০৭:৪৫ পি.এম
জন্মগত শারীরিক সীমাবদ্ধতা কখনোই স্বপ্নের পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে না। প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায় থাকলে যেকোনো কঠিন বাধা অতিক্রম করা সম্ভব—এমনই এক অনুপ্রেরণাদায়ক উদাহরণ স্থাপন করেছেন সুইটি আক্তার মুন্নি। বাকপ্রতিবন্ধকতাকে জয় করে তিনি শুধু উচ্চশিক্ষার গণ্ডি অতিক্রম করেননি, বরং নিজের সৃজনশীল প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
এবার তিনি আরও একধাপ এগিয়ে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হয়েছেন, মানুষের গড়ার কারিগর হিসেবে নাম লিখিয়েছেন। অদম্য সাহসিকতার মাধ্যমে জীবনযুদ্ধে জয়ী মুন্নি সত্যিই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছেন এবং সমাজের অসংখ্য মানুষের জন্য এক উজ্জ্বল আদর্শে পরিণত হয়েছেন।
বর্তমানে সুইটি আক্তার মুন্নি টাঙ্গাইলের পাকুটিয়া এলাকার অক্সফোর্ড কিন্ডারগার্টেনের সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছেন। সেখানে তিনি চারুকলা বা আর্ট বিষয়ে পাঠদান করবেন।
আরও পড়ুন: বাকৃবিতে শিক্ষার্থীদের মারামারি, ছাত্রদল নেতার ইন্ধনের অভিযোগ অস্বীকার
শেরপুর জেলার শ্রীবরদী উপজেলার আব্দুল মালেক ও সুফিয়া বেগম দম্পতির তিন সন্তানের মধ্যে মুন্নি সবার বড়। তার বাবা আব্দুল মালেক একজন পুলিশ কনস্টেবল, বর্তমানে ঘাটাইল থানায় কর্মরত আছেন। মা সুফিয়া বেগম গৃহিণী। মুন্নি ঘাটাইল গণপাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। পরে তিনি ইবরাহীম খাঁ সরকারি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে অনার্স শেষ করেন।
শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি ছবি আঁকার প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ ছিল। ইবরাহীম খাঁ সরকারি কলেজে পড়াশোনার সময় বিভিন্ন জাতীয় দিবস উপলক্ষে দেয়ালপত্রিকা সাজানো এবং কলেজের দেয়ালে গ্রাফিতি আঁকার কাজে দক্ষতার পরিচয় দেন। জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায়ও তিনি কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। তার আঁকা ছবিতে শিক্ষক ও সহপাঠীরা মুগ্ধ হয়েছেন।
ছবি আঁকার সেই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে একসময় মুন্নি নিজের মতো করে পাঞ্জাবি, ফতুয়া, কামিজ ও শাড়িতে নকশা আঁকতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে তার সৃজনশীল কাজই উদ্যোক্তা হওয়ার অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। বর্তমানে তিনি নিজ উদ্যোগে একটি বাটিক ও বুটিক কারখানা গড়ে তুলেছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি নিজের প্রতিষ্ঠান নিয়েও এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
সম্প্রতি নতুন করে একটি ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার খবরটি জানাতে ভূঞাপুরের ইবরাহীম খাঁ সরকারি কলেজে গিয়ে নিজের শিক্ষকদের সঙ্গে দেখা করেন মুন্নি। তার এই অর্জন ও অদম্য প্রচেষ্টায় কলেজের শিক্ষকরা মুগ্ধ হয়েছেন।
আরও পড়ুন: শহীদ জিয়ার লক্ষ্য-আদর্শে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় পুনঃপ্রতিষ্ঠায় কাজ চলছে: উপাচার্য
মুন্নিকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে একজন শিক্ষক লিখেছেন—প্রচলিত পদ্ধতিতে বাকপ্রতিবন্ধকতা জয় করে কলেজ থেকে ব্যবস্থাপনা বিভাগে অনার্স সম্পন্ন করেছেন তিনি। পড়াশোনার ফলাফলও ছিল ভালো। ছবি আঁকার পাশাপাশি নিজের সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। এবার শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হওয়ার খবর জানাতে কলেজে এসেছেন তিনি।
শিক্ষকের ভাষায়, অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে মানুষ একদিন অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে। মুন্নির আরও সাফল্য কামনা করে তিনি লিখেছেন—‘জয় হোক তোমার ইচ্ছাশক্তির।’
মুন্নির মা সুফিয়া বলেন, ‘আমার মেয়ে ছোটবেলা থেকেই কথা বলতে পারে না। তবে কখনো তার ইচ্ছাশক্তি ও স্বপ্নের কাছে হার মানতে দেখিনি। অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও সে পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। নিজের চেষ্টায় অনার্স শেষ করেছে, পাশাপাশি ছবি আঁকা ও নিজের কাজের মাধ্যমে একটি অবস্থান তৈরি করেছে। এখন শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হয়েছে, এতে একজন মা হিসেবে আমি অনেক আনন্দিত ও গর্বিত। আমি চাই, আমার মেয়ে জীবনে আরও এগিয়ে যাক, নিজের যোগ্যতায় মানুষের ভালোবাসা অর্জন করুক। সবাই আমার মেয়ের জন্য দোয়া করবেন।’
সুইটি আক্তার মুন্নির এই পথচলা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; বরং শারীরিক সীমাবদ্ধতা কোনো মানুষের স্বপ্ন পূরণের পথে চূড়ান্ত বাধা হতে পারে না, তারই এক অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ।
আরও পড়ুন: এইচএসসির সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষার ফি নিয়ে জরুরি নির্দেশনা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন