০২:০৯ পি.এম
তেলাপোকাকে সবাই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেন। কাউকে অবহেলা বা উপেক্ষা করার সময় আমরা বলি ‘তেলাপোকাও একটা পাখি, তুইও একটা মানুষ।’ তবে তেলাপোকার একটি সাংঘাতিক ক্ষমতা আছে, যা হলো অভিযোজন ক্ষমতা বা টিকে থাকার ক্ষমতা। অমর কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখে গেছেন ‘অতিকায় হস্তী লোপ পাইয়াছে কিন্তু তেলাপোকা টিকিয়া আছে’। তাচ্ছিল্য এবং টিকে থাকার ক্ষমতা- এ দুটি মিলে ভারতে এখন তেলাপোকার জোয়ার বইছে। বিজেপির কাউন্টার হিসেবে যেন মাঠে নেমেছে সিজেপি, মানে ককরোচ জনতা পার্টি।
ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ভেজালটা লাগিয়েছেন। গত ১৫ মে ভারতের সুপ্রিম কোটে একটি মামলার শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘দেশে এমন কিছু তরুণ আছে, যারা তেলাপোকার মতো; তারা না কোনো কর্মসংস্থান পায়, না নিজেদের কোনো পেশাগত অবস্থান তৈরি করতে পারে। তাদের কেউ কেউ মিডিয়া বা সোশ্যাল মিডিয়া কর্মী হয়ে ওঠে; কেউ বনে যায় অ্যাক্টিভিস্ট এবং এরপর তারা সবাইকেই আক্রমণ করা শুরু করে দেয়।’ ব্যস, আর যায় কোথায়।
আরও পড়ুন: শাহজালালের রানওয়ে-অ্যাপ্রোন এলাকায় যানবাহনের অবাধ চলাচল
এ যেন স্তুপ করে রাখা তপ্ত বারুদে অগ্নিশলাকা। প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের পরদিনই উড়তে শুরু করে তেলাপোকার দল। উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে থাকা তরুণ অভিজিত দীপক ভার্চুয়াল জগতে ককরোচ জনতা পাটি- সিজেপি গড়ে তোলেন।
আম আদমী পার্টির সাবেক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কৌশলবিদ অভিজিৎ দীপক শুরুটা করেছিলেন ফান থেকে। কিন্তু এখন বিষয়টি আর ফান পর্যায়ে নেই।
বানের জলের মতো ভাসিয়ে নিতে চাইছে সবকিছু। মাত্র ২১ দিনের মাথায় ভার্চুয়াল থেকে অ্যাকচুয়াল জগতে তারা নেমে পড়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে নয়াদিল্লীর যন্তর-মন্তরে বিক্ষোভ করেছে ককরোচ পার্টি।
শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগের জন্য ৭ দিনের আলটিমেটাম দিয়েছে তেলাপোকারা। ২৩ জুন রামলীলা ময়দানে আরো বড় বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে সিজেপি। হঠাৎ করেই ফান থেকে সিরিয়াস, যেন আন্দোলনের গিয়ার চেঞ্জ। সুকান্তের কবিতার মত ‘হে মহাজীবন, আর এ কাব্য নয়/এবার কঠিন, কঠোর গদ্যে আনো/পদ-লালিত্য-ঝংকার মুছে যাক/গদ্যের কড়া হাতুড়িকে আজ হানো’।
আরও পড়ুন: বিনিয়োগের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর তাগিদ বিজিএমইএর উপদেষ্টার
প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের পরদিন আমেরিকায় বসে অভিজিত দীপক অনলাইনে জাতীয় ককরোচ পার্টি গড়ে তোলেন। বেকার, অলস, দীর্ঘ সময় অনলাইনে কাটানো এবং পেশাগতভাবে ক্ষোভ প্রকাশের ক্ষমতা থাকা ছিল দলটিতে যোগ দেওয়ার মূল যোগ্যতা। দেখা গেল ভারতে তথাকথিত ‘বেকার, অলস ও দীর্ঘ সময় অনলাইনে কাটানো’র মতো লোকের অভাব নেই।
হু হু করে স্রোতের মতো মানুষ ককরোচ পার্টিকে ফলো করতে থাকে। শুরুতে কেউ পাত্তা না দিলেও দ্রুতই তেলাপোকা বাহিনী ভারতের পুরাতন এবং দৃঢ় অ্যাস্টাবলিস্টমেন্টের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ক্ষমতাসীনদের কপালে এখন চিন্তার ভাজ। সিজেপির ওয়েবসাইট ব্লক করা, একাউন্ট হ্যাক করা তো আছেই; অভিজিত দীপককে হুমকি দেওয়া, শনিবারের বিক্ষোভে আসতে বাধা দেওয়া- তেলাপোকাদের স্রোত ঠেকাতে অনলাইনে ও অফলাইনে চেষ্টা কম হয়নি। কিন্তু শাসকরা এখনও তরুণ প্রজন্মকে ঠেকানোর কার্যকর উপায় খুঁজে পায়নি। আসলে কংগ্রেস কিংবা তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে রাজনীতির কৌশলের খেলা যতটা সহজ; ক্ষুব্ধ তারুণ্যকে সামলানো ততটাই কঠিন। ওয়েবসাইট ব্লক, অ্যাকাউন্ট হ্যাক করার মতো ছোট চেষ্টা বড় সমালোচনা ডেকে এনেছে।
গত একযুগে ভারতের ঐতিহ্যবাহী গণতন্ত্রকে নিজের কৌশলের দাস বানিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য আছে বটে, কিন্তু নির্বাচনের মাঠ প্রায়ই অসমতল হয়ে ওঠে মোদি ও অমিত শাহর ইচ্ছায়, কৌশলে। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা নয়ছয় করে, ব্যাপক ধড়পাকড় চালিয়ে নির্বাচনের আগেই তৃণমূল কংগ্রেসকে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে একাই খেলেছেন মোদি। অনায়াসে দখল করে নিয়েছেন বহু আরাধ্য বাংলা। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেসকে ভয় দেখিয়ে মাঠছাড়া করতে পারলেও সিজেপির ক্ষেত্রে এটি সম্ভব নয় বিজেপির পক্ষে। কারণ এরা প্রচলিত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়। এদের না মারলেও বিপদ, মারলে আরো বেশি বিপদ। একটা একাউন্ট হ্যাক করলে আরেকটা অ্যাকাউন্ট খুলবে, তাতে ফলোয়ার আরো বাড়বে। সাধারণ স্রোতকে বাধা আটকানো যায়, কিন্তু সিজেপির মতো জোয়ারকে আটকানো যায় না।
তেলাপোকার দলের টিকে থাকার কৌশলটা ফাঁস করে দিয়েছেন প্রতিষ্ঠাতা অভিজিত দীপক। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রব্যবস্থার কাছে আমরা শুধুই ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ। আমরা তুচ্ছ, সহজেই অবহেলাযোগ্য এবং পুরোপুরি আবর্জনার মতো। কিন্তু তেলাপোকা সব পরিবেশেই টিকে থাকে। আপনারা আমাদের দমিয়ে রাখার চেষ্টা করতে পারেন, কিন্তু একেবারে মুছে ফেলতে পারবেন না।’
আরও পড়ুন: আইইডিসিআরের পরিচালককে মারধরের ঘটনায় চিকিৎসক জাহিদ হাসানের সদস্যপদ স্থগিত
এটাই চিন্তার কারণ। ১২ বছরে নরেন্দ্র মোদি এত বড় অনলাইন চ্যালেঞ্জে আর পড়েননি। বিজেপির তুলনায় সিজেপি ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র। বিজেপি যদি হাতি হয়, সিজেপি তেলাপোকাও নয়, অতি ক্ষুদ্র পিপড়া মাত্র। কিন্তু সেই পিপড়াই জায়গামত কামড়াতে পারলে হাতিকেও বিরক্ত করতে পারে। ভারতেরই একটি সিনেমা আছে ‘মাক্ষি’ নামে। মহা প্রতাপশালী এক লোকের মাথায় ঢুকে পড়া এক মাছি তার জীবন অতিষ্ঠ করে ফেলে। এই তেলাপোকাও সেই মাছির মত ক্ষমতাসীনদের মাথা খারাপ করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। আর শরত বাবু তো অতিকায় হস্তির লোপ পাওয়া আর তেলাপোকার টিকে থাকার গল্প অনেক আগেই লিখে গেছেন।
তেলাপোকাকে যতই অবহেলা এবং তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হোক, আদতে তেলাপোকা একটি নিরীহ পোকা। ‘করে না কো ফোঁসফাঁস, মারে না কো ঢুসঢাস’ মাকা। কিন্তু কেন অধিকাংশ মানুষ তেলাপোকাকে ভয় পায় বা ঘৃণা করে? ভারতের এই তরুণ তেলাপোকারা কি নিজেদের তেমন ভয় পাওয়ার মতো করে তুলতে পারবেন? মহাপ্রতাপশালী নরেন্দ্র মোদী কী ককরোচ পাটিকে ভয় পাচ্ছেন?
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন