১১:৫৬ এম
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রধান দুই প্রার্থী লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা এবং সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো শুক্রবার থেকে টেলিভিশন ও রেডিওতে বিনা মূল্যে নির্বাচনী প্রচার শুরু করতে যাচ্ছেন। এই প্রচারের মাধ্যমে তারা ভোটারদের সমর্থন অর্জনের লক্ষ্যে নিজেদের পরিকল্পনা ও অবস্থান তুলে ধরবেন।
ব্রাজিলের মানুষের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক উপস্থিতি থাকলেও, নির্বাচনী প্রচারে টেলিভিশন ও রেডিওর গুরুত্ব এখনও অপরিহার্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মাধ্যমে প্রচার সহজেই বৃহৎ জনগণের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম। একই সঙ্গে, টেলিভিশন ও রেডিওর বিজ্ঞাপন জনআলোচনা সৃষ্টি করে এবং ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা টানা নয়, চতুর্থবারের মতো ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য চেষ্টা করছেন।
আরও পড়ুন: ডিসেম্বরে হাসিনার ফেরার গুঞ্জন নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্য
বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, লুলার সাথে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস রয়েছে। ফলে এবারের নির্বাচনী প্রচার আক্রমণাত্মক হতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। স্বাধীন রাজনৈতিক পরামর্শক ও ব্রাজিলের সাবেক মন্ত্রী টমাস ট্রাউমান মন্তব্য করেছেন, এবারের নির্বাচনী প্রচার ২০২২ সালের তুলনায় আরও বেশি আক্রমণাত্মক ও নোংরা হতে পারে। তার মতে, ২০২২ সালের প্রচারও ব্রাজিলের ইতিহাসে অন্যতম নোংরা নির্বাচনী প্রচার ছিল।
২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লুলা সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোকে খুব কম ব্যবধানে পরাজিত করেছিলেন। ১৯৮৫ সালে ব্রাজিলে গণতন্ত্র ফিরে আসার পর এটি ছিল প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সবচেয়ে কম ব্যবধানে জয়। বর্তমানে জইর বলসোনারো অভ্যুত্থানের চেষ্টা করার অপরাধে ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। তার ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারো এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লুলার বিরুদ্ধে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে লড়ছেন। ব্রাজিলে নির্বাচনের সময় টেলিভিশন ও রেডিওতে প্রার্থীদের প্রচার শুরু হওয়া ভোটের সময় ঘনিয়ে আসার অন্যতম বড় সংকেত।
আরও পড়ুন: সরকারের ব্যর্থতা বিরোধীদের ওপর চাপাবেন না: ডা. শফিকুর রহমান
বিশ্বকাপের সময় ব্রাজিলের রাস্তায় জাতীয় পতাকা ও বিভিন্ন ছবি উৎসবের পরিবেশ তৈরি করে, ঠিক তেমনি নির্বাচনী প্রচারও দেশজুড়ে ভোটের উত্তাপ বাড়িয়ে দেয়।
ব্রাজিলে মানুষের অনলাইনে উপস্থিতি অনেক বেশি। তবে, টেলিভিশন ও রেডিওর প্রচারের গুরুত্ব কমেনি। রিও ডি জেনিরোর ৮৪ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত ইতিহাসের শিক্ষক মারিয়া ইজাবেল পেকানিয়া জানান, তার মতো অনেক ভোটার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিজ্ঞাপনে খুব বেশি নজর দেন না। বরং তারা টেলিভিশন ও রেডিওর নির্বাচনী প্রচার অনুসরণ করেন। ১৯৫০-এর দশক থেকে তিনি এভাবেই নির্বাচনী প্রচার দেখে আসছেন। পেকানিয়া বলেন, তিনি নির্বাচনী প্রচার দেখতে পছন্দ করেন। এসব প্রচার দেখে তার উত্তেজনা হয়, কখনো রাগও হয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের কীভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরেন, সেটিও বোঝা যায়। তার মতে, নির্বাচনী প্রচার থেকে অনেক কিছু শেখার সুযোগ রয়েছে। তাই এবারের প্রচারও তিনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দেখতে চান।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো ব্রাজিলে রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনী প্রচারের জন্য টেলিভিশন ও রেডিওতে টাকা দিয়ে সময় কিনতে হয় না। দলগুলো বিনা মূল্যে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রচারের সুযোগ পায়। কোনো রাজনৈতিক জোটে কতটি দল রয়েছে এবং জাতীয় কংগ্রেসের নিম্নকক্ষে ওই দলগুলোর কতটি আসন আছে, তার ওপর ভিত্তি করে প্রচারের সময় ভাগ করা হয়। সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও বিজ্ঞাপন বিভাগের অধ্যাপক ব্রুনো পোম্পেউ বলেন, এই ব্যবস্থা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য তুলনামূলকভাবে সমান সুযোগ নিশ্চিত করে। তার মতে, কোনো দলের কাছে কত টাকা আছে, তার ওপর টেলিভিশন ও রেডিওতে প্রচারের সময় নির্ভর করে না। ফলে বেশি অর্থের মালিক দলগুলো শুধু বেশি টাকা খরচ করে বেশি প্রচারের সুযোগ নিতে পারে না।
আরও পড়ুন: নির্বাচনে ভোট টানতে নেতানিয়াহুর নতুন অস্ত্র এআই, চলছে ভুয়া ভিডিও প্রচার
বছরের পর বছর ব্রাজিলের নির্বাচনী প্রচারের ধরনও বদলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন টেলিভিশন ও রেডিওর প্রচারের ভাষা ও উপস্থাপনার ধরনেও প্রভাব ফেলছে। জেতুলিও ভার্গাস ফাউন্ডেশনের ব্যবসা বিভাগের অধ্যাপক জোয়াও রিকার্দো মাত্তা মন্তব্য করেন, এবারের প্রচারগুলো আগের তুলনায় কম কৃত্রিম এবং বেশি স্বাভাবিক হতে পারে। তার মতে, প্রচারসামগ্রী এমনভাবে তৈরি করা হতে পারে, যেন সেগুলো ঘরে বসেই তৈরি করা হয়েছে। এতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচলিত সহজ ও স্বাভাবিক উপস্থাপনার ধরন টেলিভিশন ও রেডিওর প্রচারেও চলে আসবে। আগে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারের বড় অংশের অর্থ টেলিভিশন ও রেডিওর বিজ্ঞাপন তৈরিতে ব্যয় হতো। এখন সেই অর্থের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য প্রচারসামগ্রী তৈরিতেও ব্যয় হতে পারে।
৪ অক্টোবর প্রথম দফার ভোটের আগে ব্রাজিলের সম্প্রচারমাধ্যমগুলোকে প্রতিদিন মোট ১৪ মিনিট সময় নির্বাচনী প্রচারের জন্য রাখতে হবে। এই সময়ে প্রায় ১ হাজারটি ৩০ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপন প্রচার করা হবে। এর বাইরে আরো কয়েকটি আলাদা প্রচারপর্ব থাকবে। এর মধ্যে ১২ মিনিট ৩০ সেকেন্ডের সময় শুধু প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের প্রচারের জন্য নির্ধারিত। এই সময়ের মধ্যে লুলা ও তার মিত্র দলগুলো পাবে ৫ মিনিট ৩১ সেকেন্ড। অন্যদিকে ফ্লাভিও বলসোনারোর দল পাবে ৪ মিনিট ২০ সেকেন্ড। বাকি সময় অন্য দুটি দলের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে। রাজনৈতিক পরামর্শক টমাস ট্রাউমানের মতে, ফ্লাভিও বলসোনারোর প্রচারের সময় কম হওয়ার প্রধান কারণ হলো তার পক্ষে বড় রাজনৈতিক দলগুলোকে একত্র করা কঠিন হয়েছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ফ্লাভিওর বাবা জইর বলসোনারো বড় দলগুলোর সমর্থন পাওয়ার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে ছিলেন। ফ্লাভিও এবার সেই সুবিধা পাচ্ছেন না।
৪ অক্টোবরের প্রথম দফার ভোটে যদি কোনো প্রার্থী প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায়, তবে ২৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফার ভোট অনুষ্ঠিত হতে পারে। সেক্ষেত্রে লুলা ও ফ্লাভিও- যে দুই প্রার্থী দ্বিতীয় দফায় উঠবেন, তারা টেলিভিশন ও রেডিওতে সমান সময় পাবেন। এ কারণে প্রথম দফায় সময়ের ব্যবধান থাকলেও দ্বিতীয় দফায় দুই প্রধান প্রার্থীর প্রচারের সুযোগ সমান হবে। সব মিলিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে টেলিভিশন ও রেডিও এখনও গুরুত্বপূর্ণ প্রচারের ক্ষেত্র। বিশেষ করে লুলা ও ফ্লাভিওর মধ্যে লড়াই যখন খুব কাছাকাছি বলে জরিপে আভাস পাওয়া যাচ্ছে, তখন ভোটারদের কাছে নিজেদের বার্তা পৌঁছে দিতে এই দুই মাধ্যমের ওপরেই গুরুত্ব দিচ্ছেন প্রার্থীরা।
আরও পড়ুন: তেল সংকটের প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর ত্বরান্বিত করতে চায় শ্রীলঙ্কা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন