০৪:১৮ পি.এম
আসন্ন ন্যাটো সম্মেলনকে তুরস্ক ইউরোপের নিরাপত্তায় নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা আরো শক্তিশালী করার মাধ্যম হিসেবে দেখতে চায়। বিভিন্ন মিত্র দেশের আপত্তি সত্ত্বেও, আঙ্কারা দ্রুত বিকাশমান প্রতিরক্ষা শিল্পকে সামনে তুলে ধরার এটিকে একটি বড় সুযোগ হিসেবে গণ্য করছে।
মঙ্গলবার শুরু হতে যাওয়া দুই দিনের এ সম্মেলন প্রতিরক্ষা শিল্প ফোরামের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হবে। পূর্বে এটি পার্শ্ব আয়োজনের জলবায়ুর মধ্যে ছিল, তবে এবার আনুষ্ঠানিকভাবে মূল কর্মসূচির অংশ হিসেবে কাজ করবে। এতে অদূর ভবিষ্যতে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ প্রতিষ্ঠান তুরস্কের দ্রুত বিকাশমান প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রদর্শনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
ইস্তাম্বুল থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এর খবরটি প্রদান করেছে।
আরও পড়ুন: ট্রাম্প-সমর্থিত জনতাবাদী জোয়ারে আমেরিকা-ব্রাজিলে বড় ভাটা, ইউরোপের পরিণতি নিয়ে প্রশ্ন
প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান দাবি জানিয়েছেন যে, ইউরোপের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা কাঠামোর সব ক্ষেত্রেই তুরস্ককে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। তিনি বলেছেন, ‘তুরস্ককে ছাড়া ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা কল্পনাই করা যায় না।’ বিশেষত ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১৫০ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের ‘সেইফ’ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তির জন্য আঙ্কারা চাপ প্রয়োগ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পর, তুরস্ক ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী হিসেবে ৩ লাখ ৫৫ হাজার সক্রিয় সেনাসদস্য এবং ৩ লাখ ৭৮ হাজার রিজার্ভ সদস্য নিয়ে গঠিত। গত এক দশকে দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্প উল্লেখযোগ্যভাবে বৈশিষ্ট্যবান হয়েছে।
তবে, অস্ত্র সরবরাহকারী দেশের গণ্ডি পেরিয়ে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে কার্যকর হতে তুরস্কের আকাঙ্ক্ষা এখনো সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়নি।
জার্মান মার্শাল ফান্ডের আঙ্কারা প্রধান ওজগুর উনলুহিসারচিকলি মন্তব্য করেছেন যে, ‘ইউরোপ জুড়ে পরিচালিত বিভিন্ন কার্যক্রম এবং প্রকল্প থেকে তুরস্ক অনেকটাই বাদ পড়েছে। এখন আঙ্কারা সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন চায়। আর এ কারণেই এই সম্মেলনে তাদের সক্ষমতা তুলে ধরা হবে।’
আরও পড়ুন: টঙ্গীতে বিএনপির বিক্ষোভ, নুরুল ইসলাম সরকারের মুক্তির দাবি
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপ্রি) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের অস্ত্রবাজারের ১ দশমিক ৮ শতাংশের অংশীদার টার্কি। এ হিসেবে তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প বর্তমানে বিশ্বের ১১তম স্থানে রয়েছে। কর্মকর্তারা জানান, ২০২৫ সালে তুরস্কের প্রতিরক্ষা পণ্য রপ্তানি ৪৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। গত বছর এই প্রবৃদ্ধি ছিল ২৯ শতাংশ।
গত মাসে এরদোগান বলেছেন, ‘আগে এক বছরে যা অর্জন করতাম, এখন তা এক সপ্তাহে করছি।’ তিনি উল্লেখ করেছেন ড্রোন, ট্যাংক, সাঁজোয়া যান ও যুদ্ধজাহাজ রপ্তানির। তিনি জানান, রোমানিয়ায় একটি যুদ্ধজাহাজ সরবরাহ করা হয়েছে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে তুরস্কের প্রথম সামরিক জাহাজ রপ্তানির সাফল্য।
‘ভাবমূর্তি বদলের’ প্রচেষ্টায় তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প সংস্থা এসএসবির প্রধান হালুক গোরগুন গত মাসে ডিফেন্স২৪ সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, ‘আমরা শুধুমাত্র সরবরাহকারী হিসেবে পরিচিত হতে চাই না। আমরা যৌথ উৎপাদন এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার মাধ্যমে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি চাই।’
তবে ইউরোপীয় প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে তুরস্ক কতটা নির্ভরযোগ্য হবে, সে সম্পর্কে মিত্র দেশগুলোর মধ্যে প্রশ্ন উঠছে।
আরও পড়ুন: ডেমোক্র্যাটদের ইমপিচমেন্ট উদ্যোগ ধোপে টিকবে না: মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর হুংকার
উনলুহিসারচিকলি বলেছেন, ‘রাশিয়ার সঙ্গে তুরস্কের অতীত সম্পর্কের কারণে তারা প্রশ্ন তুলছে।’ তিনি ২০১৭ সালে তুরস্কের রাশিয়া থেকে এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন, যা ন্যাটোর মিত্র দেশের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
তিনি মন্তব্য করেছেন, ‘ফ্রান্স, ইতালি এবং জার্মানির চিন্তা-ভাবনা নিয়ে আশ্বস্ত করাই এখন তুরস্কের প্রধান চ্যালেঞ্জ।’
২০১৫ সালে সিরিয়া ও লিবিয়ায় তুরস্কের সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে গ্রীস এবং সাইপ্রাসকে ঘিরে উত্তেজনার কারণে সম্পর্ক আরও খারাপ হয়। ইউক্রেনকে তুরস্কের সমর্থনের কারণে সম্পর্কের উন্নতি হওয়ার চেষ্টা হলেও এস-৪০০ সমস্যা এখনো বড় বাধা হয়ে রয়েছে। বিশেষ করে ওয়াশিংটনের সঙ্গে এ নিয়ে মতভেদ এখনও কাটেনি। আঙ্কারা এখনও এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রত্যাহার করার কোনো কার্যকর পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি।
আঙ্কারার টিওবিবি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মুস্তাফা আইদিন বলেন, পশ্চিম ইউরোপের কিছু দেশের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক ভালোভাবে এগোলেও পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে তা হচ্ছে না। কারণ কিছু সদস্য দেশ এখনও বাধা সৃষ্টি করছে।
আরও পড়ুন: কাশ্মীরে হারিয়ে যাচ্ছে ‘লাল সোনা’ খ্যাত জাফরান
তিনি বলেন, ‘স্পষ্টতই জার্মানি এবং ফ্রান্স এখনও সম্মত নয়। আর এই দুটি দেশ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
‘তুরস্ককে বাদ দেওয়া অযৌক্তিক’ - এই বক্তব্যের আওতায় রয়েছে ‘সেইফ’ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে তুরস্কের মতো দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল অস্ত্রের যন্ত্রাংশের সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত সরবরাহ করতে পারবে।
এ তহবিলের বড় অংশ অধিকার করার জন্য আঙ্কারাকে প্রথমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব চুক্তি করতে হবে। এরপর ব্রাসেলসের সঙ্গে বিশেষ প্রবেশাধিকার নিয়ে আলোচনা করতে হবে। এই জন্য ২৭টি সদস্য দেশের সর্বসম্মতির প্রয়োজন।
কার্নেগি ইউরোপের জ্যেষ্ঠ ফেলো সিনান উলগেন বলেন, ‘সেইফ কর্মসূচিতে তুরস্কের প্রবেশের পথে রাজনৈতিক বাধাগুলোর মধ্যে আছে তুরস্ক, গ্রীস এবং সাইপ্রাসের বিরোধ ও ফ্রান্সের অনীহা।’
আরও পড়ুন: ব্যাংক কেলেঙ্কারি ও আর্থিক সংকটে প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনার পদত্যাগ
তিনি বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে কূটনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে, ইউরোপের বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় তুরস্ককে বাদ দেওয়া ‘অযৌক্তিক’।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে স্পেন, রোমানিয়া, পোল্যান্ড ওইভাবে তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধি করেছে। গত ১৮ মাসে, তুরস্কের ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বায়কার ইতালির পিয়াজ্জিও অ্যারোস্পেস কিনেছে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান লিওনার্দোর সঙ্গে অংশীদারিত্ব চুক্তিও করেছে।
উপরন্তু, যুক্তরাজ্য তুরস্কের মেধাসম্পদ পঞ্চম প্রজ প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমান ‘কান’ (কঅঅঘ) প্রকল্পে সহযোগিতা করছে। আগামী সপ্তাহের ন্যাটো সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তুরস্ক সফরে এলে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি একটি ব্যাচ জেট ইঞ্জিন সরবরাহের ওপর থাকা বাধা উঠে যাওয়ার আশা করছে আঙ্কারা। এই ইঞ্জিন ‘কান’ প্রকল্পে ব্যবহৃত হবে।
আরও পড়ুন: মোংলা বন্দরের উন্নয়নে মালিক-শ্রমিকের ঐক্য অপরিহার্য: নৌপরিবহনমন্ত্রী
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন