০৭:৩৯ এম
ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার আগ্রাসনে বাংলাদেশসহ ২৯টি দেশের নাগরিকদের ব্যবহার করা হচ্ছে বলে সম্প্রতি জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন তথ্য প্রকাশ করেছে। এই পরিস্থিতিতে আমাদের নীরবতা আশ্চর্য।
কিছু বলারও সাহস নেই। রাশিয়াকে কিছু বলা যেন নিষিদ্ধ।
কালের পরিবর্তন কতটা আশ্চর্যজনক! আশি ও নব্বই দশকে বাংলাদেশের কিছু ধর্মপ্রাণ তরুণ ফিলিস্তিনিদের পক্ষে লেবাননে এবং মার্কিন ও রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে আফগানিস্তানে জনগণের জন্য লড়াই করেছিলেন। রাষ্ট্র, মিডিয়া এবং সুশীল সমাজ তাদের ‘জঙ্গি’ ও ‘মৌলবাদী’ আখ্যা দিয়েছিল। দেশে ফিরে আসার পর তাদের জেলে যেতে হয়েছিল। তাদের পরিবারগুলোকে সামাজিকভাবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
আরও পড়ুন: চীনের মাটিতে বাংলার ঘ্রাণ, সানইউয়ানলিতে বাংলাদেশিদের মিলনমেলা
বর্তমানে সমাজ, অর্থনীতি এবং নৈতিকতার পরিবর্তনে আমরা অস্থির সময় পার করছি। বেকারত্বের হাত থেকে বাঁচতে প্রবাসী হওয়ার স্বপ্নে বিপর্যয় ঘটতে শুরু করেছে। বাংলাদেশিরা ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে প্রাণ হারাচ্ছেন। মালয়েশিয়ার জঙ্গলে আটকে আছেন; ইউরোপের বন্দিশিবিরে বন্দি, মধ্যপ্রাচ্যে নারী প্রবাসীরা শোষণের শিকার হচ্ছেন। প্রতিদিন এয়ারপোর্টে প্রতারণার শিকার প্রবাসীরা ফিরে আসছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এই পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন। প্রবাসীদের পাঠানো টাকায় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ডলারের বড় মজুত তৈরি হচ্ছে, গ্রামে গ্রামে পাকা বাড়ি উঠছে। অনেক পরিবার তাদের দ্বারা টিকে আছে।
রাশিয়ায় বাংলাদেশিদের চাকরির নামে নিয়ে গিয়ে যুদ্ধে পাঠানোর কিছু রিপোর্ট সামনে এসেছে। তবে জাতিসংঘের ইউক্রেনবিষয়ক স্বাধীন তদন্ত কমিশনের চলতি সপ্তাহের প্রতিবেদনে ৪৮টি দেশের নাগরিকদের রুশ সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের বিষয়টি খতিয়ে দেখে ২৯টি দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রতারণা বা জোরাজুরির প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাদের চাকরি এবং উঁচু বেতনের লোভ দেখিয়ে রাশিয়া নেওয়া হয়েছিল। তাদের বহিরাগমনে সরকারও অনাপত্তি সার্টিফিকেট দিয়েছে। সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী, গত তিন বছরে ৫৪ বাংলাদেশি রণাঙ্গনে নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৭ জনের মৃত্যু ঘটেছে যুদ্ধের প্রথম দিনে। মাত্র কয়েক দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও প্রবাসী মন্ত্রণালয় প্রবাসীদের স্বার্থরক্ষায় যথেষ্ট তৎপর। কিন্তু প্রবাসীরা সন্তুষ্ট নন। মধ্যপ্রাচ্যসহ অনেক দেশে প্রবাসীদের দুর্ভোগে আমরা সোচ্চার। বিশেষত মুসলিম দেশগুলোর ক্ষেত্রে আমরা সচেতন। ত্রিশ লাখেরও বেশি প্রবাসী যেই সৌদি আরবে, সেখানে সম্প্রতি দুই বাংলাদেশি নাগরিকের শিরশ্ছেদ নিয়ে মিডিয়া ও সুশীল সমাজের উদ্বেগে আমরাও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে জিজ্ঞেস করা হয়, তাদের বিষয়ে বাংলাদেশকে কেন আগে জানানো হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতে নারী কর্মীদের নিয়ে আমাদের উৎকণ্ঠা যুক্তিসংগত। মিডিয়াতে এর প্রতিফলন ঘটে। কিন্তু রাশিয়ার ব্যাপারে আমাদের নীরবতা কেন? সেখানে বাংলাদেশিদের জোর করে যুদ্ধে নামানো হচ্ছে। কিন্তু আমরা প্রতিবাদ বা রুশ রাষ্ট্রদূতকে তলব করছি না কেন? বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাশিয়া সফর শেষে বলেছিলেন, সে দেশে জনশক্তি রপ্তানির উল্লেখযোগ্য বাজার আছে। মনে পড়ে যায়—জেমস বন্ডের একটি নামকরা সিনেমা ছিল! ফ্রম রাশিয়া উইথ লাভ।
বাংলাদেশে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অনুগামী একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক গোষ্ঠী রয়েছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারকে পুতিন শুধু সহায়তা করেননি; বরং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে নজিরবিহীন দুর্নীতি ঘটাতে সাহায্য করেছেন। এর অর্ধেক খরচে রাশিয়া ভারতে একই ক্ষমতার পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করেছে। রূপপুর অচিরেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে, সেখানে অনেক রুশ বিশেষজ্ঞ কর্মরত। সেজন্যই কি রাশিয়ার অমানবিকতা নিয়ে আমরা প্রশ্ন তুলছি না? সৌদি আরবের মতো ঘনিষ্ঠ বন্ধুর রাষ্ট্রদূতকে তলব করতে পারলে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত কেন তলবের অযোগ্য হয়ে পড়লেন? ওই বাংলাদেশিদের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরানোর কাজটি জরুরি ভিত্তিতে করা উচিত। নিহতদের লাশও আমরা পাই না। ইসলাম ধর্মে জীবিত বা মৃত উভয়ের গুরুত্ব ও মর্যাদা সমান। আজ যদি ইউক্রেন-রাশিয়া সীমান্তে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন থাকত এবং বাংলাদেশি কোনো সৈন্যের প্রাণহানি ঘটত, তবে তার প্রত্যাবর্তন ও দাফন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় হতো।
আরও পড়ুন: লন্ডনের মেয়র সাদিক খান তুরস্ক সফরে গিয়ে আয়া সোফিয়ায় নামাজ পড়তে চান
ইসরাইল, আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে মুসলমানদের যুদ্ধে একসময় ধর্মপ্রাণ বাংলাদেশের তরুণরা জান বাজি রেখে লড়েছিল। পূর্ববঙ্গের বাংলাভাষী মুসলিম সমাজ যে ‘মার্শাল রেইস’ তার প্রমাণ সিপাহি বিদ্রোহে ‘বেঙ্গল ল্যানচার্স’-এর ভূমিকা, প্রথম যুদ্ধে বাঙালি পল্টন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাদের রণ-নৈপুণ্য, ১৯৪৮ সালে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের পত্তন, ১৯৬৫ সালে ভারতের বিরুদ্ধে বেঙ্গল টাইগারদের বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ, একাত্তর সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল শক্তি হিসেবে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের নেতৃত্ব।
বাংলাদেশের বীর সৈনিক সাবেক এমপি গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব.) সাইফুল আযম ইসরাইলের ওপর বিমান হামলায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশকে গর্বিত করে গেছেন। কিছু পশ্চিমা সরকার মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য কয়েকজনের নাগরিকত্ব বাতিল করেছে।
কথা হচ্ছে, নৈতিক ও স্বেচ্ছা যুদ্ধের পাশাপাশি জোর করে অনৈতিক যুদ্ধে ঠেলে দেওয়া এক নয়। একসময় নিষিদ্ধ ঘোষিত ‘হরকাতুল জিহাদ’-এর কিছু তরুণ ওইসব যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। তাদের তখন বলা হতো মুজাহিদ—অর্থাৎ যারা জিহাদ করেন। জিহাদ শব্দটি জুহদ ধাতু থেকে এসেছে। অর্থ হচ্ছে পরিশ্রম ও কষ্ট স্বীকার করা। তাই জিহাদের সংজ্ঞা হচ্ছে, প্রকাশ্যে কিংবা অপ্রকাশ্যে দুশমনের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য নিজের পূর্ণ শক্তি ব্যয় করা। ইসলামের মূল উদ্দেশ্য দুনিয়ায় সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং অসত্য ও অন্যায়ের বিলোপ সাধন। আমর বিল মা’রুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার।
প্রতিটি আনুগত্যের জন্য একটি বিদ্রোহ, প্রতিটি মিত্রতার জন্য একটি শত্রুতা এবং প্রতিটি বিনয়ের জন্য একটি দাম্ভিকতা ও অহংকার অপরিহার্য। আপনি কোনো এক মালিকের চাকর হতেই পারেন না, যতক্ষণ অন্যসব মালিকের মালিকানা অস্বীকার না করেন। সুতরাং আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর আনুগত্যের জন্য প্রথম কাজই হচ্ছে, যা ছাড়া আর যত শক্তি তাদের আনুগত্যের জন্য ডাকছে, সবার সঙ্গে বিদ্রোহ ঘোষণা করা। (যে সত্যের মৃত্যু নেই : ভারতের অন্যতম বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মরহুম মাওলানা আবুল কালাম আযাদ, ভাষান্তর : আখতার ফারুক)।
আরও পড়ুন: হরমুজ স্বাভাবিক না হলে ভিন্ন পথে হাঁটার হুঁশিয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মৌলবাদী রাজনীতির গ্রহণযোগ্যতা নেই, তেমনি ‘হরকাতুল জিহাদ’-এর অনেক কর্মকাণ্ড সমর্থনযোগ্য ছিল না। আশ্চর্যের বিষয় হলো, হরকাতুল জিহাদ প্রতিষ্ঠার সময় যেসব কারণ উল্লেখ করা হয়েছিল, সেসবের একটি ছিল, হাইকোর্ট কর্তৃক ফতোয়াকে নিষিদ্ধ করা। ওই বিতর্কিত রায়টি দিয়েছিলেন এমন এক মরহুম বিচারপতি, যার পূর্বকালের রাজনীতি ছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের আদর্শকেন্দ্রিক। এই মানসিকতার অভিজাত সমাজ এখনো আছে। তাদের গ্যাঁড়ামি এমন ছিল যে, বিলুপ্ত জাতীয় দৈনিক ‘দৈনিক বাংলা’য় কাজ করতেন ওই সময় এক সিনিয়র সহ-সম্পাদক। সোভিয়েত নেতা গর্বাচেভ যেদিন ‘পেরেস্ত্রোইকা’ ও ‘গ্লাসনস্ত’-এর ঘোষণা দিলেন, ওই খবরটি আর পরদিন দৈনিক বাংলায় ছাপা হলো না। কী ব্যাপার? অনুসন্ধানে বেরিয়ে এলো ওই সিনিয়র সাংবাদিকের হাতে পড়েছিল টেলিপ্রিন্টারে আসা খবরটির স্লাগ বা কাগজটি। তিনি মনে করলেন, মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি সাম্রাজ্যবাদী প্রচারণার অংশ হিসেবে গর্বাচেভের বরাতে ভুয়া নির্দেশ করেছে। গরবাচেভ তো তাদের চোখে সোভিয়েতের বেঈমান। অতঃপর আমাদের ওই ভাই বোগাস বলে স্লাগটি ছিঁড়ে ফেলে দিলেন। কাউকে কিছু জানালেন না।
লেখক: জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি ও
উইকলি ইকোনমিক টাইমস সম্পাদক
আরও পড়ুন: ইরান দিল দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের হুমকি: ট্রাম্পের হাতে থাকবে না নিয়ন্ত্রণ
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন