০৯:২৭ এম
সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী এবং উপদেষ্টাদের কাছ থেকে অর্থনীতি নিয়ে কিছু উদ্বেগজনক মন্তব্য শোনা গেছে। সরকারের কঠিন বাস্তবতা উপলব্ধি করা দেশের জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত। নির্বাচনের পূর্বে বিএনপির পক্ষ থেকে জনগণকে বোঝানো হয়েছিল যে, নির্বাচন একটি মহৌষধ, যা বাংলাদেশের সব সমস্যার সমাধান করবে রাতারাতি। জুলাই বিপ্লবের পর বিএনপির প্রথম জনসভায় তিন মাসের মধ্যে নির্বাচনের দাবি উত্থাপন করা হয়েছিল। প্রফেসর ইউনূস ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতা ধরে রাখবেনÑ এমন ধারণা দলের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে তখন প্রবাহিত হয়েছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রমে কখনো এরকম কিছু মনে হয়নি। বিএনপি গোষ্ঠী আমার বিরুদ্ধে প্রচার করেছিল যে, আমি নাকি নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছিলাম। যদিও আমার মতো একজন সাধারণ নাগরিকের জাতীয় নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সম্মতি বা অসম্মতির কোনো মূল্য নেই, তবুও বিএনপির নতুন নেতৃত্ব কেন এমন প্রচারণা চালিয়েছিল, তা আমার জানা নেই। আমি তৎকালীন উপদেষ্টাদের সঙ্গে দেখা হলে তাদের প্রায়ই বলতাম, সফলভাবে সরকার পরিচালনা করতে না পারলে যত দ্রুত সম্ভব দায়িত্ব ছেড়ে দিতে হবে।
তখনকার ক্ষমতাবানদের মধ্যে খলিলুর রহমান (বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী), আসিফ নজরুল, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এবং আদিলুর রহমান খানকে সাক্ষী হিসেবে রাখতে পারি। এই চারজনের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ অন্য উপদেষ্টাদের তুলনায় বেশি ছিল। উপদেষ্টাদের বাইরে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমের সঙ্গে কথাবার্তা হতো।
আরও পড়ুন: গোপালগঞ্জে শিশু তালহা হত্যা মামলায় দুইজনের মৃত্যুদণ্ড, একজনের যাবজ্জীবন
তিনি আমার অবস্থান জানতেন। এছাড়া, আমার লেখার নিয়মিত পাঠকদের হয়তো মনে থাকতে পারে, আমি প্রফেসর ইউনূসকে উদ্দেশ্য করে আমার দেশ পত্রিকায় একাধিকবার ‘Either Rule or Quit’ জাতীয় বার্তা লিখেছিলাম। ড. ইউনূসের রাজত্বকালে তার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি, একুশে পদকপ্রাপ্তির অনুষ্ঠানে স্বল্প সময় ছাড়া।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফেরার আগে বিএনপির একটি অনুষ্ঠানে মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবরের বিশেষ অনুরোধে যোগ দিয়েছিলাম। র্যাডিসন হোটেলে আয়োজিত সেই অনুষ্ঠানে আমি বলেছিলাম, প্রফেসর ইউনূসকে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে নির্বাচন দিতে হবে, নতুবা পদত্যাগ করতে হবে। তখন বিএনপির উপস্থিত সব নীতিনির্ধারক বেজায় অবাক ও আনন্দিত হয়েছিলেন। তাদের ধারণার সঙ্গে আমার বক্তব্যের কোনো মিল না পেয়ে তারা বিস্মিত হয়েছিল। একই অনুষ্ঠানে কবি ও কলামিস্ট ফরহাদ মজহার রাষ্ট্র সংস্কারের আগে নির্বাচন দেওয়ার বিপক্ষে তার মতামত ব্যক্ত করেছিলেন। বিএনপির লোকজন ভেবেছিল, আমিও সম্ভবত ফরহাদ ভাইয়ের মতামতই বলব। অনুষ্ঠানে বর্তমান রাষ্ট্রপতি এবং স্পিকার উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি, বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আমার স্পষ্ট ও ইতিবাচক অবস্থানের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন।
বিএনপি নেতারা দ্রুত ক্ষমতা হাতে পাওয়ার জন্য কতটা ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন, তা বোঝানোর জন্য এসব ঘটনার উল্লেখ করা হলো। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনে বিধ্বস্ত অর্থনীতি নিয়ে একটি জনবহুল দেশ পরিচালনা করা কতটা কঠিন, তা হয়তো এখন ক্ষমতায় এসে তারা বুঝতে পারছেন। বর্তমান ক্ষমতাসীনরা নিজেদের ভাগ্যবান মনে করতে পারেন যে, ৫ আগস্টের বিপ্লবের পর তাদের দায়িত্ব নিতে হয়নি। প্রফেসর ইউনূসের সরকার অন্তত একটি ভেঙে পড়া দেশ পরিচালনার বিপদ কাটিয়ে দিয়েছে। তবে, পাঠক নিশ্চয় বুঝতে পারছেন যে, আজকের মন্তব্য প্রতিবেদন মূলত দেশের অর্থনীতি নিয়ে।
পতনের কয়েক বছর আগে থেকেই শেখ হাসিনা বাংলাদেশের অর্থনীতির বারোটা বাজানো শুরু করেছিলেন। মেগা প্রজেক্টের নামে রাষ্ট্রের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অপচয় হয়েছে। রাষ্ট্রীয় খাতে কোনো সমীক্ষা ছাড়া নেওয়া এসব বিপুল বিনিয়োগের ফলে আওয়ামী লুটেরাদের সম্পদের বৃদ্ধি ছাড়া দেশে কোনো প্রকৃত কর্মসংস্থান হয়নি। বিগত এক দশকে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহের মাধ্যমে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার উল্লেখযোগ্য মজুত গড়ে উঠেছিল, যা লুটেরা শ্রেণির লোলুপ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
আরও পড়ুন: নায়ক মান্নার গাড়িতে আগুন, গ্রেফতার দুজন কারাগারে
আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের আপত্তি উপেক্ষা করে রাষ্ট্রের রিজার্ভের অর্থ বেসরকারি খাতে ঋণ প্রদানের নামে তছরুপ করা হয়েছে। এক রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অপচয় কিংবা ভাগাভাগির পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলার। আশা করি সেখানকার মহার্ঘ্য বালিশের দাম পাঠক ভুলে যাননি। এমন লুটপাটের পরিণামে কোভিড-পরবর্তী তিন বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ফ্যাসিস্ট সরকার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে ১৫ বিলিয়নে নামিয়ে এনেছিল।
এই পতনের ধারা আর বছর দুয়েক অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ ঋণখেলাপি, ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হতে হতো। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ উড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েক ডজন সরকারি ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে আমানতকারীদের গচ্ছিত হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করা হয়েছে, যা দেশের ব্যাংকিং খাতকে দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম করেছে। অর্থনীতির এমন ভঙ্গুর অবস্থায় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রফেসর ইউনূস ও তার ‘ইকোনমিক টিম’ আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলেন।
এ বছর ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় আমাদের রিজার্ভ ১৫ বিলিয়ন থেকে বেড়ে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। সম্প্রতি বর্তমান সরকারের এক মন্ত্রী বক্তৃতায় বলেছেন, প্রফেসর ইউনূসের সরকার নাকি শেখ হাসিনার মতোই দেশের সর্বনাশ করে দিয়েছেন। সব দেশেই রাজনীতিবিদরা খানিকটা মিথ্যা কথা বলেন। তবে বিএনপির মন্ত্রীর এই অকৃতজ্ঞতা মেনে নেওয়া কঠিন।
যে অন্তর্বর্তী সরকারের আনুকূল্যে দুই দশক পর তারা গাড়িতে পতাকা ওড়াচ্ছেন, স্ত্রী-ছেলেমেয়েসহ ক্ষমতা উপভোগ করছেন, বিভিন্ন সরকারি সংস্থায় পরিবারের সদস্যদের বসাচ্ছেন, হাজার হাজার কোটি টাকার সরকারি ব্যবসা পারিবারিক করছেন, সেই সরকারটিকে ফ্যাসিস্ট হাসিনার কাতারে ফেলাটা উচিত হচ্ছে কি না, সেই বিচারের ভার পাঠকের ওপর। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ মানবচরিত্রের অকৃতজ্ঞতা নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। নির্বাচনি ম্যানিফেস্টোতে বিএনপি অর্থনীতি সম্পর্কে কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা পরীক্ষা করা যাক।
আরও পড়ুন: রূপপুরের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৭ সেন্ট হতে পারে
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের তৃতীয় অধ্যায়ের শিরোনাম, ‘ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার’। লেখাটি শুরু করার আগে আমি সরকারি দলের ইশতেহারের উপরোক্ত অধ্যায়টি একাধিকবার পড়েছি। আমার সীমিত অর্থনীতি-সংক্রান্ত জ্ঞানে মনে হয়েছে সরকার বাংলাদেশের জিডিপিকে ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করাকে প্রধান লক্ষ্য স্থির করেছে। ইশতেহার অনুযায়ী, সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে জিডিপি ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে চায়। বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপি ৫০০ বিলিয়ন ডলারের সামান্য উপরে।
অর্থাৎ, লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে আগামী ৮ বছরের মধ্যে আমাদের জিডিপি দ্বিগুণ করতে হবে। সেটা সম্ভব কি না বোঝার জন্য গত দশ বছরের জিডিপি বৃদ্ধির পরিসংখ্যান দেখা দরকার। ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের মোট জিডিপি ২৬৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৪৫৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। এর অর্থ হলো গড়ে প্রতিবছর জিডিপি বেড়েছে ১৯ বিলিয়ন ডলার। ২০৩৪ সালে যদি আমাদের ট্রিলিয়ন ডলারে যেতে হয়, তাহলে এখন থেকে প্রতিবছর জিডিপি ১৯ থেকে অন্তত ৬০ বিলিয়ন ডলার করে বাড়তে হবে, যা গত ১০ বছরের গড় বৃদ্ধির তিনগুণ।
ট্রিলিয়ন ডলার জিডিপির লক্ষ্যমাত্রার আরেক অর্থ হলো, ধারাবাহিকভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ কখনো দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি অর্জন করেনি। পৃথিবীর খুব কম দেশেই দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এই শতাব্দীতে একমাত্র চীন ১৯৮৪ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত টানা তিন দশক গড়ে প্রতি বছর ৯ দশমিক ৫ থেকে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ২০০৭ সালে চীন ১৪ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। চীন কিভাবে এই অসাধ্য সাধন করেছে, সে সম্পর্কে তেমন কোনো পড়াশোনা না করেই আমাদের দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধির স্বপ্ন দেখা সমীচীন নয়। তবে, বিএনপির অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা হয়তো এ বিষয়েও বিশদ পরিকল্পনা করে ফেলেছেন।
বর্তমানের খবর মোটেও ভালো নয়। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং এডিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী চলমান অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে যথাক্রমে ৩ দশমিক ২, ৩ দশমিক ৪ এবং ৪ শতাংশ। সুতরাং, ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের কল্পনা বর্তমান পরিস্থিতিতে অবাস্তব মনে হচ্ছে। বরং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির বর্তমান অবস্থায় ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনই উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে গণ্য হবে।
আরও পড়ুন: ছাত্রদল নেতার জানাজার পরপরই গুরুদাসপুরে প্রবাসীর শপিংমলে হামলা-লুটপাট
শেখ হাসিনার মতো ‘পরিসংখ্যান ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে উচ্চ প্রবৃদ্ধি দেখানো হলে ভিন্ন কথা। দেশের বাস্তবতা হলো, উচ্চ প্রবৃদ্ধির অন্যতম হাতিয়ার, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং শিল্প খাতে দীর্ঘদিন ধরে কোনো সুখবর নেই। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে শিল্প খাতে আমাদের জিডিপি বাড়ার পরিবর্তে সংকুচিত হওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী বিগত তিন মাসে শিল্পে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির আমদানি এক-তৃতীয়াংশ হ্রাস পেয়েছে, যা বিশ্বব্যাংকের নেতিবাচক প্রতিবেদনকে সমর্থন করে। আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে স্বল্প সময়ের মধ্যে শিল্প খাতে বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতির কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। বাংলাদেশের মতো ক্ষুদ্র, জনবহুল দেশে কৃষিতে অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি অর্জনের সুযোগ নেই।
অধিকতর আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি বাড়ানো সময়সাপেক্ষ। সেবা খাতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধির সুযোগ থাকলেও তার জন্য সহায়ক বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, যা সহজ নয়। তাছাড়া, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ এবং বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সর্বত্র মন্দা যেন এগিয়ে আসছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জনগণের আয় কমে যাওয়ার কারণে আগামী ৩ নভেম্বরের কংগ্রেস এবং সিনেটের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকানদের ভরাডুবির সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি একটি বিপজ্জনক এবং অনিশ্চিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চরম বর্ণবাদী, ইসলামোফোবিক ও যুদ্ধবাজ নীতি সংকটকে আরো বাড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতি না ফিরলে বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে অভ্যন্তরীণ ভোগ বাড়িয়ে প্রবৃদ্ধি অর্জনের পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত নয়। বরং অনিয়ন্ত্রিত অভ্যন্তরীণ ভোগ হাসিনার আমলের মতো দুর্নীতি বাড়ানোর পাশাপাশি মুদ্রাস্ফীতিকে তুঙ্গে নিয়ে যাবে, যার লক্ষণ ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। সাধারণ জনগণের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে দরিদ্র এবং মধ্যবিত্তের জীবনযাপন ক্রমেই কষ্টকর হয়ে পড়ছে।
উপরোক্ত মন্দা পরিস্থিতিতে সীমিত সম্পদের বণ্টন নিয়ে আলোচনা আবশ্যক। আমাদের অর্থনীতিবিদরা যতখানি প্রবৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা করেন, সম্পদের সুষম বণ্টন প্রসঙ্গে ততটা নীরব থাকেন। শেখ হাসিনার ১৫ বছরের দুঃশাসনে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির কাগুজে গল্পের আড়ালে দেশের সম্পদ লুটেরা শ্রেণির হাতে পুঞ্জীভূত হয়েছে। এক এস আলম ব্যাংকিং সিস্টেম থেকে দুই লাখ কোটি টাকার অধিক লুট করেছে। সেই লুটের কিয়দংশ রাজনীতিবিদ ও আমলাদের পকেটেও গেছে। বাস্তবতা হলো, মাথাপিছু আয়ে ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়ার গল্প আমাদের শুনতে ভালো লাগলেও রাষ্ট্রের বর্ধিত আয় দেশের দরিদ্র মানুষের হাতে যায়নি। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার তিনভাবে দেশের মানুষকে প্রবঞ্চিত করেছে।
প্রথমত, জাতীয় আয় নিয়ে তারা ভুয়া পরিসংখ্যান বাজারে ছেড়েছে। দ্বিতীয়ত, যতটুকু আয় বৃদ্ধি পেয়েছে তার প্রায় পুরোটাই শেখ পরিবার এবং তাদের ঘনিষ্ঠ, রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক ও সামরিক ও বেসামরিক আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতাবানরা মেরে দিয়েছে। তৃতীয়ত, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেল এবং ঢাকার বিআরটি প্রকল্পের মতো তথাকথিত মেগা প্রজেক্ট গ্রহণ করে দেশের সম্পদ লুট করা হয়েছে এবং অপ্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করে দেশের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করা হয়েছে। বিআরটি প্রকল্প তৈরি করতে ৪ হাজার কোটি টাকা গচ্চা গেছে। এখন আবার সেই কুৎসিত শ্বেতহস্তী ভেঙে ময়মনসিংহগামী রাস্তা ব্যবহারযোগ্য করতে জনগণের করের কত কোটি টাকা ব্যয় হবে, সেটা আল্লাহই ভালো জানেন। এই প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত সবাইকে বিচার করে যথোপযুক্ত সাজা দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে আহ্বান জানানো হচ্ছে।
আরও পড়ুন: দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে গ্রিড বিপর্যয়ের তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন
বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় আসতে না আসতেই ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইল ও মার্কিন যৌথ হামলার পটভূমিতে বিশ্বব্যাপী তীব্র জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চ মূল্যজনিত লোকসান মেটাতে এবং আইএমএফের চাপে সরকার ইতোমধ্যে কয়েক দফায় দেশে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। ফলে জনগণের কাঁধে মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে। উপরন্তু, আমলাদের সন্তুষ্ট করতে সরকার সম্প্রতি তাদের বেতন-ভাতার বিপুল বৃদ্ধি ঘটিয়েছে। কিন্তু, দেশের মোট জনসংখ্যার তুলনায় আমলা এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের সংখ্যা একেবারেই কম। সুতরাং, আমলা গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান হলেও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের জীবনযাপন আরো কষ্টকর হয়ে উঠেছে।
বিশ্বব্যাংকের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে দরিদ্র ও হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা বিপজ্জনক হারে বৃদ্ধির আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টাও একই কথা বলেছেন। ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য মোকাবিলা করার জন্য ফ্যামিলি কার্ডের সুফল দ্রুততার সঙ্গে প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশের মন্দ রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারাবাহিকতায় যদি আবার সহায়তাপ্রাপ্তদের তালিকা তৈরি দলীয় বিবেচনা দ্বারা প্রভাবিত হয়, তাহলে একটি ভালো উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। এ দিকটায় সরকারের বিশেষ দৃষ্টি রাখা আবশ্যক। সব সমস্যার পেছনে ‘গুপ্ত’ খুঁজে বেড়ালে একসময় এ প্রচারণা হাসিনার ‘রাজাকারের’ মতো বুমেরাং হয়ে যেতে পারে। সরকারের অপচয়মূলক এবং উচ্চাভিলাষী প্রকল্প বন্ধ করে অন্তত আগামী এক বছর দারিদ্র্য বিমোচন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করা উচিত।
বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বিমান কেনার চুক্তির চাইতে রাষ্ট্রের সম্পদ উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির চাপে গলদঘর্ম সাধারণ জনগণের সহায়তায় ব্যয় করলে সরকার বরং প্রশংসিত হবে। আমাদের পরামর্শ সব সরকারের কাছে তিক্ত হলেও দেশ ও জনগণের স্বার্থে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভের দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালন করে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে আজকের লেখায় সমাপ্তি টানছি।
আরও পড়ুন: বিএনপি ও আওয়ামী লীগের পদ্ধতি একই, তারা যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ: ব্যারিস্টার আরমান
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন