০২:৫৪ এম
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচলের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নৌ-নির্দেশনা সেবার বিপরীতে ফি আরোপের একটি নতুন প্রস্তাব ইউরোপীয় দেশগুলো বিবেচনা করছে। তবে এই ফি সম্পূর্ণরূপে বাধ্যতামূলক হবে না এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও)-এর সমর্থন থাকলেই এটি কার্যকর করা হতে পারে, এমন তথ্য আলোচনায় উঠে এসেছে।
ব্রিটেনের উপপ্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেছেন, যদি হরমুজ প্রণালিতে বাধ্যতামূলক টোল আরোপ করা হয়, তাহলে তা বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে পরিণত হবে। তবে ব্রিটিশ সরকারের কিছু মন্ত্রী মনে করছেন, মালাক্কা প্রণালি ও ইংলিশ চ্যানেলের মতো আন্তর্জাতিক জলপথে নির্দিষ্ট নৌ-সেবার জন্য যে অর্থ নেওয়া হয়, একই ধরনের ব্যবস্থা হরমুজে নিয়েও আলোচনা করা যেতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে আহ্বান জানিয়েছে, যেন তারা জানান দেয় যে, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রয়েছে এবং এই পথে ব্যবহারকারী বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা যেন নিশ্চিত করা হয়। ওয়াশিংটনের বক্তব্য, তেহরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কারণে এ বিষয়ে সমঝোতা ও বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ছে। যদিও ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতিসহ সকল বিষয়ে দেশের নেতৃত্ব ঐক্যবদ্ধ রয়েছে।
আরও পড়ুন: জাতিসংঘে মানবাধিকারভিত্তিক অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের আহ্বান বাংলাদেশ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উল্লেখ করেন, যুদ্ধবিরতির অন্তর্বর্তী চুক্তি কার্যত শেষ হয়ে গেছে। তবে স্থায়ীভাবে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা চালিয়ে যাবে, এমনটিও তিনি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি ইরানের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ তুলেছেন এবং কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
অন্যদিকে, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে এবং নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি একটি বিবৃতিতে ঘোষণা করেছেন, তার বাবার হত্যা প্রতিশোধ নেওয়ার ইচ্ছা জাতির।
হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওমান ইতোমধ্যে মালাক্কা প্রণালির সহযোগিতামূলক মডেলের আদলে একটি সংগঠিত প্রস্তাব তৈরি করেছে। ব্রিটিশ আইন বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় প্রস্তুত ওই পরিকল্পনাকে ব্যাখ্যা করতে ওমান তাদের আইন বিশেষজ্ঞদের তেহরানে পাঠাতে আগ্রহী।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি হরমুজ প্রণালি এবং নৌ-সুরক্ষা নিয়ে আলোচনার জন্য ওমান সফর করবেন। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানও আশা প্রকাশ করেছেন, এ বিষয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে দ্রুত সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে।
আরও পড়ুন: বিশ্ববাজারে আবারও বাড়ল তেলের দাম
কিন্তু কূটনৈতিক তৎপরতার মাঝে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল মার্কিন ডলারে বিক্রির ক্ষেত্রে যেসব ছাড় দিয়েছিল, তা প্রত্যাহার করেছে।
হরমুজ প্রণালির অধিকাংশ নৌপথ বর্তমানে ওমানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। দেশটি বাধ্যতামূলক টোলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। কাতারও বলেছে, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন উপেক্ষা করে ইরানকে প্রণালির ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হলে তা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হবে।
তবে কূটনৈতিক সূত্রের মতে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর একটি অংশ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন মেনে চলতে অনাগ্রহী, অন্য অংশ সহযোগিতার পক্ষে সক্রিয়। তাই এ বিষয়ে তেহরানের অভ্যন্তরে মতপার্থক্য রয়েছে।
লন্ডনে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) কাউন্সিল বৈঠককালে ওমানের প্রতিনিধি খামিস বিন মোহাম্মদ আল শামাখি মন্তব্য করেন, আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধ নৌ-চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করা এবং বাধ্যতামূলক ট্রানজিট ফি আরোপের সুযোগ নেই। তবে নৌ-নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং দুর্ঘটনা মোকাবিলা সংক্রান্ত স্বেচ্ছাভিত্তিক নৌ-সহায়তা সেবা চালুর বিষয়ে আলোচনা করা হতে পারে।
আরও পড়ুন: জামায়াত নেতাদের ভারতীয় গোয়েন্দাদের সঙ্গে বৈঠকের দাবি, রাশেদকে চ্যালেঞ্জ
এখনো উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ ও ইউরোপীয় রাষ্ট্র আইএমওতে ইরানের বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছে, কিন্তু রাশিয়া ও চীন এ প্রস্তাব সমর্থন করেনি। রাশিয়ার মতে, প্রস্তাবটি সংকটের মূল কারণকে উপেক্ষা করেছে। চীনের বক্তব্য হলো, এটি একপেশে এবং আইএমওর এখতিয়ারের বাইরে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানাচ্ছে, বর্তমানে মূল বিতর্ক দুই বিষয়কে কেন্দ্র করে চলছে। এক হলো, হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি চালু হবে, কিভাবে এর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা হবে এবং অপরটি হচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদে প্রণালির প্রশাসনিক কাঠামো কেমন হবে এবং মালাক্কা প্রণালির মডেল ইরানের জন্য গ্রহণযোগ্য কি না।
গত মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে ইরান ৬০ দিনের জন্য কোনো অতিরিক্ত চার্জ ছাড়াই বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের দাবী, এর অর্থ এই নয় যে, ইরানের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করতে পারবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, মে মাসের শুরু থেকে তাদের বাহিনী ৮০০টিরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ এবং প্রায় ৩৮ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিরাপদে হরমুজ প্রণালী অতিক্রমে সহায়তা করেছে। অন্যদিকে আইআরজিসি নৌবাহিনী দাবি করেছে, সমঝোতা অনুযায়ী তাদের দায়িত্ব তারা পালন করেছে এবং হরমুজ প্রণালিতে বিদেশি বাহিনীর কোনো ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই।
আরও পড়ুন: লাভরভ: ইউরোপের নেতারা রাজনৈতিক আত্মনিপীড়ক
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন