০৩:৫৫ পি.এম
ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিদের বারবার হামলায় সৌদি আরবের তেল অবকাঠামো ও জাহাজ চলাচল ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর ফলে রিয়াদের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি নেটওয়ার্কের এক বড় দুর্বলতা সামনে উঠে এসেছে।
এটি বর্তমানে দেশটির নীতিনির্ধারকদের জন্য ক্রমেই বড় মাথাব্যথার বিষয় হয়ে উঠছে।
সাম্প্রতিক কিছু দিন ধরে ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী দাবি করছে যে, তারা জাজান ও ইয়ানবুতে সৌদি আরামকোর স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা তেল স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ছোড়া একাধিক ড্রোন ভূপাতিত করেছে। এসব হামলার সময়টিতে লক্ষ্যণীয় যে, লোহিত সাগর দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল দিন দিন আরো কঠিন হয়ে উঠছে।
আরও পড়ুন: আইটি জালিয়াতি ও সাইবার অপরাধের অভিযোগে উত্তর কোরীয়দের ওপর অস্ট্রেলিয়ার নিষেধাজ্ঞা
তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে গন্তব্যে পৌঁছাতে এখন দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে হচ্ছে। ইউরোপে অপরিশোধিত তেল পাঠাতে রপ্তানিকারকদের খরচও বেড়ে যাচ্ছে। রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিদের দায় স্বীকার করা এক হামলার পর গত ২৭ জুলাই সৌদি আরামকো তাদের দৈনিক চার লাখ ব্যারেল সক্ষমতার জাজান শোধনাগার বন্ধ করে দিয়েছে। রয়টার্স আরও জানিয়েছে, ওই হামলায় শোধনাগারের সমন্বিত গ্যাসিফিকেশন কম্বাইন্ড সাইকেল কমপ্লেক্স এবং তেল সংরক্ষণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, চলতি বছরের আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত মেরামতের কাজ চলবে।
এখন সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনও পুরো সমস্যা সমাধান করতে পারছে না। এই পাইপলাইনটি দেশের পূর্বাঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেল লোহিত সাগরের ইয়ানবুতে নিয়ে যায়। এটি বিশেষভাবে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পরিবহনের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু তেল ইয়ানবুতে পৌঁছানোর পরেও সেটিকে বাব আল-মান্দেব প্রণালি পেরিয়ে যেতে হয়।
হরমুজের মতো এই পথও এখন নিরাপদে চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়েছে। যদি এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দীর্ঘ সময় হুথিদের হুমকির মুখে থাকে, তাহলে সৌদি আরবকে অন্য কোনো পথ খুঁজতে হতে পারে। এমন একটি বিকল্প পথ ইতোমধ্যেই বিদ্যমান। তবে সেটি সবার চোখের সামনেই রয়ে গেছে, কিন্তু অনেকটা আড়ালে আছে। এটি ২৫৪ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি পাইপলাইন। এই পাইপলাইনটি লোহিত সাগর থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত ইসরায়েলের ভেতর দিয়ে গেছে। প্রায় ছয় দশক আগে ইরানের অর্থায়ন ও ইসরায়েলের প্রকৌশল দক্ষতার মাধ্যমে এটি গোপনে নির্মাণ করা হয়েছিল। তখনও ইসলামী বিপ্লবের কারণে দুই দেশ পরস্পরের কট্টর শত্রু হয়ে ওঠেনি।
এই পাইপলাইনটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যাতে ইরানের অপরিশোধিত তেল এলাত বন্দরে পৌঁছে ইসরায়েল হয়ে আশকেলনে নিয়ে যাওয়া যায়। সেখান থেকে তা ইউরোপে পাঠানো হতো। এতে সুয়েজ খাল ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়ত না। এটি মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে কম পরিচিত হলেও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি প্রকল্পগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। এখন হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দেব—দুই পথই সংঘাতের কারণে ঝুঁকির মুখে। এই অবস্থায় ইসরায়েলের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যেই বলছেন, একই অবকাঠামো ব্যবহার করে সৌদি আরব ইউরোপের বাজারে তেল পাঠানোর আরেকটি পথ পেতে পারে।
আরও পড়ুন: গাজীপুরে পুলিশের টহল দলকে পিকআপের ধাক্কা, এসআইসহ নিহত দুই
এমন একটি প্রস্তাব কয়েক বছর আগেও রাজনৈতিকভাবে কল্পনা করাও কঠিন ছিল। কিন্তু আঞ্চলিক নৌপথে দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন সরকার ও জ্বালানি পরিকল্পনাকারীদের পুরোনো ধারণা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। তেলের বাজার প্রায়ই দেশগুলোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে এমন প্রভাব ফেলে। কিন্তু এই পাইপলাইন শুধু একটি জ্বালানি অবকাঠামো নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েক দশকের ইতিহাস এবং গোপন কূটনীতি। এটি একটি প্রশ্নও বাড়িয়ে তোলে। কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও, কৌশলগত প্রয়োজন কি একদিন সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেলকে ইসরায়েলের ভূখণ্ড দিয়ে যেতে বাধ্য করবে?
১৯৬০ সালের দশকের শেষ দিকে ইসরায়েল ও শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির শাসনাধীন তৎকালীন ইম্পেরিয়াল ইরানের মধ্যে গোপন অংশীদারত্বের ভিত্তিতে এই পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল, ইসরায়েলের লোহিত সাগর উপকূলের এলাত বন্দরে পৌঁছানো ইরানের অপরিশোধিত তেল দেশটির ভেতর দিয়ে ভূমধ্যসাগর উপকূলের আশকেলনে নিয়ে যাওয়া। এরপর মিসরের সুয়েজ খাল এড়িয়ে সেই তেল ইউরোপে পাঠানো হতো। গোপনীয়তা লঙ্ঘনের সিআইএর নথি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এই প্রকল্পকে এতটা কৌশলগত মনে করেছিল যে, এটি প্রেসিডেন্টের দৈনিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছিল।
সিআইএ এর মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বিশাল তেলবাহী জাহাজগুলো এলাত বন্দরে ইরানের অপরিশোধিত তেল খালাস করত। এরপর ৪২ ইঞ্চি ব্যাসের একটি পাইপলাইন দিয়ে সেই তেল ইসরায়েলের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নেওয়া হতো। পরে আশকেলনে ছোট আকারের জাহাজে তা আবার তোলা হতো এবং সেখান থেকে মূলত ইউরোপে পাঠানো হতো। সংস্থাটি ধারণা করেছিল যে, প্রকল্পের প্রথম ধাপে বছরে প্রায় দুই কোটি টন তেল পরিবহন করা সম্ভব হবে। পরে ১৯৭০-এর দশকের মাঝামঝি সময়ে এর সক্ষমতা বাড়িয়ে বছরে পাঁচ থেকে ছয় কোটি টনে নেওয়া যাবে। সিআইএ আরও বলেছিল, সুয়েজ খাল ব্যবহার করে বা কেপ অব গুড হোপ ঘুরে তেল পাঠানোর তুলনায় এই পথটি সম্ভবত কম খরচের হবে।
পরে এই অবকাঠামোর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানটির নাম হয় ইউরোপ এশিয়া পাইপলাইন কম্পানি। সংক্ষেপে একে ইএপিসি বলা হয়। প্রতিষ্ঠানটি ইসরায়েলজুড়ে পাইপলাইন, তেল সংরক্ষণ কেন্দ্র এবং সমুদ্রবন্দরভিত্তিক টার্মিনাল পরিচালনা করে। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের পর তেহরানের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক ভেঙে যায়। এরপর এই যৌথ প্রকল্পের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ইসরায়েল নিয়ে নেয়। পরে সুইজারল্যান্ডের একটি সালিশি ট্রাইব্যুনাল সাবেক এই যৌথ প্রকল্পের বিষয়ে ইসরায়েলকে ইরানকে ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার পরিশোধের নির্দেশ দেয়। তবে ইসরায়েল সেই রায় প্রত্যাখ্যান করে। কারণ তাদের যুক্তি ছিল, অর্থ পরিশোধ করলে দেশটির 'শত্রুর সঙ্গে বাণিজ্য আইন' লঙ্ঘন হবে। বর্তমানে এই কম্পানি ইসরায়েলের সবচেয়ে গোপনীয় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের একটি হয়ে আছে। জাতীয় নিরাপত্তার কারণে ১৯৬৮ সালে চালু করা একাধিক গোপনীয়তা বিধানের আওতায় এখনও প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ফলে তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রমের অনেক তথ্য জনসাধারণের নজরের বাইরেই রয়ে যায়।
আরও পড়ুন: ডোনাল্ড ট্রাম্পের আহ্বান, ইলহান ওমরের পদত্যাগ চান
যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া, ইসরায়েলভিত্তিক মুক্ত উৎস গোয়েন্দা বিশ্লেষক এবং ওএসআইএনটি৬১৩-এর প্রতিষ্ঠাতা জে লেটনি এনডিটিভিকে বলেন, ইসরায়েলের ভেতরে এ নিয়ে আলোচনা অনেকের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব নিয়ে চলছে। সৌদি আরব এই পাইপলাইন ব্যবহার করতে পারে—এখন এ সম্ভাবনা নিয়ে কতটা গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা হচ্ছে, এমন প্রশ্নের জবাবে লেটনি বলেন, 'খুবই গুরুত্ব দিয়ে।'
জুলাইয়ের শুরুতে ইসরায়েলের জ্বালানিমন্ত্রী এলি কোহেন প্রকাশ্যে ওয়াশিংটনের কাছে সৌদি আরব থেকে এলাত পর্যন্ত ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি পাইপলাইনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ২০২০ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক ব্য unsuccessful হওয়ার পর এটিই ইসরায়েল সরকারের সবচেয়ে জোরালো উদ্যোগ। বিষয়টি এখন মন্ত্রিসভার পর্যায়েও সমর্থন পাচ্ছে। তবে পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে সৌদি আরবের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।'
ইসরায়েল কি ক্রমেই একটি আঞ্চলিক জ্বালানি কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের চিহ্নিত করছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'হ্যাঁ। এলি কোহেনের প্রকাশ্য প্রস্তাবও সেটিই নির্দেশ করছে।' উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ইসরায়েলের ভেতর দিয়ে ইউরোপে পাঠানো গেলে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমবে। একই সঙ্গে ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য ইসরায়েলের অবকাঠামো দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এই পরিকল্পনার অনুযায়ী, প্রথমে সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল দেশটির পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন দিয়ে ইয়ানবুতে পৌঁছাবে। এরপর তেলবাহী ট্যাংকারগুলো লোহিত সাগর দিয়ে উত্তর দিকে যাবে। সেখান থেকে তারা আকাবা উপসাগরে প্রবেশ করবে এবং ইসরায়েলের এলাত বন্দরে তেল খালাস করবে। এরপর পাইপলাইনের মাধ্যমে সেই তেল ইসরায়েল অতিক্রম করে আশকেলনে পৌঁছাবে। সেখান থেকে আবার ভূমধ্যসাগরগামী ট্যাংকারে তেল তোলা হবে। এই পাইপলাইন উত্তরমুখীভাবে প্রতিদিন প্রায় ১২ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করতে পারে। এটি সৌদি আরবের মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির তুলনায় অনেক কম। প্রতিবেদনে сказано হয়েছে, দেশটি প্রতিদিন প্রায় ৬০ লাখ থেকে ৭৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করে। তবে আঞ্চলিক অস্থিরতার সময় এটিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। লেটনি এনডিটিভিকে বলেন, 'এই পাইপলাইন একদিকে প্রতিদিন প্রায় চার লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করতে পারে। বিপরীত দিকে চালালে সর্বোচ্চ ১২ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত পরিবহন সম্ভব। সৌদি আরব প্রতিদিন প্রায় ৬০ লাখ থেকে ৭৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করে। তাই সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চালালেও এটি সৌদি আরবের মোট রপ্তানির মাত্র ৫ থেকে ১৫ শতাংশ বহন করতে পারবে। এটি কাজে লাগতে পারে অতিরিক্ত একটি পথ হিসেবে। তবে এটি হরমুজ প্রণালি বা সুয়েজ-ভূমধ্যসাগর পাইপলাইনের বিকল্প নয়।'
আরও পড়ুন: প্রতিমন্ত্রীর গাড়ির ধাক্কায় নিহত ফিরোজার পরিবার পেল ৫ লাখ টাকা
লেটনির মতে, এলাত বন্দরের বর্তমান অবকাঠামো সৌদি আরবের বিপুল পরিমাণ তেল রপ্তানি সামলানোর মতো নয়। তিনি বলেন, 'হুথিদের হামলা শুরুর পর এলাত বন্দরের কার্যক্রম ৯০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি আর্থিক সংকটের কারণে বন্দরটি কার্যত বন্ধ হওয়ার অবস্থায় পৌঁছায়। সৌদি আরবের মতো বড় পরিমাণ তেল পরিচালনা করতে হলে সমুদ্রের তলদেশ আরো গভীর করতে হবে। খুব বড় তেলবাহী জাহাজ ভিড়ানোর জন্য নতুন জেটি তৈরি করতে হবে। তেল সংরক্ষণের সুবিধা বাড়াতে হবে। নিরাপত্তাও অনেক শক্তিশালী করতে হবে। এসব করতে কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে। তারপরই কেবল উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল পরিবহন সম্ভব হবে।'
তিনি আরও বলেন, পাইপলাইনটিও নিরাপত্তা ঝুঁকির বাইরে নয়। হুথিদের হামলা চলতে থাকায় এর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বড় পরিসরে জোরদার করতে হবে। লেটনি বলেন, 'পাঁচ বছরে অন্তত ১১টি যন্ত্রপাতির ত্রুটিজনিত তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া নাশকতা বা মানবিক ভুলের কারণে আরও ৯টি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০২১ সালের একটি রকেট হামলাও রয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে ইরানের হামলায় বাজান স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে কারিশ ও লেভিয়াথান গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হয়। মরুভূমির মধ্যে থাকা ২৫৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে এ ধরনের হামলা ঠেকাতে ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এই অঞ্চলের অন্যতম সেরা। বিশেষ করে ড্রোন প্রতিরোধে এটি কার্যকর। যদিও এটি শতভাগ সফল নয়। ক্ষেপণাস্ত্র ও বড় আকারের ড্রোনের ক্ষেত্রে ইসরায়েলের দাবি, ইরান ও হিজবুল্লাহর ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের বিরুদ্ধে তাদের বাধা দেওয়ার হার ৯২ শতাংশ।'
তিনি আরো বলেন, 'সুয়েজ-ভূমধ্যসাগর পাইপলাইনের সর্বোচ্চ সক্ষমতা প্রতিদিন ২৫ লাখ ব্যারেল। এর মালিকানায় সৌদি আরামকোর ১৫ শতাংশ, কুয়েতের ১৫ শতাংশ, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ১৫ শতাংশ এবং কাতারের ৫ শতাংশ অংশ রয়েছে। তাই ইসরায়েলের এই পাইপলাইন মূল আগ্রাসক নয়। সুয়েজ-ভূমধ্যসাগর পাইপলাইন রাজনৈতিক কারণে সমস্যায় না পড়লে এটি কেবল একটি বিকল্প পথ হিসেবেই থাকবে।'
সৌদি আরব এখনও বলে আসছে যে, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার শর্ত হলো ফিলিস্তিনের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটি স্পষ্ট পথ থাকতে হবে। গাজায় চলমান ইসরায়েলি অভিযান কার্যত সেই আলোচনা থামিয়ে দিয়েছে, যা ২০২৩ সালের অক্টোবরের আগে গতি পেয়েছিল। সম্প্রতি ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ সৌদি আরবের সংবাদমাধ্যম আল আরাবিয়াকে বলেন, 'ইসরায়েল ও সৌদি আরবের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা দেখা আমার স্বপ্ন।' কিন্তু সৌদি কর্মকর্তারা বারবার বলেছেন, ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার আগে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে অগ্রগতি হতে হবে। কিন্তু ইসরায়েলের বর্তমান সরকার সেই অবস্থান পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে। এনডিটিভিকে লেটনি বলেন, 'আব্রাহাম চুক্তি মানসিক বাধা ভেঙে দিয়েছে। এখন ইসরায়েলের কিছু পরিকল্পনাকারী মনে করেন, সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া শুধু সময়ের ব্যাপার। প্রশ্ন হলো কবে, হবে কি না—তা নয়। তবে বাস্তবতা হলো, রিয়াদ বারবার বলেছে যে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার শর্ত পূরণ না হলে সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে না। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি বাস্তবায়ন করা খুব কঠিন।'
আরও পড়ুন: বিরোধীদলের আগ্রাসী আচরণ স্নাইপার মন্তব্যে দুঃসাহস জুগিয়েছে: রাশেদ খাঁন
তিনি বলেন, 'পাইপলাইনের এই প্রস্তাব ইসরায়েলের একটি বিকল্প কৌশল। যৌথ অবকাঠামো, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক সংযোগের মাধ্যমে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়াকে এমনভাবে লাভজনক করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে যাতে শেষ পর্যন্ত সৌদি আরব নিজেদের আগের শর্ত থেকে সরে আসার পথ খুঁজে পায়।' লেটনি আরও বলেন, 'মঙ্গলবার ইসরায়েলের মন্ত্রী এলি কোহেন মন্তব্য করেছেন, সৌদি আরবের ইসরায়েলকে যতটা প্রয়োজন, ইসরায়েলের সৌদি আরবকে ততটা প্রয়োজন নেই।' এই বক্তব্য বর্তমান ইসরায়েলি অবস্থানকে তুলে ধরে। এটি সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা নয়, বরং নিজেদের প্রভাব দেখানোর কৌশল। তবে এই আত্মবিশ্বাস বাস্তবসম্মত নাকি অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, তা পুরোপুরি নির্ভর করবে হরমুজ প্রণালির সংকট কতদিন স্থায়ী হয় তার ওপর।
ইউরোপ এশিয়া পাইপলাইন কম্পানির দীর্ঘদিনের গোপনীয়তার কারণে একটি প্রশ্ন উঠছে। এমন কোনো বাণিজ্যিক ব্যবস্থা কি গোপন রাখা সম্ভব? তবে বর্তমান প্রযুক্তির যুগে সেটি সম্ভব হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। লেটনি বলেন, 'সীমিত পরিমাণ তেলের ক্ষেত্রে কিছুটা সম্ভব। গোপনীয়তার নির্দেশ, ভুয়া কোম্পানি বা জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের মাধ্যমে বিষয়টি কিছু সময় আড়াল করা যেতে পারে। কিন্তু বর্তমানে স্যাটেলাইটের ছবি ও পণ্যের চলাচল বিশ্লেষণের মাধ্যমে খুব দ্রুতই পুরো বিষয়টি প্রকাশ হয়ে যাবে।' তিনি আরো বলেন, 'দেশের ভেতরে সীমিত পরিমাণে গোপনে কাজ চালানো গেলে রাজনৈতিক ঝুঁকি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কিন্তু আঞ্চলিক ঝুঁকি অনেক বেশি। ইরান এমন যেকোনো তথ্য নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করবে। হুথিরা এটিকে নিজেদের অবস্থানের পক্ষে প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরবে। এতে আরব ও মুসলিম বিশ্বে সৌদি আরবের অবস্থান আরো জটিল হয়ে উঠবে। তাই জ্বালানি নিরাপত্তা থেকে যে সুবিধা পাওয়া যাবে, তা অবশ্যই রাজনৈতিক ক্ষতির চেয়ে বেশি হতে হবে।'
লেটনি বলেন, 'আমার ধারণা, ইরান খুবই কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাবে। তেহরান যেকোনো চুক্তিকে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের জোট হিসেবে তুলে ধরবে। তারা তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে চাপ বাড়াবে এবং এই অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু বানাবে। হুথিরা ইতোমধ্যে দেখিয়েছে, জাহাজে হামলা চালিয়ে তারা এলাত বন্দরে জাহাজ চলাচল নিরুৎসাহিত করতে পারে। এমনকি বন্দরের জেটিতে সরাসরি হামলা না করেও তারা বীমার খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং ইসরায়েলের সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ এই প্রকল্পের সঙ্গে অনেকটাই মিল রয়েছে। লেটনি বলেন, 'এলি কোহেন ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এই ধারণা তুলে ধরেছেন। হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমানো, সৌদি আরব ও ইসরায়েলের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করা, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর স্থায়ী উপস্থিতির প্রয়োজন কমানো এবং ইউরোপকে রাশিয়া বা মিসরের বাইরের একটি বিকল্প জ্বালানি পথ দেওয়া—এসবই যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে মিলে যায়। ওয়াশিংটন সম্ভবত সামনে না এসে পর্দার আড়াল থেকে বাধাগুলো দূর করতে চাইবে।
আরও পড়ুন: জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের অনুষ্ঠানে বিরোধী দল ধোঁকাবাজির অভিযোগ প্রতিমন্ত্রীর
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন