১০:৪০ পি.এম
সাহিত্য মানবের চিন্তার প্রতিফলন, সময়ের চিহ্ন ও একটি সমাজের আত্মপরিচয়ের নান্দনিক প্রকাশ। একজন সাহিত্যিকের সৃষ্টির পেছনে থাকে দীর্ঘ সাধনা, অবিরাম অনুসন্ধান, জীবনবোধ এবং সময়কে ধারণ করার একটি গভীর প্রত্যয়। এই সাধনার যথাযথ স্বীকৃতি শুধুমাত্র একজন স্রষ্টাকে সম্মানিত করে না, বরং আগামী দিনের সৃজনশীল মানুষের জন্যও আলোকিত পথের সন্ধান দেয়। কিন্তু বর্তমান সময়ে দেশে অনেক সাহিত্য পুরস্কারের আয়োজন বন্ধ হয়ে গেছে। তবুও নতুন এবং পুরোনো বহু লেখক তাঁদের সৃষ্টিশীলতায় বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন। তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন এবং অনুপ্রেরণা জোগাতে সাহিত্য পুরস্কারের মর্যাদা ও অর্থমূল্য আরও বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন।
তিনি মন্তব্য করেন, যাঁদের সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে, তাঁদের প্রাপ্তির মাত্রা আরও বৃদ্ধি করা উচিত। পুরস্কারের সম্মানী ও মর্যাদা এমনভাবে হওয়া উচিত, যাতে তা একজন সাহিত্যিকের দীর্ঘদিনের সাধনার যথাযথ মূল্যায়ন হয়ে ওঠে। এ প্রসঙ্গে তিনি ‘আবু খালেদ পাঠান সাহিত্য পুরস্কার’ এর অর্থমূল্য ৫০ হাজার টাকা করার পরামর্শ দেন।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাজধানীর কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউয়ে অবস্থিত ডেইলি স্টার ভবনের এস মাহমুদ সেমিনার হলে তৃতীয়বারের মতো আয়োজিত আবু খালেদ পাঠান সাহিত্য পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আরও পড়ুন: ‘খালেদা জিয়া এক মৃত্যুঞ্জয়ী মহীয়সী’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন
এ বছর এ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন কিশোরগঞ্জের দুই কৃতী সাহিত্যিক, প্রখ্যাত কবি, প্রাবন্ধিক, গল্পকার ও গীতিকার আবিদ আনোয়ার এবং শিশু সাহিত্যিক, গল্পকার ও নাট্যকার মাসুম মাহমুদ। অনুষ্ঠানে তাঁদের হাতে পুরস্কার ও সম্মাননা তুলে দেন অতিথিরা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইমদাদুল হক মিলন সাহিত্যিকদের যথাযথ স্বীকৃতি প্রদানের প্রয়োজনীয়তার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, দেশে অনেক সাহিত্য পুরস্কার একসময় চালু থাকলেও বর্তমানে সেগুলোর বেশ কিছু বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ সাহিত্যচর্চা থেমে নেই। অনেকেই এখনো ভালো লিখছেন, নতুন নতুন সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করছেন। তাঁদের স্বীকৃতি ও উৎসাহিত করার জন্য সাহিত্য পুরস্কারের মূল্যায়ন যথাযথ এবং সম্মানজনক হওয়া জরুরি।
তাঁর মতে, পুরস্কার শুধুমাত্র একটি স্মারক বা আনুষ্ঠানিক সম্মাননা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একজন লেখকের সৃজনশীল জীবনের স্বীকৃতি। তাই পুরস্কারের অর্থমূল্য বাড়ানোর পাশাপাশি এর মর্যাদাও সমুন্নত রাখা প্রয়োজন। আবু খালেদ পাঠান সাহিত্য পুরস্কারের অর্থমূল্য ৫০ হাজার টাকা করার পরামর্শের মধ্য দিয়ে তিনি এ উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী ও অর্থবহ করে তোলার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
এবারের পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি আবিদ আনোয়ার বাংলা সাহিত্যের এক বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব। কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প ও গীতিকার হিসেবে তাঁর রয়েছে দীর্ঘ সাহিত্যযাত্রা। বেতার ও টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত বিশেষ শ্রেণির গীতিকার হিসেবেও তিনি পরিচিত। সাহিত্যসাধনার পাশাপাশি ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র যোদ্ধা হিসেবে অংশগ্রহণ করেন তিনি। বাংলা কবিতায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১২ সালে অর্জন করেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার। এ ছাড়া তিনি রাষ্ট্রপতি পদকেও ভূষিত হয়েছেন।
আরও পড়ুন: বাবুই শিশুসাহিত্য উৎসব ২০২৬: ২৪ জন লেখক পেলেন সেরা সম্মাননা
আবিদ আনোয়ার ১৯৫০ সালের ২৪ জুন কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলার চর আলগী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মোহাম্মদ আজিমউদ্দিন এবং মাতা হাসিনা বেগম। ১৯৬৬ সালে কটিয়াদী হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৬৮ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭১ সালে রসায়নশাস্ত্রে স্নাতক সম্মান এবং ১৯৭২ সালে একই বিষয়ে থিসিসসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মিসৌরি-কলাম্বিয়া থেকে সাংবাদিকতায় থিসিসসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
কর্মজীবনে সাংবাদিকতা ও বিভিন্ন পেশায় যুক্ত থাকা আবিদ আনোয়ার ঢাকার মহাখালীতে অবস্থিত আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)-এর সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
অন্যদিকে শিশু-কিশোর সাহিত্যের জগতে নিজস্ব পরিচিতি গড়ে তুলেছেন মাসুম মাহমুদ। গল্পকার, ছড়াকার ও নাট্যকর্মী হিসেবে তাঁর বিচরণ সাহিত্য ও সংস্কৃতির একাধিক পরিসরে। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের উপযোগী গল্প ও অণুগল্প রচনায় তাঁর রয়েছে স্বতন্ত্র আগ্রহ ও সৃজনশীলতা। শিশুমনের কল্পনা, আনন্দ, অনুভূতি ও জীবনবোধকে সহজ-সরল ভাষায় সাহিত্যের পরিসরে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে তিনি পাঠকের কাছে পরিচিতি পেয়েছেন।
মাসুম মাহমুদ ১৯৮৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সাইদুর রহমান এবং মাতা আবেদা খাতুন। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি টেলিভিশন ও মঞ্চনাটকের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। লেখালেখির পাশাপাশি নাট্যকর্মী হিসেবেও তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে।
আরও পড়ুন: কবিয়াল সাহিত্য পুরস্কার পেলেন গাজীউল হাসান খান, সুব্রত পাল ও জুনান নাশিত
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি কবি ফরিদ কবির আবু খালেদ পাঠানের উদারতা, মানবিকতা ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে দুটি শ্রেণি রয়েছে। একটি শ্রেণি শুধু গ্রহণ করে, অন্যটি দিতে জানে। আবু খালেদ পাঠান ছিলেন তেমনই একজন মানুষ, যিনি হয়তো কেবল দিতেই এসেছিলেন। পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে কিশোরগঞ্জের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি তাঁর প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধারই প্রমাণ।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ পুরস্কার নতুন প্রজন্মের লেখক ও কবিদের সাহিত্যচর্চায় অনুপ্রাণিত করবে। সৃষ্টিশীল মানুষদের যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে এ উদ্যোগ একসময় আরও বিস্তৃত সাংস্কৃতিক আন্দোলনের রূপ পাবে বলেও প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
বিশেষ অতিথি সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও লেখক আরিফ খান বলেন, সমাজে কিছু মানুষ থাকেন, যাঁরা তাঁদের কর্ম, চিন্তা ও সাধনার মধ্য দিয়ে সমাজকে সমৃদ্ধ করেন। আবু খালেদ পাঠান ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। কিশোরগঞ্জে বসেই তিনি তাঁর সাহিত্যসাধনা চালিয়ে গেছেন। তাঁর জীবন ও কর্ম স্থানীয় সমাজ ও সংস্কৃতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার।
তিনি সংবিধানের তিনটি অনুচ্ছেদের আলোকে সাহিত্যচর্চা এবং সাহিত্যসংশ্লিষ্ট মানুষের অধিকার ও মর্যাদার বিষয়গুলো তুলে ধরেন।
আরও পড়ুন: এআই দ্বারা লেখা বইয়ের জন্য নতুন সাহিত্য পুরস্কার চালু
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে আবু খালেদ পাঠান ফাউন্ডেশনের সভাপতি নায়লা ইয়াসমিন বলেন, কিশোরগঞ্জের কবি-সাহিত্যিকদের উৎসাহিত করা এবং তাঁদের সৃজনশীল অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়ার লক্ষ্যেই এ পুরস্কারের প্রবর্তন। সবার আন্তরিক সহযোগিতা ও অংশগ্রহণে এ উদ্যোগ আগামী দিনে আরও এগিয়ে যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পুরস্কার প্রদান কমিটির আহ্বায়ক লেখক ও সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ। এ সময় সাহিত্যিক, লেখক, সংস্কৃতিকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
একটি জনপদের সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাস কেবল তার খ্যাতিমান কবি-লেখকদের সৃষ্টিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর ভেতরে জড়িয়ে থাকেন নেপথ্যের সেইসব মানুষ, যাঁরা নীরবে জ্বালিয়ে রাখেন জ্ঞান, মনন ও সংস্কৃতির আলো। আবু খালেদ পাঠান ছিলেন তেমনই একজন নিবেদিতপ্রাণ মানুষ। কিশোরগঞ্জের মাটি ও মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল গভীর ও আত্মিক। শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা, সাহিত্যচর্চা এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের সময়কে সমৃদ্ধ করেছেন।
১৯৩৭ সালের ২৬ জুন কিশোরগঞ্জ পৌরসভাধীন পূর্ব তারাপাশা (সতাল) এলাকার পাঠানবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন আবু খালেদ পাঠান। শিক্ষাবিদ হিসেবে দীর্ঘ ৩৫ বছর শিক্ষকতা করেছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি যুক্ত ছিলেন সাংবাদিকতায়। কিশোরগঞ্জ প্রেস ক্লাব প্রতিষ্ঠায়ও তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা ও সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর লেখালেখি। জেলার বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে জনজীবন ও সাংস্কৃতিক পরিসরেও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। ২০২৩ সালের ১১ অক্টোবর তিনি প্রয়াত হন।
আরও পড়ুন: কবি শামসুর রাহমানের ৯৮তম জন্মদিন আজ, মৌলবাদ ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে সোচ্চার
তাঁর স্মৃতি, কর্ম ও আদর্শকে নতুন প্রজন্মের সাহিত্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত রাখার প্রত্যয় থেকেই ২০২৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর যাত্রা শুরু করে আবু খালেদ পাঠান সাহিত্য পুরস্কার। প্রথমবার এ পুরস্কার পান কবি ও সংগীতশিল্পী কফিল আহমেদ এবং কবি ও প্রাবন্ধিক আফরোজা সোমা। দ্বিতীয়বার ২০২৫ সালে এ সম্মাননায় ভূষিত হন কথাসাহিত্যিক সৈয়দ কামরুল হাসান এবং গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও নাট্যকার গোলাম শফিক।
তৃতীয়বারের এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে কবি আবিদ আনোয়ার ও সাহিত্যিক মাসুম মাহমুদের হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হলো। এ আয়োজন কেবল দুই সাহিত্যসাধকের অর্জনকে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি কিশোরগঞ্জের সাহিত্য-সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে নতুন করে স্মরণ করার, সৃজনশীল মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর এবং আগামী দিনের সাহিত্যযাত্রাকে প্রেরণা জোগানোর এক আন্তরিক প্রয়াস।
যে মানুষটি সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছেন জ্ঞান, শিক্ষা, সাহিত্য ও সমাজকল্যাণের সাধনায়, তাঁরই নামাঙ্কিত এ পুরস্কার আজ নতুন প্রজন্মের সৃজনশীল মানুষের হাতে তুলে দিচ্ছে স্বীকৃতি, সম্মান ও অনুপ্রেরণার দীপশিখা। সময়ের সীমানা পেরিয়ে তাঁর কর্ম ও আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখার পাশাপাশি নতুন সাহিত্যপ্রতিভার বিকাশে এ উদ্যোগ হয়ে উঠেছে এক অনন্য আলোকবর্তিকা। আবু খালেদ পাঠানের স্মৃতির প্রতি এর চেয়ে মহৎ, অর্থবহ ও হৃদয়স্পর্শী শ্রদ্ধার্ঘ্য আর কী হতে পারে!
আরও পড়ুন: কবি ও সাংবাদিক রথো রাফি হৃদরোগে মারা গেছেন
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন