১১:১৩ এম
উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য ছোট দেশের পরিণতি থেকে নিজেকে আলাদা রাখতে সংযুক্ত আরব আমিরাত দুই দশক ধরে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এ বিষয়ে, দেশটি বিভিন্ন ধরনের নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি বন্দর নির্মাণ, প্রভাব অর্জন, প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশে মিলিশিয়া বাহিনী গড়ে তোলা, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সুসম্পর্ক এবং মস্কো ও বেইজিংয়ের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখার মতো কৌশল অবলম্বন করেছে। এইসব পদক্ষেপের মাধ্যমে আমিরাত দুই দশকে নিজেদের একটি চটপটে, ধনী এবং অত্যন্ত দরকারি দেশ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে এসেছে এবং ভৌগোলিকভাবে কোণঠাসা হওয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করতে চেয়েছে। এইভাবে, আমিরাত নিজেকে উপসাগরীয় অঞ্চলের ‘লিটল স্পার্টা’ বা ‘ছোট অজেয় সামরিক শক্তি’ হিসেবে পরিচিত করার চেষ্টা করেছে। ‘লিটল স্পার্টা’ শব্দটি ডাকনামের চেয়ে একটি মতবাদের মতো শোনায়। একটি ছোট ফেডারেশন হিসেবে, আমিরাতের রয়েছে মধ্যম শক্তির উচ্চাকাঙ্ক্ষা, তুলনামূলক সামরিক উৎকর্ষ এবং নিজস্ব শর্তে কৌশলগত পরিবেশকে পরিবর্তন করার যথেষ্ট নেটওয়ার্কগত প্রভাব। কিন্তু ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গত তিন মাসে আবুধাবির উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে যে দুরত্ব, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আমিরাতসহ উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও অন্যান্য অবকাঠামোতে ইরানের হামলা আবুধাবির মধ্যম শক্তির দেশ হিসেবে নিজেকে দেখার ধারণার সঙ্গে কাঠামোগত দুর্বলতার তফাত স্পষ্ট করেছে। আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ সম্প্রতি তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট এক্স-এ (সাবেক টুইটার) পোস্ট করে প্রতিবেশী ও অংশীদারদের তীব্র সমালোচনা করেছেন। এই পোস্টে, তিনি লিখেছেন, ‘বন্ধুরা অবিচল মিত্র ও সমর্থক না হয়ে মধ্যস্থতাকারীতে পরিণত হয়েছে।’ এই মন্তব্য ইরানের বিরুদ্ধে আরো আক্রমণাত্মক অবস্থান গ্রহণ করতে প্রতিবেশী ও অংশীদারদের ঐক্যবদ্ধতায় আবুধাবির হতাশাই তুলে ধরেছে। হাসবে গত মাসে একটি প্রবন্ধে আমিরাতের ভাষ্যকার তারেক আল-ওতাইবা ইরানের আগ্রাসন প্রতিহত করতে আরব দেশগুলোর অক্ষমতার জন্য নিন্দা করেন। এর এক মাস আগে, ওয়াশিংটনে নিযুক্ত আমিরাতের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ আল-ওতাইবা একটি মতামত কলামে হরমুজ প্রণালি আবার খোলার জন্য একটি ‘আন্তর্জাতিক উদ্যোগে’ যোগ দেওয়ার জন্য আবুধাবির প্রস্তুতির কথা ঘোষণা করেছিলেন এবং আমিরাত পরিচালনাগত ব্যয় ভাগ করার জন্য প্রস্তুত বলে উল্লেখ করেন। এই সংকেতগুলোতে যে কঠিন সত্যটির আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে, তা হলো—ইরানের প্রবল সামরিক শক্তির মুখে আমিরাতের অর্জিত প্রভাবের উৎসগুলো বাস্তবে কার্যক্ষম নয়। প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদের অধীনে, আমিরাত সামরিক শক্তি অর্জনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপরিচালনার বিভিন্ন দিক নিখুঁত করেছে। ইয়েমেন থেকে সুদান পর্যন্ত, আমিরাত তার পক্ষের সশস্ত্র শক্তি বা প্রক্সিকে সমরাস্ত্র ও রসদ সরবরাহের করিডোর এবং কেন্দ্র তৈরি করেছে। পাশাপাশি, সার্বভৌম সম্পদ তহবিল গড়ে তোলা, তথ্য ও গণমাধ্যম নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা, বিভিন্ন পণ্যের ব্যবসা করা এবং বেসরকারি সামরিক ও নিরাপত্তা সংস্থা স্থাপন করা, এসব কিছুর মাধ্যমে আমিরাত তার আকারের তুলনায় অনেক বেশি সক্ষমতা অর্জন করেছে। সাক্ষাৎ এই মডেলটি সংঘাত ও কূটনৈতিক দর-কষাকষির সুযোগ করে দিয়েছে, কিন্তু ইরান যুদ্ধ আমিরাতকে বাস্তব পরিস্থিতির সামনে দাঁড় করিয়েছে। আমিরাতে ইরানের হামলা প্রকাশ করেছে যে, উপসাগরীয় অঞ্চলে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অর্জিত ক্ষমতা ফল নির্ধারণে কার্যকর শক্তিতে রূপায়িত হয় না। যখন ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) পরিস্থিতি আরও গুরুতর করার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন আমিরাতের নানামুখী সক্ষমতা ইরানের বিরুদ্ধে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। আমিরাত রুশ অর্থ এবং দেশটির অলিগার্কদের নিজেদের সক্ষমতার প্রতি আকৃষ্ট করতে পারলেও, মস্কো ইরানের বিরুদ্ধে আবুধাবির সমর্থনে এগিয়ে আসেনি। অপরদিকে, বেইজিং শুধু বিবৃতি দিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চিরাচরিত ভাষা ব্যবহার করেছে। ওয়াশিংটন, আমিরাতের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিলেও কার্যকর প্রতিরোধে সামান্যই এগোতে পেরেছে। যে কাঠামোটি আরব বিশ্বে আমিরাতকে অপরিহার্য করে তুলেছিল, সেটি এখন সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ করে দিয়েছে। বৈশ্বিক পুঁজির কেন্দ্র, বিশ্ববাণিজ্যের রসদ সরবরাহ কেন্দ্র এবং বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর অংশীদার হওয়ায়, সংযুক্ত আমিরাতকে আইআরজিসির প্রধান টার্গেটে পরিণত করেছে। কৌশলগতভাবে আমিরাতকে দুর্বল করার জন্য ইরানের শুধুমাত্র এটুকুই করা দরকার—বিনিয়োগকারী, বীমাকারী, জাহাজ কোম্পানি এবং প্রবাসীদের এটি মনে করিয়ে দেওয়া যে, উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তাহীনতার ক্ষেত্রে আমিরাত কোন ব্যতিক্রম নয়। এ কারণে, আমিরাতের বর্তমান বাগাড়ম্বর তো ভঙ্গুর শোনাচ্ছে। আমিরাত তার ‘লিটল স্পার্টা’ বা অপরাজেয় সামরিক শক্তির ইমেজ বজায় রাখতে চায়। দেশটি চাচ্ছে যে, তারা সুশৃঙ্খল, প্রতিবেশীদের তুলনায় বেশি সক্ষম এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য ছোট রাষ্ট্রের মতো অরক্ষিত নয়। কিন্তু ইরান যুদ্ধ দেখিয়েছে যে, আমিরাতও উপসাগরীয় অন্য ছোট দেশের মতো একই ধরনের আঞ্চলিক চাপের সম্মুখীন হয়েছে। নিজেদের সুরক্ষিত—আমিরাতের এই আস্ফালন এখন মিথ্যা প্রমাণিত। আমিরাতের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে ইরানের হামলার প্রতিশোধ নিতে পাল্টা হামলা, আইআরজিসির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ভারসাম্য পুনরুদ্ধারে সামান্যই ভূমিকা রাখবে। কারণ, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত (জিসিসি) দেশের তুলনায় আইআরজিসির সামরিক সক্ষমতা অনেক বেশি। ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযানে অংশ নিতে প্রতিবেশীদের আকৃষ্ট করার আমিরাতের প্রচেষ্টার পরই দেশে একাধিক হামলা চালায় ইরান। তবে, কোন দেশই আমিরাতের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। এরপর থেকেই, আমিরাত এসব দেশের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে প্রস্তুত হয়নি। আমিরাত, জিসিসিকে একটি প্রয়োজনীয় আঞ্চলিক ব্যবস্থা হিসেবে দেখার চেয়ে নিজেদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার পথে বড় বাধা হিসেবে বিবেচনা করেছে। তবে, এখন চাপের মুখে তারা বুঝতে পারছে যে, যেসব প্রতিবেশীকে তারা একসময় কৌশলগতভাবে পরাস্ত করেছিল, তাদের সহযোগিতা ছাড়া আমিরাত তার নিজের অবস্থানকে স্থিতিশীল করতে পারবে না। আমিরাতের নিরাপত্তার কার্যকর পথ হলো একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকা, যেখানে সৌদি আরব, কাতার, ওমান, কুয়েত, বাহরাইন এবং আরব আমিরাত স্বীকার করবে যে, তাদের নীতি ভিন্ন হলেও দুর্বলতাগুলো অভিন্ন। এমন ভান করার আর কোনো সুযোগ নেই যে, তাদের মধ্যে একজন নিজেকে সুরক্ষিত করবে এবং বাকিরা ঝুঁকি কমাবে কিংবা নিজেদের ক্ষতি করবে। আবুধাবিকে অবশ্যই পাকিস্তান, কাতার অথবা ওমানের মধ্যস্থতাকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে এবং এটিকে শ্রম বিভাজনের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। সৌদি সতর্কতাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা বন্ধ করে, রিয়াদের কৌশলগত গভীরতা ও জ্বালানি শক্তিকে একটি সম্পদ হিসেবে স্বীকার করতে হবে, যা আমিরাতের নেতৃত্বাধীন কোনো নিরাপত্তা কাঠামো প্রতিস্থাপন করতে পারে না। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই অঞ্চলে যে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছেন, তাতে আমিরাতের প্রতিরক্ষায় অভিযানিক সহায়তার জন্য ইসরাইলের সুবিধাবাদী মনোভাব, একটি অভিন্ন উপসাগরীয় নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভৌগোলিক নৈকট্যের ক্ষতিপূরণ করতে পারে না। আবুধাবি তার ভাগ্য নিজেই গড়তে পারে তখনই, যখন সে স্বীকার করবে যে, সে একা তা গড়তে পারে না। একটি মধ্যম শক্তি হিসেবে তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা কোনো সমস্যা নয়, সমস্যাটি হলো এই বিশ্বাস যে, মধ্যম শক্তির সক্রিয়তা ছোট রাষ্ট্রগুলোর দুর্বলতা মুছে ফেলতে পারে। আমিরাতের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা শ্রেষ্ঠত্বের জোরালো বক্তব্য দিয়ে সুরক্ষিত হবে না, কিংবা এই অলীক কল্পনা দিয়েও নয় যে ‘লিটল স্পার্টা’ উপসাগরীয় অঞ্চলের সম্মিলিত ভাগ্য থেকে নিজেকে আলাদা রাখতে পারে। এর নিরাপত্তা যদি আদৌ সুরক্ষিত হয়, তবে তা হবে এই বাস্তবসম্মত উপলব্ধির মাধ্যমে যে, উপসাগরীয় অঞ্চলের সব দেশ একই ছায়ার নিচে বাস করে, যদিও তাদের ছায়াগুলো ভিন্ন ভিন্ন হয়।
মিডল ইস্ট আই থেকে ভাষান্তর: মেতালেব জামালী
আরও পড়ুন: পাকিস্তান-আফগান সীমান্তে তালেবানের হামলায় ১ নিহত, ৫ আহত
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন