০৭:৩৯ এম
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরেও বাংলাদেশ কেন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ? বর্তমানে কেন দেশের কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে? মানুষ দুবেলা দুমুঠো খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছে কেন? এ দেশের শিশুরা কেন বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মারা যাচ্ছে? নারীদের সম্ভ্রমহানি কেন ঘটছে চারপাশে? অনেকেই এ বিষয়ে বিভিন্ন কারণে অবহিত হবেন। তবে একটু গভীরে গেলে একটি কারণ উল্লেখযোগ্য- আমাদের মধ্যে বিভেদ। বিভেদ থেকে উৎপন্ন হয়েছে হানাহানি। এই বিভাজন বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে চাপা দিয়ে রেখেছে। সম্ভাবনা অফুরন্ত, মানুষের অদম্য প্রাণশক্তি এবং প্রকৃতির অপার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে? বিভক্তি আর হানাহানিই এর প্রধান কারণ। বাংলাদেশের একটি অপূর্ব ঐক্যের মেলবন্ধনে বিনির্মিত হয়েছে। অধিকাংশ মানুষ এখানে এক ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, এবং ধর্মীয় বিশ্বাসে একত্রিত। জাতিগত দাঙ্গা কিংবা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ এখানে অনেক কম। সংস্কৃতির ভেতরেও তেমন ভেদাভেদ নেই। তবুও কিছু মানুষ ক্রমেই অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে, প্রতিটি মতকে নিষ্প্রাণ করতে উদ্যত। ভিন্নমত খতম করার মানসিকতায় আমাদের সম্ভাবনা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে মুক্তি দিয়েছিল। গোটা জাতির ঐক্যই আমাদের বিজয়ী করেছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পরে দ্বেষবিভাজন বজায় রাখতে আমাদের সক্ষমতা কমে এসেছে। ক্ষুদ্র স্বার্থে, রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেশকে বিভক্ত করেছি। একে অপরের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করেছি। সরকারি কর্মচারী, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক- সর্বত্র বিভাজনের রাজনীতির একটা ভয়াবহ প্রবণতা বিদ্যমান। বিরোধীপক্ষ মানে শত্রু, তাকে নিঃশেষ করার মানসিকতা মহামারির মতো সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। ইতিহাস দেখায়, যিনি ক্ষমতায় যান, বিরোধী মতকে নির্মূল করতে চান, না হলে ক্ষমতার চেয়ার নিরাপদ নয়। ভিন্নমত দমনের নামে রাজনীতির এক নীতিহীন প্রকাশ শুরু হয়েছে। দেশকে সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতির চোরাগলিতে বন্দি করে রেখেছে। মানুষের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা জন্য ৩০ লাখ শহীদ তাঁদের জীবন দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা ছিল ভিন্নমতের প্রতি সম্মান। দেশের অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, সার্বভৌমত্বে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকা উচিত। কিন্তু আমরা এখন পথ হারিয়েছি। সঠিক পথে ফিরে আসা এখন জরুরি। উন্নয়নের রোল মডেল রাষ্ট্রগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মৌলিক প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রগুলো যত বেশি উন্নতি করে। গণতন্ত্রে অনুকরণীয় রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে তীব্র মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু দেশের প্রশ্নে তারা ঐক্যবদ্ধ থাকে। সরকার পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো এক থাকে। গুণগত শাসনের সৌন্দর্য। কিন্তু আমরা ৫৫ বছর পরেও এ ধারাকে প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে কারা দেশের পক্ষের, কারা বিপক্ষের। ক্ষমতাসীনরা বিরোধী দলের মতামতকে অগ্রাহ্য করে, আবার বিরোধীদল ক্ষমতাসীনদের ভালো কাজের প্রশংসা করতে কুণ্ঠিত। ক্ষমতাসীনরা নিজেদের লোক খুঁজে বেড়ায়, সুবিধাবাদী এবং চাটুকারদের বেছে নেয়। ভিন্নমতকে গ্রহণ করার মানসিকতা ক্রমশঃ হ্রাস পাচ্ছে। এই দুষ্টচক্র থেকে বের হয়ে আসার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা উচিত। একটি সরকার যখন গঠিত হয়, তখন তাদের সকল জনগণের সরকার হতে হবে। সরকারি কাজের লক্ষ্য সকল নাগরিকের কল্যাণ নিশ্চিত করা। রক্তের মূল্যায়ন ছাড়া একজন চিকিৎসক ভিন্নমত বিকাশ করতে পারেন, তাই তাঁকে হরণ করা গণতান্ত্রিক সরকারের মানসিকতা নয়। গণতন্ত্রে ভিন্নমত থাকা দরকার। বিভাজনের রাজনীতি এই সৌন্দর্য নষ্ট করে দেয়। প্রতিশোধ আর পাল্টা প্রতিশোধের রাজনীতির নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে ব্যবসায়ীদের সঙ্কটের মুখে পড়তে হয়। ক্ষমতার দৌড়ে আসা দলগুলো বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা হিসেবে ক্ষমতাসীনদের কাছে আনুগত্য দাবি করে। নিষ্পত্তি করতে না পারলে তারা ব্যবসায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এতে জাতীয় অর্থনীতি গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিভাজনের রাজনীতি বাংলাদেশকে পিছিয়ে দিচ্ছে। বর্তমান অবস্থার পরিবর্তনের জন্য একটি সুযোগ এসেছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার প্রথম ১০০ দিনে প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার সংকেত দিয়েছে। সংসদে বিরোধী দলের মতামত গ্রহণের পথে প্রচেষ্টা চলছে। প্রধানমন্ত্রীর সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার বাণী কার্যকর হতে হবে। আসন্ন বাজেট ঐক্যের বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ এনে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রী স্পষ্টভাবে বলেছেন, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে সংকটে। আসন্ন বাজেট থেকে এই সংকটের সমাধান খুঁজতে হবে। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই। বিভক্তির রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এলেই সামনে এগিয়ে যাওয়ার গতি ফিরে আসবে। আসন্ন বাজেটে খাতের বরাদ্দের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা। ইউনূস সরকারের সময় বিতর্কিত ঘটনা দেশের অর্থনীতিকে বিভক্ত করেছে। দেশের ২০ কোটি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করলেই অর্থনীতি পুনরুদ্ধার সম্ভব। বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের সঙ্গী হতে হবে এবং তাদের আইনগত সুরক্ষা দিতে হবে। ইতিমধ্যে বন্ধ কলকারখানা খুলে দিতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এজন্য পক্ষপাতহীনভাবে দেশবাসীর স্বার্থের দিকে নজর দিতে হবে। প্রশাসনিক ব্যবস্থা না থাকলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়। তাই নতুন অর্থবছরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি প্রয়োজন। আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। সকল নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, যেন তারা ভীতিহীন পরিবেশে থাকতে পারেন। কেউ যদি মনে করে, দেশটা আমার, তবে এই দেশের অগ্রযাত্রা বন্ধ করতে পারবে না। সরকারের প্রথম ১০০ দিনের পরিকল্পনা জনগণের কাছে পৌঁছানোর একটি উদ্যোগ। যেখানে সবার আগে বাংলাদেশের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। আইনের শাসন এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে অঙ্গীকার রয়েছে। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রের নির্মাণের অভিপ্রায় প্রকাশ করা হয়েছে। এবারের বাজেট তার বাস্তবায়নের সূচনা হোক। বাজেট নির্ধারিত খাতওয়ারি বরাদ্দের হিসাব নয়, বরং সুশাসন ও জবাবদিহির একটি রূপরেখা। এই বাজেট তাই সরকারের প্রথম পরীক্ষার।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন