০৯:৩৮ এম
মহান আল্লাহ যুগে যুগে নবী ও রাসুল প্রেরণ করেছেন এই পৃথিবীকে সভ্য ও সুশৃঙ্খল করার জন্য। তাঁদের মাধ্যমে মানবজাতিকে পার্থিব ও পরকালীন জীবনের সব বিষয় শেখানো হয়েছে। এই শিক্ষার ফলে মানুষের পৃথিবীর জীবন সহজ হয়েছে এবং সৃষ্টিজগতের অন্য সবকিছুর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে। আল্লামা রাগেব ইস্পাহানি (রহ.) বলেন, ‘মানবজাতির প্রতি নবীদের প্রেরণ একটি অপরিহার্য বিষয়। মানুষ কখনোই তাদের শিক্ষা থেকে অমুখাপেক্ষী হতে পারে না।’ (তাফসিরুর রাগিব : ৪/২৩২)
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহ.) লেখেন, ‘রিসালাত মানুষের জন্য আবশ্যক ও প্রয়োজনীয় বিষয়। নবী-রাসুলদের প্রতি মানুষের প্রয়োজন অন্য সব প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে। রিসালাত (নববী শিক্ষা) পৃথিবীর আত্মা, আলো ও প্রাণতুল্য। আত্মা, আলো ও প্রাণ ছাড়া পৃথিবীর কী-ই বা মূল্য আছে? রিসালাতের সূর্য ছাড়া পৃথিবী অন্ধকার ও অভিশপ্ত। মানুষের অন্তরে যখন রিসালাতের সূর্য উদিত হয় না, তা থেকে প্রাণশক্তি সঞ্চার করে না, তা-ও অন্ধকারে আচ্ছন্ন এবং মৃত। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মৃত ছিল, যাকে আমি পরে জীবিত করেছি এবং যাকে মানুষের মধ্যে চলার আলো দিয়েছি, সেই ব্যক্তি কি ওই ব্যক্তির মতো যে অন্ধকারে আছে এবং সেই স্থান থেকে বের হওয়ার নয়?’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১২২)
এটি মুমিনের বৈশিষ্ট্য। যে জাহালাতের অন্ধকারে মৃত ছিল আল্লাহ তাকে রিসালাতের প্রাণশক্তি ও ঈমানের আলো দ্বারা জীবিত করেছেন। তিনি তাকে এমন আলো দান করেছেন, যা নিয়ে সে মানুষের মধ্যে বিচরণ করে। অন্যদিকে অবিশ্বাসীর অন্তর মৃত ও অন্ধকারে আচ্ছন্ন। আল্লাহ কোরআনে নববী শিক্ষাকে আত্মা ও প্রাণ শব্দ দ্বারা ব্যক্ত করেছেন।
আরও পড়ুন: নেক আমলে অবিচল থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের গুরুত্ব তুলে ধরা হলো
আত্মা হারিয়ে গেলে জীবন হারিয়ে যায়। তিনি বলেছেন, ‘এভাবে আমি তোমার প্রতি প্রত্যাদেশ করেছি রুহ তথা আমার নির্দেশ; তুমি জানতে না কিতাব কী এবং ঈমান কী! পক্ষান্তরে আমি তাকে করেছি আলো, যা দ্বারা আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা পথনির্দেশ করি; তুমি তো প্রদর্শন করো কেবল সরল পথ।’ (সুরা : আশ-শুরা, আয়াত : ৫২)
এখানে আল্লাহ দুটি মৌলিক বিষয় উল্লেখ করেছেন : রুহ (আত্মা) ও নুর (জ্যোতি)। রুহ হলো জীবন ও নুর হলো জীবনের আলো। (মাজমুউল ফাতাওয়া : ১৯/৯৩)
কুফর ও শিরকে আচ্ছন্ন অবিশ্বাসীরা প্রাণহীন। যদিও তাদের ভেতর জীবাত্মা বিদ্যমান, কিন্তু তাদের ভেতর উচ্চ মর্যাদাশীল আধ্যাত্মিক জীবন অনুপস্থিত, যা মূলত ঈমান থেকে সৃষ্ট। এর মাধ্যমেই বান্দা ইহকাল ও পরকালে সাফল্য অর্জন করে। আল্লাহ নবী-রাসুলদের নিজের ও বান্দাদের মধ্যে মাধ্যম বানিয়েছেন। যেন তাঁরা মানুষকে উপকারী ও ক্ষতিকর বিষয়গুলো জানাতে পারেন, তাঁদের পার্থিব জীবন ও পরকালীন জীবনের যাত্রা ত্রুটিমুক্ত হয়। তাঁরা সবাই মানুষকে আল্লাহর দিকে আহবান জানিয়েছেন, তাদের এমন পথ দেখিয়েছেন, যা অনুসরণ করে তারা আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে। তাঁরা এটাও বলেছেন, আল্লাহর কাছে পৌঁছানোর পর বান্দার পুরস্কার ও পরিণতি কী হবে। সুতরাং রিসালাতের প্রতি মানুষের প্রয়োজন চিকিৎসকের কাছে রোগীর প্রয়োজন থেকেও অনেক বড়। কেননা চিকিৎসা না পাওয়ার পরিণতি হলো দেহের মৃত্যু আর রিসালাতহীনতার পরিণতি অন্তরের মৃত্যু। অন্তরের মৃত্যু হলে যে দুর্ভাগ্য আপতিত হয় তা থেকে কোনো নিষ্কৃতি নেই।
আল্লামা ইবনুল কাইয়িম জাওজি (রহ.) লেখেন, মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো রাসুলকে চেনা এবং তাঁর আনীত শিক্ষাগুলো জানা, তিনি যে সংবাদ দিয়েছেন তা সত্যায়ন করা, তাঁর আদেশ মান্য করা। রাসুলের আনুগত্য করা ছাড়া দুনিয়া ও আখিরাতে সাফল্যের কোনো পথ নেই। তাঁদের শিক্ষা ছাড়া ভালো ও মন্দের বিস্তারিত পরিচয় নির্ণয় করাও সম্ভব নয়। তাঁদের পথে চলা ছাড়া আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব নয়। উত্তম কথা, কাজ ও চরিত্রের দিশা শুধু তাঁদের কাছেই পাওয়া যায়। তাঁদের কথা, কাজ ও চরিত্র অন্যদের কথা, কাজ ও চরিত্রের মাপকাঠি। তাঁদের আনুগত্যের মাধ্যমেই বান্দা বিভ্রান্তির পথ থেকে হেদায়েতের পথে চালিত হয়। তাঁদের প্রয়োজনীয়তা দেহের জন্য প্রাণের, চোখের জন্য জ্যোতির, আত্মার জন্য প্রাণের প্রয়োজনীয়তা থেকেও বেশি। (জাদুল মাআদ : ১/৪০)
আরও পড়ুন: নিয়ামতের মহিমা ও কৃতজ্ঞতার অমর বাণী
মুহাম্মদ রশিদ রেজা বলেন, ‘বর্তমান যুগে মানবজাতিকে রক্ষার একমাত্র পথ মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর প্রেরিত ওহির ওপর দৃঢ় থাকা, যা মানবজাতিকে একত্রকারী, যা আত্মাকে পবিত্রকারী, যে মানব প্রকৃতিকে পূর্ণতা দানকারী। আর এটাই দুনিয়া ও আখিরাতের সাফল্য।’ (আল ওয়াহইয়ুল মুহাম্মাদি, পৃষ্ঠা-৩৬)
আল্লাহ সবাইকে নববী শিক্ষার অনুসারী করুন। আমিন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন