০৫:৩৪ পি.এম
‘নুর আজিমকে চেনেন?’ মাসখানেক পূর্বে নিউ অ্যাপোলো ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দায়িত্বে থাকা এক ব্যক্তির কাছে ফোন করে জানতে চাওয়া হয়েছিল। উত্তরে না বলায় ফোনের অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়, ‘তাহলে এসে চিনিয়ে দেবানি।’ সেই হুমকির এক মাস পর আজ শনিবার দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে ৮-৯ জন যুবক চায়নিজ কুড়ালসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে হামলা চালায়।
এই হামলার সময় তারা রিসেপশন কাউন্টার, এসি ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। এক নারীর রিসেপশনে থাকা মোবাইল ফোনও তারা ছিনিয়ে নেয়।
নগরীর খানজাহান আলী রোডে সুলতানা হামিদ আলী স্কুলের বিপরীতে অবস্থিত নিউ অ্যাপোলো ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এই ঘটনা ঘটে।
আরও পড়ুন: কসবায় দু'পক্ষের সংঘর্ষে জনজীবন বিপর্যস্ত
সম্প্রতি খুলনা নগরীতে বেসরকারি চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাসী হামলা, ভাঙচুর ও চাঁদাবাজির আতঙ্ক যেন কাটছেই না। একের পর এক ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালে ভাঙচুরের ঘটনায় কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ অক্টোবর রাতে নগরীর ব্যস্ততম বাবুখান রোড এলাকার সন্ধানী ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক কমপ্লেক্সে এই সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে। রাত আনুমানিক ৮টা থেকে ১০টার মধ্যে ৮ থেকে ১০ জনের একদল মুখোশধারী দুর্বৃত্ত আকস্মিকভাবে ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টারে প্রবেশ করে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যমতে, হামলাকারীরা ক্লিনিকে ঢুকেই অতর্কিত ভাঙচুর শুরু করে। তারা চেম্বারের সামনের গ্লাস, বিভিন্ন আসবাবপত্র এবং রিসেপশন কাউন্টারের থাই গ্লাস ও কাঁচের জিনিসপত্র চুরমার করে ফেলে। এ সময় প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রাণভয়ে অনেকে ছোটাছুটি শুরু করেন।
হামলাকারীরা ভাঙচুরের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত স্টাফদের ওপর চড়াও হয়। এ সময় রিপোর্ট প্রদানকারী কর্মী ইকবাল হোসেনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। হামলায় ক্লিনিকের অপর এক কর্মকর্তা সুরেশ রায়ও আহত হন। হামলাকারীরা যাওয়ার সময় বাইরে ফাঁকা গুলি ছুড়ে সাধারণ মানুষের মাঝে ভীতি সৃষ্টি করে এবং পায়ে হেঁটে বাবুখান রোডের দিকে পালিয়ে যায়।
আরও পড়ুন: টেকনাফে মানবপাচারকারী আস্তানায় ৩ মরদেহের সন্ধান মেলেনি
তবে প্রতিষ্ঠানটির মালিক পক্ষ বলছে, তারা কোন অভিযোগ করবে না। তাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। অভিযোগ করলে আবারও হামলার আশংকাও তাদের।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এর আগেও ওই প্রতিষ্ঠানে বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে মুঠোফোনে চাঁদা দাবি ও বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে স্বাস্থ্যসেবা খাতের ব্যবসায়ীরা জানান, খুলনা নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকে এ ধরনের হামলার প্রবণতা উদ্বেগজনকহারে বেড়েছে। বিশেষ করে শামসুর রহমান রোড এবং বাবুখান রোড এলাকার বেশ কয়েকটি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে পরপর এমন নাশকতা ঘটলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
এর আগে গত ৩ নভেম্বর সন্ধ্যায় নগরীর শামসুর রহমান রোডের রংধনু ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং আব্দুল্লাহ প্যাথলজিতে হামলা ও ভাঙচুর চালায় দুর্বৃত্তরা। তারও আগে ২৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় বাবুখান রোডের সন্ধানী ডায়াগনস্টিক সেন্টারে হামলা হয়। একই প্রতিষ্ঠানের সোনাডাঙ্গা এলাকার মজিদ সরণিতে অবস্থিত সন্ধানী মেডিকেয়ার হাসপাতালেও ভাঙচুর চালানো হয়।
এসব ঘটনায় মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে। যদিও প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকপক্ষের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোন বক্তব্য দেওয়া হয়নি। বরং কারো কারো কাছে জানতে চাইলে তারা ভয়ে-আতঙ্কে মুখতে নারাজ।
আরও পড়ুন: সাভার থানা থেকে ৩৭ রাউন্ড গুলিসহ যুবক গ্রেফতার
চাঁদাবাজির অভিযোগে নগরীর টুটপাড়া সেন্ট্রাল রোড মোড়ের ঐতিহ্যবাহী চয়নিকা ফার্মেসিও গত ২৯ অক্টোবর থেকে বন্ধ রয়েছে। কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে তাদের কেউ কেউ চেম্বার বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে গেছেন।
এদিকে, একের পর এক চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও চাঁদাবাজির অভিযোগে খুলনার স্বাস্থ্যসেবা খাতের ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তাদের আশঙ্কা, এ ধরনের ঘটনা অব্যাহত থাকলে চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং নগরীর স্বাভাবিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
অপরদিকে খুলনা মহানগরীতে অন্তত নয়টি বাহিনী বিভিন্ন নামে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক কারবারে জড়িত বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে। যার একটি হলো ‘নুর আজিম’ এর নেতৃত্বাধীন নুর আজিম বাহিনী।
অভিযোগ রয়েছে, মাঝেমধ্যে এসব বাহিনীর সদস্যদের অস্ত্রসহ কিংবা অস্ত্র ছাড়াই গ্রেপ্তার করা হলেও তাদের অনেকে দ্রুত জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। এতে নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
আরও পড়ুন: ঘাটাইলে মেছোবাঘের আতঙ্কে শতাধিক পরিবার, স্থানীয়দের মধ্যে ভীতি
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব এডভোকেট মো. বাবুল হোসেন বলেন, খুলনার বর্তমান সময়ের অন্যতম প্রধান সমস্যা সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক কারবার। এসব অপরাধ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। নগরবাসীও এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি চান।
খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. লোকমান হোসেন জানান, ডায়াগনস্টিক সেন্টারটির দায়িত্বে থাকা এক ব্যক্তিকে মাসখানেক আগে ফোন করে দুর্বৃত্তরা নুর আজিমকে চেনেন কি না, জানতে চেয়েছিল। এরপর শনিবার তারা প্রতিষ্ঠানটিতে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। হামলাকারীদের শনাক্ত করা হয়েছে।
তিনি আরো জানান, অভিযুক্তরা নুর আজিমের অনুসারী একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্য। তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক দল মাঠে রয়েছে, অভিযানও চলছে।
আরও পড়ুন: বরিশালে ইসলামী আন্দোলনের সমর্থিত প্রার্থীদের নাম ঘোষণা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন