০২:১২ পি.এম
বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) দেশের কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে, যা পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের মাধ্যমে সম্ভব হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানটি ২২টি ফসলের ১৩৯টি উচ্চফলনশীল ও উন্নত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জাত উদ্ভাবন করেছে। এর মধ্যে ৯৬টি জাত সরাসরি মিউটেশন ব্রিডিং বা বিকিরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে উদ্ভাবিত হয়েছে।
এছাড়া, বিনা ১০টি জীবাণুসার এবং ৫৭টি আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। তারা মূলত প্ল্যান্ট মিউটেশন ব্রিডিং বা পরমাণু বিকিরণ (যেমন-গামা রশ্মি, এক্স-রশ্মি বা আয়ন বিম) প্রয়োগের মাধ্যমে উদ্ভিদের জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে নতুন নতুন ফসলের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে।
বিনা’র বিজ্ঞানীরা তাদের সফল ও যুগোপযোগী গবেষণা কর্মকাণ্ডের জন্য দেশ ও বিদেশে প্রশংসিত হয়েছেন। এ পর্যন্ত বিনা ৩১টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছে। এর মধ্যে স্বাধীনতা পদক-২০১৯ সহ জাতীয়ভাবে ২২টি এবং আন্তর্জাতিকভাবে ৯টি পুরস্কার রয়েছে।
আরও পড়ুন: ভূমি কর্মকর্তার হাতে কৃষকের ছদ্মবেশে দুই ‘মাটিখেকো’ আটক
বিনা’র ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক শরীফুল হক ভুঁইয়া জানান, "পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের কৃষিতে অনেক পরিবর্তন এনেছে বিনা। এ পর্যন্ত ২২টি ফসলের মোট ১৩৯টি উচ্চফলনশীল ও উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।" তিনি বলেন, এর মধ্যে পারমানবিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ৯৬টি জাত উদ্ভাবন করেছে বিনা।
বিনা’র কর্মকর্তাদের মতে, প্রতিষ্ঠানটি ধান, পাট, গম, ডাল, তেলবীজ, সব্জি ও মসলা জাতীয় শস্যের ২২টি ফসলের উচ্চ ফলনশীল এবং উন্নত গুণাবলী সম্পন্ন ১৩৯টি জাত উদ্ভাবন করেছে। ফসলের উন্নত জাতগুলো ছাড়াও ডাল ও শিম জাতীয় তেল ফসলের নাইট্রোজেনের বিকল্প হিসেবে ইনস্টিটিউট ১০টি জীবাণুসার উদ্ভাবন করেছে। বর্তমানে ছোলা, মসুর, চিনাবাদাম, সয়াবিন, মুগ, মাষকলাই, বরবটি ও ধৈঞ্চা’র জীবাণু সার ইনস্টিটিউট থেকে তৈরি ও সরবরাহ করা হচ্ছে। এসব জীবাণু সার প্রয়োগে সয়াবিনে ৭৫ থেকে ১৫০ ভাগ এবং ডাল ও শিম জাতীয় শস্যে ২০ থেকে ৪৫ ভাগ পর্যন্ত ফলন বৃদ্ধি পায়। জীবাণু সার প্রয়োগের ফলে ইউরিয়া সার দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। ফসফো-ভার্মিকম্পোস্ট ব্যবহারের মাধ্যমে মৃত্তিকার স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং ফসফেটিক সারসহ অন্যান্য রাসায়নিক সারের সাশ্রয় হয়। এছাড়াও বিনা ৫৭টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে।
পারমাণবিক পদ্ধতিতে বিনার প্রধান উদ্ভাবন ও সাফল্যের মধ্যে বিনাধান-১৪ উল্লেখযোগ্য। সাধারণত প্রচলিত পদ্ধতিতে ধানের একটি নতুন জাত তৈরি করতে ৮ থেকে ১২ বছর সময় লাগে। কিন্তু বিনা আয়ন বিম প্রযুক্তির সাহায্যে মাত্র ৪ বছরে স্বল্পমেয়াদি ও উচ্চ ফলনশীল জাত বিনাধান-১৪ উদ্ভাবন করেছে।
উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ত মাটি এবং দেশের বন্যাপ্রবণ এলাকার জন্য বিশেষ জাত (যেমন- বিনাধান-১০, বিনাধান-২৩ ইত্যাদি) উদ্ভাবন করা হয়েছে। এর ফলে উপকূলের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ ভাগ পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় এসেছে। ধান ছাড়াও তারা বিনা সরিষা, বিনা মুগ, বিনা মসুর, বিনা সয়াবিন, বিনা টমেটো এবং বিনা চিনাবাদামের মতো উচ্চ ফলনশীল ও রোগপ্রতিরোধী জাত তৈরি করেছে।
আরও পড়ুন: উলশী-যদুনাথপুর প্রকল্পের ৫০ বছর: স্বেচ্ছাশ্রমে গ্রামীণ উন্নয়নের উদাহরণ
মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি ও ক্ষতিকর রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমাতে বিনা ১০টি জীবাণু সার উদ্ভাবন করেছে। এই জীবাণু সার ব্যবহারে ডাল ও শিম জাতীয় শস্যের ফলন ২০ থেকে ৪৫ ভাগ এবং সয়াবিনের ফলন ৭৫ থেকে ১৫০ ভাগ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এটি ব্যবহারে জমিতে অতিরিক্ত ইউরিয়া সার দেওয়ার প্রয়োজন হয় না, যা কৃষকের খরচ বাঁচায় এবং পরিবেশ রক্ষা করে। বিনা দেশীয় ফসলের জিনগত বৈশিষ্ট্য গভীরভাবে জানার জন্য জিনোম সিকোয়েন্স উন্মোচন করেছে। এর মাধ্যমে তারা খরা, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, রোগবালাই এবং পোকামাকড় প্রতিরোধী ফসলের জাত তৈরি করছে।
বিনা উদ্ভাবিত ফসলের জাতসমূহের মধ্যে রয়েছে- ধান ২৬ টি’র মধ্যে আউশ জাতের ধান ২টি, আমন জাতের ধান ১৪টি, বোরো জাতের ধান ১০টি, গম ১টি, তেল জাতীয় ফসল ৩৭ টির মধ্যে সরিষা ১২ টি, চিনাবাদাম ১২ টি, সয়াবিন ৭টি, তিল ৬টি, ডাল জাতীয় ফসল ৪১টির মধ্যে মসুর ১২টি, মুগ ১৩টি, ছোলা ১১টি, মাষ ৩ টি, খেসারী ২টি, উদ্যানতাত্ত্বিক ফসল ২৫টির মধ্যে টমেটো ১৩টি, লেবু ৩টি, পিঁয়াজ ২টি, মরিচ ২টি, হলুদ ১টি, রসুন ১টি, কুল ১টি, সফেদা ১টি, কালিজিরা ১টি, আঁশ জাতীয় ফসল ৪টি ও পাট ৪টি।
এ ছাড়া বিনা উদ্ভাবিত উল্লেখযোগ্য কিছু প্রযুক্তিসমূহের মধ্যে প্রধান প্রধান শস্য পরিক্রমায় সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনা, ধান ভিত্তিক শস্য পরিক্রমায় ফসফেট সারের ব্যবস্থাপনা, ধান চাষে নাইট্রোজেন সারের ব্যবস্থাপনা, ফসফেটিক জীবাণু সার, লবণাক্ত জমিতে গম চাষ, মাটিতে দস্তার প্রয়োজনীয়তা নির্ণয়, পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে বরেন্দ্র এলাকার জন্য নতুন শস্য পরিক্রমা, আর্সেনিকমুক্ত পানি উত্তোলনের জন্য অগভীর নলকূপ স্থাপন, ধানগাছের মাধ্যমে আর্সেনিক শোষণ, মাটি-উদ্ভিদে আর্সেনিকের স্থানান্তর, লবণাক্ত এলাকায় ফসলের সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় টমেটো গাছের ঢলে পড়া রোগ দমন, রোগ প্রতিরোধী শস্য জাত উদ্ভাবন ও বিস্তার, মাটির স্বাস্থ্য সেবা, লবণাক্ত এলাকায় সূর্যমুখী, ভূট্টা ও সয়াবিন চাষে সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা, লবণাক্ত এলাকায় ফারো রোপন পদ্ধতি, লবণাক্ত এলাকায় গম চাষে সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা, মাল্টার কলম করার কলাকৌশল এবং সফেদার বংশবিস্তার কলাকৌশল অন্যতম।
কৃষি গবেষণায় প্রাতিষ্ঠানিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ইনস্টিটিউট ১৯৭৯-৮০ সালের কৃষি উন্নয়নে ‘রাষ্ট্রপতি পুরষ্কার’ লাভ করেছে। কৃষি গবেষণা ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮০-৮১ ও ১৯৮১-৮২ সালে ‘রাষ্ট্রপতি পুরষ্কার’ অর্জন করে প্রতিষ্ঠানটি।
আরও পড়ুন: সোনালি ধানের দিন শেষ, কৃষককে বাঁচিয়ে দিতে পারে কালো ধান
কৃষি গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলামের নেতৃত্বে বায়োটেকনোলজি বিভাগ, বিনা ২০১৩ সালে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে জাতীয় কৃষি পুরষ্কার রৌপ্য পদক লাভ করে। কৃষি গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ২০১৪ সালে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে জাতীয় কৃষি পুরস্কার স্বর্ণ পদক লাভ করে।
এ ছাড়া কৃষি গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ‘জাতীয় পরিবেশ পদক-২০১৬’ স্বর্ণ পদক অর্জন করে। কৃষি গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের স্বাধীনতা পদক-২০১৯ অর্জন করে।
ফুড সিকিউরিটিতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৪ সালে ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম (প্রাক্তন মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা) জাতিসংঘের এফএও-আইএইএ থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ‘আউটস্ট্যান্ডিং অ্যাচিভমেন্ট’ লাভ করেন। কৃষি গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিনা ২০১৬ সালে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক থেকে ‘আইডিবি প্রাইজ ২০১৬ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’ পুরষ্কার লাভ করে।
লবণ ও জলমগ্নতা সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবনের স্বীকৃতিস্বরূপ আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম এবং উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগকে ২০১৮ সালে সম্মাননা প্রদান করা হয়।
আরও পড়ুন: মিরসরাইয়ে মাচায় তরমুজ চাষে ৭০ হাজার খরচে লাভ ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা
মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শামছুন্নাহার বেগম কৃষি গবেষণায় মিউটেশন ব্রিডিং এর স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২১ সালে ওমেন ইন প্ল্যান্ট ব্রিডিং অ্যাওয়ার্ড অফ এফএও-আইএইএ অফ দ্য ইউনাইটেড ন্যাশনস পুরষ্কার লাভ করেন। মিউটেশন ব্রিডিং এর মাধ্যমে ফসলের জাত উদ্ভাবনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বিনা ২০২১ সালে ‘আউটস্ট্যান্ডিং অ্যাচিভমেন্ট’ অর্জন করে।
বিনা’র মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মাহবুবুর রহমান খান প্রতিষ্ঠানটির উদ্ভাবনী সক্ষমতার কথা তুলে ধরে বলেন, "বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থিত একটি জাতীয় কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে বিনা, যার প্রধান কাজ হলো- পারমাণবিক কৌশল ও বায়োটেকনোলজি ব্যবহার করে বিভিন্ন ফসলের উচ্চ ফলনশীল ও প্রতিকূলতা-সহনশীল জাত উদ্ভাবন করা।" বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি পারমাণবিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে কৃষিতে উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনে পৃথিবীর অষ্টম অবস্থানে রয়েছে। সূত্র: বাসস
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন