০৮:১৬ এম
ইরানের ওপর হামলার অংশ হিসেবে মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর পরিবর্তে ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে সেখানে মোতায়েন করা হচ্ছে। লিংকন দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকার কারণে নাবিকদের মানসিক চাপ এবং বিভিন্ন সমস্যার খবর প্রকাশিত হওয়ার পর এই পরিবর্তন করা হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেও যুদ্ধবিরতির আলোচনা যদি অচলাবস্থায় রয়ে যায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দিয়েছে যে ইরানের বন্দরগুলোতে তারা ‘অনির্দিষ্টকাল’ নৌ অবরোধ চালিয়ে যাবে। একই রকমভাবে ওয়াশিংটন দাবি করছে যে, হরমুজ প্রণালি তাদের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে’ রয়েছে।
তবে ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে রয়েছে এবং তারা এ পথে চলাচল বন্ধ রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের শর্তগুলো মেনে না নেয়, তবে ওই জলপথ খুলবে না। তাদের শর্তের মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সম্পত্তি ছাড়া।
আরও পড়ুন: চীন ‘গ্রে জোন’ কৌশল ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখছে
মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য নতুন রণতরি পাঠানোর সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এসেছে, যখন ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন টানা ২৪০ দিনের বেশি সময় ধরে গতিশীল। মার্কিন আইনপ্রণেতারা জাহাজটির নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য, প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহের অভাব, পানিদূষণ ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তবে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এসব প্রতিবেদনকে ‘সম্পূর্ণ ভুলভাবে উপস্থাপিত’ বলে দাবি করেছেন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, জাহাজের কোনো নৌ সদস্য মারা যাননি। ৩ আগস্ট, জাহাজ থেকে পড়ে যাওয়া একজন নাবিককে দ্রুত উদ্ধার করা হয়েছিল।
ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের দীর্ঘ অভিযানে নাবিকদের মানসিক চাপের সঙ্গে পানিদূষণ এবং মৌলিক সরবরাহের ঘাটতির খবর এসেছে। অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন নৌ কর্মকর্তা হারলান উলম্যান বলেন, জটিল যুদ্ধজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ সমুদ্রে করা সম্ভব নয়। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকলে জাহাজের প্রস্তুতি এবং সক্ষমতা কমে যেতে পারে। লিংকন একটানা প্রায় ২০০ দিন কোনো বন্দরে ভেড়েনি।
এ কারণে জর্জ ওয়াশিংটনকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোকে শুধু নিয়মিত জাহাজ বদল নয়, বরং দীর্ঘ অভিযানে মার্কিন নৌবাহিনীর চাপের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইতিমধ্যে জর্জ ওয়াশিংটন প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাত্রা করেছে।
আরও পড়ুন: ইরান সম্পর্কে ভুল ধারণার বিপজ্জনক পরিণতি ও শান্তিপূর্ণ চুক্তির সম্ভাবনা
এদিকে, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ গত বৃহস্পতিবার বলেন, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর চলমান নৌ অবরোধ কার্যকর রাখার জন্য মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি ‘অনির্দিষ্টকাল’ স্থায়ী রাখা সম্ভব। তিনি জানান, জাহাজগুলোকে পর্যায়ক্রমে বদল করে এ অবরোধ চলবে।
একই দিনে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের ওপর আরও কঠোর অর্থনৈতিক চাপ তৈরির ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন যে আগামী সপ্তাহ থেকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার জন্য ‘নজিরবিহীন’ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
গত ১৭ জুন যুদ্ধ বিরতি সম্পর্কিত একটি সমঝোতা স্মারকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সই করেছিল। সেই স্মারকে বলা হয়েছিল পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনা করে চূড়ান্ত যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে। কিন্তু আলোচনা ভেঙে যায় এবং দুই দেশ আবারও পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু করে।
৬০ দিনের ওই সময়সীমা আগামীকাল রবিবার শেষ হতে যাচ্ছে। তবে এই সময়ের মধ্যে সমঝোতা নবায়ন বা নতুন আলোচনার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এর মধ্যেই ইরানের ওপর চাপ তৈরি করতে নৌ অবরোধসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে ওয়াশিংটন।
আরও পড়ুন: জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ পেরিয়ে সুস্থতার পথে বাকৃবি শিক্ষার্থী জীম
হরমুজে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন ১৩০ থেকে ১৪০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করলেও মঙ্গলবার তা মাত্র আটটিতে নেমে এসেছে। কিন্তু গত ১০ দিন ধরে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১২টি জাহাজ এই প্রণালী ব্যবহার করেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ এবং ইরানের ‘প্রণালি বন্ধ’—দুটি দাবিই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে হরমুজ প্রণালি স্বীকৃত। যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হত। অবরোধ এবং ইরানের পাল্টা পদক্ষেপের ফলে এই সরবরাহব্যবস্থা চাপের মুখে পড়েছে।
ইরান বলছে, তেহরানের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক থাকার দাবি করে দেশটির যৌথ সামরিক কমান্ড বলছে, এটি হচ্ছে ‘মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন’।
এদিকে, মার্কিন অবরোধের ফলে ইরানের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস তেল রপ্তানি বিঘ্নিত হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের মাধ্যমে তেহরানকে আলোচনায় ছাড় দিতে বাধ্য করতে চায় ওয়াশিংটন।
আরও পড়ুন: ট্রাম্পকে নতুন সুযোগ দিতে প্রস্তুত ইরান, শর্ত আন্তরিকতার
তবে ইরানের হাতে রয়েছে বড় চাপ তৈরির হাতিয়ার—হরমুজ প্রণালি। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ জলপথের জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির সক্ষমতা রাখে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্র নতুন রণতরি নিয়ে এসে অবরোধের দীর্ঘায়িত করার সক্ষমতা দেখাচ্ছে। অপরদিকে, ইরান হরমুজকে দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা আবার শুরু না হলে, এই অচলাবস্থা আরও দীর্ঘতর হতে পারে।
সূত্র : আল-জাজিরা ও রয়টার্স
আরও পড়ুন: ট্রাম্প যেখানে চুক্তি দেখেন, পুতিনের চোখে তা রাশিয়ার জয়
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন