০৭:১৭ পি.এম
ওয়াশিংটন-ভিত্তিক ওয়েবসাইট দ্য হিল-এর প্রতিবেদন অনুসারে, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলার পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে, প্রায় আট মাস ধরে চলমান এই যুদ্ধের আরও একটি বড় আকার ধারণ করার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
সংবাদমাধ্যমটি জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) হোয়াইট হাউসের অনুমোদন পেলেই হামলার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি, সামরিক পরিকল্পনাকারীরা প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ-এর কাছে একাধিক বিকল্প প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন।
প্রতিবেদনে আগামী ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর সম্ভাব্য হামলার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। তবে শনিবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে আগামীকালই হামলা চালাতে পারে, আবার তেহরানের সঙ্গে একটি ‘বড় ও চমৎকার’ চুক্তির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি।
আরও পড়ুন: পাকিস্তানে বাবা নিজের সন্তানদের আপত্তিকর ভিডিও তৈরি করে বিক্রি করতেন
অন্যদিকে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান অভিযোগ করেছেন যে, ওয়াশিংটন আলোচনা প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করছে। তবে তিনি এটাও বলেন যে, চুক্তি করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া উচিত। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হুমকির প্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠছে—তবে কি এই সংঘাত আবার একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে মোড় নিচ্ছে? বিস্তারিত জানার জন্য অপেক্ষা করা যাক।
কী রয়েছে এই সামরিক পরিকল্পনায়?
সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, সামরিক প্রস্তুতি অনেকদূর এগিয়ে গেলেও ট্রাম্প কোন বিকল্পটি বা কখন অনুমোদন করবেন তা এখনও স্পষ্ট নয়। চলতি মাসের শুরুর দিকে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, পেন্টাগন সেন্টকম-কে নির্দেশ দিয়েছিল ইরানের ওপর আবারও বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করার প্রস্তুতি নিতে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই হামলায় ইরানের জ্বালানি স্থাপনা, পরিকাঠামো এবং পারমাণবিক ক্ষেত্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।
তবে এসব প্রস্তুতির মানে হামলার চূড়ান্ত নির্দেশ নয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর নির্ভর করছে, যিনি সামরিক হামলা ও কূটনৈতিক আলোচনা—উভয় পথই খোলা রাখছেন।
আরও পড়ুন: উপকূল দিয়ে পাচারকালে ইয়েমেনি বাহিনী হুথিদের বড় অস্ত্র চালান জব্দের দাবি
গত বুধবার দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ পরিকল্পনা তৈরি করেছে। বিদেশে অবস্থানরত মার্কিন কর্মীদের লক্ষ্য করে ইরানের সম্ভাব্য হামলার সতর্কবার্তার প্রেক্ষিতে এসব খবর সামনে এসেছে। জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক জয় ক্লেটন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও-র কাছে পাঠানো এক গোয়েন্দা স্মারকে জানিয়েছেন, মার্কিন কর্মীদের ওপর হামলা চালানোর চেষ্টা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য অঞ্চলে এই সংক্রান্ত ঘাতক ষড়যন্ত্র ‘আরও অগ্রসর পর্যায়ে’ রয়েছে।
এমন সতর্কবার্তার পর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর অঞ্চলটির কয়েকটি বিমানঘাঁটি ও দূতাবাস থেকে কর্মী কমানোর নির্দেশ দিয়েছে। তবে প্রকাশিত ওই গোয়েন্দা স্মারকে নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্যবস্তু বা আক্রমণের সময়ের উল্লেখ করা হয়নি।
ট্রাম্প ধোঁয়াশা আরও বাড়িয়েছেন। শুক্রবার এক সমাবেশে তিনি বলেন, ওয়াশিংটন হয়তো আরেকটি ছোট্ট ‘এপিক ফিউরি’ করতে পারে—যার মাধ্যমে তিনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান বিরোধী যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের সাংকেতিক নামের উল্লেখ করেন। আবার শনিবার হামলার নির্দিষ্ট সময়ের কথা এড়িয়ে গেলেও ইঙ্গিত দেন যে হামলা রবিবারের মধ্যেই হতে পারে।
চ্যাথাম হাউসের অ্যাসোসিয়েট ফেলো জুলি নরম্যান আল জাজিরাকে জানান, এই প্রস্তুতি সাময়িক চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল, আবার আগামী মাসে হামলা চালানোর বাস্তব সামরিক বিকল্পও বটে। তাঁর মতে, “ট্রাম্প সবসময় সব পথ খোলা রাখতে ভালোবাসেন। আমার মতে এই পরিকল্পনা একদিকে যেমন প্রতিপক্ষকে আটকে রাখার একটা তাৎক্ষণিক মহড়া, আবার মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর একটা বাস্তবিক উপায়ও।”
আরও পড়ুন: সৌদি আরবে ৮ হাজার প্রবাসী ফেরত, গ্রেপ্তার ১৩ হাজারের বেশি
হামলার গুঞ্জনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র নভেম্বরের শেষের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে তাঁদের তৃতীয় বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট’-এর পাশাপাশি প্রায় ১০ হাজার অতিরিক্ত সেনা ও ১৩তম মেরিন এক্সপিডিশনারি ইউনিট মোতায়েন করছে।
ইরানের প্রতিক্রিয়া কেমন?
তেহরান একদিকে আলোচনার কথা বলছে, অন্যদিকে সতর্ক করে জানিয়েছে যে মার্কিন হামলা হলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে। শনিবার সম্প্রচারিত এক বক্তব্যে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, “আমাদের মধ্যে তো আলোচনা চলছিলই, কিন্তু কাপুরুষেরা (আমেরিকা) সব ভণ্ডুল করে দিল।” যদিও পরে তিনি যোগ করেন, চুক্তি সম্পন্ন করার চেষ্টা অব্যাহত রাখা উচিত।
ভারতের ইরানি দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ নয়া দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ১২তম ব্রিকস পার্লামেন্টারি ফোরামে উপস্থিত থাকতে পারছেন না। এর কারণ হিসেবে কেবল ‘অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি’র কথা জানিয়েছে দূতাবাস।
আরও পড়ুন: ‘নেতানিয়াহু দেশের পরিচালনার জন্য যোগ্য নন’ দাবি বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোটের
রোববার তাসনিম বার্তা সংস্থার বরাতে ইরানের সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তারা দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসের ওপর একটি মার্কিন প্রযুক্তির ‘লুকাস’ ড্রোন গুলি করে নামিয়েছে।
রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, ইরানি নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি আবার হামলা চালায়, তবে পারস্য উপসাগরের তলদেশের যোগাযোগ কেবলগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার পরিকল্পনা সাজিয়েছে তেহরান।
এর আগে চলতি সপ্তাহের শুরুতে হরমুজ প্রণালী ও তার আশপাশে অন্তত সাতটি তেলবাহী ট্যাংকারে আগুন লাগার বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর দেয় ইরান। পাশাপাশি বুধবার ইরান তাদের সামরিক নীতি বদলে ‘আক্রমণাত্মক’ রূপ দেওয়ার কথা ঘোষণা করে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়—মার্কিন হামলায় যে সব দেশের ঘাটি ব্যবহার হবে, তারাও তাঁদের নিশানায় আসবে।
ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর মুখপাত্র হোসেন মোহেবি বলেন, “আমাদের প্রতিরক্ষা নীতি এতদিন ছিল প্রতিরক্ষামূলক। আমরা বলতাম কেউ আমাদের ওপর আক্রমণ করলে আমরা শুধু পাল্টা জবাব দেব। কিন্তু এখন থেকে আমরা বলব—কেউ আক্রমণ করলে আমরা তো জবাব দেবই, সেই সাথে সরাসরি আক্রমণাত্মক অভিযানও চালাব।”
আরও পড়ুন: হুথিদের হামলার মধ্যে তাইফ ও জাজান অঞ্চলে সতর্কতা প্রত্যাহার
ইরানের এই হুমকির ফলে পুরো অঞ্চলে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে এ অঞ্চলের জ্বালানি পরিকাঠামো এবং ওয়াশিংটনের মিত্র দেশগুলো সরাসরি হুমকির মুখে পড়তে পারে। জুলি নরম্যান বলেন, “ইরানও নিজেদের টার্গেট তালিকা তৈরি করছে, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ ও বিভিন্ন জ্বালানি অবকাঠামো রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে দু'পক্ষই বড় ধরনের সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে এবং একে অপরকে নিজেদের শক্তি জানান দিচ্ছে। আর এই উত্তেজনার মাঝে কোনো এক পক্ষের ছোট ভুল হিসেব-নিকাশও পুরো পরিস্থিতিকে দ্রুত বড় সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।”
গত ফেব্রুয়ারি মাসে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে চলতি অক্টোবর মাসেই জাহাজে হামলার ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে, যার সংখ্যা ইতিমধ্যেই ১২০টি ছাড়িয়েছে।
নতুন হামলা কি ট্রাম্পের রাজনীতিতে কাজে দেবে?
আরও পড়ুন: ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে ‘অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ’ শুরু করেছেন: বারাক ওবামা
এই মুহূর্তে রণকৌশল নির্ধারণ করা ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে বেশ স্পর্শকাতর। কারণ একদিকে আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তিনি নতুন করে বড় কোনো যুদ্ধে জড়াতে চান না, অন্যদিকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ক্রমাগত আক্রমণের জন্য চাপ দিচ্ছেন—যিনি আগামী মঙ্গলবারের নির্বাচনের আগে নিজের জনপ্রিয়তার ঘাটতি মেটাতে মরিয়া।
সম্প্রতি নেতানিয়াহু প্রকাশ্যেই মন্তব্য করেছেন, ইরান সরকারকে উৎখাত করাই নাকি এখন ইসরায়েলের ‘প্রধান লক্ষ্য’।
কাতারের দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি জানান, সাম্প্রতিক ঘটনাবলী কোনো কূটনৈতিক সমাধানের দিকে নির্দেশ করছে না, বরং লড়াই বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তিনি বলেন, “দুপক্ষের হাবভাব ও কৌশল দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে আমরা আরেকটি ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছি।”
তিনি মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথের সাম্প্রতিক ইসরায়েল সফর এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটি ও দূতাবাস থেকে মার্কিন কর্মী সরিয়ে নেওয়ার বিষয়গুলোকে সামনে এনে বলেন, “এসব কিছুই ইঙ্গিত দেয় যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল খুব শিগগির বা দ্রুতই ইরানের ওপর ফের হামলার ছক কষছে। তবে সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, এবারের যুদ্ধের ভয়াবহতা হয়তো আগের সব হামলাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।”
জুলি নরম্যান অবশ্য বলেন যে, ট্রাম্প মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর হামলাই চালাতে পারেন, তবে সামরিক উপদেষ্টাদের কাছে ট্রাম্পের বড় প্রশ্ন হবে—নতুন করে এই যুদ্ধ বাড়ালে এমন কী অর্জন হবে যা আগের হামলাগুলোতে হয়নি?
“ইরানকে আলোচনার টেবিলে বাধ্য করতে এই নীতি আদৌ কতটা কাজ করবে? আর আমার মনে হয় না যে এই প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর কারও কাছে আছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন