১২:২০ এম
এখন বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান ‘নোমান গ্রুপ’র বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকার গ্যাস চুরির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি গ্যাস অবৈধভাবে লুটপাট এবং গোপন বাইপাস লাইন স্থাপনের গুরুতর অভিযোগের তদন্তের জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিগত আ’লীগ সরকারের সময় তিতাসের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারিদের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিতভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট করছে। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তবে পরবর্তীতে এই তদন্ত কমিটির বিরুদ্ধে দুর্নীতি এবং পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ উঠেছে।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লি: সূত্রে জানা যায়, ‘নোমান গ্রুপ’ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান অবৈধ ডিস্ট্রিবিউশন কক্ষ ও অতিরিক্ত ব্যাসের পাইপলাইন স্থাপন করেছে। টঙ্গীর পাগাড় মৌজায় অবস্থিত গ্রুপ অব কোম্পানির সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘জাবের এন্ড জুবায়ের ফেব্রিক্স লিঃ’র অভ্যন্তরে তিতাস গ্যাসের ডিস্ট্রিবিউশন কক্ষ অবৈধভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ৮ ইঞ্চি ব্যাসার্ধের গ্যাস লাইনের অনুমোদন নিলেও পরবর্তীতে নিজেদের অর্থায়নে গোপনে ১২ ইঞ্চি ব্যাসার্ধের পাইপলাইন সংযোগ করে নিয়েছে। টঙ্গী চেরাগআলী টিবিএস থেকে আরেকটি নতুন গ্যাস লাইন ও ডিআরএস স্থাপন করে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখে বিশাল পরিমাণে গ্যাস ব্যবহার করছে। তদন্ত কমিটির তথ্য অনুযায়ী, সাকশন পাম্প ও বাইপাস লাইনের মাধ্যমে গ্যাস চুরি হচ্ছে।
কারখানার মূল সরবরাহ লাইনে মিটারের পূর্বে গোপন পাইপ বা বাইপাস লাইন যুক্ত করার ফলে গ্যাস সরাসরি কারখানায় চলে যাচ্ছে। এর ফলে মিটারে সঠিক রিডিং উঠছে না। এছাড়া কারখানায় শক্তিশালী সাকশন পাম্প ব্যবহার করে গ্যাস টেনে নেয়ার কারণে আশেপাশের সাধারণ গ্রাহকরা গ্যাসের তীব্র সংকটে ভুগছেন। অনুমোদনহীন একাধিক রাইজার ব্যবহারের ফলে সরকার প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
আরও পড়ুন: ছাত্রলীগ সভাপতিকে হাতকড়াসহ ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় ৭ জন আটক
এদিকে এর আগেও একই বিষয়ে তিতাস কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করা হলে কোনো ফলাফল আসেনি। প্রতিষ্ঠানটির বিগত দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হারুনুর রশিদসহ সংশ্লিষ্টরা তদন্তের নামে প্রহসন করে নোমান গ্রুপের কাছ থেকে অন্তত: ১০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। ফলে বিপুল গ্যাস চুরির বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করে তদন্তের নাটক মঞ্চস্থ করে প্রকৃত ঘটনা ধামাচাপা দেয়া হয়। সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীদের ঘুষ দিয়ে নোমান গ্রুপ বেঁচে যায়। কোনো প্রতিকার না পাওয়ায় সম্প্রতি আরেকটি অভিযোগ দাখিল করার পর গত ৮ সেপ্টেম্বর আবারো তদন্ত কমিটি গঠন করে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১২ সালের ৩০ মে ‘নোমান কম্পোজিট টেক্সটাইল লিঃ’র তিতাস গ্যাসের বরাবরে দাখিল করা অনুরূপ এক আবেদনপত্রেও তাদের নিজস্ব অর্থায়নে স্থাপিত লাইন থেকে অন্য কোনো গ্রাহককে গ্যাস সংযোগ না দেয়ার জন্য তদবির করা হয়েছিল। অতীতেও এই ধরনের সিন্ডিকেটের কারণে সরকারের শত শত কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার্থে এবং হাজার হাজার কোটি টাকার গ্যাস লুটপাটের সঙ্গে জড়িত নোমান গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক কে.এম. মাসুদুর রহমান, জাবের এন্ড জুবায়ের ফেব্রিক্স’র পরিচালক মো: আব্দুল্লাহ জাবের, টঙ্গী তিতাসের ম্যানেজার মো: মিজান-উর-রহমানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে জরুরি ভিত্তিতে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আর্জি জানানো হয়েছে তিতাস বরাবর দাখিলকৃত অভিযোগে। জাতীয় স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের নিকট অবিলম্বে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে অবৈধ ডিস্ট্রিবিউশন কক্ষ ও গ্যাস সংযোগ উচ্ছেদের আর্জি জানানো হয়েছে।
তদন্ত কমিটির বিরুদ্ধে তদন্ত দাবি :
আরও পড়ুন: বাকৃবি ক্যাম্পাসে ছুরি দেখিয়ে মোবাইল ছিনতাই, অটোচালক আটক
এদিকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুন্ঠনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে দায়েরকৃত অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ একটি তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এখন এই কমিটির বিরুদ্ধেই ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে। কমিটির প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় বরাবর দায়ের করা হয়েছে পৃথক অভিযোগ। অভিযোগে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের পরিবর্তে অভিযোগকারীর কাছ থেকেই উল্টো ৩৪ প্রশ্নের উত্তর দাবির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। নোমান গ্রুপের প্রতি তদন্ত কমিটির পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনেছেন অভিযোগকারী মো: কাজল সরকার। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে করা আবেদনে এ কমিটির কাছ থেকে নিরপেক্ষ প্রতিবেদন পাওয়া যাবে না-মর্মে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। তাই তদন্ত কমিটির বিরুদ্ধে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের অনুরোধ জানানো হয়েছে। তদন্ত কমিটিতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়সহ রাষ্ট্রের ১০ সংস্থার প্রতিনিধি সমন্বয়ে নতুন কমিটি দ্বারা ব্যাপকভিত্তিক তদন্তের দাবি জানানো হয়।
রহস্যজনক অফিস আদেশ: গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে নোমান গ্রুপ, জাবের অ্যান্ড জুবায়ের ফেব্রিক্সের পরিচালক এবং তিতাস গ্যাসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অবৈধ গ্যাস সংযোগ ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে ব্যবস্থা নেয়ার আবেদন জানানো হয়। তবে অভিযোগ জমা দেয়ার তিন দিন আগেই, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে তিতাসের মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) হাসান আহমদ স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশের মাধ্যমে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, যা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন উঠেছে। প্রকৌশলী ড. প্রদীপ চন্দ্র মন্ডলকে আহ্বায়ক এবং প্রকৌশলী কে এম মনিরুল ইসলাম ও প্রকৌশলী মো: গোলাম মহিউদ্দীনকে সদস্য করে গঠিত এই কমিটি মূল অভিযোগ ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছেন-মর্মে অভিযোগকারীর দাবি।
গত ২৬ অক্টোবর তিতাস প্রধান কার্যালয়ে অভিযোগকারী শুনানিতে অংশ নিলে তদন্ত কমিটি তাকে জানান যে, কেবল ‘জাবের অ্যান্ড জুবায়ের ফেব্রিক্স লিমিটেড’র সীমানার ভেতরের বিষয় ছাড়া নোমান গ্রুপের ‘নোমান ফ্যাশন ফেব্রিক্স, নোমান ফেব্রিক্স ইউনিট ১ ও ২, এবং ইসমাইল আঞ্জুমান আরা ফেব্রিক্স’র মতো অন্য সহযোগী প্রতিষ্ঠানের অবৈধ সংযোগের তদন্ত তারা করতে পারবেন না।
অভিযোগকারীর অভিযোগ, শুনানিকালে তিতাস কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমোদনের নথিপত্রের ছায়ালিপি চাওয়া হলেও নোমান গ্রুপের প্রভাবের ভয়ে কমিটি তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এছাড়া বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে আবেদনে বলা হয়, তদন্ত কমিটির সদস্যরা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের উপঢৌকনে প্রভাবিত হয়েছেন, ফলে তাদের দিয়ে নিরপেক্ষ বিচার ও সঠিক প্রতিবেদন পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। ১০ সদস্যের শক্তিশালী কমিটি ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিবিদ্যমান পরিস্থিতির আলোকে ৩ সদস্যের গঠিত দুর্বল ও বিতর্কিত কমিটি বাতিল করে ম্যাজিস্ট্রেট ও তিতাসের ঢাকা বিভাগের প্রকৌশলী ছাড়া নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্তির দাবি জানানো হয়েছে। নোমান গ্রুপ এ পর্যন্ত কত টাকার গ্যাস চুরি করেছে তা উদঘাটন এবং আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বিএফআইইউ, সিআইডি, গাজীপুর জেলা প্রশাসক, পুলিশ আইজিপিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে ১০ সদস্যের একটি যৌথ তদন্ত টিম গঠনের দাবি জানান অভিযোগকারী। তার মতে, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে সরজমিনে পাইপের সংযোগস্থল উন্মোচন করে নিরপেক্ষ তদন্ত না করা হলে দেশের রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুন্ঠন অব্যাহত থাকবে। প্রকৃত অপরাধীরাও থেকে যাবে ধরা- ছোঁয়ার বাইরে।
আরও পড়ুন: দলের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে: আইনমন্ত্রী
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন