামটি জানাননি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন