০৬:৫৭ পি.এম
এলাকায় ছোটখাটো বিরোধ কিংবা কথা কাটাকাটির মতো তুচ্ছ ঘটনায়ও থানায় জমা পড়ছে ‘কড়া’ বা ‘শক্ত’ লিখিত অভিযোগ। এসব অভিযোগে অবলীলায় জুড়ে দেওয়া হচ্ছে শ্লীলতাহানি, সোনার চেইন কিংবা লাখ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের মতো গুরুতর সব ঘটনার বিবরণ।
তবে পুলিশের তদন্তে প্রকাশ পাচ্ছে ভিন্ন ও বাস্তব চিত্র। দেখা যাচ্ছে, যে বাদী সোনার চেইন ছিনতাইয়ের মামলা করেছেন, তিনি হয়তো জীবনে কোনো দিন সোনার চেইনই পরেননি কিংবা তা কেনার মতো আর্থিক সক্ষমতাও তার নেই। এসব ঘটনার কাল্পনিক বা মিথ্যা বিবরণে মামলা হচ্ছে ময়মনসিংহের থানাগুলোতে।
জেলার বিভিন্ন থানার ওসি ও তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিমাসে গড়ে ২৫টি মামলা বা অভিযোগ জমা পড়লে, তার মধ্যে অন্তত ২০টিতেই এ ধরনের অতিরঞ্জিত গল্প সাজানো হয়।
আরও পড়ুন: গোবিন্দগঞ্জে দোকানিকে অপহরণ করে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ: দুই আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার দাবি বিদ্যুতের
মামলার বিবরণীতে দাবি করা হয়, বাদী বা ভুক্তভোগীর গলা থেকে সোনার চেইন, হাতের বালা কিংবা কানের দুল ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং ঘরে থাকা লাখ টাকা লুট করা হয়েছে। কিন্তু তদন্তকারী কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে গিয়ে বাদীর আর্থিক ও সামাজিক অবস্থা যাচাই করতে গিয়ে থমকে যান।
দেখা যায়, অনেক বাদীর ঘরে হয়তো ঘটনার দিন নগদ ১০টি টাকাও ছিল না। অথচ মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে লাখ টাকা।
এ ক্ষেত্রে টাকার উৎস জানতে চাইলে প্রায় সব মামলায়ই চেনা অজুহাত দেওয়া হয়। যেমন গরু বিক্রির টাকা বা ‘পরদিন বাজার থেকে গরু কেনা হতো’ কিংবা ‘এনজিও থেকে ঋণ তুলে ঘরে রাখা হয়েছিল’।
ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার পরপরই তারা আইনি প্রতিকারের জন্য থানায় ছোটেন। সেখানে লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হলে তারা আদালতের মুহুরি বা থানাসংলগ্ন অভিযোগ লেখকদের শরণাপন্ন হন।
আরও পড়ুন: ঈশ্বরদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন
অভিযোগ লেখকরা তখন জানান, ভুক্তভোগীরা প্রথমে যা ঘটেছে ঠিক তা-ই বলেন।
কিন্তু আসামি যেন সহজে পার না পেয়ে যায় এবং পুলিশ যাতে ঘটনাটিকে গুরুত্ব দেয়, সেজন্য বাদীর কানপড়া দেওয়া হয় ‘মামলা শক্ত না করলে আসামি জামিন পেয়ে যাবে’। এই ‘জামিন ঠেকানো’ ও প্রতিপক্ষকে চরম বিপদে ফেলার মানসিকতা থেকেই বাদীর সম্মতিতে মারধরের পাশাপাশি শ্লীলতাহানি, দামি মোবাইল ও স্বর্ণালংকার ছিনতাইয়ের মতো কাল্পনিক তথ্য যুক্ত করা হয়।
মামলায় এ ধরনের মিথ্যার আশ্রয় নেওয়াকে আইনি ভাষায় ‘আত্মঘাতী’ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
ময়মনসিংহের কয়েকটি থানার তদন্তকারী কর্মকর্তারা (এসআই) জানান, যা ঘটেছে ঠিক তা দিয়ে মামলা হলে তদন্ত করা সহজ হয় এবং দ্রুত আদালতে নিখুঁত চার্জশিট (চূড়ান্ত প্রতিবেদন) জমা দেওয়া যায়, কিন্তু মামলায় অবাস্তব ও বানোয়াট তথ্য ঢুকিয়ে দেওয়া হলে তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশকে চরম বেগ পেতে হয়। ছিনতাই বা শ্লীলতাহানির কোনো সত্যতা বা তথ্যপ্রমাণ না পেয়ে পুলিশ বাধ্য হয়ে শুধু মূল ঘটনার (যেমন সামান্য মারামারি বা হুমকি) ধারাগুলো রেখে আদালতে প্রতিবেদন পাঠায়। এতে মামলাটি দুর্বল হয়ে পড়ে আদালতে।
আরও পড়ুন: জামিনে মুক্ত হয়ে শ্বশুরবাড়িতে পুলিশকন্যা তাসনিয়া রানা তামান্না
এদিকে, বিচারকরা যখন দেখেন বাদীর আর্থিক সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও লাখ টাকা বা সোনার চেইনের কাল্পনিক দাবি করা হয়েছে, তখন মামলার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়। আইনি এই ফাঁক-ফোঁকরের সুযোগ নিয়ে মূল অপরাধীরা সহজেই আদালত থেকে জামিন ও চূড়ান্ত খালাস পেয়ে যান। ফলে বিনা অপরাধে অনেকে যেমন হয়রানির শিকার হন, তেমনি ভুক্তভোগীরাও বঞ্চিত হন প্রকৃত বিচার থেকে।
এ ব্যাপারে ময়মনসিংহ জেলা আদালতের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এমদাদুল হক মিল্লাত বলেন, অপরাধীকে শাস্তি দিতে হলে মামলার অভিযোগ হতে হবে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ। আবেগের বশে বা জিদ মেটাতে গিয়ে মামলায় কাল্পনিক গল্প সাজালে শেষ পর্যন্ত নিজেরই ক্ষতি হয়। তাই থানায় অতিরঞ্জিত কিছু না লিখে, বাস্তবে যা ঘটেছে হুবহু তা-ই উল্লেখ করা দরকার।
ময়মনসিংহের কয়েকটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, থানায় সাজানো বা অতিরঞ্জিত অভিযোগ করায় মামলার তদন্তে চরম জটিলতা তৈরি হচ্ছে এবং বানোয়াট তথ্যের জট খুলতে পুলিশের মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে। তারা বলেন, যা ঘটেছে, হুবহু তা দিয়ে অভিযোগ করলে তাদের জন্য তদন্ত করা সহজ হয় এবং খুব দ্রুততম সময়ে আদালতে নিখুঁত চার্জশিট জমা দেওয়া সম্ভব হয়।
এ ব্যাপারে ময়মনসিংহ জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) আব্দুল্লাহ আল মামুন কালের কণ্ঠকে বলেন, মামলার অভিযোগ অতিরিক্ত ‘কড়া’ বা ‘শক্ত’ করার মানসিকতা একটি আইনি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। অনেক বাদী মনে করেন গুরুতর ধারা যুক্ত না করলে পুলিশ গুরুত্ব দেবে না—এই ধারণা ভুল। সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও লাখ টাকা লুট বা সোনার চেইন ছিনতাইয়ের কাল্পনিক দাবি করা হলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তেই বিষয়টি ধরা পড়ে যায়।
আরও পড়ুন: ভালুকায় যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে মিলটনের নেতৃত্বে হাজারো নেতাকর্মীর র্যালি
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, ‘আসামিপক্ষ এই বানোয়াট তথ্যের সুযোগ নিয়ে সহজেই খালাস পেয়ে যায় এবং বাদী প্রকৃত বিচার থেকে বঞ্চিত হন। তাই প্রতিপক্ষকে অতিরিক্ত ঘায়েল করার মানসিকতা পরিহার করে থানায় হুবহু সত্য ঘটনার ভিত্তিতে অভিযোগ করতে হবে।
আরও পড়ুন: সাংবাদিক আশরাফ ইকবালের জন্মদিন
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন