০৫:৪০ পি.এম
যে সাগর স্বামী জালাল মিয়াকে কেড়ে নিয়েছিল, সেই সাগরেই ছেলেকে হারানোর ভয় ছিল মা ছাহেরা বেগমের। তাই স্বামীকে হারানোর পর একমাত্র ছেলেকে বাঁচানোর আকুল প্রয়াসে ধারদেনা করে তাকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন।
তিনি ভেবেছিলেন, দূরদেশে অন্তত সাগরের অনিশ্চিত জীবনের মুখোমুখি হতে হবে না ছেলেকে। কিন্তু ৩৪ বছর পর সেই ছেলেও মারা গেছেন বিদেশের মাটিতে। স্বামীর মরদেহ তো পাননি, এবার একমাত্র ছেলের মুখটি শেষবারের মতো দেখতে চান হতভাগ্য এই মা।
বরগুনার তালতলী উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের নলবুনিয়া গ্রামের বাড়িতে বসে এখন শুধু ছেলের নাম ধরে বিলাপ করছেন ছাহেরা বেগম।
আরও পড়ুন: নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষা
পরিবার সূত্রে জানা যায়, বহু বছর আগে সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ হন জালাল মিয়া। তখন তার ছেলে হানিফের বয়স ছিল মাত্র দুই বছর। পিতৃহীন হানিফই ছিল মায়ের একমাত্র বেঁচে থাকার অবলম্বন। স্বামীর পরিণতি যেন ছেলের জীবনেও না আসে, সেজন্য দালালের মাধ্যমে আড়াই বছর আগে হানিফকে সৌদি আরবে পাঠান তারা। বিদেশ যাওয়ার জন্য সে সময় ধারদেনা করে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা জোগাড় করতে হয়েছিল পরিবারটিকে। সৌদি আরবে একটি পাথর প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় শ্রমিকের কাজ করতেন হানিফ। তবে ভিসার জটিলতায় প্রায় দুই বছর তাকে অবৈধ অবস্থায় কাটাতে হয়।
সেই অনিশ্চয়তা কাটাতে পাঁচ মাস আগে ফের টাকা জোগাড় করেন হানিফ। ভিসা বৈধ করার আশায় ছয়টি এনজিও ও একটি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আরও চার লাখ ৫০ হাজার টাকা তুলে দেন দালালের হাতে। এত চেষ্টা ও ঋণের বোঝা সবই ছিল একটু নিশ্চিন্তে বাঁচার আশায়। কিন্তু ৩ অক্টোবর সৌদি আরবে হানিফের মৃত্যু হয়। সে দিনই পরিবারের কাছে তার মৃত্যুসংবাদ আসে। তবে ঠিক কী কারণে তার মৃত্যু হয়েছে, তা এখনও জানতে পারেনি পরিবার।
হানিফের মৃত্যুর পর পরিবারটি এখন দ্বিমুখী সংকটের মুখে। বৈধ কাগজপত্র না থাকা এবং চরম আর্থিক সংকটের কারণে তার মরদেহ দেশে ফেরানো নিয়ে তৈরি হয়েছে শংকা। হানিফের সংসারেও নেমে এসেছে শোকের অন্ধকার। তার স্ত্রী কাজল আক্তারের কোলে রয়েছে ১১ বছরের ছেলে মো. জেনায়েদ ও পাঁচ বছরের মেয়ে মোসা. ছামিরা। স্বামীর মৃত্যুর পর দুই সন্তানকে নিয়ে চরম ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় পড়েছেন কাজল। মাথার ওপর চেপে বসেছে বিদেশযাত্রা ও ভিসা বৈধ করার জন্য বিভিন্ন এনজিও ও ব্যাংক থেকে নেওয়া ১০ লাখ টাকার ঋণের পাহাড়।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে কাজল আক্তার বলেন, "স্বামী বিদেশ যাওয়ার সময় ধারদেনা করে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছিলাম। পরে আবার ভিসা বৈধ করার আশায় ছটি এনজিও ও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে চার লাখ ৫০ হাজার টাকা দিই। এখন দুটি অবুঝ সন্তান নিয়ে সংসার চালানোর কোনো উপায় নেই, উল্টো মাথার ওপর ঋণের পাহাড়। সরকারের কাছে আমাদের একটাই আবেদন, হানিফের মরদেহ যেন দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়, যাতে অন্তত সন্তান দুটি তাদের বাবার কবর দেখতে পায়।"
আরও পড়ুন: মুন্সীগঞ্জ ডিসি অফিসে সোলার প্যানেলে উৎপাদন হবে ৮০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ
তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অতীশ সরকার জানান, হানিফের মৃত্যুর খবর তার পরিবার তাকে জানিয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। এ ক্ষেত্রে উপজেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে।
নিশানবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ড. কামরুজ্জামান বাচ্চু বলেন, হানিফের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে।
সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ছেলের মরদেহ দেশে ফেরার অপেক্ষায় এখন দিন কাটছে মা ছাহেরা বেগম ও স্ত্রী কাজলের। যে ছেলেকে সমুদ্রের ভয় থেকে বাঁচাতে ঋণ করে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন, সেই সন্তানের মরদেহ শেষবারের মতো চোখের দেখা দেখতে পাওয়ার আকুতি এখন তাদের বুকজুড়ে।
আরও পড়ুন: শীতের আগমনে গফরগাঁওয়ে প্রস্তুতির ধুম, বাজারে শীতকালীন পণ্য আসছে
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন