০৭:৪৩ এম
বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে স্বর্ণের দাম আবারও বাড়ছে। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর চাহিদা বাড়ানোর ফলে মূল্যবান এই ধাতুটির বাজারে নতুন গতি তৈরি হয়েছে।
কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতি আউন্স প্রায় ৪ হাজার ডলারে স্থির থাকার পর আগস্টের শুরু থেকে স্বর্ণের দাম প্রায় ৪০০ ডলার বা ১০ শতাংশ বেড়েছে। এর ফলে চলতি আগস্টে স্বর্ণের দাম এই শতাব্দীর সেরা মাসগুলোর একটি দিকে এগোচ্ছে। এর আগে কোনো মাসে স্বর্ণের দাম ১৩ শতাংশ বা তার বেশি বেড়েছিল ১৯৯৯ সালের সেপ্টেম্বরে।
স্বর্ণের সাম্প্রতিক এই উত্থানের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে ফেডারেল রিজার্ভের নমনীয় সুদনীতি, দুর্বল কর্মসংস্থানের তথ্য এবং তুলনামূলক সহনীয় মুদ্রাস্ফীতি। এসব কারণে ফেডের সুদের হার বাড়ানোর প্রত্যাশা কমেছে এবং ডলারের দরও কমেছে। সাধারণত দুর্বল ডলার স্বর্ণের দাম বাড়াতে সহায়তা করে।
আরও পড়ুন: কক্সবাজারে নলকূপ খননের স্থান থেকে গ্যাসের আগুন, বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে
তবে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভূ-রাজনৈতিক ও নীতিগত পরিস্থিতি, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে স্বর্ণের আকর্ষণ বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধের পরিস্থিতি আবারও তীব্র হয়েছে। ফলে একটি শান্তি 'চুক্তি'র সম্ভাবনাও ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসার পথ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। সংঘাত বাড়ানো বা আত্মসমর্পণই একমাত্র বিকল্প নয়। তবে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা নিয়ে কিছু বিশ্লেষক উদ্বিগ্ন।
এদিকে ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতা এবং এর চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শের মুদ্রাস্ফীতি মোকাবেলার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে। জুলাইয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ওয়ার্শের মন্তব্যে বিনিয়োগকারীরা সন্তুষ্ট হননি।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিয়োগের পর থেকে ট্রাম্প ওয়ার্শকে একাধিকবার ফোন করেছেন। পাশাপাশি ফেডের গভর্নর লিসা কুককে বরখাস্ত করার প্রচেষ্টাও আবার শুরু হয়েছে।
এসব ঘটনা বন্ড বাজারেও অস্থিরতা তৈরি করেছে। বেঞ্চমার্ক ১০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি নোটের ইল্ড গত ১৮ মাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সময়ে ৩০ বছর মেয়াদি বন্ড এবং ৩০ বছর মেয়াদি মুদ্রাস্ফীতি-সুরক্ষিত বন্ডের ইল্ড যথাক্রমে ২০০৭ ও ২০০৮ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
আরও পড়ুন: কুমিল্লায় রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যা মামলায় পাঁচজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট
এমন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো নিউইয়র্ক ফেডে তাদের কাস্টডিতে থাকা মার্কিন ট্রেজারির পরিমাণও কমিয়ে চলেছে। এসব সম্পদের পরিমাণ ২০১২ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।
অর্থনীতিবিদ ফিল সাটল গত সপ্তাহে লিখেছেন, বিশ্বের রিজার্ভ মুদ্রা সরবরাহের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যে বৈশ্বিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণের সুবিধা পেয়েছে, তা এখন শেষ হওয়ার পর্যায়ে রয়েছে। এর পরের ধাপে বিদেশি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো মার্কিন ঋণ ধরে রাখার বিষয়ে আরও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠতে পারে।
এসব কারণে স্বর্ণের দামে এত বড় উত্থান ঘটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। কিন্তু সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করলে স্বর্ণের দাম বাড়ার পেছনে শক্তিশালী কারণ তৈরি হয়। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রথম প্রান্তিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনার গতির কিছুটা কম থাকলেও দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা আবার বেড়েছে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্যমতে, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মোট ২৮৯ টন স্বর্ণ কিনেছে। আগের তিন মাসের তুলনায় যা পাঁচ গুণেরও বেশি। দ্বিতীয় প্রান্তিকে এটি ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনার রেকর্ড।
আরও পড়ুন: সেনাপ্রধানের সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধি দলের সাক্ষাৎ, এলএফটি-২০২৬ সফলভাবে সম্পন্ন
গড় দাম বিবেচনায় ডয়চে ব্যাংকের বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, দ্বিতীয় প্রান্তিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনার পরিমাণ ছিল রেকর্ড ৪৫ বিলিয়ন ডলার।
এটি খুব শিগগির ভেঙে যেতে পারে এমন রেকর্ড। জুনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ওপর ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের এক জরিপে দেখা গেছে, রেকর্ড ৪৫ শতাংশ উত্তরদাতা আগামী ১২ মাসে নিজেদের স্বর্ণের মজুদ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন।
প্রাথমিক তথ্যও সেই প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জুলাইয়ে মোট ২০ মেট্রিক টন স্বর্ণ কিনেছে, যা আগের মাসের তুলনায় দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। এটি ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর মাসিক হিসাবে সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি।
এতে চীনের মোট স্বর্ণের রিজার্ভ বেড়ে রেকর্ড ২ হাজার ৩৭৭ দশমিক ৫ টনে দাঁড়িয়েছে। চীন আবারও উল্লেখযোগ্যভাবে স্বর্ণের রিজার্ভ বাড়াচ্ছে। এ বিষয়ে বিএনওয়াইয়ের বিশ্লেষকরা গত সপ্তাহে বলেছেন, স্বর্ণ সরাসরি ফেডের নীতির সংকেত না হলেও সরকারি খাতের অব্যাহত চাহিদা ও বিনিয়োগকারীদের নতুন করে আগ্রহ, মুদ্রাস্ফীতি, মুদ্রা ও ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি কমানোর উপায় হিসেবে স্বর্ণের গুরুত্ব বাড়াচ্ছে।
আরও পড়ুন: আদাবরে যুবদল নেতাকে কুপিয়ে মারাত্মকভাবে জখম
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্বর্ণের প্রতি আগ্রহ বাড়ালেও তারা খুব ধীরগতিতে এগোচ্ছে। ফলে স্বর্ণের সঙ্গে তাদের নতুন করে সম্পর্ক তৈরির পুরো চিত্র স্পষ্ট হতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
এটি একমুখী প্রবণতাও নাও হতে পারে। গত কয়েক বছরে স্বর্ণের দামে নজিরবিহীন অস্থিরতার পর মূল্যবান এই ধাতু আগের মতো চূড়ান্ত নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে থেকেও নয়। যদিও তারা সবচেয়ে রক্ষণশীল, দাম নিয়ে কম সংবেদনশীল এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারী হিসেবে পরিচিত।
গত মাসে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, স্বর্ণ অত্যন্ত অস্থিতিশীল এবং এটি কেবল নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ঝুঁকি মোকাবিলা ও বিনিয়োগে বৈচিত্র্য আনার সুবিধা দেয়। তারল্য নিশ্চিত করার জন্য স্বর্ণ কেনা উচিত নয় বলেও গবেষণাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণার লেখকরা বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণকে উচ্চঝুঁকির রিজার্ভ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। স্বর্ণের মজুত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে কৌশলগত সম্পদ বণ্টন ও যথাযথ নীতি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে।
আরও পড়ুন: সাঈদীর মামলার বাদীকে দাফনে বাধা দেয়ার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন জামায়াতের
তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্বর্ণের সাম্প্রতিক ঊর্ধ্বগতির পেছনে অন্ধভাবে ছুটবে, এমন সম্ভাবনা কম। তবে বিশ্বের রিজার্ভ সম্পদের ওপর আস্থা কমতে থাকলে স্বর্ণের আকর্ষণ শিগগির ম্লান হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন