০৫:০৩ পি.এম
কায়রোর ‘গারবেজ সিটি’র সরু গোলকধাঁধার মতো গলিগুলোতে বর্তমানে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ব্যবসায়ী পিটার রোমানির।
ইরান যুদ্ধের কারণে কাঁচামালের সরবরাহে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তার কারণে বিভিন্ন কারখানা এখন তাকে নিয়মিত ফোন করে প্লাস্টিকের খোঁজ করছে। ২৫ বছর বয়সী রোমানি মিসরের শতাধিক পুনর্ব্যবসায়ী ও উৎপাদনকারীদের মধ্যে একজন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের ফলে হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্লাস্টিক তৈরির কাঁচামাল পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে, তারা ব্যবসায় বড় ধরনের সুবিধা পাচ্ছেন।
কায়রো থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এই খবরটি জানাচ্ছে। এই প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রবিন্দু পূর্ব কায়রোর বিস্তীর্ণ এলাকা মানশিয়েত নাসের। এই স্থানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আবর্জনা সংগ্রহকারীরা বিশ্বের অন্যতম উন্নত অনানুষ্ঠানিক পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন।
আরও পড়ুন: যাত্রাবাড়ীতে ছিনতাই সন্দেহে গণপিটুনিতে আহত যুবক নিশাত মিয়ার মৃত্যু
চাপ দিয়ে বাঁধাই করা প্লাস্টিকের বিশাল স্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে রোমানি এএফপিকে বলেন, ‘যুদ্ধের আগে আমাদেরই কারখানাগুলোকে ফোন করে আমাদের মাল বিক্রির চেষ্টা করতে হতো।’ তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে কারখানাগুলোই আমাদের ফোন করছে। তারা জানতে চায়, কত মাল আছে? আজই সরবরাহ করা যাবে? আগে এমনটা কখনো হয়নি।'
-আবর্জনার ওপর গড়ে ওঠা জনপদ-
মানশিয়েত নাসেরে এক লাখ ১৫ হাজারের বেশি মানুষের বসবাস রয়েছে। মোকাত্তাম পাহাড়ের নিচে এবং কায়রোর ঐতিহাসিক সিটাডেলের বিপরীতে এই এলাকায় প্রধানত কনক্রেট ক্রিশ্চান জনগণের বসবাস। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কায়রোর মোট বর্জ্যের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি এখানে প্রক্রিয়াজাত করা হয়।
এখানে একই ছাদের নিচে বসবাস ও কাজ করেন পরিবারগুলোর সদস্যরা। অনেক সময় তাদের থাকার জায়গা ও আবর্জনার স্তূপের মধ্যে ব্যবধান বলতে থাকে শুধু একটি সিঁড়ি বা একটি পর্দা। ফলে, তাদের দুর্গন্ধ, প্লাস্টিকের ধোঁয়া এবং নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে থাকতে হয়।
আরও পড়ুন: কাতারের শান্তি প্রস্তাব নাকচ, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন হামলার শঙ্কা
নিচতলায় পুরুষেরা প্লাস্টিক, কার্ডবোর্ড, কাগজ, ধাতু ও কাচ আলাদা করে স্তূপে সাজান। পরে এগুলো কারখানায় পাঠানো হয়। অন্যদিকে, ওপরতলায় শিশুরা পড়াশোনা করে। মায়েরা রান্না করেন। ছোট ছোট বসার ঘরে টেলিভিশন চলে। আর নিচতলায় প্লাস্টিক কুচি করার যন্ত্র ও বেলিং প্রেসের অবিরাম শব্দ শোনা যায়।
পুরো এলাকায় আবর্জনার গন্ধ ভাসতে থাকে। সরু গলিতে ধীরে ধীরে পিকআপ ভ্যান ও হাতগাড়ি চলে। দিনের সংগ্রহ করা আবর্জনা নামানো হয়। আর সেগুলোর ফাঁকেই শিশুদের ফুটবল খেলতে দেখা যায়।
-আগাম অর্থ পরিশোধ-
রোমানি মূলত পুনর্ব্যবহারযোগ্য পলিইথিলিন নিয়ে কাজ করেন। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত প্লাস্টিকগুলোর একটি এবং প্যাকেজিং শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল।
আরও পড়ুন: গণভোটের রায় না মানলে তারেক রহমানের ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই: জুনায়েদ
মূল্য নির্ধারণকারী সংস্থা ইন্ডিপেনডেন্ট কমোডিটি ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসেস (আইসিআইএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য পলিথিলিনের অন্যতম প্রধান বৈশ্বিক সরবরাহকারী। এই অঞ্চলের প্রায় ৮৫ শতাংশ রপ্তানি হরমুজ প্রণালী দিয়ে হয়ে থাকে।
মিসরের কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ চেম্বারের তথ্য অনুযায়ী, দেশটি প্লাস্টিক শিল্পের প্রায় ৪০ শতাংশ কাঁচামাল আমদানি করে। এর বেশির ভাগ আসে উপসাগরীয় দেশ, ইউরোপ, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে।
শিল্প খাতের তিনটি সূত্র এএফপিকে জানায়, কিছু পণ্যের প্যাকেজিং ও প্লাস্টিকের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। ফলে উৎপাদকরা স্থানীয়ভাবে পুনর্ব্যবহার করা প্লাস্টিকের দিকে ঝুঁকছেন। মূলত পানীয় ও খাদ্যপণ্যের মোড়কে ব্যবহৃত পিইটি প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারকারী রিজক ইউসুফ বলেন, যেসব কারখানা আগে অর্থ পরিশোধ করতে দেরি করত, তারা এখন কাঁচামাল নিশ্চিত করতে আগাম টাকা দিচ্ছে। তিনি এএফপিকে বলেন, চাহিদা তিন গুণ বেড়েছে। আর কিছু পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের দাম ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
-সাময়িক উল্লম্ফন?-
আরও পড়ুন: বিয়ের ১৫ দিনের মাথায় সড়কে প্রাণ গেল ইতালি প্রবাসী তানভীরের
এই সরবরাহ সংকট পুরো উৎপাদন শৃঙ্খলে স্থানীয় ব্যবসার জন্য ইতিবাচক হয়ে উঠেছে। সাদাত সিটি কেমিক্যাল ফাইবার ফ্যাক্টরির প্রধান নির্বাহী ফাইরুজ এল-সাইয়েদ বলেছেন, তাদের প্রতিষ্ঠান ১৬ বছর ধরে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের বোতল থেকে পলিয়েস্টার ফাইবার তৈরি করছে। তিনি জানান, সর্বশেষ সংকটের পরেই তারা ব্রাজিলের মতো দূরবর্তী বাজারেও প্রবেশ করতে পেরেছেন।
প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে নতুন প্যাকেজিং উপকরণ তৈরি করার প্রতিষ্ঠান ইউফ্লেক্স ইজিপ্টের জ্যেষ্ঠ বিপণন ও বিক্রয় ব্যবস্থাপক নেসমা এলআরিফ জানিয়েছেন, তাদের পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্যের চাহিদা ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। তবে শিল্পসংশ্লিষ্টদের ধারণা, সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হলে এই ব্যবসায়িক উল্লম্ফন স্থায়ী নাও হতে পারে। ইউসুফ জানিয়েছেন, গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে আলোচনা এগোচ্ছে বলে ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই দাম ও চাহিদা কমতে শুরু করেছে।
তিনি বলেন, ‘মাত্র একটি পোস্টেই বাজার বদলে গেছে। যুদ্ধ শেষ হলে এই অবস্থা থাকবে কি না, আমি নিশ্চিত নই।’
তবে চলতি সপ্তাহে ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানের বন্দরগুলো অবরোধ করছে এবং হরমুজ প্রণালীর ‘নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে।’ দুই দেশের মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষও শুরু হয়েছে। রোমানি ও ইউসুফ দুজনই বলেছেন, এরই মধ্যে আবার অর্ডার বাড়তে শুরু করেছে। ইউসুফ বলেন, ‘এখন আমরা এতে অভ্যস্ত। ওখানে যখনই কোনো সমস্যা হয়, ক্রেতারা আমাদের ফোন করতে শুরু করেন।’
আরও পড়ুন: ক্ষমতা হারালেই কি গ্রেফতার হবেন নেতানিয়াহু?
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন


