০৫:১৪ এম
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গত পাঁচ দিন ধরে মাটির নিচ থেকে নির্গত গ্যাসের আগুন জ্বলছে। বিশেষজ্ঞরা প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে গ্যাসের সঙ্গে তেল বা কনডেনসেট থাকার সম্ভাবনা দেখছেন। উৎস ও মজুত সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য বাপেক্স ও পেট্রোবাংলা ১৫ দিন পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগুনের তীব্রতা না কমলে বিকল্প বা ‘রিলিফ কূপ’ খনন করা হতে পারে। তবে সম্ভাবনার সঙ্গে দুর্ঘটনার শঙ্কাও বাড়ছে। জননিরাপত্তার জন্য ঘটনাস্থলের ২০০ মিটারের মধ্যে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে।
গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে রিলিফ কূপ খননের ঘোষণা দেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) এবং বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) উচ্চ পর্যায়ের একটি দল। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা আগুনের উৎসকে একটি অগভীর গ্যাসের মজুত বা শ্যালো রিজার্ভার বলে ধারণা করছেন। তারা ইতোমধ্যে বিভিন্ন ধরনের নমুনা সংগ্রহ করেছেন এবং পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, ইনানীর ওই উৎস থেকে উৎপাদন ও ব্যবহারযোগ্য গ্যাস বা জ্বালানি তেল পাওয়া গেলে এটি হবে দেশের ৩১তম খনিজ কূপ।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আনার লক্ষ্যে অ্যামচ্যাম
গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা আগুনের প্রকৃতি এবং গ্যাস নির্গমন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন। বাপেক্সের ভূতাত্ত্বিক বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শামসিয়া মুকতাদির বলেন, "এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাপেক্সের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা রয়েছে। নিজস্ব ব্যবস্থাপনাতেই এ পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব।" তবে নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে, কারণ যেকোনো সময় অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) প্রকৌশলী শোয়েব জানান, বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন মহাব্যবস্থাপককে নিয়ে বৃহস্পতিবার পেট্রোবাংলায় একটি সভা হয়েছে। সেখানে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছে, নির্গত গ্যাসটি থার্মোজেনিক ও বায়োজেনিক প্রকৃতির হতে পারে। তবে আগুনের শিখার রঙ দেখে গ্যাসের সঙ্গে তেল বা কনডেনসেট থাকার বিষয়টিও অনুমান করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ধারণা করা হচ্ছে, আগুনের উৎস একটি অগভীর গ্যাসের মজুত বা শ্যালো রিজার্ভার। দেশে সাধারণত ভূগর্ভের দেড় থেকে পাঁচ কিলোমিটার গভীরে গ্যাসের মজুত পাওয়া যায়। তবে গ্যাসের উৎস ও প্রকৃত পরিমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে ১৫ দিন পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ সময় আগুনের শিখার উচ্চতা ও গ্যাস নির্গমনের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
পেট্রোবাংলার এই কর্মকর্তা জানান, ১৫ দিন পর্যবেক্ষণের পর যদি দেখা যায় আগুনের শিখার উচ্চতা বেড়েছে বা একই রকম রয়েছে, তাহলে আগুন বন্ধ করার জন্য প্রাথমিকভাবে একটি রিলিফ কূপ খননের পরিকল্পনা করা হবে। সাইড ট্র্যাকিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে রিলিফ কূপ খননের মাধ্যমে গ্যাসের নির্গমন বন্ধ করার চেষ্টা করা হবে। তবে গ্যাসের প্রবাহ কমে গেলে বা বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আরও পড়ুন: ট্রাম্পের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা ‘ভালো হয়েছে’: কানাডার প্রধানমন্ত্রী কার্নি
আশপাশেও গ্যাসের অস্তিত্ব
মো. শোয়েবের মতে, আশপাশের কয়েকটি ভূতাত্ত্বিক স্তর থেকেও গ্যাস জ্বলতে দেখা গেছে। ভূগঠনে কিছু পরিবর্তনের কারণে গ্যাস নির্গমন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরে বাপেক্স সেখানে ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) ভূকম্পন জরিপ পরিচালনা করবে। জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে গ্যাস মজুতের সম্ভাবনা যাচাই করা হবে। সেখানে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক গ্যাসের মজুত পাওয়া গেলে নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
জানা গেছে, গত ২৭ অক্টোবর সকালে উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ছয় নম্বর ওয়ার্ডের ইনানী ছোট খাল ব্রিজসংলগ্ন একটি বাড়িতে নলকূপ স্থাপনের কাজ চলছিল। ওই সময় মাটির প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে পাইপ ঢোকানোর পর গ্যাস বের হতে শুরু করে। এক পর্যায়ে সেই গ্যাসে আগুন ধরে যায়।
পরে উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ফায়ার সার্ভিসের কয়েকটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায়। ঘটনাস্থলে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত থাকার সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় বাপেক্সের একটি কারিগরি দল স্থানটি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছে।
আরও পড়ুন: পল্লী বিদ্যুতের মিটার চুরির ঘটনায় টাকা দাবি, প্রতিকার পাচ্ছে না গ্রাহক
এ পরিস্থিতিতে জননিরাপত্তা নিশ্চিতে গত বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ে জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় আগুনের উৎস ও আশপাশের এলাকাকে বিভিন্ন নিরাপত্তা অঞ্চলে ভাগ করে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
২০০ মিটারে ১৪৪ ধারা জারি
এরপর উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পান্না আক্তারের এক আদেশে ঘটনাস্থলের আশপাশের ২০০ মিটারের মধ্যে সাধারণ মানুষের প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। এ ঘটনায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করেছে উপজেলা প্রশাসন।
আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, ঘটনাস্থল ও আশপাশে আগুন জ্বালানো, ধূমপান, দিয়াশলাই বা লাইটার ব্যবহারসহ স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে- এমন সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ। আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরও পড়ুন: গৃহবধূর আপত্তিকর ভিডিওধারণ করে ব্ল্যাকমেইল, ধর্মীয় শিক্ষক নূর আলম শেখ গ্রেপ্তার
এদিকে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে এলাকায় মাইকিংয়ের পাশাপাশি বসানো হয়েছে কাঁটাতারের বেড়া ও লাল পতাকা। তবে এসব সতর্কতামূলক ব্যবস্থার পরও ঘটনাস্থলের আশপাশে মানুষের ভিড় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ১৪৪ ধারা জারির পরও প্রতিদিনই বিকালে ঘটনাস্থলে মানুষের ভিড় বেড়ে যাচ্ছে। অনেকে ছবি ও ভিডিও ধারণ করছেন। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীকে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
বাসিন্দাদের মাঝে আতঙ্ক
এদিকে আগুনের এমন পরিস্থিতিতে এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ছৈয়দ আলম জানান, বাপেক্সের পক্ষ থেকে ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা দেওয়ায় তারা আশা করেছিলেন এর মধ্যে আগুনের তীব্রতা কমে আসবে। কিন্তু দিন দিন তা আরো বাড়ছেই।
আরও পড়ুন: দুই বোনের চলার শক্তি নেই, বাড়িতে যাওয়ার রাস্তা নেই
আরেক বাসিন্দা বেলাল উদ্দিন বলেন, আগুনের কারণে রাস্তার দুই পাশ দিয়ে চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। যানবাহন নিয়ে চলাচলেও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
শহিদুল আলম নামের এক ব্যক্তি বলেন, ঘটনার তিন দিন পর প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করেছে। কিন্তু তা অমান্য করেই উৎসুক লোকজন ঘটনাস্থলের আশপাশে ভিড় করছেন। এভাবে চলতে থাকলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন