১০:৫২ এম
রেদওয়ান আহমদ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ৬ নভেম্বর, ২০২৬ : কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিসত্তা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সাহিত্যকর্ম সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল, তবে সেই সময়ের কিছু অংশের বিরোধিতা ও বিদ্বেষের সম্মুখীনও হয়েছিল। ১৯২৯ সালে চট্টগ্রামের কাট্টলিতে কবিকে সংবর্ধনা জানিয়ে সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন মাওলানা তমিজুর রহমান। কবির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ করে তিনি রচনা করেন ২৬ পঙ্ক্তির একটি কাব্যিক মানপত্র।
দীর্ঘ ৯৭ বছর পর কাজী নজরুল ইসলামকে দেওয়া ঐতিহাসিক মানপত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। ১৯২৯ সালে কাট্টলি ইউনিয়ন ক্লাবের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কবিকে এই মানপত্রটি প্রদান করা হয়েছিল। সম্প্রতি মানপত্রটির একটি ফটোকপি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) নজরুল গবেষণা কেন্দ্রে সংরক্ষিত হয়েছে।
আরও পড়ুন: প্লাস্টিক দূষণ বন্ধের এখনই সময়: বরিশালে বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আলোচনা
মানপত্রটিতে নজরুলকে ‘বিশ্বকবি’, ‘অগ্নিকবি’, ‘বঙ্গরবি’ ও ‘অগ্নিবীণার বুলবুলি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তাঁর সাহিত্যপ্রতিভার তুলনা করা হয়েছে ফারসি সাহিত্যের বিখ্যাত কবি উরফি, সাদী, জামি, ফেরদৌসী, আনওয়ারি ও খাকানীর সঙ্গে। বাংলায় নজরুলের জন্মকে ‘বাঙালির ভাগ্য’ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
মানপত্রটি রচনা করেছিলেন কাট্টলি ইউনিয়ন ক্লাবের তৎকালীন সভাপতি মাওলানা তমিজুর রহমান, যিনি চট্টগ্রামের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি বহু ভাষাবিদ, শিক্ষাবিদ, লেখক, অনুবাদক ও ইসলামি গবেষক হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং তাঁর একাধিক গ্রন্থ ও অভিধান প্রণয়নের কৃতিত্ব রয়েছে। এই ২৬ পঙ্ক্তির কাব্যিক মানপত্রের শিরোনাম ছিল ‘অগ্নিকবি কাজী নজরুল ইসলামের খায়রে-মকদম উপলক্ষে’।
মাওলানা তমিজুর রহমানের নাতি সারওয়ার আলম কায়সার বাসসকে জানিয়েছেন, নজরুল তাঁর দাদার আমন্ত্রণে কাট্টলি ইউনিয়ন ক্লাবে এসেছিলেন। ১৯২৯ সালের ১১ জানুয়ারি কাট্টলির নাজির বাড়ির মাঠে কবিকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ওই অনুষ্ঠানে মানপত্রটি কাজী নজরুল ইসলামের হাতে তুলে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানটি প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী চলেছিল, যার সভাপতিত্ব করেন তমিজুর রহমান। সঞ্চালনা করেন মাহমুদুন্নবী চৌধুরী, যিনি যুক্তফ্রন্ট সরকারের সাবেক মন্ত্রী মাহমুদুন্নবী চৌধুরীর বাবা। তিনি অনুষ্ঠানে মানপত্রটি আবৃত্তি করেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নজরুল গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ফরিদুদ্দিন বাসসকে জানিয়েছেন, মানপত্রের কবিতাটি শুনে নজরুল এতটাই আবেগাপ্লুত ও মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তিনি সঙ্গে সঙ্গে মাওলানা তমিজুর রহমানকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। এ সময় তাঁকে ইরানের বিখ্যাত কবি হাফিজের সঙ্গে তুলনা করেন।
আরও পড়ুন: বরিশাল বিএম কলেজের শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ
অধ্যাপক ফরিদুদ্দিন জানান, ওই সংবর্ধনা সভায় নজরুলকে নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবও গৃহীত হয়েছিল। সেই প্রস্তাবে তাঁকে বাংলার ‘শ্রেষ্ঠকবি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।
প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়, “এই সভা বাঙ্গালার ‘শ্রেষ্ঠ-কবি’ কাজী নজরুল ইসলাম সাহেবকে বাঙ্গালার তরুণ মুসলিম নেতা বলিয়া স্বীকার করিতেছে এবং যে সকল স্বার্থপর নেতা ও সংবাদপত্র তাঁহার বিরুদ্ধে নানা অমূলক আন্দোলন চালাইতেছেন এই সভা তাঁদের তীব্র নিন্দা করিতেছে। কলিকাতা নগরে নজরুল ইসলামের সম্বর্ধনায় যে আয়োজন হইতেছে এবং এ সম্পর্কে যে সমস্ত প্রস্তাব গৃহীত হইয়াছে এই সভা তাহার পূর্ণ সমর্থন করিতেছে।”
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) সাবেক কর্মকর্তা সাইফুদ্দিন আহমদ সাকি ৯৭ বছর আগের এই ছাপা মানপত্রটির সন্ধান প্রথম পান। প্রায় তিন দশক আগে মাওলানা তমিজুর রহমানের বড় ছেলে শামসুল আলমের কাছ থেকে তিনি এটি সংগ্রহ করেন। পরে গত ৪ জুলাই চট্টগ্রামের তরুণ লেখক ও গবেষক শামস সাইমুম মানপত্রটির একটি কপি সংগ্রহ করে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ফরিদুদ্দিনের কাছে হস্তান্তর করেন।
সাইফুদ্দিন সাকি জানিয়েছেন, মানপত্রটি ছাপা হয়েছিল চট্টগ্রামের এসলামাবাদ প্রেস থেকে। এই প্রেসের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মাওলানা আজিজুর রহমান। মানপত্রের গায়ে ছাপার সাল ও মাস হিসেবে উল্লেখ রয়েছে ‘জানুয়ারি, ১৯২৯’। তবে এর মূল কপিটির আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন: হারানো পোষা বিড়াল ফিওনা’র সন্ধানে পুরস্কার ঘোষণা
অধ্যাপক ফরিদুদ্দিন বলেন, তমিজুর রহমানের এই মানপত্রের কথা বাংলাদেশের নজরুল গবেষক অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলামের ‘নজরুলের স্মৃতিধন্য চট্টগ্রাম’ বইতেও উল্লেখ নেই। এতদিন এটি পাঠক ও গবেষকদের নজরের আড়ালে ছিল।
তিনি জানান, এক আত্মীয়ের মাধ্যমে প্রথম মানপত্রটির খোঁজ পান তিনি। তবে তখন এর কোনো কপি সংগ্রহ করতে পারেননি। পরে বিষয়টি তিনি শামস সাইমুমকে অবহিত করেন।
শামস সাইমুম বাসসকে বলেন, কর্নেলহাট এলাকায় থাকার সময় স্থানীয় লোকজনের মুখে মানপত্রটির প্রথম দুই-চারটি লাইন শুনেছেন তিনি। এলাকার প্রায় সবারই সেগুলো মুখস্থ ছিল। কিন্তু পরের অংশটুকু কারও জানা ছিল না। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর সাইফুদ্দিন সাকির কাছে মানপত্রটির সন্ধান পান তিনি। পরে এর একটি কপি অধ্যাপক ফরিদুদ্দিনের কাছে তুলে দেন। নজরুল গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে তিনিই এটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে পারবেন—এমন বিবেচনা থেকেই কপিটি তাঁর কাছে দেওয়া হয়।
অধ্যাপক ফরিদুদ্দিনের মতে, মাওলানা তমিজুর রহমানের এই মানপত্র ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। তিনি বলেন, যখন পূর্ব বাংলার একশ্রেণির মানুষ নজরুলের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছিল, প্রতিক্রিয়াশীল সমাজ কবিকে অবজ্ঞা করছিল এবং তাঁর বিরুদ্ধে ‘কাফের’ ফতোয়া দেওয়া হয়েছিল, তখন তমিজুর রহমানের এই সংবর্ধনা ও মানপত্র ছিল এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। সে সময় এমন উদ্যোগ নেওয়া ছিল সাহসের ব্যাপার।
আরও পড়ুন: তালতলীতে সোনাকাটা ইকোপার্কের বেহাল দশা, এক যুগেও হয়নি সংস্কার
তিনি আরও বলেন, নজরুলকে দেওয়া ওই সংবর্ধনা ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। সেদিন কর্নেলহাট চত্বর জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল।
সাইফুদ্দিন সাকি বাসসকে বলেন, মানপত্রটিতে নজরুলের সাহিত্যপ্রতিভা, বিদ্রোহী চেতনা ও মানবতাবাদী দর্শনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধার প্রকাশ ঘটেছে। তৎকালীন চট্টগ্রামের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সমাজে নজরুলের গ্রহণযোগ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে আছে এটি।
মানপত্রে নজরুলকে ‘বিশ্বকবি’ হিসেবে অভিহিত করা প্রসঙ্গে অধ্যাপক ফরিদুদ্দিন বলেন, মাওলানা তমিজুর রহমানের আগে নজরুলকে এই উপাধিতে ভূষিত করার কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তাঁর মতে, নজরুল প্রকৃত অর্থেই বিশ্বকবি। তাঁর কবিতা জাতি, ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি, দেশ, কাল কিংবা মানচিত্রের ভেদাভেদ মানে না। পৃথিবী যতদিন টিকে থাকবে, শাসক ও শোষিতের লড়াই যতদিন চলবে, ততদিন নজরুল নিত্য-আধুনিক হয়ে ফিরে আসবেন।
বিশিষ্ট কবি, সম্পাদক ও নজরুল গবেষক আবদুল হাই শিকদার বাসসকে বলেন, এর আগে নজরুলকে কেউ ‘বিশ্বকবি’ উপাধি দিয়েছেন বলে জানা যায় না। নজরুল বলেছেন, ‘আমি হয়তো এই ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণ করেছি। কিন্তু আমি সকল কালে সকল মানুষের কবি।’ তাঁর সাহিত্যসাধনায় এমন কিছু পাওয়া যায় না, যেখানে তিনি শুধু বাঙালি কিংবা বাঙালি মুসলমানের কথা বলেছেন।
আরও পড়ুন: বাবুগঞ্জে মেয়েদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হাইজিন কর্নার স্থাপন
তিনি বলেন, নজরুলের ‘মানুষ’ কবিতায় মানুষ বলতে কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, বর্ণ, জাতি কিংবা ভাষাভাষীর মানুষকে বোঝানো হয়নি; বরং সব যুগের, সব কালের মানুষকেই বোঝানো হয়েছে।
নজরুল সম্পর্কে নিজের উপলব্ধি তুলে ধরে আবদুল হাই শিকদার আরো বলেন, ‘নজরুল হয়তো নিজের দেশকে ভালোবেসেছেন, কিন্তু দেশকে ভালোবাসার মধ্য দিয়েই তিনি বিশ্বনাগরিক হয়ে উঠেছেন। এ কথা ধ্রুবতারার মতো সত্য।’
নিচে কাব্যমানপত্রটি হুবহু তুলে ধরা হলো—
অগ্নি-কবি কাজী নজরুল ইসলামের খায়রে-মকদম উপলক্ষে-
আরও পড়ুন: পিরোজপুরে বিশ্ব পরিবেশ দিবসে বিএনপির বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি
আজ আমাদের গুলশনেতে ফুল ফুটেছে শীতের কালে,
অগ্নিবীণার বুল্ বুলিটী গাইবে গযল ডালে ডালে।
আয়রে দয়েল, আয় পাপিয়া,
ভক্তি গুলের হার গাঁথিয়া,
আগমনীর নায্ রানা দে, বিশ্ব-কবি নজ্রুল গলে,
গরীর দেশে আর কি আছে তোহ্ফা দিতে চরণ তলে।
আয়রে কবি, বঙ্গ-ুরবি,
আঁকিয়ে দে তোর রক্ত-ছবি,
বিশ্বজোরা কীর্ত্তি তোমার থাকুক লিখা যুগের তালে,
হিংসা-অনল দগ্ধীভূত করুক তোমার শত্রু দলে।
উরফি তুমি, ছাদি তুমি,
জামি ও ফেরদৌছি তুমি,
আনওয়ারী, খাকানী তুমি, ঘোষবে জগৎ কালে কালে
বঙ্গদেশে জন্মেছিলে বাঙ্গালীদের ভাগ্যফলে।
সর্ব্বহারা জাতি মোরা,
হিংসা দ্বেষে দেলটী ভরা,
গুণের আদর করতে জানে কয়জন আছে মোদের দলে;
তাইত এই বিশাল জাতি যাচ্ছে ক্রমে রসাতলে।
তুমি কবি ভাবের আকর,
ভাবগুলি ত তোমার চাকর,
অনায়াসে ভাবের ধারা আনতে পার এমন ছলে,
দোশ্ মনেরাও দোস্ত হয়ে নাচে যেমন তোমার তালে।
ধ্বংস পথের যাত্রী মোরা,
তরক্কি পথ চাই আমরা,
তুমি পার কাব্য ছলে পথ দেখা’তে সর্ব্ব-দলে;
বিশ্ব-প্রেমের কীর্ত্তি যেন বজায় থাকে ধরাতলে।
কাট্টলি ইউনিয়ন ক্লাব, চট্টগ্রাম।
[Composed by Moulvi Tamizur Rahman, the President of the Club]
———————————————————------------------------————————————
January, 1929.
এসলামাবাদ প্রেস, চট্টগ্রাম।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন