০৯:৫৯ এম
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বহু বছর আগে ধূমপান ছেড়েছিলেন এবং একসময় তিনি দেশটিতে তামাক নিয়ন্ত্রণের জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই অগ্রগতি খুবই ধীর হয়ে গেছে। বর্তমান সময়ে চীন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সিগারেট ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে এখনও শীর্ষে রয়েছে।
২০১২ সালে বেইজিংয়ে তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বিল গেটসের সঙ্গে এক বৈঠকে ধূমপান নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি সেসময় জানান, ধূমপান ছাড়ার ফলে তিনি নিজের স্বাস্থ্য অনেক বেশি ভালো অনুভব করছেন এবং তামাককে চীনের একটি বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন। সেদিনই তিনি তামাক নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। পরে তার স্ত্রী পেং লিয়ুয়ানকেও ধূমপানবিরোধী প্রচারণায় সক্রিয়ভাবে দেখা যায়।
কিন্তু সেই ঘটনার পর ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও চীনে ধূমপান নিয়ন্ত্রণে খুব সামান্যই অগ্রগতি হয়েছে। বরং অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
আরও পড়ুন: পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা হুমকির মুখে, শান্তি সুদূরপরাহত
চীনা সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের সাবেক কর্মকর্তাদের প্রতিষ্ঠিত এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০০৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে চীনে সিগারেট ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ৩৯ শতাংশ। একই সময় বিশ্বে অন্যান্য দেশে সিগারেট ব্যবহার প্রায় ২৬ শতাংশ কমেছে। বর্তমানে বিশ্বে উৎপাদিত সিগারেটের প্রায় অর্ধেকই ব্যবহৃত হচ্ছে চীনে।
চীনে বছরে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার কোটি সিগারেট বিক্রি হয়। যদিও ধূমপায়ীর সংখ্যা কিছুটা কমেছে, তবে মোট সিগারেট বিক্রির পরিমাণ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। দেশটির সিগারেটের দামও তুলনামূলকভাবে কম, ফলে সেগুলোর ব্যবহার কমানো খুবিভাবে কঠিন হয়ে পড়েছে। চীনে একটি প্যাকেট সিগারেটের গড় দাম প্রায় ৩ ডলার, যা অনেক উন্নত দেশের তুলনায় অনেক কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের রাষ্ট্রীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং দেশটির বড় তামাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রভাব ধূমপান কমাতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ খাত থেকে সরকারের বিপুল রাজস্ব আয় হয়, যা দেশের মোট আয়ের একটি বৃহৎ অংশ। শুধু ২০২৫ সালের মধ্যে এ খাত থেকে প্রায় ২৪৪ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে, যা দেশটির মোট সরকারি আয়ের প্রায় ৭ শতাংশের সমান।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তামাক খাত থেকে আসা রাজস্ব এখন চীনের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেক অঞ্চলে স্থানীয় বাজেটের বড় অংশই আসে তামাক কর থেকে।
আরও পড়ুন: ‘ফ্রম রাশিয়া উইথ লাভ’
ফলে ধূমপান কমানোর উদ্যোগ নিলেও, তা বাস্তবায়নে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনৈতিক চাপের সময় তামাক খাত থেকে আসা বিপুল অর্থের কারণে সরকার কঠোর ধূমপানবিরোধী নীতিমালা বাস্তবায়নে পিছিয়ে রয়েছে। বহু বছর ধরে করা ডাক্তারি নির্দেশনা অনুযায়ী ঘরের ভেতর ধূমপান নিষিদ্ধ করার প্রচেষ্টা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। অনেক এলাকায় এখনও রেস্তোরাঁ, বার এবং জনসমাগমস্থলে প্রকাশ্যে ধূমপান করতে দেখা যায়।
তবে আশার খবরও আছে। তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ সামাজিক মাধ্যমে ধূমপানবিরোধী আন্দোলন শুরু করেছে। তারা প্রকাশ্যে ধূমপান নিয়ন্ত্রণ এবং কঠোর শাস্তির দাবি জানাচ্ছে। তরুণদের মধ্যে ধূমপানের হারও কিছুটা কমছে। বিশেষ করে তরুণ নারী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক কর্মীরা ধূমপানবিরোধী সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছেন।
চীনা সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ধূমপায়ীর হার ২৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন, এই লক্ষ্য অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শক্তিশালী তামাক শিল্প, শিথিল আইন প্রয়োগ এবং অর্থনৈতিক নির্ভরতা—এই তিনটি বিষয়েই চীনে ধূমপান নিয়ন্ত্রণ এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
আরও পড়ুন: রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আসছে বিদেশি শ্রমিক
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন