১২:৪৮ পি.এম
উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী, পিরোজপুরের দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কলেজ থেকে অংশ নেওয়া সাত পরীক্ষার্থী কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
প্রতিষ্ঠান দুটি হলো- নাজিরপুরের দীঘিরজান মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ এবং পিরোজপুর সদরের কদমতলা জর্জ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এই দুটি প্রতিষ্ঠানে মোট ২৪ জন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। দীঘিরজান মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের পাঁচজন এবং কদমতলা জর্জ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের তিনজন পরীক্ষার্থী এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করেছিলেন। কিন্তু পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী সাতজনের মধ্যে কেউই পাশ করতে পারেনি।
সূত্রে জানা গেছে, নাজিরপুর দীঘিরজান মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের কলেজ শাখা ২০১৪ সালে পাঠদানের অনুমতি লাভ করে। গত চার বছরের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এখানে উত্তীর্ণের সংখ্যা অনুত্তীর্ণের তুলনায় বেশি। ২০২৩ সালে কলেজটি থেকে ৩৯ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ১৮ জন উত্তীর্ণ হয়। ২০২৪ সালে ২৭ জনের মধ্যে ১৩ জন এবং ২০২৫ সালে ১৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র পাঁচজন পাশ করে। ২০২৬ সালে মানবিক বিভাগের পাঁচজন পরীক্ষায় অংশ নিলেও কেউ পাশ করতে পারেনি। এখানে শিক্ষক সংখ্যা আটজন এবং কর্মচারী দুজন।
আরও পড়ুন: এইচএসসির সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষার ফি নিয়ে জরুরি নির্দেশনা
অন্যদিকে, পিরোজপুর সদরের কদমতলা জর্জ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের কলেজ শাখা ২০২৩ সালে পাঠদানের অনুমতি পায়। শুরু থেকেই এই প্রতিষ্ঠানের কলেজ শাখার পাশের হার কম। ২০২৩ সালে ১২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬ জন উত্তীর্ণ হয়। ২০২৪ সালে ৭ জনের মধ্যে ৩ জন এবং ২০২৫ সালে ৭ জনের মধ্যে ৪ জন পাশ করে। চলতি বছর তিনজন পরীক্ষার ফরম পূরণ করলেও অংশ নেয় দুজন, এবং তাদের দুজনই ফেল করেছে।
তবে একই প্রতিষ্ঠানের স্কুল শাখার ফলাফল সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত চার বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে প্রতিষ্ঠানটির পাশের হার তুলনামূলক ভালো। ২০২৩ সালে ৮৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৭৫ জন উত্তীর্ণ হয়। ২০২৪ সালে ৭৫ জনের মধ্যে ৬৯ জন, ২০২৫ সালে ৭০ জনের মধ্যে ৪৮ জন এবং ২০২৬ সালে ৫০ জনের মধ্যে ৪৫ জন পাশ করে। চলতি বছর এসএসসিতে প্রতিষ্ঠানটির পাশের হার ৮৬ শতাংশ। এখানে শিক্ষক রয়েছেন ১৬ জন এবং কর্মচারী দুজন।
এদিকে, বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের ছয় জেলার মধ্যে পাশের হারে শীর্ষে রয়েছে পিরোজপুর। বরিশাল জেলা দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। তবে গত দুই বছরে পিরোজপুরে এইচএসসিতে পাশের হার ৩১ দশমিক ৭৮ শতাংশ কমেছে। ২০০৯ সাল থেকে পাওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবারই জেলাটিতে সর্বনিম্ন পাশের হার দেখা গেছে।
শনিবার সকালে বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর জেলাভিত্তিক ফলাফল থেকে এ তথ্য জানা যায়।
আরও পড়ুন: হাবিপ্রবির পাঁচ শিক্ষার্থী গণিত অলিম্পিয়াডের রংপুর অঞ্চলের সেরা দশে
এ বছর পিরোজপুর জেলায় এইচএসসি পরীক্ষায় মোট পরীক্ষার্থী ছিল ৭ হাজার ৯৮ জন। এর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেয় ৬ হাজার ৭৮২ জন। উত্তীর্ণ হয়েছে ৩ হাজার ৪৯৬ জন। জেলায় পাশের হার ৫১ দশমিক ৫৫ শতাংশ। এ ছাড়া জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬৬ জন শিক্ষার্থী।
জেলার গত কয়েক বছরের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালে পাশের হার ছিল ৮৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৬৪ দশমিক ০৭ শতাংশে। সর্বশেষ ২০২৬ সালে পাশের হার আরও কমে ৫১ দশমিক ৫৫ শতাংশে নেমে আসে।
কদমতলা এলাকার এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক মো. সাইদুল ইসলাম মন্তব্য করেন, "গত বছর এ কলেজে নতুন করে কেউ ভর্তি হয়নি। গত বছর যে দুজন শিক্ষার্থী ছিল, তারাই এবার পরীক্ষা দিয়েছে। তারা গত বছরও ফেল করেছে, এ বছরও ফেল করেছে। তাই কলেজ শাখার ফল খারাপ হয়েছে। কলেজটি যদি এমপিওভুক্ত হয় এবং সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা পায়, তাহলে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা এখানেই ভর্তি হবে। এতে ফলাফলও ভালো হবে বলে আশা করি।"
স্থানীয় আরেক অভিভাবক সুমি আক্তার বলেন, "এখানে স্কুল শাখার পাশাপাশি কলেজ শাখায়ও ফলাফল ভালো হয়। তবে আমরা জানতে পেরেছি, গত বছর যারা এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছিল, তারাই এ বছর পরীক্ষা দিয়ে আবারও ফেল করেছে।"
আরও পড়ুন: কিউএস এশিয়া র্যাঙ্কিংয়ে ৩০ ধাপ পেছাল চুয়েট, ৪১৫তম স্থানে
কদমতলা এলাকার দুই বাসিন্দা মো. মাসুম বিল্লাহ ও সুলতানা জেসমিন মাহিনুর বলেন, "আমরাও এখানে লেখাপড়া করেছি। এখানে এসএসসির ফলাফল খুব ভালো হয়। ২০২৩ সালে এখানে কলেজ চালু হয়েছে। কলেজটি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় এখান থেকে এসএসসি পাশ করা শিক্ষার্থীরা অন্য কলেজে ভর্তি হয়। কলেজটি এমপিওভুক্ত হলে এখানকার স্কুলের শিক্ষার্থীরা এখানেই ভর্তি হতে পারবে। তাহলে আমাদের সন্তানদের দূরের কোনো প্রতিষ্ঠানে যেতে হবে না। আমরা জোর অনুরোধ জানাই, আমাদের এই কলেজটি যেন এমপিওভুক্ত করা হয়।"
নাজিরপুর দীঘিরজান সেকেন্ডারি স্কুল অ্যান্ড কলেজের ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষক সুমন বিশ্বাস বলেন, "২০১৪ সালে কলেজটি পাঠদানের অনুমতি পাওয়ার পর থেকে প্রতি বছরই পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। বিগত বছরগুলোতে পরীক্ষার ফলাফল মোটামুটি সন্তোষজনক ছিল। তবে প্রতিষ্ঠানটি নন-এমপিওভুক্ত হওয়ায় শিক্ষকরা সরকারিভাবে কোনো বেতন-ভাতা পান না। ফলে তারা আর্থিক অসচ্ছলতার মধ্যে জীবনযাপন করছেন।"
পিরোজপুর সদরের কদমতলা জর্জ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, "আমাদের বিদ্যালয় শাখার ফলাফল ভালো। কলেজ শাখার পাঠদানের অনুমতি পাওয়ার পর থেকে ফলাফলও সন্তোষজনক ছিল। তবে এ বছর নতুন কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি না হওয়ায় ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এ অবস্থার উন্নতি করতে হলে কলেজ শাখাটিকে এমপিওভুক্ত করা জরুরি।"
তিনি আরও বলেন, "এটি গ্রাম পর্যায়ের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখানে কলেজ শাখায় পাঠদানের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই। ফলে বিদ্যালয় শাখার শিক্ষকদের দিয়েই কলেজের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। কলেজটি এমপিওভুক্ত হলে প্রয়োজনীয় বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে। এতে বিদ্যালয় শাখার শিক্ষার্থীদের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনার জন্য শহরমুখী হতে হবে না। তারা নিজ প্রতিষ্ঠানেই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে। পাশাপাশি শিক্ষার মান উন্নয়নের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক ভালো ফলাফলও ধরে রাখা সম্ভব হবে।"
আরও পড়ুন: জাবি ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সেলিম রেজা সাময়িকভাবে বহিষ্কার
বরিশাল অঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা পরিচালক অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন বলেন, "যেসব প্রতিষ্ঠান পাশ করেনি, সেসব প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকদের নিয়ে জেলাভিত্তিক একটি সভা করব। যেসব প্রতিষ্ঠানে শূন্য পাশ, সেগুলোর বেশিরভাগই নন-এমপিও। আমরা এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারি। নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানগুলো তো চেষ্টা করে যাচ্ছে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিগত দিনের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে একটি সমাধানে যাব।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন