মোঃ সোহেল রানা, রাঙামাটি প্রতিনিধি
০৩:১০ পি.এম
রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে হাসিনা বেগম ওরফে সুমি হত্যা মামলায় মোহাম্মদ মাহিবুর কামাল প্রকাশ মোহিবুল্লাহকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এটি রাঙামাটি জেলা ও দায়রা জজ আদালতের দ্বিতীয় মৃত্যুদণ্ডের রায় বলে জানা গেছে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাঙামাটি জেলা ও দায়রা জজ আদালত এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। পরে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
মামলার নথি ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ১১ মার্চ সন্ধ্যার পর রাঙুনিয়ার দুবাসী বাজারের ভাড়া বাসা থেকে কাপ্তাই নতুন বাজার এলাকায় যাওয়ার পর হাসিনা বেগম নিখোঁজ হন। পরদিন কাপ্তাই থানাধীন চন্দ্রঘোনা-কাপ্তাই ইউনিয়নের বিএফআইডিসি মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উত্তর পাশে একটি পরিত্যক্ত টয়লেট থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ও আগুনে পোড়ানোর আলামত পাওয়া যায়।
এ ঘটনায় নিহতের মা আমেনা বেগম বাদী হয়ে ১৩ মার্চ ২০২২ কাপ্তাই থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২ ও ২০১ ধারায় অভিযোগ আনা হয়।
মামলাটির প্রথম দফা তদন্ত শেষে ২০২২ সালের ২৯ অক্টোবর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। পরে বাদীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অধিকতর তদন্তের জন্য মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন—পিবিআইকে দেওয়া হয়। পিবিআই তদন্ত শেষে ২০২৪ সালের ৯ জানুয়ারি একই আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে।
মামলার বিচার চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষ ১৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য উপস্থাপন করে। অন্যদিকে আসামিপক্ষ কোনো সাফাই সাক্ষী উপস্থাপন করেনি। আদালতে আসামি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। তবে সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা শেষে আদালত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করেন।
রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন রাঙামাটি জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) সিনিয়র অ্যাডভোকেট প্রতিম রায় পাম্পু। আসামিপক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম পনির, মোখতার আহমদ, সফিউল আলম মিয়া ও অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মাসুম রহিম।
রায়ের পর পিপি প্রতিম রায় পাম্পু বলেন, এ রায়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি বার্তা যাবে—অপরাধ করে কেউ পার পাবে না; একসময় তাকে আইনের আওতায় আসতেই হবে।
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মাসুম রহিম বলেন, তারা এ ধরনের রায় প্রত্যাশা করেননি। আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আসামির সঙ্গে আলোচনা করে আপিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রায়ের বিরুদ্ধে সাত দিনের মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে আপিল করার সুযোগ রয়েছে বলে আদালত উল্লেখ করেছেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
কক্সবাজার শহরের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কস্তুরাঘাট এলাকায় বাঁকখালী নদীর তীর ও নবনির্মিত কক্সবাজার-খুরুশকুল ব্রিজসংলগ্ন স্থান থেকে ময়লার ভাগাড় দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি শহরে আধুনিক ও পরিবেশসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালুর দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এ মানববন্ধনটি কক্সবাজার পৌরসভা প্রাঙ্গণে ৩ নম্বর ওয়ার্ডের আট মহল্লা সমাজ কমিটির উদ্যোগে আয়োজন করা হয়। মানববন্ধনের পর জেলা প্রশাসক ও কক্সবাজার পৌরসভার প্রশাসকের কাছে পৃথক স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। একই সঙ্গে কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার প্রতিনিধির সঙ্গে মতবিনিময় করে শহরকে মাদকমুক্ত করার দাবি জানানো হয়।
মানববন্ধনের সভাপতিত্ব করেন আট মহল্লা সমাজ কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম। বক্তৃতা দেন সাবেক জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও কবি-ছড়াকার মো. নাছির উদ্দিন, কক্সবাজার দোকান মালিক সমিতি ফেডারেশনের সহসভাপতি ও পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন এবং আট মহল্লা সমাজ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও কক্সবাজার জেলা জামায়াতের নেতা আমিনুল ইসলাম হাসান।
বক্তারা উল্লেখ করেন, বদর মোকাম মসজিদ রোড থেকে পূর্বে বড়বাজার জামে মসজিদ সড়ক, দক্ষিণে প্রধান সড়ক এবং উত্তরে বাঁকখালী নদী—এ সীমানা নিয়ে গঠিত ৩ নম্বর ওয়ার্ডটি শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ময়লা-আবর্জনা, পানি সংকট, মাদক ও অপরাধসহ নানা নাগরিক সমস্যায় এ এলাকার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, কস্তুরাঘাট ও খুরুশকুল ব্রিজসংলগ্ন বাঁকখালী নদীর তীরে দীর্ঘদিন ধরে শহরের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এর ফলে সেখানে বিশাল ময়লার স্তূপ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বর্জ্য ফেলার কারণে নদীর তীর ও নদীর অংশবিশেষ ভরাটের পাশাপাশি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কস্তুরাঘাট এলাকায় ৪০ থেকে ৪৫ ফুট উঁচু বর্জ্যের স্তূপ গড়ে উঠেছে। সেখানে কয়েকটি পরিবারের বসতঘরও ময়লার স্তূপের মধ্যে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বরাত অনুযায়ী, প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ ট্রাক বর্জ্য সেখানে ফেলা হয়।
পরিবেশবাদীদের হিসাব অনুযায়ী, কক্সবাজার শহরে প্রতিদিন ৯৭ টনের বেশি বর্জ্য উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে প্রায় ৭০ টন কস্তুরাঘাট এলাকায় ফেলার অভিযোগ রয়েছে। বছরের পর বছর বর্জ্য ফেলায় সেখানে ৪০ থেকে ৫০ ফুট উঁচু বর্জ্যের স্তূপ নয় পাহার তৈরি হয়েছে।
বক্তারা বলেন, পর্যটননগরীর প্রাণকেন্দ্রে এ ধরনের বর্জ্যের পাহাড় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে একদিকে বাঁকখালী নদী দূষিত হচ্ছে, অন্যদিকে বর্জ্য পচে দুর্গন্ধ ছড়ানো, মশা-মাছি ও পোকামাকড়ের উপদ্রব এবং বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছে শহরের বাসিন্দারা।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, ময়লার ভাগাড়ের বিষাক্ত দুর্গন্ধ ও ধোঁয়ার কারণে ৩ নম্বর ওয়ার্ডের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। শিশু, নারী ও বয়স্করা শ্বাসকষ্ট, কাশি, চর্মরোগসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। বর্জ্য থেকে নির্গত দূষিত তরল ও ময়লা পানি মাটিতে মিশে ভূগর্ভস্থ পানির মানও নষ্ট করছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
এলাকার ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত, দুর্গন্ধযুক্ত ও লবণাক্ত হয়ে পড়ায় দীর্ঘদিন ধরে শত শত পরিবার পৌরসভার সরবরাহ করা পানির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু নিয়মিত পানি সরবরাহ না পাওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে অনেক পরিবার দুর্ভোগে পড়েছে। কোথাও কোথাও বাধ্য হয়ে দূষিত ও লবণাক্ত পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে বলে মানববন্ধনে অভিযোগ করা হয়।
এদিকে কক্সবাজার শহরের দীর্ঘদিনের বর্জ্য সংকট নিরসনে আধুনিক ও সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজলের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সদর উপজেলায় আধুনিক ও সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে স্থানীয় সরকার বিভাগকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে প্রকাশিত তথ্যে জানা গেছে। ৭ সেপ্টেম্বর জারি করা চিঠিতে প্রকল্পের অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানোর কথাও বলা হয়েছে।
প্রস্তাবিত এ ব্যবস্থায় বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও চূড়ান্ত ব্যবস্থাপনায় আধুনিক পদ্ধতি চালুর কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কক্সবাজার পৌরসভার আধুনিকায়ন ও নগরসেবা উন্নয়নের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ডাম্পিং স্টেশন স্থাপনের বিষয়টিও রয়েছে।
কক্সবাজার পৌরসভার একটি সাম্প্রতিক উন্নয়ন পরিকল্পনায়ও ডাম্পিং স্টেশনসহ আধুনিক নগরসেবা উন্নয়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন আরবান রেজিলিয়েন্ট অ্যান্ড টেকনিক্যাল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (RUTDP) আওতায় ডাম্পিং স্টেশন, সড়ক-ফুটপাত, ড্রেন, পাবলিক টয়লেট, বাজার ও বাসটার্মিনালসহ বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকার দেশের যেসব পৌরসভায় এখনো আধুনিক ডাম্পিং ইয়ার্ড নেই, সেসব এলাকায় খাসজমি চিহ্নিত করে ডাম্পিং ইয়ার্ড নির্মাণের উদ্যোগও নিয়েছে। এ জন্য জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
বক্তারা বলেন, শুধু বর্তমান ময়লার ভাগাড় অন্যত্র সরিয়ে নিলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বর্জ্য পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য আলাদা করা, জৈব বর্জ্য থেকে সার উৎপাদন, প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার এবং বর্জ্য পরিবহনের আধুনিক ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
তারা বলেন, কক্সবাজার পর্যটননির্ভর শহর। প্রতিদিন দেশ-বিদেশের বিপুলসংখ্যক পর্যটক এখানে আসেন। ফলে শহরের গুরুত্বপূর্ণ নদীতীর ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ময়লার পাহাড় পর্যটননগরীর ভাবমূর্তির জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর।
বক্তারা আরও বলেন, শহরের বিভিন্ন এলাকায় ময়লার স্তূপ জমে থাকায় বর্ষাকালে ড্রেন ও নালা বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। তাই বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে শুধু পরিচ্ছন্নতার বিষয় হিসেবে না দেখে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, পর্যটন ও নগর পরিকল্পনার সমন্বিত বিষয় হিসেবে দেখতে হবে।
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, ৩ নম্বর ওয়ার্ডটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা হওয়ায় বিভিন্ন স্থান থেকে লোকজন এসে এখানে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে সামাজিক শৃঙ্খলা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধও বেড়েছে বলে তারা দাবি করেন।
শহরের ময়লার ভাগাড়ের আশপাশে অপরাধপ্রবণতা রোধে নিয়মিত পুলিশি নজরদারি ও অভিযান জোরদারের দাবি জানানো হয়।
বক্তারা বলেন, এর আগেও কস্তুরাঘাটের ময়লার ডিপো সরানোর দাবিতে মানববন্ধন ও স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছিল। পৌরসভার মেয়র ও প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ডিপো সরানোর আশ্বাস দেওয়া হলেও কার্যকরভাবে তা বাস্তবায়ন হয়নি।
তারা অবিলম্বে বাঁকখালী নদীর তীর থেকে ময়লার ভাগাড় সরিয়ে নির্ধারিত ও পরিবেশসম্মত স্থানে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র স্থাপনের দাবি জানান। একই সঙ্গে নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত, মাদক ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং বাঁকখালী নদীকে দূষণমুক্ত করার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, নভেম্বরের মধ্যে ময়লার ডিপো সরানোর দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া না হলে আরও বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
পরে আট মহল্লা সমাজ কমিটির পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক ও কক্সবাজার পৌরসভার প্রশাসকের কাছে পৃথক স্মারকলিপি দেওয়া হয়। বক্তারা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে ওঠা কস্তুরাঘাটের ময়লার ভাগাড় দ্রুত অপসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
রাঙ্গামাটি, ৬ অক্টোবর, ২০২৬ : কক্সবাজারের সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সাইকেল চালিয়ে নেপালের এভারেস্ট অঞ্চলের তিনটি উচ্চতম পাস জয় করে অনন্য কীর্তি গড়েছেন রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলার ওয়াগ্গা ইউনিয়নের বাসিন্দা সাইক্লিস্ট বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা।
‘সি টু হিমালয়াস-এক্সপেডিশন ফর অ্যাওয়ারনেস’ শীর্ষক অভিযানে তিনি প্রথম বাংলাদেশি ও প্রথম ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠীর সাইক্লিস্ট হিসেবে স্থলপথে সাইকেল চালিয়ে এভারেস্ট অঞ্চলের কংমা লা, চো লা ও রেঞ্জো লা পাসের চূড়ায় পৌঁছেছেন বলে জানিয়েছেন বীর কুমার।
অভিযানের সর্বশেষ ধাপে গতকাল সোমবার নেপালের স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ২৬মিনিটে ৫ হাজার ৩৬০মিটার উচ্চতার ‘রেঞ্জো লা পাস’ জয় করেন বীর কুমার।
এর আগে গত ১ অক্টোবর দুপুর ১২টা ৩৩মিনিটে ৫ হাজার ৪২০মিটার উচ্চতার ‘চো লা পাস’ এবং ২১ সেপ্টেম্বর দুপুর ১টা ৫৩মিনিটে ৫ হাজার ৫৩৫মিটার উচ্চতার ‘কংমা লা পাস’ জয় করেন তিনি।
এভারেস্ট অঞ্চলের দুর্গম ও উচ্চতম তিনটি পাস সাইকেলে অতিক্রমের এ অভিযানে গত ১৪ আগস্ট বীর কুমার কক্সবাজারের জিরো পয়েন্ট থেকে স্থলপথে সাইকেল চালিয়ে নেপালের হিমালয় অঞ্চলে পৌঁছান।
দীর্ঘ পথের নানা প্রতিকূলতা, দুর্গম পাহাড়ি পথ ও উচ্চতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে তিনি একে একে তিনটি পাসের চূড়ায় সাইকেল নিয়ে পৌঁছান। কাপ্তাইয়ের প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনপদ থেকে উঠে এসে সাইক্লিংয়ের মাধ্যমে দেশ-বিদেশে বাংলাদেশের পতাকা তুলে ধরার স্বপ্ন নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযানে অংশ নিয়ে আসছেন। তার এবারের অভিযানও সেই ধারাবাহিকতারই বড় সংযোজন।
অভিযান শেষে মঙ্গলবার সকালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বীর কুমার বাসস’কে জানান, ‘এই অর্জন শুধু আমার একার নয়-এটি আমার পাশে থাকা প্রত্যেক মানুষের। আপনাদের ভালোবাসা, সহযোগিতা, উৎসাহ ও অনুপ্রেরণাই আমার পথচলার শক্তি।’
তিনি বলেন, ‘কক্সবাজারের সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সাইকেল চালিয়ে হিমালয়ের উচ্চতায় পৌঁছানো এবং এভারেস্ট অঞ্চলের তিনটি উচ্চতম পাস জয় করা আমার জন্য অত্যন্ত গর্বের ও আনন্দের। পথটি সহজ ছিল না। তবে বাংলাদেশের পতাকা ও নিজের এলাকার মানুষের ভালোবাসা আমাকে প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে সাহস জুগিয়েছে।’
বীর কুমার বলেন, কঠিন এই অভিযানের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত যারা আমাকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা, উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিয়েছেন, তাদের সবার প্রতি আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই।
বীর কুমার আরও বলেন, ‘আমার এই যাত্রার মূল উদ্দেশ্য শুধু রেকর্ড সৃষ্টি নয়; সাইক্লিং, পরিবেশ সচেতনতা ও মানুষের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেয়া। সেই লক্ষ্যেই আমার একটি প্রচেষ্টা।’
কাপ্তাইয়ের এই তরুণ সাইক্লিস্টের এমন অর্জনে স্থানীয়দের মধ্যেও আনন্দ ও গর্বের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, বীর কুমারের এই সাফল্য দেশের তরুণদের সাইক্লিং ও অ্যাডভেঞ্চারভিত্তিক কার্যক্রমে আরও উৎসাহিত করবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
দেশে ইলিশের উৎপাদন গত দুই বছর ধরে অব্যাহতভাবে কমে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে মা ইলিশের সুরক্ষায় সরকার কর্তৃক ঘোষিত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার জন্য সরকারি সংস্থাগুলির পাশাপাশি জেলে, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়, এনজিও এবং স্থানীয় জনগণের সমন্বয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।
এই উদ্যোগের আওতায় বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটিতে একটি সমন্বয় সেল গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার সময় মাছঘাটে সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা, স্থানীয় তথ্যদাতা নেটওয়ার্ক তৈরি এবং সরকারি সহায়তা পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ প্রজননক্ষেত্রে নজরদারি জোরদার করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্টরা কাজ করবে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) রাজধানীর মেঘনা ভবনে বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির কনফারেন্স রুমে ‘ব্রুড ইলিশ কনজারভেশন ইনিশিয়েটিভ’ নিয়ে অংশীজনদের পরামর্শ সভায় এই সিদ্ধান্তগুলি গৃহীত হয়। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. নিয়ামত এলাহি।
আগামী ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত সারাদেশে ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম উপলক্ষে সব ধরনের মাছ ধরা, পরিবহন, মজুত এবং বিক্রয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে।
সভায় জানানো হয়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৫ দশমিক ৭১ লাখ মেট্রিক টন। পরবর্তী অর্থবছরে তা কমে ৫ দশমিক ২৯ লাখ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫ লাখ মেট্রিক টনে নেমে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত আহরণ, নিষিদ্ধ ও সূক্ষ্ম ফাঁসের জাল, মা ইলিশ ও জাটকা নিধন, তলদেশীয় ট্রলিং, নদীদূষণ, পলি জমা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।
তবে সভায় অংশগ্রহণকারী গবেষক ও মৎস্যজীবী প্রতিনিধিরা মত প্রকাশ করেন যে, শুধুমাত্র নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করলেই ইলিশ রক্ষা সম্ভব নয়। তাদের দাবি, নিষেধাজ্ঞার সময় দুর্গম নদী ও অভয়াশ্রম এলাকায় অবৈধ মাছ শিকার বন্ধে নজরদারি আরও বাড়াতে হবে।
জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতি ও সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজের প্রতিনিধিরা জানান, পদ্মার জাজিরা, সুরেশ্বর ও চরভৈরবীসহ বিভিন্ন এলাকায় নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার সময় সংঘাতের ঘটনা ঘটে। কখনও কখনও অবৈধ শিকারিরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা চালায়।
সভায় বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড ও বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করা হয় এবং নিষেধাজ্ঞার সময় গুরুত্বপূর্ণ প্রজননক্ষেত্রে আরও সক্রিয় নজরদারির ওপর জোর দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির উপাচার্য রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. নিয়ামত এলাহি বলেন, ইলিশ রক্ষায় সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষক, জেলে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং এনজিওগুলোর মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি। গুরুত্বপূর্ণ প্রজননক্ষেত্রে মা ইলিশ নির্বিঘ্নে পৌঁছাতে কোস্ট গার্ডের নজরদারি আরও শক্তিশালী করা যেতে পারে।
সম্প্রতি ভারতের গুজরাট থেকে বাংলাদেশে ইলিশ প্রবেশের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের চাহিদা পূরণের জন্য নিজেদের ইলিশের মজুত রক্ষা করা প্রয়োজন।
নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগে ৮ ও ৯ অক্টোবর বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি, নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের বৈঠক আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার ২২ দিনে মাছঘাটে সচেতনতামূলক প্রচারণা, স্থানীয় তথ্যদাতা নেটওয়ার্ক পরিচালনা এবং বরিশালের একটি ইলিশ ঘাটে গণজমায়েত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি জেলেদের জন্য সরকারি খাদ্য সহায়তা সঠিকভাবে পৌঁছাচ্ছে কিনা, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা হবে।
সভায় জাতীয় পর্যায়ে সেমিনার আয়োজন, মন্ত্রী পর্যায়ে ‘হিলসা থিংক ট্যাংক’ গঠন এবং ইলিশের সংখ্যা, প্রজননক্ষেত্র ও নদীদূষণ নিয়ে যৌথ গবেষণার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন সম্ভাব্য গবেষণা অর্থায়নে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
সভায় বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, সার্ক কৃষি কেন্দ্র, কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন, সিএনআরএস, কোস্ট ফাউন্ডেশন, শুশীলন এবং জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সরকার চিকিৎসকের ওপর হামলার ঘটনার প্রতি কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে, যা রোগীর মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রধানমন্ত্রী তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, "রোগীর মৃত্যু নিয়ে অভিযোগ থাকলে তা তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে, কিন্তু চিকিৎসককে মারধর কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।" তিনি আরও জানান, স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা দুর্নীতি ও অনিয়মের কাঠামো ধীরে ধীরে ভেঙে ফেলা হবে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব মন্তব্য করেন।
স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি প্রসঙ্গে জাহেদ উর রহমান বলেন, "শুধু চিকিৎসকদের দোষারোপ করলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় সামগ্রিকভাবেই নানা সমস্যা রয়েছে। সমাজে দুর্নীতি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে তা কোনো একটি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।"
চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনাকে উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, "হাসপাতালে রোগী মারা যাওয়ার পর অনেক সময় চিকিৎসকদের ওপর হামলা হচ্ছে। এমনকি জরুরি বিভাগে চিকিৎসক রোগীকে মৃত ঘোষণা করার পরও হামলার ঘটনা ঘটেছে। চিকিৎসকদের অন্ধভাবে সাফাই গাওয়ার বিষয় নয়, তবে রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসককে মারধরও গ্রহণযোগ্য নয়।" তিনি স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে বলেও উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, "গত ১৫ বছরে দেশের বিভিন্ন খাতে দুর্নীতির পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতও এর বাইরে নয়। দীর্ঘদিন ধরে কোনো খাতে দুর্নীতির কাঠামো চালু থাকলে তা পরিবর্তন করা সহজ নয়। বাংলাদেশে আগে থেকেই দুর্নীতি ছিল, তবে গত ১৫ বছরে পরিস্থিতি অনেক খারাপ হয়েছে এবং এর প্রভাব প্রায় সব খাতেই পড়েছে।"
স্বাস্থ্য খাতে পরিবর্তনের জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরেজমিনে কাজ করছেন জানিয়ে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, "এ খাতে সরকারের বাজেট বরাদ্দও বাড়ানো হচ্ছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। তবে বাংলাদেশে দুর্নীতি যে মাত্রায় পৌঁছেছে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে সময় লাগবে। সরকারের লক্ষ্য হলো পরিবর্তনের গতি যতটা সম্ভব বাড়ানো।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ