০৩:২৯ পি.এম
কুড়িগ্রামের সাবেক জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং বর্তমান চট্টগ্রাম বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার নুসরাত সুলতানা সরকার যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি লাভ করেছেন। তাঁর এই সাফল্যে কুড়িগ্রামের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে বইছে আনন্দের বন্যা। সোসাল মিডিয়ায় চলছে তাঁর সাফল্য কামনা করে বার্তা, বিশেষ করে দুর্গম চরাঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত বাসিন্দাদের মাঝে আনন্দের বন্যা বইছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পটপরিবর্তন-পরবর্তী দেশের এক অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং সময়ে, ওই বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসক হিসেবে কুড়িগ্রামে যোগদান করেছিলেন নুসরাত সুলতানা। ২০২৫ সালের ৩০ আগস্ট বদলি হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত প্রায় এক বছরের কার্যকালে তিনি জেলার সামগ্রিক উন্নয়ন এবং চরাঞ্চলের পিছিয়ে পড়া মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে অত্যন্ত সাহসী ও মানবিক ভূমিকা পালন করেন।
এসি রুমের মায়া ত্যাগ করে চরের তপ্ত বালুতে দেশের অন্যতম দরিদ্র জেলা কুড়িগ্রামের ১৬টি নদ-নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন প্রায় সাড়ে ৮শ’ বর্গকিলোমিটার চরাঞ্চলে ৪ শতাধিক চরের মধ্যে প্রায় আড়াই শতাধিক চরে বসবাসকারী সাড়ে ৫ লক্ষ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে তিনি দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করেছেন। এসি রুমের মায়া ত্যাগ করে কখনো ঘোড়ার গাড়ি, কখনো ভাঙা মোটরবাইক, আবার কখনো তপ্ত বালুচর পায়ে হেঁটে তিনি চিলমারীর অষ্টমীর চর, নাগেশ্বরীর দুর্গম নারায়ণপুর এবং তিস্তার বিদ্যানন্দ চরের মানুষের দ্বারে দ্বারে ছুটে গেছেন।
আরও পড়ুন: রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করলেন মাভাবিপ্রবি উপাচার্য
চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদ কুড়িগ্রাম জেলার সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, 'সাবেক জেলা প্রশাসক নুসরাত সুলতানার মূল লক্ষ্যই ছিল কুড়িগ্রামকে দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্ত করা। চরাঞ্চলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সংকটের পাশাপাশি বাল্যবিবাহের কারণে জেলায় প্রতিবন্ধী জনসংখ্যা প্রায় ১ লাখে দাঁড়িয়েছিলো। তিনি বিশ্বাস করতেন চরের উন্নয়ন ছাড়া জেলার উন্নয়ন সম্ভব নয়।'
জেলা উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সাইয়েদ আহমেদ বাবু জানান, নুসরাত সুলতানা কুড়িগ্রামের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে বেশ কিছু দূরদর্শী মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে: ডিসি পার্ক নির্মাণ: ধরলা নদীর পাড়ে ৩০ কোটি টাকার বালু ভরাট ও প্রায় দেড় কোটি টাকা সরকারি বরাদ্দে প্রস্তাবিত ‘ডিসি পার্ক নির্মাণ। তিনি আরও জানান, চরের মানুষের স্থায়ী দুঃখ দূর করতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আদলে একটি স্বাধীন ‘চর বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ গঠনের জন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ে ঐতিহাসিক প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন নুসরাত সুলতানা, যা দেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে এক দূরদর্শী ও অনন্য নজির।
কুড়িগ্রামের উন্নয়নে তিনি নানামুখী মহাপরিকল্পনা নিয়েছিলেনঃ রেলপথ সংযোগ: সোনাহাট স্থলবন্দর থেকে ভূরুঙ্গামারী-নাগেশ্বরী-কুড়িগ্রাম-চিলমারী-গাইবান্ধা হয়ে ঢাকা পর্যন্ত সরাসরি রেলপথ সংযোগের মহাপরিকল্পনা।
অর্থনৈতিক অঞ্চল: কুড়িগ্রাম সদরের ধরলা ব্রিজ সংলগ্ন ভুটানিজ অর্থনৈতিক জোন দ্রুত চালুকরণ এবং সোনাহাট স্থলবন্দর আধুনিকায়নের উদ্যোগ।
আরও পড়ুন: নওগাঁয় ভাড়া বাসায় জাল টাকার কারবার, ডিবির হাতে গ্রেপ্তার জব্বার
নৌপথ সচল: নৌপথ সচল রাখতে ধরলা নদী ড্রেজিংয়ের কাজ শুরুকরণ।
এছাড়াও চরের নারীদের স্বাবলম্বী করা, যুবকদের বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণ এবং বন্যার সময় চরের শিশু ও প্রবীণদের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য নানামুখী টেকসই পরিকল্পনা করেছিলেন এই কর্মকর্তা।
কেন অকালে বদলি হতে হয়েছিলো? স্থানীয় সূত্র জানায়, কুড়িগ্রামে নুসরাত সুলতানার এই গতিশীল কর্মযজ্ঞ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি এক অদৃশ্য প্রশাসনিক টানাপোড়েনের কারণে।
অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু জানান, জেলা প্রশাসকের কিছু সাহসী কর্মকাণ্ডে স্থানীয় এনজিও নেতার সাথে তার দূরত্ব তৈরি হয়। পরবর্তীতে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পানি সম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের সাথে বনিবনা না হওয়ায় এক年的 মাথায় কুড়িগ্রাম থেকে তাঁকে বদলি করা হয়। তবে জেলা প্রশাসক নুসরাত সুলতানা একজন সম্পূর্ণ নিরহংকারী এবং মানবিক মানুষ ছিলেন। মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ছিল তার ব্রত।
আরও পড়ুন: মাগুরায় বিএনপি নেতা হত্যা মামলায় সাবেক ওসি ও এসআইকে কারাগারে পাঠাল আদালত
বর্তমানে চট্টগ্রাম বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে দূর সমুদ্র উপকূলে কর্মরত থাকলেও, যুগ্ম সচিব পদে তাঁর এই পদোন্নতিকে কুড়িগ্রামের অবহেলিত চরাঞ্চলের অধিকারবঞ্চিত মানুষেরা নিজেদের গৌরব হিসেবে দেখছেন। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, যেখানেই থাকুন না কেন, এই মানবিক আমলা কুড়িগ্রাম ও চরের মানুষের কথা ভুলে যাবেন না।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন