মঙ্গলবার, ২৭শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং
১০:৪৮ এম
অধিকৃত পশ্চিম তীরে প্রবেশের চেষ্টা করতে গিয়ে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের বাধার সম্মুখীন হয়েছেন যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির দুই সংসদ সদস্য ক্লাইভ লুইস এবং লারা বার্ড। জর্ডান থেকে পশ্চিম তীরে প্রবেশের সময় তাদের এবং তাদের সফরসঙ্গীদের আটক করা হয়। পরে আট ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং আটক রাখা হয় বলে জানিয়েছেন উক্ত দুই এমপি।
সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্টের মাধ্যমে ক্লাইভ লুইস এই তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ফিলিস্তিনে ইসরাইলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া সংগঠন প্রগ্রেসিভ ইন্টারন্যাশনালের দ্বিতীয় রামাল্লা কংগ্রেসে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে তারা সেখানে গিয়েছিলেন।
এছাড়া, জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের ক্রমবর্ধমান সহিংসতার শিকার ফিলিস্তিনি কৃষকদের সঙ্গে সময় কাটানোর পরিকল্পনাও ছিল তাদের।
লুইস বলেন, ‘আমরা কোনো অন্যায় না করা সত্ত্বেও আট ঘণ্টার বেশি সময় আমাদের আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি সমর্থন জানাতে এবং তাদের ওপর সংঘটিত ভয়াবহ অবিচার ও সহিংসতার বিষয়টি তুলে ধরতেই আমরা সেখানে গিয়েছিলাম।’
অন্যদিকে, লারা বার্ড এক্সে দেওয়া পোস্টে বলেন, তিনি ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর নিপীড়ন ও গণহত্যার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে এবং নেতানিয়াহু সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন।
বার্ড বলেন, ‘ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর নিপীড়ন ও গণহত্যার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এবং নেতানিয়াহু সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে আমি আমার সাধ্যমতো সবকিছু করে যাব।’
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
কক্সবাজারের টেকনাফে ২০১৮ সালে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনায় কাউন্সিলর একরামুল হককে হত্যার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত পলাতক প্রধানমন্ত্রী হাসিনাসহ ১১ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের শুনানি আজ মঙ্গলবার নির্ধারিত রয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এ মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। প্যানেলের অন্যান্য সদস্যরা হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবির।
এ মামলায় চার আসামি বর্তমানে গ্রেপ্তার অবস্থায় রয়েছেন। তাদের মধ্যে কক্সবাজার-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য বদিউর রহমান বদি, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুব আলম এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান তুষার অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
হাসিনা ছাড়া পলাতক অন্যান্য আসামির মধ্যে সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ, অবসরপ্রাপ্ত মেজর রুহুল আমিন, লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আশিকুর রহমান এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক কর্মকর্তা স্কোয়াড্রন লিডার নাজমুস মাহমুদ রয়েছেন।
গত ২৬ জুলাই, ১১ আসামির বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গ্রহণ করে ট্রাইব্যুনাল। ওই দিন পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয় এবং গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
মামলার অভিযোগ অনুসারে, ২০১৮ সালের ২৬ মে রাত সাড়ে ১০টার দিকে কক্সবাজারের টেকনাফের কিরণতলীতে হোটেল নেটংয়ের সামনে থেকে একরামুল হককে অপহরণ করা হয়। এরপর রাত ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের নোয়াখালিয়াপাড়ায় মেরিন ড্রাইভের সাগরতীরে র্যাবের কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ তিনি নিহত হন।
একরামুল হক ছিলেন টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এবং উপজেলা যুবলীগের সভাপতি।
মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে একরামুলকে বেআইনিভাবে আটক ও অপহরণ, কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নাটক সাজিয়ে গুলি করে হত্যা, অপরাধ সংঘটনে সংশ্লিষ্টতা, প্ররোচনা ও সহায়তা এবং হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
এএম
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি এ্যাসুরেন্স সেলের (আইকিউএসি) উদ্যোগে নতুন ও কনিষ্ঠ শিক্ষকদের শিক্ষাদান এবং গবেষণা দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তিন দিনব্যাপী ‘ট্রেইনিং অন প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট ফর জুনিয়র ফ্যাকাল্টি’ শীর্ষক প্রশিক্ষণ কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকাল ৯ টায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম একাডেমিক ভবনের আইকিউএসির নিজস্ব কনফারেন্স কক্ষে কনিষ্ঠ শিক্ষকদের পেশাগত বিকাশ, বিশ্বমানের শিক্ষাদান পদ্ধতি, উচ্চতর গবেষণা পরিচালনা এবং একাডেমিক ক্যারিয়ার গঠনে এ কর্মশালার উদ্বোধন করা হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন যবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীর। প্রধান অতিথি ও প্রশিক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আসাদুজ্জামান সরকার। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যবিপ্রবির উপ-উপাচার্য অধ্যাপক শেখ মাহমুদুল হাসান, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফারুক হাসান ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. হামাদুর রহমান।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে যবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীর উল্লেখ করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, "একজন ছাত্র থেকে শিক্ষক হওয়ার প্রক্রিয়াটি একটি বড় রূপান্তর।" এই রূপান্তরের সময়ে নবীন শিক্ষকদের ক্লাসরুমে কার্যকর শিক্ষাদান, গবেষণা পরিচালনা এবং একাডেমিক নীতি নৈতিকতা পালনে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, "শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়, এটি একটি বড় দায়িত্ব।" শিক্ষকদের সততা, স্বচ্ছতা, সময়ের প্রতি অনুবর্তিতা এবং ইতিবাচক আচরণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য রোল মডেল হয়ে উঠতে হবে। উপাচার্য বিশ্বাস করেন যে, আজকের এই প্রশিক্ষণ কনিষ্ঠ শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা ও নৈতিকতার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আসাদুজ্জামান সরকার বলেন, "বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্তর্জাতিক স্তরের শিক্ষা ও গবেষণা পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।" তিনি উল্লেখ করেন, আগামীতে এক ট্রিলিয়ন ডলারের জিডিপি অর্জনের লক্ষ্য বাস্তবায়নে শিক্ষাব্যবস্থার আমূল রূপান্তর ও মানসম্মত গবেষণার কোনো বিকল্প নেই।
তিনি আরও বলেন, "শিক্ষকতা কেবল একটি সাধারণ চাকরি নয়, এটি একটি মহান দায়বদ্ধতা ও ‘প্যাশন’।" নবীন শিক্ষকদের আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এগিয়ে নিতে এবং মানসম্মত গবেষণা নিশ্চিত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। নিয়মিত দক্ষতা উন্নয়ন ও আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতির প্রশিক্ষণই শিক্ষকদের বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার উপযুক্ত করে গড়ে তুলবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে যবিপ্রবি উপ-উপাচার্য অধ্যাপক শেখ মাহমুদুল হাসান বলেন, "শিক্ষকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি মহান ব্রত বা প্যাশন।" শিক্ষকদের আন্তরিকতা ও ভালোবাসার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে আদর্শ ও রোল মডেল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নতি ও অগ্রযাত্রায় শিক্ষকদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনের দায়িত্ব হলো কেবল সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। তাই সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে দেশের অন্যতম সেরা উচ্চশিক্ষালয় হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য দেন যবিপ্রবির কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফারুক হাসান ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. হামাদুর রহমান। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন আইকিউএসির পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. মীর মোশাররফ হোসেন। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন আইকিউএসির অতিরিক্ত পরিচালক ড. ফারহানা ইয়াসমিন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলাচলকারী আন্তঃনগর মহানগর এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রাপথ কক্সবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারণের উদ্যোগে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে ফেনীবাসীর মধ্যে। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ফেনীসহ আশপাশের এলাকার মানুষের যাতায়াত সহজ হওয়ার পাশাপাশি পর্যটন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণের এ উদ্যোগকে ফেনীবাসীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারে যাতায়াতের সুযোগ বাড়লে পরিবার-পরিজন নিয়ে ভ্রমণ, শিক্ষা সফর এবং বিভিন্ন প্রয়োজনে যাতায়াত আরও সহজ হবে।
এ উদ্যোগের পেছনে রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ এমপি এবং ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক ও ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মুন্সী রফিকুল আলম মজনুর ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ফেনী ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেলা। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যবর্তী অবস্থানের কারণে প্রতিদিন এ জেলার বিপুলসংখ্যক মানুষ চাকরি, ব্যবসা, শিক্ষা ও চিকিৎসার প্রয়োজনে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করেন। এ অবস্থায় রেল যোগাযোগের সুযোগ সম্প্রসারণ হলে সাধারণ যাত্রীদের পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও পর্যটকদেরও উপকার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কক্সবাজারের পর্যটন খাতের সঙ্গে হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসার মতো বহু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড জড়িত। রেল যোগাযোগ সহজ হলে পর্যটকের সংখ্যা বাড়তে পারে। এতে পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে এ উদ্যোগের সুফল নিশ্চিত করতে ট্রেনের সময়ানুবর্তিতা, পর্যাপ্ত আসন, টিকিটপ্রাপ্যতা ও যাত্রীসেবার মান বজায় রাখা জরুরি। পাশাপাশি নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
ফেনীবাসীর প্রত্যাশা, মহানগর এক্সপ্রেসের যাত্রাপথ সম্প্রসারণের উদ্যোগ দ্রুত বাস্তব সুবিধায় রূপ নেবে। এর মাধ্যমে কক্সবাজারের সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ হবে এবং ফেনীর মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের পাশাপাশি পর্যটন ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
নিজের ছাত্রজীবনে আর্থিক সংকটের কারণে যিনি শিক্ষার্জনের পথে নানা বাধার সম্মুখীন হয়েছেন, কর্মজীবনে তিনিই শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন পূরণের সহযাত্রী হয়ে উঠেছেন। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন—সব ক্ষেত্রেই তার কাছে শিক্ষকতা কেবল একটি পেশা নয়, বরং মানুষ গড়ার এক অনন্য দায়িত্ব। প্রায় চার দশক ধরে শিক্ষকতা জীবনে নিষ্ঠা, সততা ও মানবিকতার পরিচয় দিয়ে এবার জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি অর্জন করেছেন নেত্রকোনা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আবু তাহের খান।
জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ-২০২৬-এ ময়মনসিংহ বিভাগের শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানপ্রধান নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি বিশ্ব শিক্ষক দিবস-২০২৬ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া গুণী শিক্ষক সম্মাননা পদকও তিনি অর্জন করেছেন। তার এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং শিক্ষার্থীবান্ধব নেতৃত্ব এবং দায়িত্বশীল শিক্ষকতারও স্বীকৃতি।
সংগ্রাম থেকে সাফল্যের পথে
নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার একটি অসচ্ছল কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আবু তাহের। শৈশব থেকেই মেধাবী এই শিক্ষার্থী প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় দ্বিতীয় গ্রেডে এবং অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভ করেন। ১৯৮৩ সালে কলমাকান্দা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করার পর ভর্তি হন নেত্রকোনা সরকারি কলেজে।
তবে উচ্চশিক্ষার পথ তার জন্য সহজ ছিল না। আর্থিক সংকটের কারণে নেত্রকোনা শহরে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। কলমাকান্দায় থেকেই শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়িয়ে নিজের পড়াশোনার খরচ জোগানোর চেষ্টা করেন। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পারিবারিক সমস্যার কারণে মাত্র সাত দিন ক্লাস করার সুযোগ পেয়েছিলেন।
নেত্রকোনা সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সপ্তম স্থান অর্জন করেন। পরে সরকারি আনন্দ মোহন কলেজে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনার্সে প্রথম শ্রেণিতে সপ্তম স্থান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণিতে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন।
নিজের জীবনের এই সংগ্রাম তাকে শিক্ষার মূল্য বুঝতে শিখিয়েছে। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে যে সুযোগগুলো তিনি পাননি, কর্মজীবনে শিক্ষার্থীদের জন্য সেগুলো তৈরি করার তাগিদ তিনি সব সময় অনুভব করেছেন।
ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে শিক্ষকতায়
জীবিকার প্রয়োজনে ছাত্রজীবনেই কাজ করেছেন তিনি। মাস্টার্স শেষ করে নিয়োগ পরীক্ষায় মেধাতালিকায় দ্বিতীয় স্থান লাভ করে অগ্রণী ব্যাংকের অফিসার পদে যোগ দেন। তবে তার আকর্ষণ ছিল শিক্ষকতায়। ১৯৯৬ সালে ১৬তম বিসিএসের মাধ্যমে শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দিয়ে নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
দীর্ঘ কর্মজীবনে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, সরকারি আনন্দ মোহন কলেজ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, গৌরীপুর সরকারি কলেজ, নেত্রকোনা সরকারি মহিলা কলেজ ও ফুলবাড়ী সরকারি কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন। গণিতের শিক্ষক হিসেবে পাঠদানের পাশাপাশি প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তিনি অর্জন করেছেন অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা।
তার কর্মদর্শনের অন্যতম দিক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রাখা। তিনি মনে করেন, শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; তাদের আত্মবিশ্বাস, নৈতিকতা ও ভবিষ্যৎ গঠনের পরিবেশও তৈরি করতে হয়।
নিজের এলাকায় শিক্ষার সুযোগ তৈরি
দারিদ্র্যের কারণে শিক্ষাজীবনে বাধার অভিজ্ঞতা থেকে নিজ এলাকার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগেও যুক্ত হন অধ্যাপক আবু তাহের। একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামো নির্মাণে ব্যক্তিগতভাবে ১৭ লাখ টাকা অনুদান দেন।
তার প্রচেষ্টায় নেত্রকোনা সরকারি কলেজ ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে পাঠদানের অনুমতি পায়। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটি উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে এবং চলতি বছর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাডেমিক স্বীকৃতি লাভ করে।
প্রতিষ্ঠানটিতে তিনি গণিত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও উপাধ্যক্ষের দায়িত্বও পালন করেন। দুই বছরের বেশি সময় ধরে অধ্যক্ষের দায়িত্বে থেকে কলেজটির অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলার কাজ করছেন।
শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য বিআরটিসি বাস সার্ভিস চালু এবং মেডিকেল সেন্টার প্রতিষ্ঠা তার উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ। পাশাপাশি ছাত্রাবাস, ১০ তলাবিশিষ্ট অ্যাকাডেমিক ভবন ও অডিটোরিয়াম নির্মাণসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের মেধা ও প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব বিকাশেও রয়েছে তার বিশেষ উদ্যোগ। কলেজের ১৪টি অনার্স বিভাগের বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে সেরাদের পুরস্কৃত করা হয়। চার বছরে ৫৬টি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ৫৬০ জন শিক্ষার্থীকে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ফলাফলের ভিত্তিতে পুরস্কার বিতরণের ব্যবস্থা রয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় উৎসাহিত করা এবং যোগ্যতার স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি।
স্বীকৃতির চেয়েও বড় মানুষ গড়ার দায়িত্ব
জাতীয় পর্যায়ে সম্মাননা অর্জনের প্রতিক্রিয়ায় অধ্যাপক আবু তাহের বলেন, দীর্ঘ কর্মজীবনের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি এ অর্জনকে দেখছেন। একসময় আর্থিক সংকটের কারণে নিজের পড়াশোনার পথ সহজ করতে পারেননি, অথচ এখন শিক্ষার্থীদের এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করে দিতে পারছেন—এটিই তার কাছে বড় প্রাপ্তি।
তার ভাষায়, শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি প্রজন্ম গড়ে তোলার দায়িত্ব। প্রতিকূলতা মানুষের পথ কঠিন করতে পারে, কিন্তু অধ্যবসায়, সততা ও মানুষের জন্য কাজ করার মানসিকতা সাফল্যের পথ খুলে দেয়।
তিনি বলেন, শিক্ষকতা আমার কাছে শুধু একটি পেশা নয়; এটি প্রজন্ম গড়ে তোলার দায়িত্ব। আর সেই দায়িত্ব পালনের স্বীকৃতিই আজ আমাকে এনে দিয়েছে জাতীয় সম্মান।
নেত্রকোনা সাহিত্য সমাজের সাধারণ সম্পাদক তানভীর জাহান চৌধুরী বলেন, অধ্যাপক আবু তাহের নেত্রকোনার উচ্চশিক্ষার দিগন্ত প্রসারে নিরলসভাবে কাজ করছেন। তার সততা, নিয়মানুবর্তিতা ও প্রজ্ঞা একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে। তার মতো গুণী ও সৎ শিক্ষকের সুযোগ্য নেতৃত্বেই নেত্রকোনা সরকারি কলেজ আগামী দিনে দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে—এটাই জেলাবাসীর প্রত্যাশা।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ