ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ই অক্টোবর, ২০২৬খ্রিষ্টাব্দ ০৪ই কার্তিক, ১৪৩৩বঙ্গাব্দ ০৯ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮হিজরী
মঙ্গলবার, ২০ই অক্টোবর, ২০২৬ইং ০৪ই কার্তিক, ১৪৩৩বাং

উদ্যোক্তা তৈরিতে রাষ্ট্রীয় সহায়তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরলেন বিশেষজ্ঞরা


উদ্যোক্তা তৈরিতে রাষ্ট্রীয় সহায়তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরলেন বিশেষজ্ঞরা

একটি দেশের অর্থনীতি কেবল বড় শিল্পকারখানার উঁচু চিমনি, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের বিপুল বিনিয়োগ অথবা রাজধানীকেন্দ্রিক ব্যবসাবাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল নয়। মানুষের কর্মশক্তি, সৃজনশীলতা ও উদ্যোগের ভিত্তিতে অর্থনীতির প্রকৃত ভিত গড়ে ওঠে। প্রত্যন্ত গ্রামের তরুণের ছোট্ট কারখানা, নারীর ঘরে বসে গড়ে তোলা ক্ষুদ্র উদ্যোগ কিংবা বেকার যুবকের সামান্য পুঁজি নিয়ে শুরু করা ব্যবসা—এসব একদিন বৃহত্তর অর্থনীতির শক্তিশালী অনুষঙ্গ হয়ে উঠতে পারে। তবে, যখন স্বপ্নের সঙ্গে পুঁজি থাকে না, দক্ষতার সঙ্গে বাজারের সংযোগ থাকে না, এবং উদ্যোগের পাশে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার দৃশ্যমান হাত থাকে না, তখন সম্ভাবনার অনেক প্রদীপ জ্বলার আগেই নিভে যায়।

বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের অন্যতম বড় শক্তি। এই তরুণদের মেধা, শ্রম, প্রযুক্তির সঙ্গে অভিযোজনের ক্ষমতা এবং নিজের ভাগ্য নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। কিন্তু কর্মসংস্থানের প্রচলিত কাঠামো এই বিপুল জনশক্তিকে ধারণ করতে পারছে না। প্রতিবছর শ্রমবাজারে অসংখ্য তরুণ প্রবেশ করছে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত চাকরির সুযোগ সীমিত। ফলে চাকরিপ্রত্যাশীদের দীর্ঘ সারি আরো দীর্ঘ হচ্ছে। এই বাস্তবতায় উদ্যোক্তা সৃষ্টি শুধু অর্থনৈতিক প্রয়োজন নয়, এটি কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলার একটি কার্যকর পথ।

একজন উদ্যোক্তা নিজের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন—এটি তার প্রথম সাফল্য। যখন তার উদ্যোগ বিস্তৃত হয়, তখন সেখানে যুক্ত হয় আরো কয়েকজন মানুষের শ্রম, মেধা ও জীবিকার সম্ভাবনা। একটি ক্ষুদ্র ব্যবসা তাই নিছক ব্যক্তিগত উপার্জনের মাধ্যম নয়; এটি একটি পরিবারকে স্বাবলম্বী করে, স্থানীয় বাজারকে সক্রিয় করে এবং ধীরে ধীরে একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক গতিশীলতা বাড়ায়। এজন্য উদ্যোক্তা তৈরির বিষয়টি ব্যক্তিগত উদ্যোগের গণ্ডিতে আবদ্ধ না রেখে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন: বাংলাদেশ ব্যাংক ২ কোটি ডলার বিক্রি করেছে

তবে উদ্যোক্তা হওয়া কেবল সাহসের ব্যাপার নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুঁজি, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, বাজার, যোগাযোগ, হিসাবরক্ষণ, বিপণন, আইনগত জ্ঞান এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা। একজন তরুণ হয়তো উৎকৃষ্ট পণ্য তৈরি করতে পারেন, কিন্তু বাজারজাতকরণের কৌশল না জানায় ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে পারেন না। কেউ হয়তো চমৎকার ব্যবসায়িক পরিকল্পনা করেছেন, কিন্তু প্রাথমিক মূলধনের অভাবে সেটি বাস্তবায়নের সুযোগ পান না। আবার কেউ ঋণ পেলেও ব্যবসা পরিচালনার অভিজ্ঞতার অভাবে অল্প সময়েই বিপাকে পড়েন। ফলে উদ্যোক্তা উন্নয়নে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন সমন্বিত রাষ্ট্রীয় কাঠামো।

প্রথমত, সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। নতুন উদ্যোক্তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা অনেক সময় পুঁজির অভাব নয়, বরং জামানত দেওয়ার সামর্থ্যের অভাব। ফলে প্রচলিত ঋণব্যবস্থার কঠিন শর্ত বহু সম্ভাবনাময় উদ্যোগকে শুরু হওয়ার আগেই থামিয়ে দেয়। বাস্তবসম্মত মূল্যায়নের ভিত্তিতে স্বল্পসুদের ঋণ, প্রকল্পভিত্তিক অর্থায়ন এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য পরামর্শনির্ভর ঋণব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। শুধু অর্থ দেওয়া নয়, অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য নিয়মিত দিকনির্দেশনাও প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, প্রশিক্ষণব্যবস্থাকে বাস্তবমুখী করতে হবে। উদ্যোক্তা উন্নয়নের নামে কয়েক দিনের আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। হিসাবরক্ষণ থেকে ডিজিটাল বিপণন, পণ্যের মান থেকে ভোক্তার চাহিদা, করব্যবস্থা থেকে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা—ব্যবসার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে হাতে-কলমে দক্ষতা প্রয়োজন। অভিজ্ঞ উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নবীনদের সংযোগ ঘটানো গেলে ভুল থেকে শেখার সুযোগও তৈরি হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি পরামর্শ ও পরবর্তী তদারকির ব্যবস্থা করতে পারে।

তৃতীয়ত, বাজারে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। উৎপাদন করলেই উদ্যোক্তা সফল হন না; পণ্য বিক্রির জন্য দরকার বিস্তৃত বাজার। সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় ক্ষুদ্র ও নবীন উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো, দেশীয় পণ্যের প্রদর্শনী এবং মেলার আয়োজন, অনলাইন বাজারে প্রবেশের সহায়তা এবং পণ্যের মানোন্নয়নে কারিগরি সহযোগিতা তাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াতে পারে।

আরও পড়ুন: বড় মূলধনি ও অবকাঠামো কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনতে শর্ত শিথিল করেছে বিএসইসি

পাহাড়, চর, হাওর কিংবা সীমান্তবর্তী অঞ্চলের উদ্যোক্তাদের বাস্তবতা আরো কঠিন। যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতা, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের সংকট, পরিবহন ব্যয় এবং বাজারের দূরত্ব তাদের ব্যবসাকে অতিরিক্ত প্রতিকূলতার মুখে ঠেলে দেয়। তাই রাজধানীকেন্দ্রিক একক নীতি দিয়ে উদ্যোক্তা উন্নয়ন সম্ভব নয়। অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনায় স্থানীয় কৃষি, হস্তশিল্প, ক্ষুদ্র উৎপাদন, পর্যটন ও প্রাকৃতিক সম্পদকে ঘিরে টেকসই উদ্যোগের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এতে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের নতুন দ্বার খুলবে।

নারী উদ্যোক্তাদের জন্যও প্রয়োজন কার্যকর সহায়তা। পুঁজি ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি নিরাপদ কর্মপরিবেশ, বাজারসংযোগ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একইভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও প্রত্যন্ত এলাকার তরুণদের উদ্যোক্তা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ আরো বিস্তৃত হবে।

উদ্যোক্তা তৈরির অর্থ কেবল ব্যবসায়ী সৃষ্টি নয়; এর গভীরে রয়েছে আত্মনির্ভর মানুষের একটি প্রজন্ম নির্মাণের স্বপ্ন। রাষ্ট্রের কাজ মানুষের হয়ে ব্যবসা করা নয়, বরং মানুষের উদ্যোগকে এগিয়ে যাওয়ার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা। এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে একজন তরুণ আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় নিরুৎসাহিত হবেন না, পুঁজির অভাবে থেমে যাবেন না এবং বাজারের অনিশ্চয়তায় একা পড়ে থাকবেন না।

বাংলাদেশের তরুণদের হাতে সম্ভাবনার যে উর্বর জমি, সেখানে রাষ্ট্রীয় সহায়তা হতে পারে বীজ, প্রশিক্ষণ হতে পারে পরিচর্যা এবং বাজারসংযোগ হতে পারে ফসল ঘরে তোলার পথ। একটি উদ্যোগ সফল হলে শুধু একজন মানুষের ভাগ্য বদলায় না; তার সঙ্গে বদলায় কয়েকটি পরিবারের জীবন, তৈরি হয় কর্মসংস্থান, সচল হয় স্থানীয় অর্থনীতি। তাই উদ্যোক্তা তৈরিতে রাষ্ট্রীয় সহায়তা কোনো অনুগ্রহ নয়—এটি কর্মসংস্থান, আত্মনির্ভরতা এবং টেকসই অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য দূরদর্শী বিনিয়োগ।

আরও পড়ুন: আজ থেকে ৫ দিন বন্ধ ব্যাংক, কিছু সেবা চালু থাকবে

লেখক: কবি ও ছড়াকার

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

বাংলাদেশে ওষুধের মূল্য যৌক্তিকীকরণের প্রক্রিয়া ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বিশ্লেষণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

সোমবার, ১৯ই অক্টোবর, ২০২৬ ইং

০৯:৩৮ এম


বাংলাদেশে ওষুধের মূল্য যৌক্তিকীকরণের প্রক্রিয়া ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বিশ্লেষণ

দেশের চাহিদার ৯৮ শতাংশ ওষুধ উৎপাদন করে এবং ১৫০টি দেশে রপ্তানি করে ওষুধশিল্প। এই বাজারের আর্থিক মূল্য ৩৯ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা, যা ৬৭ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। রপ্তানির তালিকায় উচ্চপ্রযুক্তিভিত্তিক ওষুধও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে, ‘অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস’ (এপিআই) এর ৮৫ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এ কারণে সরকার একটি ‘এপিআই পার্ক’ গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু, বিশ্ববাজারে টিকে থাকার জন্য বাংলাদেশকে মেধাস্বত্ববিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি ‘ট্রিপস’-এর শর্তাবলি পূরণ করতে হবে।

বাংলাদেশে পারিবারিক ব্যয়

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘খানা আয় ও ব্যয় জরিপ ২০২২’ অনুযায়ী, বাংলাদেশে মাসিক পারিবারিক ব্যয় ৩১ হাজার ৫০০ টাকা। শহরাঞ্চলে এই ব্যয় ৪১ হাজার ৪২৪ টাকা এবং গ্রামাঞ্চলে ২৬ হাজার ৮৪২ টাকা। ব্যয়ের ৪৫ দশমিক ৮ শতাংশ খাদ্য ও পানীয়ের পেছনে এবং ৫৪ দশমিক ২ শতাংশ খাদ্যবহির্ভূত খাতে ব্যয় হয়। খাদ্যবহির্ভূত খাতের মধ্যে রয়েছে আবাসন, পোশাক, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও পরিবহন।

স্বাস্থ্যসেবা খাতে মাসিক ব্যয় ৩,৪৫৪ টাকা, যা পারিবারিক ব্যয়ের ১১ শতাংশ। দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য এই ব্যয়ের হার ৩৫ শতাংশ। স্বাস্থ্যসেবার মোট খরচের ৭৬ দশমিক ৫ শতাংশ রোগীরা বহন করেন। স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়িত জিডিপির ২ দশমিক ৩৪ শতাংশের মধ্যে ১ দশমিক ৮ শতাংশ আসে ব্যক্তিগত খাত থেকে; সরকারি অবদান শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণায় দেখা গেছে, মাসে দেশের জনসংখ্যার ২২ শতাংশের স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন হয়। তাদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ উচ্চ ব্যয়ের কারণে স্বাস্থ্যসেবা নিতে পারেন না। স্বাস্থ্যসেবার মোট ব্যয়ের ৬৪ থেকে ৬৮ শতাংশ ব্যয় হয় ওষুধ ও ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যে। রোগনির্ণয়ের পরীক্ষায় ব্যয় হয় ৮ থেকে ১২ এবং বাকি ২০ থেকে ২৮ শতাংশ ব্যয় হয় হাসপাতাল ও চিকিৎসকের জন্য। মাসিক ব্যয়ের হিসাবে এই খাতগুলোতে যথাক্রমে ২,২৮০, ৩৪৫ ও ৮২৯ টাকা ব্যয় হয়।

ঔষধ ও প্রসাধনি আইন, ২০২৩

আইনটিতে ওষুধ ও প্রসাধনসামগ্রীর উৎপাদন, আমদানি, রপ্তানি, বিক্রি, মজুত, সংরক্ষণ, বিতরণ এবং গুণমান নিয়ন্ত্রণের বিধান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, নকল ও ভেজাল ওষুধ উৎপাদন, চিকিৎসকদের জন্য সরবরাহ করা নমুনা ওষুধ বিক্রি, লাইসেন্স ছাড়া ওষুধ উৎপাদন এবং নিম্নমানের ওষুধ বিক্রির জন্য শাস্তির বিধানও রয়েছে। নিবন্ধিত চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া বিক্রিযোগ্য ওষুধের ক্ষেত্রে পৃথক বিধান প্রযোজ্য।

আইনটির আওতায় যন্ত্রপাতি, ইমপ্ল্যান্ট, সফটওয়্যার এবং মানুষ বা প্রাণীর রোগ, আঘাত বা অক্ষমতা নির্ণয়, প্রতিরোধ, পর্যবেক্ষণ, চিকিৎসা কিংবা উপশমে ব্যবহৃত বিভিন্ন বস্তুও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার অনুসন্ধান, অঙ্গ প্রতিস্থাপন, জীবন রক্ষা, গর্ভনিয়ন্ত্রণ, চিকিৎসাসরঞ্জাম জীবাণুমুক্তকরণ এবং মানুষের শরীর থেকে সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষার বিষয়ও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

আইনটিতে অনলাইনে ওষুধ বিক্রি ও ডিজিটাল বিজ্ঞাপন, টিকার লটের বাধ্যতামূলক পরীক্ষা এবং অত্যাবশ্যকীয় ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধের ঘাটতি রোধে প্রস্তুতকারকদের ন্যূনতম পরিমাণে এসব ওষুধ উৎপাদনের বাধ্যবাধকতার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীকে সভাপতি এবং সচিবকে সদস্য সচিব করে একটি ‘জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদ’ গঠনের বিধান রয়েছে। পরিষদটি সরকারকে নিম্নলিখিত বিষয়ে পরামর্শ দেয়Ñ

ক. ‘জাতীয় ঔষধ নীতি’ বাস্তবায়ন;

খ. দেশীয় ওষুধশিল্পের উন্নয়ন এবং দেশের চাহিদা পূরণ;

গ. অ্যালোপ্যাথিক, আয়ুর্বেদিক, ইউনানি, হোমিওপ্যাথিক, বায়োকেমিক্যাল, ভেষজ ও ভেটেরিনারি ওষুধের মধ্যে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রকাশ এবং প্রতি দুই বছর অন্তর তা হালনাগাদ করা;

ঘ. ওষুধ ও কাঁচামাল আমদানি, উৎপাদন, বিতরণ এবং বিক্রির সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, মন্ত্রণালয় ও ব্যক্তির কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় এবং জরুরি পরিস্থিতিতে আনুষঙ্গিক বিষয়গুলোর সমাধান;

ঙ. একটি ‘ঔষধ নিয়ন্ত্রণ কমিটি’ গঠন, যার সুপারিশের ভিত্তিতে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (ডিজিডিএ) ওষুধ নিবন্ধন করবে;

চ. সরকার কর্তৃক গেজেটে ওষুধ ও কাঁচামালের তালিকা প্রকাশ এবং স্থানীয় কাঁচামালের সর্বোচ্চ বিক্রয়মূল্য নির্ধারণের প্রজ্ঞাপন জারি।

বাংলাদেশে ওষুধের মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া

বাংলাদেশে ওষুধের দুটি শ্রেণি রয়েছে—অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ এবং অ-অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে কাঁচামালের খরচ, মোড়কীকরণের খরচ এবং ‘মার্কআপ’ বা অতিরিক্ত ব্যয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে ওভারহেড, বিপণন ও বিতরণ ব্যয়, বেতন, পুরস্কার, মুনাফা, ভ্যাট এবং গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের খরচ। অ-অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের ক্ষেত্রে বাজারের মধ্যক মূল্যের ভিত্তিতে দাম নির্ধারণ করা হয়।

কাঁচামালের মূল্য নির্ধারণে গত ছয় মাসের আমদানিমূল্যের গড় বিবেচনা করা হয়। অন্যদিকে, জমকালো মোড়কের ভেতরে থাকে বাংলা ও ইংরেজিতে ছাপানো রঙিন নির্দেশিকা, যা রোগীরা অনেক সময় পড়েন না। ওষুধের গুণমান অক্ষুণ্ণ রেখেই এসব খরচের কিছু অংশ কমানো সম্ভব।

ওষুধের মূল্য নির্ধারণের জন্য প্রস্তুতকারককে মূল্য নির্ধারণের যৌক্তিকতা প্রমাণে প্রয়োজনীয় তথ্য ডিজিডিএর কাছে জমা দিতে হবে। অন্যদিকে, পণ্য বা সেবার পরিমাণ, গুণমান ও নির্ধারিত মূল্যসংক্রান্ত নিয়ম মেনে চলা হচ্ছে কি না তা তদারক করা এবং প্রয়োজনে শাস্তিমূলক বা সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা ডিজিডিএর থাকা প্রয়োজন।

২০২৩ সালের আইনের ফাঁক ও সুপারিশ

১. আইনে অত্যাবশ্যকীয় ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধ উৎপাদন না করলে প্রস্তুতকারকদের জন্য শাস্তির বিধান থাকতে হবে।

২. চিকিৎসাসেবার বাজার একটি অসম বাজার। চিকিৎসাসেবা, রোগনির্ণয়ের পরীক্ষা কিংবা ওষুধের মূল্য সাধারণ মানুষের পক্ষে নির্ধারণ করা অসম্ভব। স্বাস্থ্য খাত চাহিদা ও জোগানের সমীকরণ অনুযায়ী চললেও বাজারের পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে নির্ভুল সমীকরণ নির্ধারণ করা কঠিন। তাই স্বাস্থ্য খাতে হস্তক্ষেপ করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। হাসপাতাল ও রোগনির্ণয় সেবার ক্ষেত্রেও এই তদারকি প্রযোজ্য হতে পারে।

৩. বাংলাদেশে প্রায় এক লাখ ওষুধ বিপণন প্রতিনিধি কর্মরত আছেন। অভিযোগ রয়েছে, তারা চিকিৎসকদের বিভিন্ন উপহার ও সুবিধা দিয়ে ওষুধ লিখতে এবং নির্দিষ্ট পরামর্শ দিতে প্রভাবিত করেন। বলা হয়, বিপণন খাতে এ ব্যয় বছরে ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ কোটি টাকা। এ প্রবণতা প্রতিরোধে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন বিপণন প্রতিনিধিদের চিকিৎসকদের সরাসরি নাগালের বাইরে রেখে ওষুধ-সম্পর্কিত তথ্য সরাসরি চিকিৎসকদের কাছে পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছিল।

৪. ওষুধের মূল্য ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যে সরকার ‘এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড’ গঠন করেছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি সে লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলে বাজারে প্রতিযোগিতাহীন পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে।

৫. ওষুধশিল্পের বিশালতা বাজারকে অস্বচ্ছ করে তুলতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ক্যানসার ও কিডনি ডায়ালাইসিসের ওষুধের ওপর কর কমানো সত্ত্বেও সেগুলোর মূল্য কমেনি। আবার একই ওষুধের বিভিন্ন মূল্যও দেখা যায়।

৬. ডিজিডিএর দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে টিকার লট পরীক্ষা, ওষুধের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির দায়ে কারাদণ্ড ও জরিমানা, ‘ওভার দ্য কাউন্টার’ ওষুধ ছাড়া চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া ওষুধ বিক্রির দায়ে জরিমানা, চিকিৎসকদের জন্য সরবরাহ করা নমুনা ওষুধ বিক্রির দায়ে জরিমানা এবং নিম্নমানের ওষুধ বিক্রির দায়ে কারাদণ্ড ও জরিমানা। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে সংস্থাটির কার্যকর পদক্ষেপ যথেষ্ট নয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

৭. আইনে ‘জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদ’ ও ডিজিডিএর ভূমিকা আরো স্পষ্ট করতে হবে।

৮. ওষুধ প্রস্তুতকারকরা মূল্য নির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য না দিলে কিংবা অত্যাবশ্যকীয় ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধ সরবরাহ না করলে কী শাস্তি হবে, তা আইনে উল্লেখ করা প্রয়োজন।

৯. কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা গেলে বাজার থেকে সরাসরি অনেক কমমূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসাসরঞ্জাম সংগ্রহ করা সম্ভব।

১০. স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ ও প্রযুক্তির ওপর কর কমানো, দেশে এপিআই উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রস্তুতকারকদের আর্থিক সহায়তা এবং ব্যয়বহুল ওষুধের মূল্য কমানোর লক্ষ্যে ব্যবস্থাপত্রের ২০ শতাংশ ওষুধ জেনেরিক নামে লেখার সুপারিশ করেছিল।

১১. কমিশন প্রস্তাবিত জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন পরিচালকের নিয়ন্ত্রণে গ্রাম থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত ফার্মেসিগুলোকে একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সংযুক্ত করা এবং ব্যবস্থাপত্রের যৌক্তিকতা যাচাইয়ের জন্য অনলাইনে ব্যবস্থাপত্র তদারকির পরামর্শ দিয়েছিল।

১২. ওষুধের দাম নির্ধারিত সীমার মধ্যে রাখা নিশ্চিত করতে অগ্রাধিকারভিত্তিতে ওষুধ ব্যবসায় স্বার্থের সংঘাত রোধ এবং কার্যকর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

১৩. জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদের সঙ্গে পরামর্শ করে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় প্রয়োজনীয়সংখ্যক ওষুধ অন্তর্ভুক্ত করা বাঞ্ছনীয়।

১৪. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুমোদনকারীদের কারিগরি কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত নয়। এতে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে এবং একটি ভালো পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে।

এএম

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

২০২৯ সালে নতুন জায়গায় সচিবালয়ের অফিস শুরুর পরিকল্পনা অনুমোদন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

তালাশ বিডি ডেস্ক

সোমবার, ১৯ই অক্টোবর, ২০২৬ ইং

০৯:৪০ এম


২০২৯ সালে নতুন জায়গায় সচিবালয়ের অফিস শুরুর পরিকল্পনা অনুমোদন

রাজধানীর শেরেবাংলানগরের পুরনো বাণিজ্য মেলার মাঠে নতুন বাংলাদেশ সচিবালয় স্থাপনের প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। সরকারের নতুন পরিকল্পনা অনুসারে, ২০২৯ সালে নতুন স্থানে অফিস কার্যক্রম শুরু হবে। স্থপতি লুই আই কানের মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, ৩১ একর জমির ওপর নির্মিত হবে নতুন সচিবালয়। পুরো প্রকল্পটি বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হবে।

আজ রবিবার বিকেলে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার ২৫তম বৈঠকে সচিবালয় স্থানান্তরের প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলনকক্ষে সংবাদ সম্মেলনে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান মন্ত্রিপরিষদসচিব নাসিমুল গনি।

তিনি জানান, নকশা অনুযায়ী শেরেবাংলানগরের পুরনো বাণিজ্য মেলার মাঠের প্রায় ৩১.৫৮ একর জায়গায় মোট প্রায় ৩৩.১৬ লাখ বর্গফুট স্পেসসহ ৩টি বেজমেন্ট নির্মাণ করা হবে, যার মধ্যে ২০০টি ভূ-উপরিস্থ পার্কিংসহ ৩,৮০০টি গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে। এতে মসজিদ, ৩৫০ জন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ২টি মাল্টিপারপাস হল, ১টি ক্যাফেটেরিয়া এবং ১টি ডাকঘর থাকবে। প্রকল্প এলাকার প্রায় ৩০ শতাংশ জায়গায় সবুজায়ন ও জলাধারের সংস্থান রাখা হয়েছে। বর্তমান সচিবালয় ১৭ একর জায়গার নির্মিত।

মন্ত্রিপরিষদসচিব বলেন, লুই আই কানের মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী ঢাকার শেরেবাংলানগরের পুরনো বাণিজ্য মেলার মাঠ প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ সচিবালয় স্থাপনের লক্ষ্যে স্থাপত্য অধিদপ্তর কর্তৃক ধারণাগত স্থাপত্য নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে।

সভায় মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তও গ্রহণ করা হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

সভায় বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ, ২০২৬-এর খসড়া নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাসসহ বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ কমবে।

অধিকতর জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্যে বিদ্যুৎ বিভাগ ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৬-২০৩০’ প্রণয়ন করেছে। আগামী গ্রীষ্মের আগে ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য সরকার ইতিমধ্যে প্রণোদনা ঘোষণা করছে।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে আজ দেশের সব জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

তালাশ বিডি ডেস্ক

সোমবার, ১৯ই অক্টোবর, ২০২৬ ইং

০৯:৪১ এম


শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে আজ দেশের সব জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ

শারদীয় দুর্গোৎসবের উপলক্ষে আজ সোমবার (১৯ অক্টোবর) দেশের সকল জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অষ্টমী পূজা উপলক্ষে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) কর্তৃক জানানো হয়েছে।

বাজুসের সভাপতি এনামুল হক খান স্বাক্ষরিত একটি বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের অষ্টমী পূজার দিন দেশের সব জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণরূপে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের আওতায়, সোমবার দেশের সব জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অনুরোধ করা হয়েছে। সংগঠনটি এ বিষয়ে সবার আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেছে।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

ইউরোপজুড়ে তরুণদের বিক্ষোভ: কী চাইছেন তারা?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

সোমবার, ১৯ই অক্টোবর, ২০২৬ ইং

০৯:৪১ এম


ইউরোপজুড়ে তরুণদের বিক্ষোভ: কী চাইছেন তারা?

ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে তরুণরা রাজপথে আন্দোলনে নেমেছেন। ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি ও আলবেনিয়ায় বিক্ষোভের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন স্থানে শিক্ষাব্যবস্থার অবস্থা, শিক্ষকের অভাব, বাড়িভাড়া ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, এবং দুর্নীতি ও কর্মসংস্থানের অভাব নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন বিক্ষোভকারীরা। ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলন পরে সরকারবিরোধী বৃহত্তর বিক্ষোভে পরিণত হয়েছে। কিছু দেশে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ সহিংসতায় পরিণত হয়েছে।

ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থা ও ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে ক্ষোভ
ফ্রান্সে সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার এক সপ্তাহ পর শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে অংশ নেন। উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। দীর্ঘ ক্লাসের সময়, শিক্ষকের অভাব, জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অস্পষ্ট পদ্ধতি নিয়ে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষক পদে শূন্যতা পূরণ না হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থীকে নিয়মিত কয়েক মাস পর্যন্ত পাঠদান থেকে বঞ্চিত থাকতে হয়। এসব সমস্যার প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলনে পরে অন্যান্যরা যোগ দেন। তারা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, বিশেষ করে জ্বালানির দাম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলার পর হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ ও দাম নিয়ে উদ্বেগ আরো বেড়ে গেছে।

ফ্রান্সের অন্যতম বৃহৎ শ্রমিক সংগঠন জেনারেল কনফেডারেশন অব লেবার (সিজিটি) বিক্ষোভের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। সংগঠনটি দ্রব্যমূল্য কমানোর, পেনশন বৃদ্ধির এবং মজুরি বৃদ্ধির দাবি তুলেছে।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর দুই মেয়াদের শাসনের শেষ পর্যায় চলছে। দেশটিতে আগামী ২০২৭ সালের এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

স্পেনে বাড়িভাড়া ও উচ্ছেদের প্রতিবাদ

স্পেনে গত সেপ্টেম্বরে বাড়ির দাম ও ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে অধিকারকর্মীরা রাজপথে নেমে আসেন। ৮৭ বছর বয়সি মারিকারমেন আবাসকালকে তার বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনা বিক্ষোভের সূচনা করে। একটি বিনিয়োগ তহবিল তার বাড়িভাড়া ২৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছিল। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দুই সপ্তাহ পর তিনি মারা যান।

বিক্ষোভকারীরা বাড়িভাড়া কমানো, উচ্ছেদ বন্ধ এবং বিনিয়োগ তহবিলের আবাসন কেনার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি জানিয়েছেন।

স্পেনের সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ভাড়াটেদের সুরক্ষায় জরুরি আবাসন আইন পাসের চেষ্টা করেছিলেন। তবে পার্লামেন্টে ডানপন্থি ও উগ্রডানপন্থি দলগুলোর বিরোধিতার কারণে আইনটি পাস হয়নি। এরপর ২৯ নভেম্বর আগাম নির্বাচনের ডাক দেন সানচেজ। সংস্কার কার্যকর করার জন্য তার আরো বিস্তৃত প্রগতিশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন বলে তিনি জানিয়েছেন।

নির্বাচনের আগে পার্লামেন্টের স্থায়ী পরিষদের মাধ্যমে আবাসনসংক্রান্ত কিছু অধ্যাদেশ পাস করাতে পারলে স্পেনের বিক্ষোভ কমতে পারে। সানচেজের সমাজতান্ত্রিক দল ও রক্ষণশীল পিপলস পার্টি—দুই পক্ষই আগামী নির্বাচনে জিতলে আরো বাড়ি নির্মাণ এবং আবাসন সংকট সমাধানে গুরুত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

পর্তুগালে বাড়ির দাম বেড়েছে ১২৪ শতাংশ

স্পেনের প্রতিবেশী পর্তুগালেও শনিবার আবাসন সংকটের প্রতিবাদে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজধানী লিসবনের কেন্দ্রীয় এলাকায় শত শত মানুষ জড়ো হন।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পর্তুগালে বাড়ির দাম বেড়েছে ১২৪ শতাংশ। এই বৃদ্ধির হার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) গড়ের প্রায় দ্বিগুণ। বাড়ির দাম ও ভাড়া সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় আবাসন সংকট এখন দেশটির অন্যতম বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইতালিতে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বিক্ষোভ
ইতালির মিলানেও সংসার চালানোর ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবারের মিছিল শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হলেও পরে সহিংসতায় রূপ নেয়। মুখোশ পরা বিক্ষোভকারীরা দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত পুলিশের দিকে পাথর, পেভমেন্টের ব্লকসহ বিভিন্ন বস্তু ছোড়েন। বার ও রেস্তোরাঁর টেবিল দিয়ে তৈরি প্রতিবন্ধকতায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

ইতালিতে শনিবারই জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বিক্ষোভের প্রথম দিন ছিল। এদিকে ফ্রান্সের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে বেলজিয়ামেও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

আলবেনিয়ায় দুর্নীতি ও কর্মসংস্থানের অভাবের অভিযোগ
আলবেনিয়ায় প্রধানমন্ত্রী এদি রামার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ রোববার ষষ্ঠ দিনে প্রবাহিত হয়েছে। দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের অভাব এবং শিক্ষার নিম্নমান নিয়ে বিক্ষোভকারীরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

গত গ্রীষ্মে দেশটির উপকূলে একটি বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ শুরু হয়। প্রকল্পটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সমর্থনপুষ্ট বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিক্ষোভে কি পরিবর্তন এসেছে?

ফ্রান্সে শিক্ষকসংকট মোকাবিলায় সরকার আরো তিন হাজার অস্থায়ী শিক্ষক নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। বিদ্যালয় পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদেরও যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। আগামী বছরের বাজেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু নিবন্ধন ফি বাড়ানোর যে পরিকল্পনা ছিল, তা-ও বাতিল করেছে সরকার।

সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি জ্বালানির দাম নিয়ে বিক্ষোভের পর নির্দিষ্ট কিছু শিল্প খাতে পেট্রলের ভর্তুকি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিল ফরাসি প্রেসিডেন্টের দপ্তর।

তবে এসব পদক্ষেপে বিক্ষোভ পুরোপুরি থামেনি। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ সহিংসতার জন্য চরম বামপন্থি বিক্ষোভকারী ও লুটপাটকারীদের দায়ী করেছেন। তার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, সরকার আরো ছাড় দিতে আগ্রহী নয়।

ফ্রান্সে বিক্ষোভের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ভর করছে সরকার শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের দাবির বিষয়ে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তার ওপর।

স্পেনে আবাসনসংক্রান্ত কিছু প্রস্তাব পার্লামেন্টের স্থায়ী পরিষদের মাধ্যমে পাস করানো গেলে বিক্ষোভের চাপ কমতে পারে। তবে বাড়িভাড়া, আবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের ক্ষোভ কত দ্রুত কমবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

সব মিলিয়ে ইউরোপের সাম্প্রতিক বিক্ষোভে ভিন্ন ভিন্ন দেশের স্থানীয় সমস্যা সামনে এলেও কয়েকটি বিষয়ে মিল রয়েছে। যেমন—তরুণদের শিক্ষার সুযোগ, কর্মসংস্থান, সাশ্রয়ী আবাসন এবং জীবনযাত্রার ব্যয়। এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তনের দাবিতেই রাজপথে নামছেন তারা।

এএম

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

আর্কাইভ

Please select a date!

নামাজের সময়সূচী

তারিখঃ ৯ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮হিঃ
ফজর ০৪:৪২
জোহর ১১:৪৪
আসর ০৩:৫১
মাগরিব ০৫:২৮
ইশা ০৬:৪০
সূর্যোদয় : ০৫:৫৮ সূর্যাস্ত : ০৫:২৮
অনলাইন জরিপ
ফলাফল
থার্টি-ফার্স্ট নাইটে তরুণদের জন্য প্রকাশ্যে পানি-টানি খাওয়ার বিরুদ্ধে আহ্বান। আপনার মন্তব্য দিন
হ্যা
100%
না
0%
মন্তব্য নেই
0%